চীনে সি চিনপিংয়ের শাসনামলে সংস্কারের যুগের অবসান ঘটেছে। এই বিষয়টি খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। তবে অনেকের কাছে যা সত্যিই আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে তা হলো, সি চিনপিং নিজেই ক্রমাগত এই কথাটি প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছেন। গত ১ জুলাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্যাপন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বিপ্লব, গঠন, সংস্কার এবং নতুন যুগ”-এর এই মহান অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পার্টি জনগণকে অগণিত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সফলভাবে চীনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্রের পথ উন্মোচন ও তা বজায় রেখেছে। তার এই একটি বাক্য কার্যত একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যার সোজা অর্থ হলো– চীনের সংস্কারের যুগের অবসান ঘটেছে।
অবশ্যই সি চিনপিং এই ধরনের শব্দচয়ন বা সূত্র প্রথমবার ব্যবহার করেননি, বরং এটি সিসিপির ইতিহাসের এক বিশাল আখ্যানের মধ্যে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তার একটি সুপরিকল্পিত নকশা। ২০২১ সালের পার্টির শতবর্ষ উদ্যাপন ভাষণ এবং সিসিপির তৃতীয় ঐতিহাসিক প্রস্তাবেই সি চিনপিং পার্টির ইতিহাসকে চারটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করেন– বিপ্লব, গঠন, সংস্কার ও নতুন যুগ। এবার তিনি সেই একই আখ্যানকে আরও সংক্ষিপ্ত ও সংকুচিত ভাষায় পুনরুল্লেখ করেছেন এবং এটিকে সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের সিলমোহর দিয়েছেন।
সি চিনপিং-এর হিসাব অনুযায়ী, বিপ্লবী পর্যায়টি শুরু হয় ১৯২১ সালে পার্টির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং তা স্থায়ী হয় ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত। এরপর গঠন বা নির্মাণের পর্যায়টি ১৯৪৯ থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৮ সালে সংস্কারের সূচনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর সংস্কারের মূল পর্যায়টি ১৯৭৮ থেকে শুরু করে ২০১২ সালে সি চিনপিং-এর ক্ষমতায় আরোহণ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এর পরবর্তী সময়কাল থেকেই শুরু হয়েছে ‘নতুন যুগ’, যা বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
সিসিপির পুরনো এবং প্রচলিত ঐতিহাসিক আখ্যানে পার্টির ইতিহাসকে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হতো–প্রথমটি হলো বিপ্লবী সময়কাল যখন পার্টি ক্ষমতার জন্য লড়াই করেছিল; দ্বিতীয়টি হলো বিজয়ের পর সমাজতান্ত্রিক গঠনের সময়কাল; এবং তৃতীয়টি হলো দেং শিয়াওপিংয়ের অধীনে শুরু হওয়া সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের যুগ। এই শেষ পর্যায়টিকে এতদিন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে চলমান, এমনকি স্থায়ী বা চিরন্তন হিসেবে বর্ণনা করা হতো। সি চিনপিং নিজেও অতীতে বারবার বলেছেন যে সংস্কার সবসময় ‘পথেই চলমান’ থাকে। ফলস্বরূপ বহু মানুষের মনে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে সংস্কারের এই যুগটি আসলে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং এর কোনো নির্দিষ্ট শেষ সীমানা নেই।
কিন্তু সি চিনপিং সংস্কারের সেই পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যান থেকে একটি সম্পূর্ণ পৃথক অংশ কেটে বের করার ব্যাপারে জেদ ধরেছেন এবং ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সময়টিকে ‘নতুন যুগ’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তার মূল উদ্দেশ্য হলো সিসিপি-কে নতুন রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের কাজ ও অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরা এবং নিজের পূর্বসূরি জিয়াং জেমিন ও হু জিনতাও, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দেং শিয়াওপিংয়ের থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা। সিসিপির রাজনীতিতে ঐতিহাসিক আমল বা পর্যায়গুলোর বিভাজন এবং নামকরণ কখনোই কেবল ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে ঘটে না। এগুলো সবসময় ক্ষমতার রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। যে নেতাই কোনো নির্দিষ্ট যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন, পার্টির ইতিহাসে তিনি এক অপরিবর্তনীয় ও অনন্য স্থান দখল করে নেন।
মাও সেতুং একাই বিপ্লব এবং গঠনের পর্যায়ের একচ্ছত্র মালিক, তা কেবল এই কারণে নয় যে তিনি ওই সময়গুলোতে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। বরং এই কারণে যে তাকেই এই পর্যায়গুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও মাও সেতুং গঠন বা নির্মাণ যুগে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো মারাত্মক ও বিপর্যয়কর ভুল করেছিলেন– যা চীনের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসেও আংশিকভাবে স্বীকৃত– তবুও তা কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল ইতিহাসে এই দুটি যুগের আখ্যানকে মাও সেতুংয়ের নামের অধীনে রাখতে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি।
তবে দেং শিয়াওপিং সংস্কার যুগের গৌরবকে মাও সেতুংয়ের মতো অতটা একচ্ছত্রভাবে নিজের নামে ধরে রাখতে পারেননি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেংকে চীনের সংস্কারের প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি যে পথটির নকশা করেছিলেন তা সিসিপি-কে এক দ্বিতীয় বৈধতার উৎস এনে দিয়েছিল এবং চীনের সংস্কার, উন্মুক্তকরণ ও আধুনিকায়নের প্রধান স্থপতি হিসেবে তিনি প্রশংসিত হন। কিন্তু সংস্কারের এই যুগটি কেবল দেং শিয়াওপিংয়ের একার সম্পত্তি হতে পারে না; এটিকে জিয়াং জেমিন এবং হু জিনতাওয়ের সাথে ভাগ করে নিতে হয়, যাদের আমলে চীনের বাজার সংস্কার এবং বিশ্বায়ন আরও গভীরতর হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যানে এই দুই নেতাই চীনের সংস্কারের পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ফলস্বরূপ সংস্কারের গৌরব এই তিন নেতার মধ্যেই বণ্টিত হয়, যদিও তাদের মধ্যে দেং শিয়াওপিংয়ের স্থানটি যে সবার ওপরে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর বিপরীতে ‘নতুন যুগ’-এর ওপর কেবল এবং কেবলমাত্র সি চিনপিং-এর একক অধিকার রয়েছে।
২০১২ সালে নিজের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শুরু হওয়া সময়কালটিকে ‘নতুন যুগ’ নাম দেওয়ার মাধ্যমে সি চিনপিং স্পষ্টভাবেই নিজের ঐতিহাসিক অর্জন ও মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছেন। তিনি চান না যে ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকেরা তাকে কেবল সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের একটি ধারাবাহিক অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করুক। কিংবা দেংয়ের পর সাধারণ একজন নেতা বা জিয়াং ও হু-র পর কেবল আরেকজন সাধারণ জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে গণ্য করুক। তিনি ইতিহাসের পাতায় নিজের নামে একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতন্ত্র যুগের সৃষ্টি করতে চান।
আর তিনি কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা ছাড়াই এটি করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ পার্টিকে নিজের মতো করে পুনর্গঠন করার মাধ্যমে তিনি মাও সেতুংয়ের পর চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতায় পরিণত হতে পেরেছেন। সিসিপির ইতিহাসের এই চার-পর্যায়ের বিভাজন মূলত ক্ষমতারই একটি আখ্যান। বিপ্লব, গঠন ও সংস্কারের পাশাপাশি নতুন যুগকে স্থান দিয়ে সি চিনপিং এমন এক ঐতিহাসিক মঞ্চ তৈরি করেছেন যা তাকে আর অন্য কোনো নেতার সাথে ভাগ করে নিতে হবে না। তার নিজস্ব প্রত্যাশা এখানে অত্যন্ত পরিষ্কার– পার্টির ইতিহাসে তিনি নিজেকে মাও সেতুংয়ের ঠিক পরেই স্থান দিতে চান, তবে দেং শিয়াওপিংয়ের আগে।
আপাতত সি চিনপিং এখনো মাও সেতুংয়ের ঐতিহাসিক অবস্থানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখাননি। কারণ মাও এখনো এমন একজন নেতা যার ছবি চীনের সমস্ত মুদ্রা বা ব্যাংক নোটে রয়েছে এবং যার বিশাল প্রতিকৃতি বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারের ওপর এখনো সগৌরবে ঝুলছে। তাছাড়া মাও সেতুংয়ের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো প্রয়োজনও তার নেই। তার আসল কাজ ও লক্ষ্য হলো দেং শিয়াওপিংকে ছাড়িয়ে যাওয়া। দেং শিয়াওপিং সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ শুরু করেছিলেন এবং চীন কীভাবে ধনী হতে পারে সেই প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন। এর বিপরীতে সি চিনপিং সমাধান করতে চান যে চীন কীভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সি চিনপিং-এর ঐতিহাসিক কল্পনায় বা চিন্তাধারায় সম্পদের চেয়ে শক্তি বা প্রতিপত্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সি চিনপিং-এর অধীনে এই নতুন যুগ মূলত পার্টির ইতিহাসকে একটি চতুর্থ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। ঠিক যেভাবে গঠনের যুগটি বিপ্লবী যুগকে প্রতিস্থাপিত করেছিল এবং সংস্কারের যুগটি গঠনের যুগকে সরিয়ে দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে এই নতুন যুগটি সংস্কারের যুগকে প্রতিস্থাপন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সি চিনপিং নিজেকে সংস্কার যুগের সাধারণ একজন উত্তরাধিকারী থেকে রূপান্তর করে এর সমাপ্তি ঘোষণাকারী এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। এর ফলে পার্টির প্রতি তার অবদানকে মাও সেতুংয়ের কাছাকাছি একটি স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
যদিও সি চিনপিং সংস্কারের যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তার মানে এই নয় যে, এই নতুন যুগে কোনো সংস্কার হবে না। বা চীনা নেতৃত্ব সংস্কার নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেবে। বরং এর ঠিক উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে– প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে এখনো অত্যন্ত জোরেশোরে সংস্কারের প্রচার চালানো হচ্ছে। সিসিপির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় প্লেনাম থেকে আরও বিস্তৃতভাবে সংস্কারকে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জারি করা হয়েছে। তবে বাইরের বিশ্বের দর্শকদের এটি বোঝা জরুরি যে, এখন এই একই ‘সংস্কার’ শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অর্থ বহন করছে।
আজকের দিনে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় যে ‘সংস্কার কথাটি বলা হচ্ছে, তা মূলত নতুন যুগের ভেতরের সংস্কার, যা সি চিনপিং-এর নিজস্ব মূল্যবোধের অধীনে পরিচালিত, এটি কোনো ঐতিহাসিক স্বতন্ত্র পর্যায় হিসেবে সংস্কার নয়। এটি এখন একটি যান্ত্রিক বা কৌশলগত সংস্কার, রাজনৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কোনো স্বাধীন সংস্কার নয়। একসময় সংস্কার নিজেই ছিল রাজনৈতিক বৈধতার মূল ভিত্তি, সরকারের শাসন নীতির প্রধান নাম এবং একটি গোটা যুগের প্রধান নির্দেশক। সংস্কার শব্দটির নিজস্ব একটি উদ্দেশ্য ও সত্তা ছিল; এটি নিজেই একটি স্বাধীন মূল্যবোধ হিসেবে কাজ করত। এর বিপরীতে নতুন যুগের ভেতরের সংস্কার এখন কেবলই একটি হাতিয়ার বা মাধ্যম মাত্র, যা নতুন যুগের লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য একটি নীতিগত কৌশল হিসেবে কাজ করে। এটি এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা, পার্টির নেতৃত্ব এবং সি চিনপিং-এর দেওয়া চীনা আধুনিকায়নের সংজ্ঞার অধীনে সম্পূর্ণ অধীনস্থ।
বিগত এক দশকে চীনের সরকারের মেজাজ, স্বভাব ও চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন আসা সত্ত্বেও তারা ক্রমাগত সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করে চলেছে। অতীতে সংস্কারের যুগে যেসব স্লোগানের ওপর জোর দেওয়া হতো তা ছিল মূলত ‘মনোভাবের মুক্তি ঘটানো’ এবং ‘পাথর ছুঁয়ে নদী পার হওয়া’, যেখানে উন্নয়নকে সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে রাখা নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিছু মানুষকে প্রথমে ধনী হওয়ার সুযোগ দেওয়া, বাইরের বিশ্বের জন্য দরজা উন্মুক্ত করা, পশ্চিমের কাছ থেকে শেখা এবং বিশ্বব্যবস্থার সাথে একীভূত হওয়াই ছিল সেই সময়ের ভাষা।
অন্যদিকে নতুন যুগের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে– এটি কথা বলে পার্টির ব্যাপক ও সর্বাত্মক নেতৃত্ব, নিরাপত্তা, সংগ্রাম, আত্মনির্ভরশীলতা, সাধারণ সমৃদ্ধি, চীনা ধাঁচের আধুনিকায়ন, প্রাচ্যের উদয় ও পাশ্চাত্যের পতন এবং এক শতাব্দীতেও না দেখা বৈশ্বিক পরিবর্তনের বিষয়ে। এর মধ্যে একটি নীতি চীনকে বদ্ধ অবস্থা থেকে উন্মুক্ততার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, আর অন্যটি চীনকে উন্মুক্ততা থেকে পুনরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একটি নীতি বাজার ও সমাজকে তাদের নিজস্ব শক্তি ও স্বাধীনতা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিল, আর অন্য নীতিটি সমাজ ও বাজারকে পুনরায় পার্টির কঠোর শৃঙ্খলা ও আদেশের অধীনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার ছিল মূলত মাও যুগের কঠোরতা থেকে এক প্রকার পশ্চাদপসরণ বা পিছু হটা। সেটি ছিল এই বিষয়ের একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি যে, পুরনো ব্যবস্থা আর এভাবে চলতে পারে না এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রগুলোকে রাজনীতি ও কঠোর মতাদর্শের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন। এর ঠিক বিপরীতে সি চিনপিং-এর সংস্কার হলো দেংয়ের পর যেসব ক্ষমতা, সম্পদ ও মুক্ত জায়গা সমাজ ও বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে পুনরায় কেড়ে নেওয়া এবং সেগুলোকে আবার পার্টির কেন্দ্রীয় ও একক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে আসা। সুতরাং 'সংস্কার' শব্দটি রয়ে গেলেও সংস্কারের মূল আত্মাটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সংস্কারের সেই সোনালী যুগটিকে সি চিনপিং এখন সিলমোহর দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন এবং চীনের ইতিহাসের পাতায় চিরতরে লিখে দিয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যানে বা রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে এটিকে এখনো হয়তো স্মরণ করা হবে, কিন্তু এটি আর কোনোভাবেই চীনের বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত বা পরিচালনা করবে না। চীনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে ‘নতুন যুগ’ দ্বারা সংজ্ঞায়িত এবং এই নতুন যুগটি কেবল এবং কেবলমাত্র সি চিনপিং-এর একক ক্ষমতার প্রতীক।
দেং ইউওয়েন:চীনা লেখক ও গবেষক
(এই লেখাটি ওয়াশিংটনভিত্তিক বিখ্যাত সাময়িকী ফরেন পলিসি-র সৌজন্যে)
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
চীনে সি চিনপিংয়ের শাসনামলে সংস্কারের যুগের অবসান ঘটেছে। এই বিষয়টি খুব একটা আশ্চর্যজনক নয়। তবে অনেকের কাছে যা সত্যিই আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে তা হলো, সি চিনপিং নিজেই ক্রমাগত এই কথাটি প্রকাশ্যে বলে যাচ্ছেন। গত ১ জুলাই চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্যাপন অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “বিপ্লব, গঠন, সংস্কার এবং নতুন যুগ”-এর এই মহান অনুশীলনের মধ্য দিয়ে পার্টি জনগণকে অগণিত প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং সফলভাবে চীনা বৈশিষ্ট্যযুক্ত সমাজতন্ত্রের পথ উন্মোচন ও তা বজায় রেখেছে। তার এই একটি বাক্য কার্যত একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যার সোজা অর্থ হলো– চীনের সংস্কারের যুগের অবসান ঘটেছে।
অবশ্যই সি চিনপিং এই ধরনের শব্দচয়ন বা সূত্র প্রথমবার ব্যবহার করেননি, বরং এটি সিসিপির ইতিহাসের এক বিশাল আখ্যানের মধ্যে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তার একটি সুপরিকল্পিত নকশা। ২০২১ সালের পার্টির শতবর্ষ উদ্যাপন ভাষণ এবং সিসিপির তৃতীয় ঐতিহাসিক প্রস্তাবেই সি চিনপিং পার্টির ইতিহাসকে চারটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করেন– বিপ্লব, গঠন, সংস্কার ও নতুন যুগ। এবার তিনি সেই একই আখ্যানকে আরও সংক্ষিপ্ত ও সংকুচিত ভাষায় পুনরুল্লেখ করেছেন এবং এটিকে সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের সিলমোহর দিয়েছেন।
সি চিনপিং-এর হিসাব অনুযায়ী, বিপ্লবী পর্যায়টি শুরু হয় ১৯২১ সালে পার্টির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এবং তা স্থায়ী হয় ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত। এরপর গঠন বা নির্মাণের পর্যায়টি ১৯৪৯ থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৮ সালে সংস্কারের সূচনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আর সংস্কারের মূল পর্যায়টি ১৯৭৮ থেকে শুরু করে ২০১২ সালে সি চিনপিং-এর ক্ষমতায় আরোহণ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এর পরবর্তী সময়কাল থেকেই শুরু হয়েছে ‘নতুন যুগ’, যা বর্তমান সময় পর্যন্ত চলমান রয়েছে।
সিসিপির পুরনো এবং প্রচলিত ঐতিহাসিক আখ্যানে পার্টির ইতিহাসকে সাধারণত তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হতো–প্রথমটি হলো বিপ্লবী সময়কাল যখন পার্টি ক্ষমতার জন্য লড়াই করেছিল; দ্বিতীয়টি হলো বিজয়ের পর সমাজতান্ত্রিক গঠনের সময়কাল; এবং তৃতীয়টি হলো দেং শিয়াওপিংয়ের অধীনে শুরু হওয়া সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের যুগ। এই শেষ পর্যায়টিকে এতদিন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রে চলমান, এমনকি স্থায়ী বা চিরন্তন হিসেবে বর্ণনা করা হতো। সি চিনপিং নিজেও অতীতে বারবার বলেছেন যে সংস্কার সবসময় ‘পথেই চলমান’ থাকে। ফলস্বরূপ বহু মানুষের মনে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে সংস্কারের এই যুগটি আসলে অত্যন্ত দীর্ঘ এবং এর কোনো নির্দিষ্ট শেষ সীমানা নেই।
কিন্তু সি চিনপিং সংস্কারের সেই পুরনো প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যান থেকে একটি সম্পূর্ণ পৃথক অংশ কেটে বের করার ব্যাপারে জেদ ধরেছেন এবং ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সময়টিকে ‘নতুন যুগ’ হিসেবে নামকরণ করেছেন। তার মূল উদ্দেশ্য হলো সিসিপি-কে নতুন রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের কাজ ও অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরা এবং নিজের পূর্বসূরি জিয়াং জেমিন ও হু জিনতাও, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে দেং শিয়াওপিংয়ের থেকেও নিজেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা। সিসিপির রাজনীতিতে ঐতিহাসিক আমল বা পর্যায়গুলোর বিভাজন এবং নামকরণ কখনোই কেবল ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে ঘটে না। এগুলো সবসময় ক্ষমতার রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। যে নেতাই কোনো নির্দিষ্ট যুগের প্রতিনিধিত্ব করেন, পার্টির ইতিহাসে তিনি এক অপরিবর্তনীয় ও অনন্য স্থান দখল করে নেন।
মাও সেতুং একাই বিপ্লব এবং গঠনের পর্যায়ের একচ্ছত্র মালিক, তা কেবল এই কারণে নয় যে তিনি ওই সময়গুলোতে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। বরং এই কারণে যে তাকেই এই পর্যায়গুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। যদিও মাও সেতুং গঠন বা নির্মাণ যুগে গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মতো মারাত্মক ও বিপর্যয়কর ভুল করেছিলেন– যা চীনের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসেও আংশিকভাবে স্বীকৃত– তবুও তা কমিউনিস্ট পার্টির রক্ষণশীল ইতিহাসে এই দুটি যুগের আখ্যানকে মাও সেতুংয়ের নামের অধীনে রাখতে কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি।
তবে দেং শিয়াওপিং সংস্কার যুগের গৌরবকে মাও সেতুংয়ের মতো অতটা একচ্ছত্রভাবে নিজের নামে ধরে রাখতে পারেননি। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেংকে চীনের সংস্কারের প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি যে পথটির নকশা করেছিলেন তা সিসিপি-কে এক দ্বিতীয় বৈধতার উৎস এনে দিয়েছিল এবং চীনের সংস্কার, উন্মুক্তকরণ ও আধুনিকায়নের প্রধান স্থপতি হিসেবে তিনি প্রশংসিত হন। কিন্তু সংস্কারের এই যুগটি কেবল দেং শিয়াওপিংয়ের একার সম্পত্তি হতে পারে না; এটিকে জিয়াং জেমিন এবং হু জিনতাওয়ের সাথে ভাগ করে নিতে হয়, যাদের আমলে চীনের বাজার সংস্কার এবং বিশ্বায়ন আরও গভীরতর হয়েছিল। প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যানে এই দুই নেতাই চীনের সংস্কারের পথে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। ফলস্বরূপ সংস্কারের গৌরব এই তিন নেতার মধ্যেই বণ্টিত হয়, যদিও তাদের মধ্যে দেং শিয়াওপিংয়ের স্থানটি যে সবার ওপরে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এর বিপরীতে ‘নতুন যুগ’-এর ওপর কেবল এবং কেবলমাত্র সি চিনপিং-এর একক অধিকার রয়েছে।
২০১২ সালে নিজের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শুরু হওয়া সময়কালটিকে ‘নতুন যুগ’ নাম দেওয়ার মাধ্যমে সি চিনপিং স্পষ্টভাবেই নিজের ঐতিহাসিক অর্জন ও মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাইছেন। তিনি চান না যে ভবিষ্যতের ঐতিহাসিকেরা তাকে কেবল সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের একটি ধারাবাহিক অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করুক। কিংবা দেংয়ের পর সাধারণ একজন নেতা বা জিয়াং ও হু-র পর কেবল আরেকজন সাধারণ জেনারেল সেক্রেটারি হিসেবে গণ্য করুক। তিনি ইতিহাসের পাতায় নিজের নামে একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব ও স্বতন্ত্র যুগের সৃষ্টি করতে চান।
আর তিনি কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা ছাড়াই এটি করতে সক্ষম হয়েছেন। কারণ পার্টিকে নিজের মতো করে পুনর্গঠন করার মাধ্যমে তিনি মাও সেতুংয়ের পর চীনের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতায় পরিণত হতে পেরেছেন। সিসিপির ইতিহাসের এই চার-পর্যায়ের বিভাজন মূলত ক্ষমতারই একটি আখ্যান। বিপ্লব, গঠন ও সংস্কারের পাশাপাশি নতুন যুগকে স্থান দিয়ে সি চিনপিং এমন এক ঐতিহাসিক মঞ্চ তৈরি করেছেন যা তাকে আর অন্য কোনো নেতার সাথে ভাগ করে নিতে হবে না। তার নিজস্ব প্রত্যাশা এখানে অত্যন্ত পরিষ্কার– পার্টির ইতিহাসে তিনি নিজেকে মাও সেতুংয়ের ঠিক পরেই স্থান দিতে চান, তবে দেং শিয়াওপিংয়ের আগে।
আপাতত সি চিনপিং এখনো মাও সেতুংয়ের ঐতিহাসিক অবস্থানকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখাননি। কারণ মাও এখনো এমন একজন নেতা যার ছবি চীনের সমস্ত মুদ্রা বা ব্যাংক নোটে রয়েছে এবং যার বিশাল প্রতিকৃতি বেইজিংয়ের তিয়ানানমেন স্কয়ারের ওপর এখনো সগৌরবে ঝুলছে। তাছাড়া মাও সেতুংয়ের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো প্রয়োজনও তার নেই। তার আসল কাজ ও লক্ষ্য হলো দেং শিয়াওপিংকে ছাড়িয়ে যাওয়া। দেং শিয়াওপিং সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ শুরু করেছিলেন এবং চীন কীভাবে ধনী হতে পারে সেই প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন। এর বিপরীতে সি চিনপিং সমাধান করতে চান যে চীন কীভাবে আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সি চিনপিং-এর ঐতিহাসিক কল্পনায় বা চিন্তাধারায় সম্পদের চেয়ে শক্তি বা প্রতিপত্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সি চিনপিং-এর অধীনে এই নতুন যুগ মূলত পার্টির ইতিহাসকে একটি চতুর্থ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। ঠিক যেভাবে গঠনের যুগটি বিপ্লবী যুগকে প্রতিস্থাপিত করেছিল এবং সংস্কারের যুগটি গঠনের যুগকে সরিয়ে দিয়েছিল, ঠিক একইভাবে এই নতুন যুগটি সংস্কারের যুগকে প্রতিস্থাপন করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সি চিনপিং নিজেকে সংস্কার যুগের সাধারণ একজন উত্তরাধিকারী থেকে রূপান্তর করে এর সমাপ্তি ঘোষণাকারী এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছেন। এর ফলে পার্টির প্রতি তার অবদানকে মাও সেতুংয়ের কাছাকাছি একটি স্তরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
যদিও সি চিনপিং সংস্কারের যুগের সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। তার মানে এই নয় যে, এই নতুন যুগে কোনো সংস্কার হবে না। বা চীনা নেতৃত্ব সংস্কার নিয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেবে। বরং এর ঠিক উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে– প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে এখনো অত্যন্ত জোরেশোরে সংস্কারের প্রচার চালানো হচ্ছে। সিসিপির ২০তম কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় প্লেনাম থেকে আরও বিস্তৃতভাবে সংস্কারকে আরও গভীরভাবে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জারি করা হয়েছে। তবে বাইরের বিশ্বের দর্শকদের এটি বোঝা জরুরি যে, এখন এই একই ‘সংস্কার’ শব্দটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অর্থ বহন করছে।
আজকের দিনে প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় যে ‘সংস্কার কথাটি বলা হচ্ছে, তা মূলত নতুন যুগের ভেতরের সংস্কার, যা সি চিনপিং-এর নিজস্ব মূল্যবোধের অধীনে পরিচালিত, এটি কোনো ঐতিহাসিক স্বতন্ত্র পর্যায় হিসেবে সংস্কার নয়। এটি এখন একটি যান্ত্রিক বা কৌশলগত সংস্কার, রাজনৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কোনো স্বাধীন সংস্কার নয়। একসময় সংস্কার নিজেই ছিল রাজনৈতিক বৈধতার মূল ভিত্তি, সরকারের শাসন নীতির প্রধান নাম এবং একটি গোটা যুগের প্রধান নির্দেশক। সংস্কার শব্দটির নিজস্ব একটি উদ্দেশ্য ও সত্তা ছিল; এটি নিজেই একটি স্বাধীন মূল্যবোধ হিসেবে কাজ করত। এর বিপরীতে নতুন যুগের ভেতরের সংস্কার এখন কেবলই একটি হাতিয়ার বা মাধ্যম মাত্র, যা নতুন যুগের লক্ষ্যগুলো পূরণের জন্য একটি নীতিগত কৌশল হিসেবে কাজ করে। এটি এখন রাজনৈতিক ক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা, পার্টির নেতৃত্ব এবং সি চিনপিং-এর দেওয়া চীনা আধুনিকায়নের সংজ্ঞার অধীনে সম্পূর্ণ অধীনস্থ।
বিগত এক দশকে চীনের সরকারের মেজাজ, স্বভাব ও চালচলনে ব্যাপক পরিবর্তন আসা সত্ত্বেও তারা ক্রমাগত সংস্কারের ভাষা ব্যবহার করে চলেছে। অতীতে সংস্কারের যুগে যেসব স্লোগানের ওপর জোর দেওয়া হতো তা ছিল মূলত ‘মনোভাবের মুক্তি ঘটানো’ এবং ‘পাথর ছুঁয়ে নদী পার হওয়া’, যেখানে উন্নয়নকে সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে রাখা নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিছু মানুষকে প্রথমে ধনী হওয়ার সুযোগ দেওয়া, বাইরের বিশ্বের জন্য দরজা উন্মুক্ত করা, পশ্চিমের কাছ থেকে শেখা এবং বিশ্বব্যবস্থার সাথে একীভূত হওয়াই ছিল সেই সময়ের ভাষা।
অন্যদিকে নতুন যুগের ভাষা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে– এটি কথা বলে পার্টির ব্যাপক ও সর্বাত্মক নেতৃত্ব, নিরাপত্তা, সংগ্রাম, আত্মনির্ভরশীলতা, সাধারণ সমৃদ্ধি, চীনা ধাঁচের আধুনিকায়ন, প্রাচ্যের উদয় ও পাশ্চাত্যের পতন এবং এক শতাব্দীতেও না দেখা বৈশ্বিক পরিবর্তনের বিষয়ে। এর মধ্যে একটি নীতি চীনকে বদ্ধ অবস্থা থেকে উন্মুক্ততার দিকে নিয়ে গিয়েছিল, আর অন্যটি চীনকে উন্মুক্ততা থেকে পুনরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একটি নীতি বাজার ও সমাজকে তাদের নিজস্ব শক্তি ও স্বাধীনতা প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিল, আর অন্য নীতিটি সমাজ ও বাজারকে পুনরায় পার্টির কঠোর শৃঙ্খলা ও আদেশের অধীনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।
দেং শিয়াওপিংয়ের সংস্কার ছিল মূলত মাও যুগের কঠোরতা থেকে এক প্রকার পশ্চাদপসরণ বা পিছু হটা। সেটি ছিল এই বিষয়ের একটি পরোক্ষ স্বীকৃতি যে, পুরনো ব্যবস্থা আর এভাবে চলতে পারে না এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রগুলোকে রাজনীতি ও কঠোর মতাদর্শের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা প্রয়োজন। এর ঠিক বিপরীতে সি চিনপিং-এর সংস্কার হলো দেংয়ের পর যেসব ক্ষমতা, সম্পদ ও মুক্ত জায়গা সমাজ ও বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে পুনরায় কেড়ে নেওয়া এবং সেগুলোকে আবার পার্টির কেন্দ্রীয় ও একক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে আসা। সুতরাং 'সংস্কার' শব্দটি রয়ে গেলেও সংস্কারের মূল আত্মাটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সংস্কারের সেই সোনালী যুগটিকে সি চিনপিং এখন সিলমোহর দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছেন এবং চীনের ইতিহাসের পাতায় চিরতরে লিখে দিয়েছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক আখ্যানে বা রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে এটিকে এখনো হয়তো স্মরণ করা হবে, কিন্তু এটি আর কোনোভাবেই চীনের বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত বা পরিচালনা করবে না। চীনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে ‘নতুন যুগ’ দ্বারা সংজ্ঞায়িত এবং এই নতুন যুগটি কেবল এবং কেবলমাত্র সি চিনপিং-এর একক ক্ষমতার প্রতীক।
দেং ইউওয়েন:চীনা লেখক ও গবেষক
(এই লেখাটি ওয়াশিংটনভিত্তিক বিখ্যাত সাময়িকী ফরেন পলিসি-র সৌজন্যে)