Advertisement Banner

দূতাবাসে হামলা চালিয়ে আমেরিকার কতটা ক্ষতি করতে পারল ইরান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
দূতাবাসে হামলা চালিয়ে আমেরিকার কতটা ক্ষতি করতে পারল ইরান?
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইরানের হামলা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে যুদ্ধ শুরু করার পরপরই উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা শুরু করে তেহরান। এরমধ্যে গত মাসে সৌদি আরবের এক মার্কিন দূতাবাসে ইরানের একটি ড্রোন হামলায় আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যা বলা হচ্ছে, বাস্তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ। তাছাড়া এও ইঙ্গিত দেয় যে ওই দেশগুলোতে ওয়াশিংটনের স্থাপনাগুলোতেও আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে ইরানের।

সৌদির হামলার ঘটনা উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, হামলাটি ঘটেছিল ৩ মার্চ। রিয়াদের সুরক্ষিত ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে মার্কিন কম্পাউন্ডে আঘাত হানে ইরানি ড্রোন। এক মিনিট পর আরেকটি ড্রোন প্রথমটির তৈরি গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয় বলে কর্মকর্তারা জানান।

রাতের এই হামলা দূতাবাসের একটি সুরক্ষিত অংশে আঘাত হানে, যেখানে দিনে কয়েকশ মানুষ কাজ করেন। এতে তিনটি তলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি ওয়াল স্ট্রিটকে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর মধ্যে সিআইএ-এর একটি স্টেশনও ছিল।

যদিও সে সময় সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় সীমিত অগ্নিকাণ্ড ও সামান্য ক্ষতি হয়েছে, তবে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে ক্ষয়ক্ষতি ছিল অনেক বেশি এবং এতে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলতে থাকে। দূতাবাসের কিছু অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে সেগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন এক ব্যক্তি।

ওই রাতে কয়েক ঘণ্টা পর আরও কিছু ড্রোন প্রতিহত করা হয়, যার ধ্বংসাবশেষ একটি প্রি-স্কুলের কাছাকাছি পড়ে। ধারণা করা হয়, ওই হামলার একটি লক্ষ্য ছিল সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদস্থ কূটনীতিকের বাসভবন, যা দূতাবাস থেকে কয়েকশ ফুট দূরে অবস্থিত।

ওয়াল স্ট্রিট জানায়, রাত ১টা ৩০ মিনিটে এই হামলা ঘটে। কর্মকর্তারা বলেন, এটি যদি দিনে কাজ চলাকালীন সময়ে হত, তাহলে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত। তবে এই হামলার মাধ্যমে একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে—ইরান এমন স্থানেও মার্কিনদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যেগুলোকে আগে নিরাপদ মনে করা হতো।

সিআইএ-এর সাবেক সন্ত্রাসবিরোধী কেন্দ্রের প্রধান বার্নাড হুডসন বলেন, “ইরান নিজস্ব প্রযুক্তিতে এমন একটি অস্ত্র তৈরি করতে পেরেছে, যেটি শত শত মাইল দূরে নিক্ষেপ করে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষের দূতাবাসে আঘাত হেনেছে। এর অর্থ তারা চাইলে শহরের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে পারে।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ও ঘাঁটিগুলোতে আসল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে সম্পূর্ণ নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। এতে সন্দেহ জোরদার হয় যে বাস্তবে আরও বেশি ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে।”

ওয়াল স্ট্রিট জানায়, মার্চের শেষ দিকে সৌদির প্রিন্স সুলতান মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে আরেকবার নিজেদের সক্ষমতার জানান দেয় ইরান। ওই ঘাঁটির মার্কিন বিমানগুলোকে নিখুঁতভাবে আঘাত করে ইরান। দ্বিতীয়বারের মতো মার্কিন ট্যাংকারে আঘাত হানতে সক্ষম নয় ইরানের অস্ত্র। ওই হামলায় প্রায় এক ডজন সেনা আহত হন, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, এই যুদ্ধে ভারসাম্যহীনতা স্পষ্ট। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২০ হাজারের বেশি বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছে, সামরিক অবকাঠামো ও অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ ধ্বংস করেছে এবং ইস্পাতসহ বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে দিয়েছে। তবে ইরান এখনো নিয়মিতভাবে এমন হামলা চালাতে সক্ষম, যা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো, বিমানবন্দর ও জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

গতকাল শুক্রবার একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। এর মধ্যে একটি হলো এফ-১৫ বিমান ও এ-১০ ওয়ার্থগ মডেলের আরেকটি যুদ্ধবিমান।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও কূটনৈতিক স্থাপনাগুলোর ওপর সবচেয়ে বিস্তৃত ও ঘন ঘন হামলা চালিয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জানিয়েছে, বাগদাদ, দুবাই, কুয়েত সিটি, রিয়াদ ও ইরাকি কুর্দিস্তানের এরবিলে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। অবশ্য এসব হামলায় কোনো মার্কিন নাগরিক নিহত হয়নি। তবে ঘাঁটিগুলোর ওপর হামলায় সাতজন সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন, পাশাপাশি যুদ্ধবিমান ও সরঞ্জামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যার আর্থিক পরিমাণ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

নিরাপত্তাজনিত কারণে বিদেশে মার্কিন মিশনের সুরক্ষা ব্যবস্থার নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয় না বলে জানিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় সৌদি আরব তুলনামূলক কম হামলার শিকার হয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরান প্রায় আড়াই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।

গতকাল শুক্রবার একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। ছবি: রয়টার্স
গতকাল শুক্রবার একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। ছবি: রয়টার্স

তা সত্ত্বেও ইরানে একটি হুঁশিয়ারির পর মার্কিন কোম্পানি রয়েছে রিয়াদের এমন কয়েকটি ব্যবসা পার্ক ও অফিস টাওয়ার কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়।

ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসগুলো অন্যগুলোর মতো নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করে না। পরিবর্তে সুরক্ষা ও উন্নত অগ্নিনির্বাপণের জন্য স্বাগতিক দেশের ওপর নির্ভর করে।

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, সৌদির সামরিক বাহিনী কাছাকাছি একটি রাজ প্রাসাদকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা দিয়ে সুরক্ষা দেয়, যার কভারেজ ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টার পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এই নিরাপদ এলাকায় আঘাত হেনেছে ইরান।

ওই এলাকায় অধিকাংশ বিদেশি দূতাবাসের পাশাপাশি হাজারো প্রবাসী ও সৌদি নাগরিক বসবাস করেন। তাদের মধ্যে শীর্ষ ব্যবসায়ী, কয়েকজন মন্ত্রী এমনকি রাজপরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা নাগরিকদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। কয়েক বছর আগে এই ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টার বারবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছিল, যা চালিয়েছিল হুতিরা।

সম্পর্কিত