ads

ব্যাংককের অভিনব অভিনন্দন ও বিদায় সম্ভাষণ

আবু এন এম ওয়াহিদ
আবু এন এম ওয়াহিদ
ব্যাংককের অভিনব অভিনন্দন ও বিদায় সম্ভাষণ
বাড়িতে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে, হঠাৎ মাথার ওপর থেকে ভেসে এলো “... কুহু, কুহু...।” ছবি: লেখক

সম্মেলনের ডাকে পৃথিবীর নানা শহরে যখনই যেতে হয়, আমি সাধারণত শহরের হৃৎপিণ্ডের কাছাকাছি কোনো হোটেলেই আশ্রয় নিই। কাচ, কংক্রিট আর ইস্পাতের অরণ্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সব হোটেল যেন আধুনিক সভ্যতার বিশাল বটগাছ–যার শেকড় মাটির গভীরে নয়, বরং মানুষের ব্যস্ততার ভেতর প্রোথিত। অধিকাংশ সময় সেমিনারের আয়োজনও সেখানেই হয়, নতুবা আশেপাশে কোথাও। ফলে কয়েকটি দিন কাটে নগরের ধাতব নিঃশ্বাসের ভেতর–লিফটের ওঠানামা, কফির ধোঁয়া, কাগজের শব্দ, আলো-আঁধারি সভাকক্ষ আর মানুষে মানুষে জ্ঞান-বিনিময়ের অনবরত ঢেউয়ের মধ্যে। মনে হয়, যেন কোনো নদীর উৎসে নয়, তার মোহনায় দাঁড়িয়ে আছি–যেখানে শত উপনদীর জল এসে মিশছে, কিন্তু কোথাও পাখির ডাক নেই, শিউলি ঝরার শব্দ নেই।

প্রথম দিনের উদ্বোধনী অধিবেশনে অতিথিদের জন্য থাকে ফুলেল সম্ভাষণ, মৃদু করতালি, হাসিমাখা মুখ; অথচ শেষ দিনের বিদায়ে অধিকাংশ সময় কোনো আনুষ্ঠানিকতার বালাই থাকে না। যেন শরতের সাদা মেঘের মতো মানুষ আসে, ভেসে যায়–কেউ কারও আকাশে স্থায়ী হয় না। এ-ই এখনকার রেওয়াজ। কিন্তু ব্যাংকক সফরে সেই প্রচলিত নিয়মের ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে আমি শুধু আগমনী অভিনন্দনই পাইনি, পেয়েছিলাম বিদায়েরও এক অদ্ভুত, হৃদয়ছোঁয়া সম্ভাষণ– যার ভাষা ছিল মানুষের নয়, প্রকৃতির; যার কণ্ঠ ছিল কোনো সভানেতার নয়, এক অদৃশ্য কোকিলের।

সম্মেলনটি হয়েছিল শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত–অ্যাম্বেসেডর হোটেলে ২০১৮ সালের ১৬ ও ১৭ ফেব্রুয়ারি, শুক্র ও শনিবার। তারপর আমার আরেকটি আমন্ত্রিত বক্তৃতা ছিল থাইল্যান্ডের বিখ্যাত পর্যটননগরী চিয়াং মাইয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু নিয়তিরও তো নিজস্ব খেয়াল আছে। শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি বাতিল হয়ে গেল। ফলে আচমকা হাতে এসে পড়ল বাড়তি দুদিনের অবকাশ–যেন ব্যস্ত জীবনের মরুভূমিতে হঠাৎ জেগে ওঠা এক টুকরো সবুজ দ্বীপ।

ভাবলাম, এই সুযোগে এআইটি, এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি দেখে আসি। বহুদিনের ইচ্ছে। সেখানে আমার কিছু জার্নালসংক্রান্ত কাজও ছিল। তদুপরি, এআইটির কাছেই সপরিবারে থাকে আমার মামাতো বোন শায়লা ও তার স্বামী ফারুক। যেন এক ঢিলে দুই পাখি– বিদ্যা আর আত্মীয়তা, দুয়েরই আহ্বান।

রোববার সকালে শায়লা গাড়ি পাঠিয়ে দিল। গাড়িতে উঠে বসতেই আমার মন অদ্ভুত আনন্দে ভরে উঠল। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের কোনো হারানো নদীর দিকে ফিরে চলেছি। একদিকে এআইটি দেখার বহুদিনের স্বপ্ন, অন্যদিকে শহরের বাইরে থাইল্যান্ডের প্রকৃতি দেখার কৌতূহল। নগরের সুউচ্চ দালান, স্কাইট্রেন, ফ্লাইওভার আর কংক্রিটের কুণ্ডলী পেরিয়ে যখন গাড়ি ধীরে ধীরে শহরতলির দিকে ঢুকল, তখন হঠাৎ মনে হলো এ যেন বাংলাদেশই! কেবল ভাষা আলাদা, অথচ মাটির গন্ধ একই।

স্থানীয় আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি এগোতে লাগল। দুচোখ ভরে দেখতে লাগলাম মাঠের পর মাঠ সবুজ ধান, কলাগাছের পাতা, নারকেলের মাথা দোলানো সারি, জলভরা খাল, ঝোপে ঝোপে নাম-না-জানা ফুল, আর আকাশ কেটে উড়ে যাওয়া পাখির দল। কোথাও সাদা বক দাঁড়িয়ে আছে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো; কোথাও তালগাছগুলো বিকেলের হাওয়ায় এমনভাবে দুলছে যেন বহুদিনের কোনো গোপন কথা নিজেদের মধ্যে বিনিময় করছে। আমার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সব গ্রাম যেন এক অদৃশ্য মায়ের সন্তান—তাদের ভাষা আলাদা হলেও ঘাসের রং, মাটির গন্ধ, বৃষ্টির শব্দ একই থাকে।

কিছুক্ষণ পর গাড়ি ঢুকে পড়ল এক অনিন্দ্য সুন্দর আবাসিক এলাকায়। ঘন বৃক্ষরাজির ফাঁকে ফাঁকে তৈরি বড় বড় বাড়িগুলোকে দূর থেকে মনে হচ্ছিল, বনভূমির ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সাদা রাজহাঁস। কলা, নারকেল, সুপারি, বোগেনভেলিয়া, অর্কিড আর অজস্র লতাপাতার আড়ালে বাড়িগুলো যেন লাজুক কিশোরীর মতো মুখ লুকিয়ে আছে। রাস্তার ধারে ঝরে পড়া ফুলের পাপড়ি দেখে মনে হচ্ছিল, বসন্ত এখানে নীরবে নিজের চিঠি লিখে রেখে গেছে।

ধুলোবালিহীন সেই নির্মল পরিবেশে পৌঁছে মন এমনিতেই আলোয় ভরে উঠেছিল। কিন্তু তারও আগে, শায়লাদের বাড়িতে পৌঁছানোর ঠিক আগ মুহূর্তে, হঠাৎ মাথার ওপর থেকে ভেসে এলো “... কুহু, কুহু...” আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

এ কি সত্যি? হাজার মাইল দূরে, বিদেশের মাটিতে, হঠাৎ সেই শৈশবের কোকিল! মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল আমাদের গ্রামের মরা ধামাই গাঙের পাড়, শিমুলফুলের লাল আগুন, বৈশাখের দুপুর, আর কিশোর বয়সের আকাশভরা রোদ। সেই কোকিলের ডাক যেন সময়ের ওপার থেকে ভেসে এসে আমার কাঁধে হাত রাখল। মনে হলো, পৃথিবী যত দূরেই যাই, প্রকৃতি মানুষের স্মৃতিকে কখনো একা ফেলে না। সে পাখির কণ্ঠে, বাতাসের গন্ধে, ফুলের রঙে বারবার ফিরে আসে।

বাড়িতে ঢুকেই আমি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললাম, তোমাদের আগে তো আমাকে বরণ করে নিল এক কোকিলও।

শায়লারা হেসে উঠল। অথচ আমার মনে হচ্ছিল, এ কেবল পাখির ডাক নয়–এ বসন্তের নিজস্ব অভিবাদন। যেন ফাল্গুনের অদৃশ্য রাণী সবুজ পাতার আড়াল থেকে আমাকে বলছে, “দেখ, পৃথিবী এখনো সুন্দর আছে। দিন-তারিখ মিলিয়ে দেখলাম, সত্যিই ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহ। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ম্যাট্রিক পাস করে বাড়ি ছাড়ার পর এমন নিবিড়, উচ্ছ্বসিত কোকিলের ডাক আর কোথাও শুনিনি। ফারুক বলল, “এখানে তো বারো মাসই কোকিল ডাকে।”

আমি বিস্মিত হলাম। ভাবলাম, তাহলে হয়তো এই দেশ চিরবসন্তের দেশ। এখানে ঋতুরা হয়তো আমাদের দেশের মতো কঠোর নিয়ম মানে না; তারা নদীর জলের মতো অবিরাম মিশে থাকে।

শায়লা বলল, আজ হোটেলে না ফিরে এখানেই থেকে যান। সকালে ঘুঘুর ডাক শুনে ঘুম ভাঙবে।

আমি মুগ্ধ হয়ে তার দিকে তাকালাম। বললাম, “তুমি কি কবিতা লেখ?”

সে হেসে বলল, “না ভাইয়া, আমি তো অঙ্ক পড়াই।” কিন্তু আমার মনে হলো, প্রকৃতির কাছাকাছি যারা থাকে, তারা অজান্তেই কবি হয়ে ওঠে। অঙ্কের সূত্র মুখস্থ করলেও, ঘুঘুর ডাকের ভেতর যে বিষণ্ণ সুর লুকিয়ে থাকে, তা অনুভব করতে পারা নিজেই এক ধরনের কবিতা।

চা-নাস্তার টেবিলে এল সিলেটের মেড়া পিঠা। পিঠার গরম ভাপ উঠছিল শীতসকালের কুয়াশার মতো। নারকেলের গন্ধ, চালের মিহি স্বাদ, আর চায়ের ধোঁয়া মিলেমিশে ঘরটিকে মুহূর্তে বাংলার কোনো গ্রাম্য রান্নাঘরে পরিণত করল। বিদেশের মাটিতে মানুষ সবচেয়ে বেশি বুঝতে পারে–স্বদেশ আসলে কোনো মানচিত্র নয়; স্বদেশ হলো গন্ধ, স্বাদ, শব্দ আর স্মৃতির সমষ্টি।

তারপর ফারুক আমাকে নিয়ে বেরোল আশপাশ ঘুরে দেখাতে। বিশাল জলাধারের চারপাশে গল্ফ কোর্টে ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম পানির ওপর আকাশের নীল ছায়া ভাসছে। কোথাও সাদা মেঘ এসে জলে মুখ ধুচ্ছে, কোথাও বাতাসের হালকা ঢেউ জলকে কিশোরীর কেশের মতো এলোমেলো করে দিচ্ছে। দূরে নারকেল গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রযাত্রার প্রহরীর মতো।

গাছের মাথায় ঝুলে থাকা নারকেলের থোকাগুলো জালে বাঁধা দেখে অবাক হলাম। ফারুক বলল, “পাকা নারকেল পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে, তাই।”

ভাবলাম, প্রকৃতিও কখনো কখনো তার সৌন্দর্যের ভেতরে বিপদের বীজ লুকিয়ে রাখে–যেমন গোলাপের নিচে কাঁটা থাকে, কিংবা নদীর শান্ত জলের নিচে ঘূর্ণি। দুপুরে অধ্যাপক ফজলে করিম সাহেবের বাড়িতে খাওয়ার আয়োজন ছিল। টেবিলভর্তি খাবার দেখে মনে হচ্ছিল, বাংলার কোনো ঈদের দুপুর। পাবদা মাছের দোপেঁয়াজা, ডাল, ভর্তা, কাবাব, হালুয়া, ফল– সব মিলিয়ে যেন স্বাদের এক সবুজ অরণ্য। বিশেষ করে লাল টুকটুকে জামরুলগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল, গাছে গাছে ছোট ছোট সন্ধ্যাতারা ঝুলছে।

খাওয়ার পর কাচের প্যাটিও ডোর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বাগানের লেমন গ্রাস বাতাসে দুলছে; আম, জামরুল, লেবু, জাম্বুরা গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে গৃহস্থের শান্ত সন্তানের মতো। পেছনের খালে স্থির পানি–যেন আয়নার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা আকাশ। ওপারে জঙ্গলি ঘাসে বাতাস বইছে। মনে হচ্ছিল, যদি এখন কোনো রাখাল বালক বাঁশি বাজাতে বাজাতে চলে যেত, তাহলে এই দৃশ্য পুরোপুরি বাংলার হয়ে উঠত।

বিকেলের শেষে লাইব্রেরিতে গেলাম। কাজ সেরে ফেরার পথে তারা আমাকে নিয়ে গেল ব্যাংককের বিশাল পাইকারি বাজারে। ফুল, ফল, শাকসবজি, মাছ, মসলা—সব মিলিয়ে সে যেন রঙের এক সাগর। লাল মরিচগুলোকে মনে হচ্ছিল শুকনো আগুন; কাঁচা আমের স্তূপ যেন বর্ষার সবুজ মেঘ; আর ফুলের সারি– যেন বসন্ত তার সমস্ত অলংকার খুলে এখানে রেখে গেছে।

রাতে মসজিদে গিয়ে দেখলাম মেলার মতো পরিবেশ। থাই ইমামের ক্বিরাত শুনে মনে হলো, দূরদেশের বাতাসেও আল্লাহর বাণী একইভাবে হৃদয় ছুঁয়ে যায়। ভাষা ভিন্ন হলেও সুরের ভেতর এক অদৃশ্য নদী প্রবাহিত হয়, যা মানুষের আত্মাকে একত্র করে। পরদিন হোটেলে ফিরে এলাম। ভোরের ঘুঘুর ডাক আর শোনা হলো না। পরদিন দেশে ফেরার সময় আমার জন্য আরেকটি বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ট্রাফিক জ্যামে আটকে আছি। চারদিকে গাড়ির সারি, ধোঁয়া, কংক্রিটের প্রাচীর, মানুষের ক্লান্ত মুখ। এমন সময় কোথা থেকে যেন ভেসে এলো– কুহু... কুহু...

আমি অবিশ্বাসে স্তব্ধ হয়ে গেলাম।

এ কোন কোকিল? এই ধাতব শহরের কোথায় তার বাসা? এখানে তো নেই কোনো শিমুল, নেই কদম, নেই আম্রকুঞ্জ। তবু সে ডাকল। করুণ, মৃদু, বিষণ্ণ সুরে। মনে হলো, এ আর বসন্তের ডাক নয়– এ ব্যাংককের বিদায়সম্ভাষণ। যেন শহরটি নিজেই অদৃশ্য কণ্ঠে বলছে, “যাও, কিন্তু আমাকে ভুলে যেও না।”

অবশেষে দেশে ফিরলাম। ‘হোম, সুইট হোম।’ কিন্তু থাইল্যান্ডের সেই কোকিল আজও মাঝে মাঝে আমার কানে বাজে। কখনো উচ্ছ্বাসের সুরে, কখনো বিষণ্ণ বিদায়ের মতো। মানুষের জীবনে অনেক সফর আসে, অনেক শহর আসে-যায়; কিন্তু কিছু কিছু মুহূর্ত পাখির ডানায় ভর করে স্মৃতির আকাশে চিরকাল উড়ে বেড়ায়। সেই কোকিলের কুহু ডাকও তেমনই–এক টুকরো বসন্ত, যা আজও আমার হৃদয়ের নির্জন বনে ডেকে চলে।

লেখক: অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি এবং এডিটর - জার্নাল অফ ডেভোলাপিং এরিয়াজ, ই্যাশভিল, টেনেসি।

সম্পর্কিত