আমিনুল মজলিশ

সরকার বলছে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, কিন্তু পেট্রোল পাম্পে কমছে না দীর্ঘ লাইন। চলছে হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। গতকাল রাতে বাসা থেকে টেলিভিশন স্টেশনে যাচ্ছিলাম অফিসের গাড়িতে, পথে একই গাড়িতে সহযাত্রী হলেন বিএনপি দলীয় নেত্রী এবং একই সাথে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। আসলে জ্বালানি সংকটের আঁচে বাধ্য হয়ে দুজনকে এক গাড়িতে যেতে হচ্ছে। তিনি আমার টক-শো’র অতিথি। দুজনের বাসা একই দিকে হওয়ায় অফিস থেকে এক গাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সচরাচর এমনটা ঘটে না কিন্ত বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। পেট্রল পাম্পে গাড়ি গেলে কখন ফিরবে সেই গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। একসাথে দীর্ঘক্ষণ বেশ কয়েকটি গাড়ি তেলের অপেক্ষায় অবস্থান করছে পাম্পে, অফিসে তাই বাহন সংকট।
সরকার বলছে কোনো সংকট নাই কিন্তু আমরা (অর্থ্যাৎ আমার সাথে গাড়িতে বসা সরকারদলীয় নেত্রী) দেখলাম প্রায় জাহাঙ্গীর গেট থেকে বিজয় স্মরণি সিগন্যাল পযর্ন্ত অপেক্ষায় থাকা ক্লান্ত মোটরবাইক আর বিভিন্ন গাড়ির চালকের লম্বা লাইন। রাত তখন প্রায় ১১ টা। তবে পাম্পে দৃশ্যতঃ তেলের সংকট থাকলেও এযাবৎ অভিযানে প্রায় চার লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। মাটির নিচে, পানির ট্যাংকে কিংবা নানা সুড়ঙ্গ পথে পাওয়া যাচ্ছে তেলের সন্ধান। এমনকি ময়দার কারখানা, কসমেটিকের দোকান, লন্ড্রির দোকান, মুদি দোকানেও অভিযানে মিলছে তেলের ড্রাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তেল মজুতে। অনেক বাইক চালকরা নিজেদের বাসা বাড়িতেও গ্যালনের পর গ্যালন মজুত করেছে। আগামী দু-তিন মাস পর যদি তেল না পাওয়া যায় তবে তাদের তো চলতে হবে। খুবই যৌক্তিক আচরণ! কিন্তু তাদেরকে এই আতঙ্কিত কেনাকাটা বা ভয়াবহ আচরণে প্রলুব্ধ করছে কে? পারিপার্শ্বিকতা। সময়ে অসময়ে সরকারি- বেসরকারি পর্যায় থেকে দরকারি বেদরকারি তথ্যের ছড়াছাড়ি ভীতি ছড়িয়েছে অতি তাড়াতাড়ি।
তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপিসি তথা সরকারের অতি সরলতায় কিছুটা গরল ছড়িয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। কারণ আমাদের কত দিনের ডিজেল মজুত আছে, কত দিনের পেট্রল মজুত আছে এসব তথ্য উপাত্ত এত সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়ার ফলে জনমনে আশ্বাসের বদলে তৈরি হয় আতঙ্ক। সব তথ্য সবার জন্য নয়, গুরুজনে সে কথাই কয়। আসলে কিছু বিষয় সরকার কৌশলে এড়িয়ে গেলে সাধারণ মানুষকে বিশেষ গোষ্ঠীর লোভ ও লাভের বলি হতে হয় না।
রেশনিংয়ের ‘ভুল’ অংক ও ‘লোকসানের তত্ত্ব’
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায়, গেল ৬ মার্চ থেকে ডিপো ও পাম্প উভয় ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দেয় সরকার। সরকারে রেশনিং এর সিদ্ধান্তের পর পরই অনেকটা আতঙ্কে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে শুরু হয় তেল কেনা। ফলে ১৫ মার্চ জনভোগান্তির মুখে তা আবার প্রত্যাহার করতে হয়।
আসলে রেশনিং প্রক্রিয়া কতটা সময়োপযোগী এবং যুক্তিযুক্ত ছিলে এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এখানে বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে যেগুলো সচরাচর সরকারি কর্মকর্তাদের বোঝার কথা নয়। সুতরাং পাম্প মালিকদের সাথে আলাপ করা প্রয়োজন ছিল। সাধারণত একটা বড় ট্যাঙ্কারে তেলের ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার, অথচ সরকার রেশনিং করে সেই একই ট্যাঙ্কারে সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার লিটার তেল দেওয়ার সিদ্ধন্ত নেয়। ফলে পাম্প মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ডিপোতে এসে, চালক ও সহকারীদের পারিশ্রমিক এবং যাতায়তসহ আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন খরচ বহন করার পর এতো অল্প তেল নিলে প্রতি ট্রিপেই লোকসান গুনতে হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে রেশনিংএর কারণে পাম্পের অভ্যন্তরেও তৈরি হয় নানা বিশৃঙ্খলা। প্রথমত আগে এক হাজার লিটার তেল বিক্রি করতে যে জনবল লাগত, রেশনিং এর সময় সেই একই জনবলে তেল বিক্রি হচ্ছে অর্ধেকেরও কম, কিন্তু সময়ও লাগছে অনেক বেশি। এখানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে পাম্প মালিকদের। তারওপর চাহিদা মতো তেল না পেয়ে সাধারণ মানুষের অনেকেই মারমুখী ও চড়াও হয় পাম্পের কর্মচারীদের ওপর। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকেই সেসময় পাম্প বন্ধ রাখে।
ওই সময় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বক্তব্য ছিল, পাম্প মালিকদের অনেকেই রেশনিং এর আগে থেকে তেল মজুত করেছে। পরে সেগুলো খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করেছে। পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করার ক্ষেত্রেও তারা সরকারি রেশনিং এর নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেনি। অনেকেই নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে কিছু মানুষকে হয়ত একবারে বেশি তেল দিয়ে এরপর পাম্প বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ নির্ধারিত নিয়মে প্রত্যেক গ্রাহককে তেল সরবরাহ করলে তাদের হয়ত সারাদিন পাম্প খুলে বসে থাকতে হবে। এখানে বিপিসি’র বক্তব্য থেকেই তাদের ভূমিকাটা স্পষ্ট যে তারা অনেকটা ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ নীতি গ্রহণ করেছিল। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখছি, অপরাধী বিদেশে চলে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিদেশ যাত্রার নিষেধাজ্ঞা আসে কিংবা কেউ তার ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের নির্দেশ আসে। জ্বালানি খাতের কর্তাব্যক্তিরা যেহেতু অন্য গ্রহে বাস করেন না, সুতরাং তারা আর ব্যতিক্রম হবেন কীভাবে? এক্ষেত্রেও ঠিক তেমন ঘটনাই ঘটেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা আগেই বিপুল পরিমাণ তেল তাদের ইচ্ছামতো ডিপো থেকে তুলে নিয়েছে এরপর বিপিসি রেশনিং এর ঘোষণা দেয়। অথচ যখন এসব ব্যবসায়ীরা ডিপো থেকে অস্বাভাবিক হারে তেল তুলে নিচ্ছিল তখন বিপিসি হয়তো কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। আসলে সংকটের আগাম সর্তকতায় রেশনিং দোষের কিছু না। আমাদের পরিবারেও আমরা যদি ইচ্ছামতো খরচ করি তবে মাস শেষে মানিব্যাগে টাকা থাকে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কখন মিতব্যায়ী হতে হবে কিংবা খরচের রাশ কীভাবে টেনে ধরতে হবে সে বিষয়ে অবশ্যই কর্তার বিবেচনাবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের দুঃচিন্তা ও দুভোর্গের সীমা থাকে না।
আবার ঈদুল ফিতরেও পোহাতে হয়েছে তেলের জ্বালা। টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকার সময় পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাম্প মালিকরা যে তেল উত্তোলন করতে পারবে না সেটি প্রায় সবাই জানলেও বোধহয় বিষয়টি অজানা ছিল বিপিসি’র। পে-অর্ডার না করতে পারায় মালিকরা তেল তোলেনি পাম্পে, ফলে সে সময় পাম্পগুলোতে দেখা দেয় তেলের চরম সংকট, যা তৎক্ষণাৎ আরেক দফা সাধারণ মানুষকে ‘প্যানিক বায়িং’বা আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুতে বাধ্য করে। এত লম্বা সময় ধরে ব্যাংক বন্ধ থাকলে বিকল্প কোনো পথ কেন খোলা রাখা হয়নি সে বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। আমলাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা কি তাদের অদূরদর্শিতা, অদক্ষতা নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা?
এখানেই শেষ নয় রেশনিং জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন ডিপো ও পাম্পে জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এমনিতেই পাম্পগুলোর পরিস্থিতি উত্তপ্ত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ অতিষ্ঠ, কর্মচারীরাও হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান চালায়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বাড়তি ঝামেলা এড়াতে অনেক মালিক পাম্প বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব না বুঝে আমলাদের একের পর এক সিদ্ধান্ত জনভোগান্তিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে তেল সংকট নিরসনে বুমেরাং হচ্ছে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ।
নিন্দুকেরা বলছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতায় নষ্ট করা হয়েছে অনেক আমলাদের চরিত্র এবং তারা অনেকেই নানাভাবে অনৈতিক সুবিধাভোগ করেছেন। সুতরাং সেসব আমলা দিয়ে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা বর্তমানে কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আবার খোলা বাজারের তেলে অনেক যানবাহনের ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে সুতরাং মান যাচাই জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ডিপো থেকে পাম্পগুলো যে তেল নিচ্ছে সেখানে মানের কোনো ঘাটতি হচ্ছে না কি পাম্পে আসার পর তেলের মান হারাচ্ছে এই বিষয়টি জানা জরুরি। অর্থাৎ সমস্যা উপরিকাঠামোতেও আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু দেখবে কে? ঘিরে ধরে বহুল প্রচলিত পুরনো আশঙ্কা! তবে কি শর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত! সকল আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হোক, সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকায় জনমনে আসুক শান্তি, স্বস্তি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সরকার বলছে জ্বালানি তেলের সংকট নেই, কিন্তু পেট্রোল পাম্পে কমছে না দীর্ঘ লাইন। চলছে হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। গতকাল রাতে বাসা থেকে টেলিভিশন স্টেশনে যাচ্ছিলাম অফিসের গাড়িতে, পথে একই গাড়িতে সহযাত্রী হলেন বিএনপি দলীয় নেত্রী এবং একই সাথে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। আসলে জ্বালানি সংকটের আঁচে বাধ্য হয়ে দুজনকে এক গাড়িতে যেতে হচ্ছে। তিনি আমার টক-শো’র অতিথি। দুজনের বাসা একই দিকে হওয়ায় অফিস থেকে এক গাড়িতে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। সচরাচর এমনটা ঘটে না কিন্ত বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। পেট্রল পাম্পে গাড়ি গেলে কখন ফিরবে সেই গ্যারান্টি দেওয়া যায় না। একসাথে দীর্ঘক্ষণ বেশ কয়েকটি গাড়ি তেলের অপেক্ষায় অবস্থান করছে পাম্পে, অফিসে তাই বাহন সংকট।
সরকার বলছে কোনো সংকট নাই কিন্তু আমরা (অর্থ্যাৎ আমার সাথে গাড়িতে বসা সরকারদলীয় নেত্রী) দেখলাম প্রায় জাহাঙ্গীর গেট থেকে বিজয় স্মরণি সিগন্যাল পযর্ন্ত অপেক্ষায় থাকা ক্লান্ত মোটরবাইক আর বিভিন্ন গাড়ির চালকের লম্বা লাইন। রাত তখন প্রায় ১১ টা। তবে পাম্পে দৃশ্যতঃ তেলের সংকট থাকলেও এযাবৎ অভিযানে প্রায় চার লাখ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। মাটির নিচে, পানির ট্যাংকে কিংবা নানা সুড়ঙ্গ পথে পাওয়া যাচ্ছে তেলের সন্ধান। এমনকি ময়দার কারখানা, কসমেটিকের দোকান, লন্ড্রির দোকান, মুদি দোকানেও অভিযানে মিলছে তেলের ড্রাম। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তেল মজুতে। অনেক বাইক চালকরা নিজেদের বাসা বাড়িতেও গ্যালনের পর গ্যালন মজুত করেছে। আগামী দু-তিন মাস পর যদি তেল না পাওয়া যায় তবে তাদের তো চলতে হবে। খুবই যৌক্তিক আচরণ! কিন্তু তাদেরকে এই আতঙ্কিত কেনাকাটা বা ভয়াবহ আচরণে প্রলুব্ধ করছে কে? পারিপার্শ্বিকতা। সময়ে অসময়ে সরকারি- বেসরকারি পর্যায় থেকে দরকারি বেদরকারি তথ্যের ছড়াছাড়ি ভীতি ছড়িয়েছে অতি তাড়াতাড়ি।
তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বিপিসি তথা সরকারের অতি সরলতায় কিছুটা গরল ছড়িয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। কারণ আমাদের কত দিনের ডিজেল মজুত আছে, কত দিনের পেট্রল মজুত আছে এসব তথ্য উপাত্ত এত সুনির্দিষ্ট করে বলে দেওয়ার ফলে জনমনে আশ্বাসের বদলে তৈরি হয় আতঙ্ক। সব তথ্য সবার জন্য নয়, গুরুজনে সে কথাই কয়। আসলে কিছু বিষয় সরকার কৌশলে এড়িয়ে গেলে সাধারণ মানুষকে বিশেষ গোষ্ঠীর লোভ ও লাভের বলি হতে হয় না।
রেশনিংয়ের ‘ভুল’ অংক ও ‘লোকসানের তত্ত্ব’
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায়, গেল ৬ মার্চ থেকে ডিপো ও পাম্প উভয় ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দেয় সরকার। সরকারে রেশনিং এর সিদ্ধান্তের পর পরই অনেকটা আতঙ্কে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে শুরু হয় তেল কেনা। ফলে ১৫ মার্চ জনভোগান্তির মুখে তা আবার প্রত্যাহার করতে হয়।
আসলে রেশনিং প্রক্রিয়া কতটা সময়োপযোগী এবং যুক্তিযুক্ত ছিলে এ নিয়েও রয়েছে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এখানে বেশ কিছু টেকনিক্যাল বিষয় রয়েছে যেগুলো সচরাচর সরকারি কর্মকর্তাদের বোঝার কথা নয়। সুতরাং পাম্প মালিকদের সাথে আলাপ করা প্রয়োজন ছিল। সাধারণত একটা বড় ট্যাঙ্কারে তেলের ধারণ ক্ষমতা হচ্ছে সাড়ে ১৩ হাজার লিটার, অথচ সরকার রেশনিং করে সেই একই ট্যাঙ্কারে সাড়ে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার লিটার তেল দেওয়ার সিদ্ধন্ত নেয়। ফলে পাম্প মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ডিপোতে এসে, চালক ও সহকারীদের পারিশ্রমিক এবং যাতায়তসহ আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন খরচ বহন করার পর এতো অল্প তেল নিলে প্রতি ট্রিপেই লোকসান গুনতে হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে রেশনিংএর কারণে পাম্পের অভ্যন্তরেও তৈরি হয় নানা বিশৃঙ্খলা। প্রথমত আগে এক হাজার লিটার তেল বিক্রি করতে যে জনবল লাগত, রেশনিং এর সময় সেই একই জনবলে তেল বিক্রি হচ্ছে অর্ধেকেরও কম, কিন্তু সময়ও লাগছে অনেক বেশি। এখানেও লোকসান গুনতে হচ্ছে পাম্প মালিকদের। তারওপর চাহিদা মতো তেল না পেয়ে সাধারণ মানুষের অনেকেই মারমুখী ও চড়াও হয় পাম্পের কর্মচারীদের ওপর। ফলে বাধ্য হয়েই অনেকেই সেসময় পাম্প বন্ধ রাখে।
ওই সময় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বক্তব্য ছিল, পাম্প মালিকদের অনেকেই রেশনিং এর আগে থেকে তেল মজুত করেছে। পরে সেগুলো খোলা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করেছে। পাম্প থেকে তেল সরবরাহ করার ক্ষেত্রেও তারা সরকারি রেশনিং এর নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করেনি। অনেকেই নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী আর্থিক লাভের কথা চিন্তা করে কিছু মানুষকে হয়ত একবারে বেশি তেল দিয়ে এরপর পাম্প বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ নির্ধারিত নিয়মে প্রত্যেক গ্রাহককে তেল সরবরাহ করলে তাদের হয়ত সারাদিন পাম্প খুলে বসে থাকতে হবে। এখানে বিপিসি’র বক্তব্য থেকেই তাদের ভূমিকাটা স্পষ্ট যে তারা অনেকটা ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ নীতি গ্রহণ করেছিল। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখছি, অপরাধী বিদেশে চলে যাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিদেশ যাত্রার নিষেধাজ্ঞা আসে কিংবা কেউ তার ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দের নির্দেশ আসে। জ্বালানি খাতের কর্তাব্যক্তিরা যেহেতু অন্য গ্রহে বাস করেন না, সুতরাং তারা আর ব্যতিক্রম হবেন কীভাবে? এক্ষেত্রেও ঠিক তেমন ঘটনাই ঘটেছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা আগেই বিপুল পরিমাণ তেল তাদের ইচ্ছামতো ডিপো থেকে তুলে নিয়েছে এরপর বিপিসি রেশনিং এর ঘোষণা দেয়। অথচ যখন এসব ব্যবসায়ীরা ডিপো থেকে অস্বাভাবিক হারে তেল তুলে নিচ্ছিল তখন বিপিসি হয়তো কোনো উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। আসলে সংকটের আগাম সর্তকতায় রেশনিং দোষের কিছু না। আমাদের পরিবারেও আমরা যদি ইচ্ছামতো খরচ করি তবে মাস শেষে মানিব্যাগে টাকা থাকে না, এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কখন মিতব্যায়ী হতে হবে কিংবা খরচের রাশ কীভাবে টেনে ধরতে হবে সে বিষয়ে অবশ্যই কর্তার বিবেচনাবোধ থাকা বাঞ্ছনীয়। অন্যথায় পরিবারের সদস্যদের দুঃচিন্তা ও দুভোর্গের সীমা থাকে না।
আবার ঈদুল ফিতরেও পোহাতে হয়েছে তেলের জ্বালা। টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকার সময় পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাম্প মালিকরা যে তেল উত্তোলন করতে পারবে না সেটি প্রায় সবাই জানলেও বোধহয় বিষয়টি অজানা ছিল বিপিসি’র। পে-অর্ডার না করতে পারায় মালিকরা তেল তোলেনি পাম্পে, ফলে সে সময় পাম্পগুলোতে দেখা দেয় তেলের চরম সংকট, যা তৎক্ষণাৎ আরেক দফা সাধারণ মানুষকে ‘প্যানিক বায়িং’বা আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুতে বাধ্য করে। এত লম্বা সময় ধরে ব্যাংক বন্ধ থাকলে বিকল্প কোনো পথ কেন খোলা রাখা হয়নি সে বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। আমলাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা কি তাদের অদূরদর্শিতা, অদক্ষতা নাকি ইচ্ছাকৃত অবহেলা?
এখানেই শেষ নয় রেশনিং জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, দেশের বিভিন্ন ডিপো ও পাম্পে জ্বালানি তেলের মান যাচাইয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। এ যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। এমনিতেই পাম্পগুলোর পরিস্থিতি উত্তপ্ত। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ অতিষ্ঠ, কর্মচারীরাও হিমশিম খাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি ভ্রাম্যমাণ আদালত নিয়মিত অভিযান চালায়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। বাড়তি ঝামেলা এড়াতে অনেক মালিক পাম্প বন্ধ রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব না বুঝে আমলাদের একের পর এক সিদ্ধান্ত জনভোগান্তিকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে তেল সংকট নিরসনে বুমেরাং হচ্ছে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ।
নিন্দুকেরা বলছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম-স্বেচ্ছাচারিতায় নষ্ট করা হয়েছে অনেক আমলাদের চরিত্র এবং তারা অনেকেই নানাভাবে অনৈতিক সুবিধাভোগ করেছেন। সুতরাং সেসব আমলা দিয়ে এ ধরনের অভিযান পরিচালনা বর্তমানে কতটা কাজে আসবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আবার খোলা বাজারের তেলে অনেক যানবাহনের ইঞ্জিনের ক্ষতি হচ্ছে সুতরাং মান যাচাই জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, ডিপো থেকে পাম্পগুলো যে তেল নিচ্ছে সেখানে মানের কোনো ঘাটতি হচ্ছে না কি পাম্পে আসার পর তেলের মান হারাচ্ছে এই বিষয়টি জানা জরুরি। অর্থাৎ সমস্যা উপরিকাঠামোতেও আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার। কিন্তু দেখবে কে? ঘিরে ধরে বহুল প্রচলিত পুরনো আশঙ্কা! তবে কি শর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত! সকল আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণিত হোক, সকলের দায়িত্বশীল ভূমিকায় জনমনে আসুক শান্তি, স্বস্তি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত শক্তির ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে ওঠে এবং বিকল্প শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা স্পষ্ট হতে শুরু করে। বর্তমান বৈশ্বিক আর্থিক প্রেক্ষাপট ঠিক তেমনই এক সন্ধিক্ষণ। যুক্তরাষ্ট্রের ডলার, যা বহু দশক ধরে বিশ্বের প্রধান ‘সেফ হেভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয়

ইরান জানে তারা সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ নয়। তাই তারা ‘আউটলাস্ট’ করার কৌশল নিয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করা। তারা মনে করে, সময় যত যাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অস্ত্র ও সম্পদ ফুরিয়ে আসবে, আর তখন তারা ভালো শর্তে সমঝোতা করতে পারবে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত ২০ জানুয়ারি দাভোসে তার ভাষণের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি কানাডার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা