যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল পার্কে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্ত তেহরানে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হন ইসরাইলি-যুক্তরাষ্ট্র বাহিনীর যৌথ অভিযানে খুন হওয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে অন্তিম বিদায় জানাতে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের কঠিন বার্তাই বটে। বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা খামেনির শেষকৃত্যে সাগ্রহে অংশ নিয়েছেন।
ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের ভাষণ চলাকালে অনেক মানুষ সমাবেশ স্থল ত্যাগ করেছেন। শুধু বৈরি আবহাওয়ার কারণে এটি ঘটেনি, আমেরিকার জনগণ অনেক আগেই তার প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে।
খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষের আবেগপূর্ণ উপস্থিতি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি যাকে ভেবেছিলেন ইরানিরা ‘ঘৃণা’ করে, তিনিই হয়ে উঠেছেন দেশটির জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ট্রাম্প এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি আলি খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণকারী দেশটির অবশিষ্ট শীর্ষ নেতৃত্বকে মাত্র ‘একটি গুলির’ মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারেন বলেও হুমকি দিয়েছেন। একজন মানুষ কতটা বিবেকবর্জিত হলে এ রকম মন্তব্য করতে পারেন।
ইরানিদের কাছে নাস্তনাবুদ হওয়ার পরও ট্রাম্প দাবি করেন, ‘আমরা ভেনিজুয়েলাকে একদিনে হারিয়েছি এবং ইরানকেও চরম বেকায়দায় ফেলেছি। আমরা দয়ালু বলেই জানাজার আনুষ্ঠানিকতার জন্য তাদের এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি।’ তার এই দম্ভোক্তি যে কত অসার তেহরানে, কোমে ও কারবালায় খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিই তা প্রমাণ করে।
ওয়াশিংটনে ন্যাশনাল মলে আয়োজিত সমাবেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। টেনে আনেন দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের কথাও। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো যুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হয়নি। আমেরিকার সাধারণ মানুষের প্রবল প্রতিবাদের মুখে যেমন সাবেক রাষ্ট্রনেতাদের ভিয়েতনাম, ইরাক প্রভৃতি দেশ থেকে পাততাড়ি গোটাতে হয়েছে, এবারেও ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে বাধ্য হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নো কিংস স্লোগান তুলে ৮০ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল।
৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ট্রাম্প কমিউনিজমকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার জন্য হুমকি’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘কমিউনিজম ব্যর্থ মতবাদ। সব সময় এটি ব্যর্থই থাকবে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ ব্যবস্থা কখনোই সফল হয়নি।’
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর কোথাও কমিউনিজম নেই। কমিউনিজম হলো সমাজতান্ত্রিক সমাজের চূড়ান্ত ধাপ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিজম থেকে অনেক আগেই সরে এসেছিল। সেখানে ভ্লাদিমির পুতিন পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই চালু করেছেন। চীনও সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসেছে। তারপরও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাথায় কমিউনিজমের ভুত চাপার কারণ দর্শন হিসেবে এর শ্রেষ্ঠত্ব। কমিউনিজম ব্যর্থ হয়েছে আমলাতান্ত্রিক ও একনায়কত্ববাদী ব্যবস্থার কারণে। ট্রাম্প কমিউনিজমের বিরোধিতা করলেও তার দেশে একনায়কত্বই কায়েম করেছেন। তিনি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী কায়দায় একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, যা কেবল সেখানকার নাগরিকদের অধিকার খর্ব করছে না, সারা বিশ্বের মানুষকেও আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ভাষণে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, এ দেশ কখনোই কাউকে নিজের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে দেবে না’। কেন তিনি আগ বাড়িয়ে এই বার্তা দিলেন? তাহলে কি তার ভেতরেও ভয় ঢুকে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের এই সমাজব্যবস্থা টিকবে না?
ট্রাম্প যাকে আমেরিকার স্বর্ণযুগের সূচনা বলে আখ্যায়িত করেছেন, অনেকে সেটাকে পতনের সূচনা বলেও অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতেই যুক্তরাষ্ট্রের পতনের সূচনা হতে চলেছে।
ব্যক্তি স্বাধীনতার পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রে তিনি নিজ দেশের নাগরিকদেরও রেখেছেন ভয়ভীতির মধ্যে। দেশটিতে বৈষম্যের সঙ্গে বেড়েছে বেকারত্ব। মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষ চিড়েচ্যাপ্টা। ট্রাম্পের কমিউনিজমভীতির পেছনে আরও একটি কারণ আছে। সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও নিউইয়র্কের মেয়র পদে মামদানির জয় ঠেকাতে পারেননি। মামদানি কমিউনিজমের সমর্থক না হলেও নিজেকে সমাজতান্ত্রিক হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি নিউইয়র্কবাসীর জন্য এমন কিছু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নিয়েছেন, যা অতীতের কোনো মেয়র নেননি। সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। নানা কারণে চাপে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কমিউনিজমকেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘আমেরিকার স্বাধীনতা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না’ বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার পাশাপাশি অন্য দেশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক সেই দেশ থেকে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বিচারের মুখোমুখি করেছেন। ইরানে রেজিম চেঞ্জের কথা বলে সেখানকার শীর্ষ নেতাকে হত্যা করেছেন। কোনো দেশে কে সরকার গঠন করবে, সেটি সেই দেশের জনগণ ঠিক করবে। এমনকি সেখানে অনির্বাচিত বা কর্তৃত্ববাদী সরকার থাকলেও তা পরিবর্তনের দায়িত্ব সেই দেশের জনগণের, যুক্তরাষ্ট্রের নয়।
চার মাস ধরে চলা যুদ্ধে ইরানের তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষ মারা গেছে, যাদের একটা বড় অংশ বেসামরিক নাগরিক। আকাশ থেকে বোমা ফেলে বিদ্যালয়ে পাঠরত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের হত্যা করা হয়েছে। ধবংস করা হয়েছে, দেশটির অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা। তারপরও ইরানের সরকার ও জনগণ এতটুকু বিচলিত হয়নি।

২৮ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হলেও যুদ্ধের কারণে এতদিন ইরান সরকার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেনি। সম্প্রতি তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যুদ্ধবিরতি সেই সুযোগ এনে দেয়। সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে ৬ দিন ব্যাপী শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দ এসেছেন।
যে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করে ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেছিলেন, ইরান জয় করে ফেলেছেন, সেই নেতার রাজসিক বিদায়কে তিনি কোনোভাবে মেনে নিতে পারেননি। তিনি ভেবেছিলেন, ইরানের মানুষ তাকে ঘৃণা করে। আজ খামেনির শেষকৃত্যে লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়ে জানিয়ে দিল, কাকে তারা ঘৃণা করে। কাকে ভালোবাসে। অস্ত্র ও শক্তি দিয়ে আর যা-ই হোক মানুষের ভালোবাসা ও সমীহ আদায় করা যায় না।
ইরানি নেতার শেষকৃত্যে যেসব নেতা যোগ দিয়েছেন, তারা সবাই ইরানি শাসনব্যবস্থার অনুসারী নন, অনেকে বিরোধিতাও করেন। কিন্তু গুপ্তঘাতকের বেশে তাকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে শক্তির উন্মত্ততা প্রকাশ পেয়েছে। এ কারণে খামেনির জানাজায় লাখ লাখ মানুষ উপস্থিত হয়েছে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘অস্ত্র ও দম্ভের চেয়ে শোকের শক্তি অনেক বেশি।’
লেখক: সম্পাদক, চরচা