রঞ্জন সোলোমন

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিশ্চিত করেছেন, চলমান সংঘাতের মধ্যেও আমেরিকার সঙ্গে তাদের বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। তবে এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়। আরাঘচি এই আস্থার সংকটের পেছনে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের বেরিয়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকার সঙ্গে এতবার যে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একবারও ইতিবাচক কোনো ফল আসেনি।
দুইদেশের মধ্যে চলমান বার্তাগুলো এখনো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হচ্ছে। এই যোগাযোগকে প্রকৃত কূটনীতির চেয়ে বরং সতর্কবার্তা এবং নিজেদের অবস্থান জানানোর মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরান আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না।
আরাঘচি বলছেন, ইরান মার্কিন প্রস্তাবগুলোতে কোনো সাড়া দেয়নি। তার মতে, বর্তমানে আস্থার পরিমাণ শূন্য। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনা প্রায় নিরর্থক বলে মনে হয়। পাশাপাশি তেহরানের দৃষ্টিতে, এসব আলোচনা প্রায়ই কৌশলগত বিরতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই সময়টাকে আমেরিকা পুনরায় সংগঠিত হওয়া এবং চাপ প্রয়োগ করার জন্য ব্যবহার করে।
অনেক পর্যবেক্ষক এখন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্যের পতনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আশাবাদীরা যুক্তি দিয়েছেন, আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা তাদের মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে এই যুক্তি ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক, নৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো দিক থেকেই আমেরিকার আগের সেই প্রভাব আর নেই। ট্রাম্প যুগ ক্ষমতার বদলে বরং ক্ষোভ, অসঙ্গতি এবং কৌশলগত বিচ্যুতিকে বাড়িয়ে তুলেছে। এই মেরুকরণ আকস্মিক নয়। এটি মূলত অভিজাত শ্রেণির কারসাজি, মিডিয়া ইকোসিস্টেম এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার শত্রুতার ফল।
এ ছাড়াও একটি ‘ব্যবস্থার বিলুপ্তির’ ধারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ ক্ষয়ে যাচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘নো কিংস’-এর মতো প্রতিবাদী আন্দোলন এবং নেতৃত্বের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষের মধ্য দিয়ে, যার গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক উদ্বেগ, জাতিগত উত্তেজনা এবং অমীমাংসিত সংঘাতের এক মিশ্রণ।
অর্থনৈতিক চিত্রটি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ২০২৬ সালের মধ্যে আমেরিকায় জাতীয় ঋণ জিডিপির প্রায় ১২৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে। মুদ্রাস্ফীতি আংশিকভাবে সংরক্ষণবাদী শুল্ক নীতির কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে গেছে এবং জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রিক ভেহিকল, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে চীনের কাছে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন দ্রুত নিজেকে একটি প্রভাবশালী ‘ইলেক্ট্রোস্টেট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের জন্য প্রণীত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। বাণিজ্য যুদ্ধ এবং জবরদস্তিমূলক কূটনীতি মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে তিক্ত করেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকাকে চীনের প্রভাব বলয়ের আরও কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে।
একাধিক সংঘাত সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রকে এক দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এখন দেশটিকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখার বদলে ‘শিকারী ও বেপরোয়া শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। যারা বিশৃঙ্খলা দমনের চেয়ে তা বৃদ্ধিতেই বেশি ভূমিকা রাখছে।
সবচেয়ে হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সেটি, যাকে কেউ কেউ ‘নৈরাশ্যবাদী’ অবস্থান বলেন। আমেরিকার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ফাটলগুলো এতটাই গভীর যে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে তা মেরামত করা অসম্ভব। হয়তো একটি অভ্যন্তরীণ আত্মোপলব্ধি এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবুও অনেকে মার্কিন ক্ষমতার এক চিরন্তন ‘প্যারাডক্সের’ দিকে ইঙ্গিত করেন। পতনের বারবার ঘোষণা সত্ত্বেও, আমেরিকার কাছে এখনও বিপুল অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিশ্বসেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা।
তা সত্ত্বেও, ২০২৬ সালকে একটি ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কেবল তার বৈশ্বিক ভূমিকাকে সংস্কারই করছে না, বরং তারা একদা নিজের হাতে গড়ে তোলা বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেই ভেঙে ফেলছে বলে মনে হয়। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এই ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। বিশেষ করে যদি অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অজানা এবং বিপজ্জনক পথে হাঁটছে, যেখানে তাদের নিজস্ব নীতিগত বৈপরীত্যের ফলাফল তাদেরই মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এই অনিশ্চয়তা ইরানের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ওয়াশিংটন একটি জটিল ও বহুমুখী আলোচনার কৌশল গ্রহণের চেষ্টা করছে, যার লক্ষ্য হলো সরাসরি সামরিক সংঘাত থেকে পিছু হটা। কিন্তু সেটা এমনভাবে করা, যেন মনে না হয় তারা পরাজয় মেনে নিয়েছে। ইরানের ওপর চাপানো শর্তগুলো (যেমন–ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং সামুদ্রিক রুটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা) বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘমেয়াদী তদারকি প্রয়োজন। অথচ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে একটি দ্রুত সামরিক প্রত্যাহার চাইছে।
এই বৈপরীত্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়া অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন, অথচ তিনি ইরানের কাছ থেকে এমন কাঠামোগত ছাড় আশা করছেন, যা কার্যকর করতে কয়েক বছর সময় লাগে। যা নিশ্চিত করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো নেই। নেই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গিতে, এসব দাবি কোনো আলোচনা নয় বরং এটি একটি জবরদস্তি।

এদিকে, ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা হুমকি বাড়িয়ে দিয়েছে। যার ফলে মার্কিন বাহিনী আরও বিচ্ছিন্ন এবং সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে বাধ্য হয়েছে। বাণিজ্যিক শিপিং রুটগুলোতে সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, এই সংঘাতের পরিধি কতখানি বিস্তৃত।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার অস্বস্তিকর সম্পর্ক। তাদের স্বার্থ এখন আর পুরোপুরি এক নয়। ইসরায়েল হয়তো বিশ্ব অর্থনীতির পরিণতির কথা চিন্তা না করেই তার কথিত হুমকিগুলো নির্মূল করতে দীর্ঘায়িত সামরিক কার্যক্রম পছন্দ করতে পারে। যেখানে ওয়াশিংটন চায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত প্রস্থান’। এই উত্তেজনার আদর্শিক পটভূমি হলো ‘বৃহত্তর ইসরায়েলের’ ধারণা। এটি একটি কট্টরপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, যা ফিলিস্তিনি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমি দখলের পক্ষে কথা বলে। যদিও এটি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতি নয়, তবে বর্তমান ইসরায়েলি শাসক জোটের মধ্যে এই মতাদর্শ গেঁথে আছে।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং গাজায় প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ধারণা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপগুলো মূলত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এক প্রকার ভূখণ্ড দখলেরই কৌশল।
এ ধরনের আলোচনা জর্ডান, সিরিয়া এবং লেবাননের মতো দেশগুলোর আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব নিয়েও গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এমনিতেই অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলে অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। হিজবুল্লাহর মতো ইরানি সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাত ইসরায়েলের সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে এবং তাদের কৌশলগত হিসাবনিকাশকে জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক, আর্থিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন ক্রমশ একটি দায় বা বোঝা হয়ে উঠছে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপট থেকে একটি মৌলিক সত্য বেরিয়ে আসে। চিরস্থায়ী এবং অবিসংবাদিত ক্ষমতার ধারণাটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেই এই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সেখানকার সরকারগুলো ক্রমে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
এই অঞ্চলটি স্থিতিশীলতা দিয়ে নয়, বরং চিরস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত। এখানে ক্ষমতা আর নিরঙ্কুশ নয়। এটি সাময়িক, আপেক্ষিক এবং নিরন্তর হুমকির মুখে। ইরান তার ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ এবং কৌশলগত গভীরতার মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখছে। ইসরায়েল তার সামরিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী আধিপত্যে রূপান্তর করতে চায়। আর যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক ভূমিকা রক্ষা করার পাশাপাশি এই উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তবে এই তিন পক্ষই একই সত্য আবিষ্কার করছে। আর তা হচ্ছে, বৈধতাহীন ক্ষমতা অত্যন্ত ভঙ্গুর।
এই বিভাজিত ও বিকেন্দ্রীভূত বিশ্বে যেখানে সবাই নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধ করছে, সেখানে জনসম্মতি বা বৈধতা ছাড়া আধিপত্য কেবল অস্থিতিশীলই নয়, বরং এটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা কেবল আমেরিকান ক্ষমতার পতন নয়, বরং এমন এক যুগের অবসান, যেখানে জবাবদিহিতা ছাড়াই ক্ষমতা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। উদীয়মান বিশ্ব তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে না, যারা শক্তি দিয়ে শৃঙ্খলা চাপিয়ে দিতে পারে। বরং তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে, যারা মানুষের সম্মতি অর্জন করতে পারে।
আর ঠিক এখানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে।
লেখক: রঞ্জন সোলোমন একজন গবেষক ও লেখক। ফিলিস্তিন ইস্যুতে লেখালেখি করেন তিনি।
(লেখাটি মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি নিশ্চিত করেছেন, চলমান সংঘাতের মধ্যেও আমেরিকার সঙ্গে তাদের বার্তা আদান-প্রদান হয়েছে। তবে এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয়। আরাঘচি এই আস্থার সংকটের পেছনে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে ওয়াশিংটনের বেরিয়ে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকার সঙ্গে এতবার যে আলোচনা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একবারও ইতিবাচক কোনো ফল আসেনি।
দুইদেশের মধ্যে চলমান বার্তাগুলো এখনো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হচ্ছে। এই যোগাযোগকে প্রকৃত কূটনীতির চেয়ে বরং সতর্কবার্তা এবং নিজেদের অবস্থান জানানোর মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতো ব্যক্তিদের সঙ্গে ইরান আলোচনা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো ভেঙে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান তাদের বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না।
আরাঘচি বলছেন, ইরান মার্কিন প্রস্তাবগুলোতে কোনো সাড়া দেয়নি। তার মতে, বর্তমানে আস্থার পরিমাণ শূন্য। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনা প্রায় নিরর্থক বলে মনে হয়। পাশাপাশি তেহরানের দৃষ্টিতে, এসব আলোচনা প্রায়ই কৌশলগত বিরতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই সময়টাকে আমেরিকা পুনরায় সংগঠিত হওয়া এবং চাপ প্রয়োগ করার জন্য ব্যবহার করে।
অনেক পর্যবেক্ষক এখন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্যের পতনের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আশাবাদীরা যুক্তি দিয়েছেন, আমেরিকার অর্থনৈতিক শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা তাদের মানিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে এই যুক্তি ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক, নৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো দিক থেকেই আমেরিকার আগের সেই প্রভাব আর নেই। ট্রাম্প যুগ ক্ষমতার বদলে বরং ক্ষোভ, অসঙ্গতি এবং কৌশলগত বিচ্যুতিকে বাড়িয়ে তুলেছে। এই মেরুকরণ আকস্মিক নয়। এটি মূলত অভিজাত শ্রেণির কারসাজি, মিডিয়া ইকোসিস্টেম এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার শত্রুতার ফল।
এ ছাড়াও একটি ‘ব্যবস্থার বিলুপ্তির’ ধারণা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রথাগত রাজনৈতিক আদর্শ ক্ষয়ে যাচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘নো কিংস’-এর মতো প্রতিবাদী আন্দোলন এবং নেতৃত্বের প্রতি ব্যাপক অসন্তোষের মধ্য দিয়ে, যার গভীরে রয়েছে অর্থনৈতিক উদ্বেগ, জাতিগত উত্তেজনা এবং অমীমাংসিত সংঘাতের এক মিশ্রণ।
অর্থনৈতিক চিত্রটি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ২০২৬ সালের মধ্যে আমেরিকায় জাতীয় ঋণ জিডিপির প্রায় ১২৫ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করবে। মুদ্রাস্ফীতি আংশিকভাবে সংরক্ষণবাদী শুল্ক নীতির কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে গেছে এবং জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। একইসঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্র ইলেকট্রিক ভেহিকল, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে চীনের কাছে প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। চীন দ্রুত নিজেকে একটি প্রভাবশালী ‘ইলেক্ট্রোস্টেট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের জন্য প্রণীত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিগুলো দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। বাণিজ্য যুদ্ধ এবং জবরদস্তিমূলক কূটনীতি মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে তিক্ত করেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলকে, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকাকে চীনের প্রভাব বলয়ের আরও কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে।
একাধিক সংঘাত সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রকে এক দ্বিধাবিভক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক এখন দেশটিকে একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখার বদলে ‘শিকারী ও বেপরোয়া শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করছেন। যারা বিশৃঙ্খলা দমনের চেয়ে তা বৃদ্ধিতেই বেশি ভূমিকা রাখছে।
সবচেয়ে হতাশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সেটি, যাকে কেউ কেউ ‘নৈরাশ্যবাদী’ অবস্থান বলেন। আমেরিকার রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ফাটলগুলো এতটাই গভীর যে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে তা মেরামত করা অসম্ভব। হয়তো একটি অভ্যন্তরীণ আত্মোপলব্ধি এখন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তবুও অনেকে মার্কিন ক্ষমতার এক চিরন্তন ‘প্যারাডক্সের’ দিকে ইঙ্গিত করেন। পতনের বারবার ঘোষণা সত্ত্বেও, আমেরিকার কাছে এখনও বিপুল অবকাঠামোগত সুবিধা রয়েছে। সম্পদ, ভৌগোলিক অবস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বিশ্বসেরা মেধাবীদের আকর্ষণ করার ক্ষমতা।
তা সত্ত্বেও, ২০২৬ সালকে একটি ভূ-রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কেবল তার বৈশ্বিক ভূমিকাকে সংস্কারই করছে না, বরং তারা একদা নিজের হাতে গড়ে তোলা বিশ্বব্যবস্থাকে নিজেই ভেঙে ফেলছে বলে মনে হয়। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন এই ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করতে পারে। বিশেষ করে যদি অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখন এক অজানা এবং বিপজ্জনক পথে হাঁটছে, যেখানে তাদের নিজস্ব নীতিগত বৈপরীত্যের ফলাফল তাদেরই মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
এই অনিশ্চয়তা ইরানের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ওয়াশিংটন একটি জটিল ও বহুমুখী আলোচনার কৌশল গ্রহণের চেষ্টা করছে, যার লক্ষ্য হলো সরাসরি সামরিক সংঘাত থেকে পিছু হটা। কিন্তু সেটা এমনভাবে করা, যেন মনে না হয় তারা পরাজয় মেনে নিয়েছে। ইরানের ওপর চাপানো শর্তগুলো (যেমন–ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং সামুদ্রিক রুটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা) বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘমেয়াদী তদারকি প্রয়োজন। অথচ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে একটি দ্রুত সামরিক প্রত্যাহার চাইছে।
এই বৈপরীত্য দীর্ঘস্থায়ী হওয়া অসম্ভব। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন, অথচ তিনি ইরানের কাছ থেকে এমন কাঠামোগত ছাড় আশা করছেন, যা কার্যকর করতে কয়েক বছর সময় লাগে। যা নিশ্চিত করার মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো নেই। নেই আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। তেহরানের দৃষ্টিভঙ্গিতে, এসব দাবি কোনো আলোচনা নয় বরং এটি একটি জবরদস্তি।

এদিকে, ইরানের আঞ্চলিক মিত্ররা হুমকি বাড়িয়ে দিয়েছে। যার ফলে মার্কিন বাহিনী আরও বিচ্ছিন্ন এবং সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়তে বাধ্য হয়েছে। বাণিজ্যিক শিপিং রুটগুলোতে সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, এই সংঘাতের পরিধি কতখানি বিস্তৃত।
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার অস্বস্তিকর সম্পর্ক। তাদের স্বার্থ এখন আর পুরোপুরি এক নয়। ইসরায়েল হয়তো বিশ্ব অর্থনীতির পরিণতির কথা চিন্তা না করেই তার কথিত হুমকিগুলো নির্মূল করতে দীর্ঘায়িত সামরিক কার্যক্রম পছন্দ করতে পারে। যেখানে ওয়াশিংটন চায় একটি ‘নিয়ন্ত্রিত প্রস্থান’। এই উত্তেজনার আদর্শিক পটভূমি হলো ‘বৃহত্তর ইসরায়েলের’ ধারণা। এটি একটি কট্টরপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি, যা ফিলিস্তিনি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূমি দখলের পক্ষে কথা বলে। যদিও এটি সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতি নয়, তবে বর্তমান ইসরায়েলি শাসক জোটের মধ্যে এই মতাদর্শ গেঁথে আছে।
পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং গাজায় প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে ব্যাপকভাবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ধারণা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। সমালোচকরা মনে করেন, এই পদক্ষেপগুলো মূলত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এক প্রকার ভূখণ্ড দখলেরই কৌশল।
এ ধরনের আলোচনা জর্ডান, সিরিয়া এবং লেবাননের মতো দেশগুলোর আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব নিয়েও গুরুতর উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এমনিতেই অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলে অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তোলে। হিজবুল্লাহর মতো ইরানি সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ক্রমাগত সংঘাত ইসরায়েলের সক্ষমতাকে ক্ষয় করছে এবং তাদের কৌশলগত হিসাবনিকাশকে জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সামরিক, আর্থিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন ক্রমশ একটি দায় বা বোঝা হয়ে উঠছে, যা এই অঞ্চলে মার্কিন প্রভাবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপট থেকে একটি মৌলিক সত্য বেরিয়ে আসে। চিরস্থায়ী এবং অবিসংবাদিত ক্ষমতার ধারণাটি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেই এই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। সেখানকার সরকারগুলো ক্রমে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
এই অঞ্চলটি স্থিতিশীলতা দিয়ে নয়, বরং চিরস্থায়ী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে সংজ্ঞায়িত। এখানে ক্ষমতা আর নিরঙ্কুশ নয়। এটি সাময়িক, আপেক্ষিক এবং নিরন্তর হুমকির মুখে। ইরান তার ‘প্রক্সি নেটওয়ার্ক’ এবং কৌশলগত গভীরতার মাধ্যমে প্রভাব বজায় রাখছে। ইসরায়েল তার সামরিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী আধিপত্যে রূপান্তর করতে চায়। আর যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক ভূমিকা রক্ষা করার পাশাপাশি এই উভয়কেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। তবে এই তিন পক্ষই একই সত্য আবিষ্কার করছে। আর তা হচ্ছে, বৈধতাহীন ক্ষমতা অত্যন্ত ভঙ্গুর।
এই বিভাজিত ও বিকেন্দ্রীভূত বিশ্বে যেখানে সবাই নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধ করছে, সেখানে জনসম্মতি বা বৈধতা ছাড়া আধিপত্য কেবল অস্থিতিশীলই নয়, বরং এটি টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। আমরা যা প্রত্যক্ষ করছি, তা কেবল আমেরিকান ক্ষমতার পতন নয়, বরং এমন এক যুগের অবসান, যেখানে জবাবদিহিতা ছাড়াই ক্ষমতা পরিচালনা করা সম্ভব ছিল। উদীয়মান বিশ্ব তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে না, যারা শক্তি দিয়ে শৃঙ্খলা চাপিয়ে দিতে পারে। বরং তাদের দ্বারা পরিচালিত হবে, যারা মানুষের সম্মতি অর্জন করতে পারে।
আর ঠিক এখানেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যর্থ হচ্ছে।
লেখক: রঞ্জন সোলোমন একজন গবেষক ও লেখক। ফিলিস্তিন ইস্যুতে লেখালেখি করেন তিনি।
(লেখাটি মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া)

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে ওঠে এবং বিকল্প শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক প্রেক্ষাপট ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ডলার, যা বহু দশক ধরে বিশ্বের প্রধান ‘সেফ হেভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয়

ইরান জানে তারা সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। তাই তারা ‘আউটলাস্ট’ করার কৌশল নিয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা। তারা মনে করে, সময় যত যাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্ত্র ও সম্পদ ফুরিয়ে আসবে, আর তখন তারা ভালো শর্তে সমঝোতা করতে পারবে।