সরকারি দল স্বাভাবিকভাবেই সরকারি নীতিকে পাস করাতে চায়, সেটির মান্যতাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী দলের কাজ হলো, নানা প্রশ্নে জেরবার করে, যৌক্তিক বিরোধিতার মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলকে স্বেচ্ছাচারী হতে না দেওয়া।
অর্ণব সান্যাল

বিরোধী শব্দটি শুনলে আপনাদের চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? বা কী মনে হয়, বলুন তো?
হ্যাঁ, একদল মানুষ কোমর বেঁধে বিরোধিতা করছে, স্লোগান দিচ্ছে–এমনটা অনেকের মানসপটে আঁকা হয়ে যেতে পারে। যেহেতু বিরোধিতা বলতে আমাদের এই দেশে অনেকাংশে শুধু বিরোধিতা করে যাওয়াকেই বোঝানো হয়, তাই এ রকম ভাবাটা অযৌক্তিক কিছু নয়। এ দেশের অনেকে অবশ্য বিরোধিতা বলতে শুধু ঝগড়া করাকেও বোঝে। সেক্ষেত্রে তাই ডানে গেলেও বিরোধিতা হয়, বামে গেলেও হয়। কিন্তু সমাধান আর কেউ খোঁজে না।
বিরোধী–পদের হিসেবে এটি বিশেষণ। আভিধানিকভাবে এর অর্থ হলো, বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল। কূলের বিরুদ্ধে বা স্রোতের বিপরীতে যেতে থাকলেও বিরোধী তকমা পাওয়া যায়। আর এমনটা করাকেই বলে বিরোধিতা।
এই বিরোধিতা নানাভাবে করা যায়। একটি হলো যৌক্তিক উপায়ে। আরেকটি হলো অযৌক্তিক উপায়ে যেকোনো কিছুতেই বিরোধিতার ঝান্ডা তুলে ধরা। গণতন্ত্রে রাজনীতিসহ অন্য যেকোনো বিষয়ে বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে গঠনমূলক পথে হাঁটার একটা তাগিদ থাকে। গণতন্ত্র তাত্ত্বিকভাবেই এমন। এই কারণেই এ পন্থার নাম গণের তন্ত্র।
আমাদের দেশেও বর্তমানে এই তন্ত্রই চলছে। মাঝে গণ অনুপস্থিত ছিল দুই বছর। এখন আবার নির্বাচনের পর তা ফিরে এসেছে। আর এই গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম প্রধান শর্তই হলো, পার্লামেন্ট বা সংসদে জনপ্রতিনিধিদের আলোচনা। জনপ্রতিনিধি ক্ষমতাসীন দল থেকেও হয়, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও হয়। তাই সংসদে সরকারি দল থাকে, বিরোধী দলও থাকে।

সরকারি দল স্বাভাবিকভাবেই সরকারি নীতিকে পাস করাতে চায়, সেটির মান্যতাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী দলের কাজ হলো, নানা প্রশ্নে জেরবার করে, যৌক্তিক বিরোধিতার মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলকে স্বেচ্ছাচারী হতে না দেওয়া। একইসাথে একটি গঠনমূলক সমাধানের পথও খুলতে হয় বা সেদিকে এগিয়ে যেতে হয় অন্তত। এভাবেই একটা ভারসাম্য আসার সম্ভাবনা থাকে, নইলে শাসনকাঠামো আর ঠিক পথে থাকে না।
অথচ, আমাদের দেশে এখন বিরোধীদল কেন জানি সঠিক ও গঠনমূলক বিরোধিতার বদলে আশপাশের অন্য অনেক কিছু নিয়ে কথা বলছে সংসদে। কী রকম? চলুন, কিছু উদাহরণ দেখা যাক।
উদাহরণ ১
এবারের সংসদে যাওয়ার আগ থেকেই বেশ আলোচিত ছিলেন আমির হামজা। কথিত ইসলামী বক্তা হিসেবে তিনি নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের পরিচিত মুখ। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন আমির হামজা।
বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে কিছু মন্তব্য করেন আমির হামজা। বাজেট নিয়েই। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু আমির হামজা বলেন, বাজেটের আকার এত বড় হওয়া উচিত হয়নি।

আমির হামজা ওই সময় আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। ঘাটতি থেকে যাবে। চাহিদা পূরণ হবে না। একই সাথে গত ৫৫ বছরের ধারাবাহিকতায় একটি গতানুগতিক বাজেট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এই এমপি।
আমির হামজা তখন আরো বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হলে ভালো হতো। এরপর আবার বলেন, বাজেটের আকার ৬০০ কোটি টাকা হলেও হতো। পরে আবার বলেন, বাজেটের আকার ৬০০০ কোটি টাকা হলে ভালো হতো।
আমির হামজা পরে অবশ্য দাবি করেন, তিনি বলতে চেয়েছিলেন ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন।
যদিও ওই ভিডিওতে (যা পরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে) শুরুর দিকেই দেখা যায় যে, একজন সহকারীর কাছ থেকেই বাজেটের আকার যে ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে, তা তিনি জেনে নিচ্ছেন। এরপরই আমির হামজা ২০০, ৬০০ বা ৬০০০ কোটি টাকা-সংক্রান্ত মন্তব্য করেন।
উদাহরণ ২
গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান নিয়ে কিছু দাবি করেন।
জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই–চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জনের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা।” তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকদের একজন, কিন্তু আমি আজকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই কেউ কেউ অনেক কিছু বলে ফেলে।”
এই এমপির বক্তব্য সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে জানা যায়, তিনি নির্বাচনী হলফনামায় জানিয়েছেন, তার জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া এ সংসদ সদস্যের বাবা ১৯৭১ সালে ‘শহীদ’ হন কীভাবে? এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসও ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিয়ে চরচাকে সংসদ সদস্য মুনতাকিম বলেন, ‘‘আমার কথা বলতে গিয়ে স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে।” তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ কি না–জানতে চাইলে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘না, ওইটা স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে। আমার বাবা এখনো বেঁচে আছেন। আমার আব্বা আলহামদুলিল্লাহ, সুস্থ আছেন।”

হলফনামায় দেওয়া তার জন্মবৃত্তান্ত সঠিক কি না–জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মুনতাকিম বলেন, ‘‘হ্যাঁ, সেটাই সত্যি। আমি ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেছি।” পরিবারে কতজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আছে–এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
নীলফামারীর এই সংসদ সদস্য বলেন, “আমার বক্তব্যে অসাবধানতাবশত ভুল হয়ে গিয়েছে।” এ নিয়ে স্পিকার বরাবর সংশোধনী দেওয়ারও দাবি করেছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত এপ্রিল মাসে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করেছিলেন।
উদাহরণ ৩
বাজেট অধিবেশনেরই আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চান।
মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনও ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে এ নিয়ে সরব হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলও। নিন্দুকদের বক্তব্য, জনগণের বদলে নিজেদের সুবিধা দেখতেই বেশি মনযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে।
উদাহরণ ৪
জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ের অবৈতনিক শিক্ষা নিয়ে একটি প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকা। তিনি বলেন, “একটা জিনিস অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, গত তিন দশক ধরেই নারী শিক্ষার ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং নারীরা শিক্ষায় বেশ এগিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, শুধু কি নারীরাই এ দেশের নাগরিক, মেয়েরাই এদেশের নাগরিক? ছেলেরা নয়? তাহলে ছেলে, মেয়ে উভয়ের যদি অধিকার সমান হয়, তাহলে কেন ছেলেদের শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হচ্ছে না?”
আপাতত চলুন, এই চারটি উদাহরণ নিয়েই ভাবা যাক। বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে ওঠা এসব মন্তব্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক আসলে? কতটা নাগরিক দুর্ভোগ-সংক্রান্ত? কতটা সাধারণ মানুষের কল্যাণসাধনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত? কতটা দায়িত্বশীল বলে বোধ হয়?
ধরুন, জামায়াতের নারী এমপি যখন সংসদে মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার তুলনা করে ছেলেদের অবৈতনিক শিক্ষার দাবি তুলছেন, তখন কি তিনি মনে রাখছেন যে, কেন মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা সরকার করেছিল? সমানাধিকারের প্রশ্নে? নাকি পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে এনে পুরুষদের কাছাকাছি করতে? তা, এমন প্রশ্ন তোলার আগে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য কি বোঝার চেষ্টা করেছেন, কেন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হয়েছে?
অন্য তিনটি উদাহরণের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে যে, এর অন্তত দুটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ বা ব্যক্তিগত চাহিদা দাবি। আরেকটি বুঝিয়ে দেয় যে, আইন প্রণয়নের জন্য সংসদে যাওয়া আইনপ্রণেতা সংসদে উত্থাপিত বিষয়ই ঠিকমতো জানেন না। অথচ এই আইনপ্রণেতাদের পেছনেই নাগরিকদের করের টাকা ব্যয় হচ্ছে। আর এমন ধরনের আইনপ্রণেতারা যখন বিরোধীদলীয় হন, তখন হতাশ বোধ করা ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সংসদীয় অধিকার নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, লোডশেডিং, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার বদলে এমপিদের ওয়াশিং মেশিন বা ওভেন পাওয়া নিয়ে আলাপ তোলেন, তাও বাজেট অধিবেশনে, তখন আর কেমন বোধ হওয়া উচিত বলুন তো? আনন্দ নিশ্চয়ই লাগার কথা না, আর যাই হোক!

অথচ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে প্রশ্নের মুখে রাখার জন্য সংসদে সরাসরি এবং সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৯০। কিন্তু জামায়াত, এনসিপির কোনো সংসদ সদস্য অর্থ বিলে সংশোধনী প্রস্তাব দেননি। অথচ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত হওয়া নিয়ে সংসদে তাদের অনেক বক্তব্য শোনা গেছে। তবে কি এই বিরোধী দল সব মানুষের হয়ে কথা বলতে সংসদে যায়নি?
এমন প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক নয়, অস্বাভাবিকও নয়। বিশেষ করে ওপরের উদাহরণগুলো যখন সামনে আসে, তখন বিরোধী দলের সক্ষমতা বা জনতার উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এসব প্রশ্নের ধারাবাহিকতায় আরও একটি চিন্তাও তখন সাধারণের মাথায় খেলা করতে পারে। সেটি হলো–এমন ঘরানার বিরোধী দলের কাজটা কী আসলে!
সুতরাং, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর। বিশেষ করে যারা সংসদে আছেন, তাদের তো আরও বেশি। কারণ, কোনোভাবে যদি বিরোধী দল নিজেদের জনতার কাছে অপ্রাসঙ্গিক বা অহেতুক হিসেবে প্রমাণ করে ফেলে, তখন কিন্তু আমও যাবে, যাবে ছালাও!
অবশ্য সবচেয়ে বেশি বিপদ হবে আসলে এই বাংলার মানুষেরই। যদিও সাধারণ মানুষের কথা আর কেইবা ভাবে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

বিরোধী শব্দটি শুনলে আপনাদের চোখের সামনে কী ভেসে ওঠে? বা কী মনে হয়, বলুন তো?
হ্যাঁ, একদল মানুষ কোমর বেঁধে বিরোধিতা করছে, স্লোগান দিচ্ছে–এমনটা অনেকের মানসপটে আঁকা হয়ে যেতে পারে। যেহেতু বিরোধিতা বলতে আমাদের এই দেশে অনেকাংশে শুধু বিরোধিতা করে যাওয়াকেই বোঝানো হয়, তাই এ রকম ভাবাটা অযৌক্তিক কিছু নয়। এ দেশের অনেকে অবশ্য বিরোধিতা বলতে শুধু ঝগড়া করাকেও বোঝে। সেক্ষেত্রে তাই ডানে গেলেও বিরোধিতা হয়, বামে গেলেও হয়। কিন্তু সমাধান আর কেউ খোঁজে না।
বিরোধী–পদের হিসেবে এটি বিশেষণ। আভিধানিকভাবে এর অর্থ হলো, বিরুদ্ধ বা প্রতিকূল। কূলের বিরুদ্ধে বা স্রোতের বিপরীতে যেতে থাকলেও বিরোধী তকমা পাওয়া যায়। আর এমনটা করাকেই বলে বিরোধিতা।
এই বিরোধিতা নানাভাবে করা যায়। একটি হলো যৌক্তিক উপায়ে। আরেকটি হলো অযৌক্তিক উপায়ে যেকোনো কিছুতেই বিরোধিতার ঝান্ডা তুলে ধরা। গণতন্ত্রে রাজনীতিসহ অন্য যেকোনো বিষয়ে বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে অন্ততপক্ষে গঠনমূলক পথে হাঁটার একটা তাগিদ থাকে। গণতন্ত্র তাত্ত্বিকভাবেই এমন। এই কারণেই এ পন্থার নাম গণের তন্ত্র।
আমাদের দেশেও বর্তমানে এই তন্ত্রই চলছে। মাঝে গণ অনুপস্থিত ছিল দুই বছর। এখন আবার নির্বাচনের পর তা ফিরে এসেছে। আর এই গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম প্রধান শর্তই হলো, পার্লামেন্ট বা সংসদে জনপ্রতিনিধিদের আলোচনা। জনপ্রতিনিধি ক্ষমতাসীন দল থেকেও হয়, আবার ক্ষমতার বাইরে থেকেও হয়। তাই সংসদে সরকারি দল থাকে, বিরোধী দলও থাকে।

সরকারি দল স্বাভাবিকভাবেই সরকারি নীতিকে পাস করাতে চায়, সেটির মান্যতাই প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে বিরোধী দলের কাজ হলো, নানা প্রশ্নে জেরবার করে, যৌক্তিক বিরোধিতার মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলকে স্বেচ্ছাচারী হতে না দেওয়া। একইসাথে একটি গঠনমূলক সমাধানের পথও খুলতে হয় বা সেদিকে এগিয়ে যেতে হয় অন্তত। এভাবেই একটা ভারসাম্য আসার সম্ভাবনা থাকে, নইলে শাসনকাঠামো আর ঠিক পথে থাকে না।
অথচ, আমাদের দেশে এখন বিরোধীদল কেন জানি সঠিক ও গঠনমূলক বিরোধিতার বদলে আশপাশের অন্য অনেক কিছু নিয়ে কথা বলছে সংসদে। কী রকম? চলুন, কিছু উদাহরণ দেখা যাক।
উদাহরণ ১
এবারের সংসদে যাওয়ার আগ থেকেই বেশ আলোচিত ছিলেন আমির হামজা। কথিত ইসলামী বক্তা হিসেবে তিনি নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের পরিচিত মুখ। পরে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন আমির হামজা।
বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে সংসদের বাইরে সাংবাদিকদের কাছে কিছু মন্তব্য করেন আমির হামজা। বাজেট নিয়েই। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে। কিন্তু আমির হামজা বলেন, বাজেটের আকার এত বড় হওয়া উচিত হয়নি।

আমির হামজা ওই সময় আরও বলেন, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। ঘাটতি থেকে যাবে। চাহিদা পূরণ হবে না। একই সাথে গত ৫৫ বছরের ধারাবাহিকতায় একটি গতানুগতিক বাজেট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন এই এমপি।
আমির হামজা তখন আরো বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হলে ভালো হতো। এরপর আবার বলেন, বাজেটের আকার ৬০০ কোটি টাকা হলেও হতো। পরে আবার বলেন, বাজেটের আকার ৬০০০ কোটি টাকা হলে ভালো হতো।
আমির হামজা পরে অবশ্য দাবি করেন, তিনি বলতে চেয়েছিলেন ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন।
যদিও ওই ভিডিওতে (যা পরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে) শুরুর দিকেই দেখা যায় যে, একজন সহকারীর কাছ থেকেই বাজেটের আকার যে ৯ লাখ কোটি টাকার ওপরে, তা তিনি জেনে নিচ্ছেন। এরপরই আমির হামজা ২০০, ৬০০ বা ৬০০০ কোটি টাকা-সংক্রান্ত মন্তব্য করেন।
উদাহরণ ২
গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধে তার পরিবারের সদস্যদের অবদান নিয়ে কিছু দাবি করেন।
জামায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম সংসদে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন, “আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই–চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জনের ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা।” তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকদের একজন, কিন্তু আমি আজকে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই কেউ কেউ অনেক কিছু বলে ফেলে।”
এই এমপির বক্তব্য সামনে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে জানা যায়, তিনি নির্বাচনী হলফনামায় জানিয়েছেন, তার জন্ম ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি। তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া এ সংসদ সদস্যের বাবা ১৯৭১ সালে ‘শহীদ’ হন কীভাবে? এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাস্যরসও ছড়িয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিয়ে চরচাকে সংসদ সদস্য মুনতাকিম বলেন, ‘‘আমার কথা বলতে গিয়ে স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে।” তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ কি না–জানতে চাইলে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘‘না, ওইটা স্লিপ অব টাং হয়ে গেছে। আমার বাবা এখনো বেঁচে আছেন। আমার আব্বা আলহামদুলিল্লাহ, সুস্থ আছেন।”

হলফনামায় দেওয়া তার জন্মবৃত্তান্ত সঠিক কি না–জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মুনতাকিম বলেন, ‘‘হ্যাঁ, সেটাই সত্যি। আমি ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেছি।” পরিবারে কতজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ আছে–এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারেননি তিনি।
নীলফামারীর এই সংসদ সদস্য বলেন, “আমার বক্তব্যে অসাবধানতাবশত ভুল হয়ে গিয়েছে।” এ নিয়ে স্পিকার বরাবর সংশোধনী দেওয়ারও দাবি করেছিলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত এপ্রিল মাসে সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের নিজেকে ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করেছিলেন।
উদাহরণ ৩
বাজেট অধিবেশনেরই আরেকটি ঘটনা উল্লেখ করা যাক। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চান।
মিজানুর রহমান বলেন, “আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনও ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে এ নিয়ে সরব হয় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলও। নিন্দুকদের বক্তব্য, জনগণের বদলে নিজেদের সুবিধা দেখতেই বেশি মনযোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে।
উদাহরণ ৪
জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ছেলে-মেয়ের অবৈতনিক শিক্ষা নিয়ে একটি প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি ও জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নিসা সিদ্দীকা। তিনি বলেন, “একটা জিনিস অবাক হয়ে লক্ষ্য করছি, গত তিন দশক ধরেই নারী শিক্ষার ওপরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং নারীরা শিক্ষায় বেশ এগিয়েছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন, শুধু কি নারীরাই এ দেশের নাগরিক, মেয়েরাই এদেশের নাগরিক? ছেলেরা নয়? তাহলে ছেলে, মেয়ে উভয়ের যদি অধিকার সমান হয়, তাহলে কেন ছেলেদের শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হচ্ছে না?”
আপাতত চলুন, এই চারটি উদাহরণ নিয়েই ভাবা যাক। বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে ওঠা এসব মন্তব্য কতটুকু প্রাসঙ্গিক আসলে? কতটা নাগরিক দুর্ভোগ-সংক্রান্ত? কতটা সাধারণ মানুষের কল্যাণসাধনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত? কতটা দায়িত্বশীল বলে বোধ হয়?
ধরুন, জামায়াতের নারী এমপি যখন সংসদে মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার তুলনা করে ছেলেদের অবৈতনিক শিক্ষার দাবি তুলছেন, তখন কি তিনি মনে রাখছেন যে, কেন মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা সরকার করেছিল? সমানাধিকারের প্রশ্নে? নাকি পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে এনে পুরুষদের কাছাকাছি করতে? তা, এমন প্রশ্ন তোলার আগে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য কি বোঝার চেষ্টা করেছেন, কেন সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন রাখা হয়েছে?
অন্য তিনটি উদাহরণের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে যে, এর অন্তত দুটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ বা ব্যক্তিগত চাহিদা দাবি। আরেকটি বুঝিয়ে দেয় যে, আইন প্রণয়নের জন্য সংসদে যাওয়া আইনপ্রণেতা সংসদে উত্থাপিত বিষয়ই ঠিকমতো জানেন না। অথচ এই আইনপ্রণেতাদের পেছনেই নাগরিকদের করের টাকা ব্যয় হচ্ছে। আর এমন ধরনের আইনপ্রণেতারা যখন বিরোধীদলীয় হন, তখন হতাশ বোধ করা ছাড়া উপায় থাকে না। কারণ, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সংসদীয় অধিকার নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, লোডশেডিং, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার বদলে এমপিদের ওয়াশিং মেশিন বা ওভেন পাওয়া নিয়ে আলাপ তোলেন, তাও বাজেট অধিবেশনে, তখন আর কেমন বোধ হওয়া উচিত বলুন তো? আনন্দ নিশ্চয়ই লাগার কথা না, আর যাই হোক!

অথচ, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে প্রশ্নের মুখে রাখার জন্য সংসদে সরাসরি এবং সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে জামায়াত জোটের সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৯০। কিন্তু জামায়াত, এনসিপির কোনো সংসদ সদস্য অর্থ বিলে সংশোধনী প্রস্তাব দেননি। অথচ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত হওয়া নিয়ে সংসদে তাদের অনেক বক্তব্য শোনা গেছে। তবে কি এই বিরোধী দল সব মানুষের হয়ে কথা বলতে সংসদে যায়নি?
এমন প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক নয়, অস্বাভাবিকও নয়। বিশেষ করে ওপরের উদাহরণগুলো যখন সামনে আসে, তখন বিরোধী দলের সক্ষমতা বা জনতার উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব করার ইচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এসব প্রশ্নের ধারাবাহিকতায় আরও একটি চিন্তাও তখন সাধারণের মাথায় খেলা করতে পারে। সেটি হলো–এমন ঘরানার বিরোধী দলের কাজটা কী আসলে!
সুতরাং, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর। বিশেষ করে যারা সংসদে আছেন, তাদের তো আরও বেশি। কারণ, কোনোভাবে যদি বিরোধী দল নিজেদের জনতার কাছে অপ্রাসঙ্গিক বা অহেতুক হিসেবে প্রমাণ করে ফেলে, তখন কিন্তু আমও যাবে, যাবে ছালাও!
অবশ্য সবচেয়ে বেশি বিপদ হবে আসলে এই বাংলার মানুষেরই। যদিও সাধারণ মানুষের কথা আর কেইবা ভাবে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

যে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ইরান জয় করে ফেলেছেন, সেই নেতার রাজসিক বিদায়কে তিনি কোনোভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, ইরানের মানুষ তাকে ঘৃণা করে। আজ খামেনির শেষকৃত্যে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়ে জানিয়ে দিল, কাকে তারা ঘৃণা করে। কাকে ভালোবাসে। অস্ত্র ও শক্তি দিয়ে