কবির কবিতা থেকে বের হয়ে সেই কবেই মানুষের গবেষণায় প্রবেশ করেছে চাঁদ। আর এই চাঁদ নিয়ে কাড়াকাড়িও চলছে দশকের পর দশক ধরে। রাশিয়াকে টেক্কা দিয়ে শেষে আমেরিকারই জয় হয়েছে। এই কাহিনি তো ১৯৬৯ সালের। এরপর কী হয়েছিল? এরপর চাঁদে আরও গেছে মানুষ। কিন্তু রহস্যজনক ব্যাপার হলো, গত ৫৩ বছর ধরে চাঁদে আর একবারও মানুষ পাঠায়নি কোনো দেশ।
এই লম্বা সময়ের মধ্যেই চাঁদ নিয়ে কাড়াকাড়িতে যুক্ত হয়েছে অন্যতম পরাশক্তি চীন। আর সেই চীনও জানিয়ে দিয়েছে, খুব শিগগির তারা চাঁদে মানুষ পাঠাবে। চীন ঘোষণা করেছে, ২০৩০ সালের মধ্যেই চাঁদে মানুষ পাঠাবে। আর তাতেই আমেরিকাও গুরুত্ব বাড়াল চন্দ্রাভিযানে।
আমেরিকার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় পর পৃথিবী থেকে কোনো মানুষ আবারও চাঁদের উদ্দেশ্যে মহাকাশে পাড়ি জমালো। ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ মিশনের পর এই প্রথম নাসার ‘আর্টেমিস-২’ মিশনের মাধ্যমে মানববাহী একটি মহাকাশযান পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে গভীর মহাকাশে প্রবেশ করেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় নাসার বিশালাকার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ (এসএলএস) রকেটে চড়ে চার নভোচারী তাদের ১০ দিনের দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর মিশনে রওনা হয়েছেন।
এই মিশনে মূলত দেখা হবে ওরিয়ন ক্যাপসুল এবং সিস্টেমগুলো মানুষের বসবাসের জন্য কতটুকু নির্ভরযোগ্য, যা আগামীতে চাঁদের মাটিতে মানুষের স্থায়ী বসতি স্থাপনের পথকে সুগম করবে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, ৩২২ ফুট লম্বা এসএলএস রকেট যখন কেনেডি স্পেস সেন্টারের প্যাড ৩৯-বি থেকে আগুনের গোলক ছুটিয়ে গর্জে উঠল, তখন তা কেবল একটি যান্ত্রিক যাত্রা ছিল না, বরং ছিল স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। তবে যাত্রাটি সহজ ছিল না। উৎক্ষেপণের আগে ইঞ্জিনিয়ারদের বেশ কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, বিশেষ করে হাইড্রোজেনের লিক নিয়ে নাসার উদ্বেগ ছিল দীর্ঘদিনের। এর আগে বেশ কয়েকবার এই লিকের কারণেই মিশনটি পেছাতে হয়েছিল। গত নভেম্বরে হওয়ার কথা থাকলেও ওরিয়ন ক্যাপসুলের ‘হিট শিল্ড’ বা তাপ সুরক্ষাকবচ নিয়ে দীর্ঘ তদন্তের কারণে এটি বিলম্বিত হয়। এমনকি উৎক্ষেপণের ঠিক আগ মুহূর্তেও ব্যাটারি সেন্সর এবং রকেটের ‘ফ্লাইট টারমিনেশন সিস্টেম’ (যা রকেট পথ হারালে ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হয়) নিয়ে ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সব বাধা কাটিয়ে চারজন আরোহীকে নিয়ে মহাকাশে ডানা মেলে ওরিয়ন।
সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে আর্টেমিস-২ এর রকেট। ছবি: নাসার ওয়েবসাইট থেকেমার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, উৎক্ষেপণের মাত্র পাঁচ মিনিট পরই মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান আবেগের সঙ্গে বলে ওঠেন, “আমরা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখছি। আর এখন আমরা সরাসরি সেদিকেই এগোচ্ছি।”
কারা আছেন ঐতিহাসিক সফরে?
আর্টেমিস-২ মিশনের ক্রু নির্বাচন করা হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে, যেখানে স্থান পেয়েছেন অভিজ্ঞ তিনজন আমেরিকান এবং একজন কানাডীয় নভোচারী।
রিড ওয়াইজম্যান (কমান্ডার): ৫০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নভোচারী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের প্রাক্তন কমান্ডার। টেস্ট পাইলট হিসেবে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ভিক্টর গ্লোভার (পাইলট): ৪৯ বছর বয়সী গ্লোভার মার্কিন নৌবাহিনীর একজন দক্ষ বৈমানিক। প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে তিনি চন্দ্রাভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
ক্রিস্টিনা কোচ (মিশন স্পেশালিস্ট): ৪৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিনা কোচ একজন নারী হিসেবে মহাকাশে দীর্ঘতম সময় (৩২৮ দিন) থাকার বিশ্ব রেকর্ডধারী। তার বৈজ্ঞানিক দক্ষতা মিশনের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।
জেরেমি হ্যানসেন (মিশন স্পেশালিস্ট): ৫০ বছর বয়সী হ্যানসেন একজন প্রাক্তন ফাইটার পাইলট। তিনি প্রথম কানাডীয় হিসেবে চাঁদের কাছাকাছি যাচ্ছেন, যা মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক বড় প্রতীক।
১০ দিনের মিশন পরিকল্পনা
আর্টেমিস-২ মিশনটি মূলত ১০ দিনের একটি সুপরিকল্পিত মহড়া। এর লক্ষ্য চাঁদে অবতরণ করা নয়। বরং চাঁদের চারপাশ ঘুরে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসা। এই মিশনের ১০ দিন নভোচারীরা আসলে কী করবেন–আল জাজিরার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বিস্তারিত।
যাত্রার প্রথম দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে অবস্থান করবেন। এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে ওরিয়ন ক্যাপসুলের লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য জটিল যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হবে। সবকিছু ঠিক থাকলে মহাকাশযানের প্রপালশন সিস্টেম ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ নামক কৌশল প্রয়োগ করবে। এই কৌশলের মাধ্যমে ওরিয়নকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের করে সরাসরি চাঁদের অভিমুখে ছুড়ে দেওয়া হবে।
পরের দুই দিন ওরিয়ন গভীর মহাকাশ পাড়ি দেবে। নভোচারীরা অনবরত মহাকাশযানের সিস্টেমগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। এই সময়ে তারা মহাকাশযানের ভেতর নিজেদের খাপ খাইয়ে নেবেন এবং গভীর মহাকাশের বিকিরণ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার প্রক্রিয়াগুলো পরীক্ষা করবেন।
মহাকাশযানটি একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন ট্রাজেক্টরি’ অনুসরণ করবে। এটি এমন একটি কৌশলগত পথ, যেখানে চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ব্যবহার করে মহাকাশযানটি প্রাকৃতিকভাবেই আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে। এর জন্য বাড়তি জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না।
পঞ্চম দিনে ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ বলয়ের ভেতরে প্রবেশ করবে। এই পর্যায়ে পৃথিবীর চেয়ে চাঁদের আকর্ষণ বল বেশি কার্যকরী হবে। এই দিন নভোচারীরা তাদের স্পেসস্যুটগুলো পরার মহড়া দেবেন, স্যুটগুলোর ভেতরের চাপ পরীক্ষা করবেন এবং দ্রুত সিটে আটকে থাকার চর্চা করবেন, যা মূলত জরুরি অবস্থার প্রস্তুতি।
মিশনের চার নভোচারী। ছবি: নাসার ওয়েবসাইট থেকেষষ্ঠ দিনটি মিশনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর সময়। ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৪,০০০ থেকে ৬,০০০ মাইল (প্রায় ৬,৪৫০ থেকে ৯,৬৫০ কিলোমিটার) উপর দিয়ে উড়ে যাবে। চাঁদের সবচেয়ে দূরতম অঞ্চল (ফার সাইড) অতিক্রমের সময় কয়েক মিনিটের জন্য পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। নভোচারীরা এই সময় চাঁদের অসাধারণ সব ছবি তুলবেন এবং ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ চালাবেন।
সপ্তম থেকে নবম দিন চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে ফেরার পথে ওরিয়ন আবারও গভীর মহাকাশে থাকবে। এই সময়ে ‘আর্চার’ নামক বিশেষ মেডিকেল প্রোগ্রামের মাধ্যমে নভোচারীদের শারীরিক পরিবর্তন এবং গভীর মহাকাশের তেজস্ক্রিয়তা তাদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে–তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এটি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি মঙ্গল অভিযানের জন্য তথ্য সরবরাহ করবে।
মিশনের শেষদিন ওরিয়ন তার সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। পৃথিবীতে প্রবেশের সময় এর গতি থাকবে ঘণ্টায় প্রায় ২৫,০০০ মাইল (৪০,২৩০ কিলোমিটার)। প্রচণ্ড তাপে ওরিয়নের চারপাশ জ্বলে উঠলেও এর ‘হিট শিল্ড’ নভোচারীদের রক্ষা করবে। সবশেষে প্যারাসুটের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরের নির্দিষ্ট স্থানে এটি আছড়ে পড়বে, যেখান থেকে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের উদ্ধার করবে।
মিশনটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ যেখানে আগেই চাঁদে পা রেখেছে, তবে এখন কেন এই ‘ফ্লাইবাই’ মিশন? ফ্লাইবাই মিশন কী, তাই তো? ফ্লাইবাই হলো–মহাকাশযানের এমন একটি অভিযান, যেখানে যানটি কোনো গ্রহ, উপগ্রহ বা মহাজাগতিক বস্তুর কক্ষপথে প্রবেশ না করে বা সংঘর্ষ না ঘটিয়ে খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়। নাসার ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, এটি সরাসরি চাঁদে নামার আগে একটি চূড়ান্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা।
প্রযুক্তির পরীক্ষা: ১৯৭০-এর দশকের প্রযুক্তি আর বর্তমানের প্রযুক্তিতে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। ওরিয়ন ক্যাপসুল এবং এসএলএস রকেট আধুনিক যুগের সক্ষমতা প্রমাণের পরীক্ষা দিচ্ছে।
মানুষের নিরাপত্তা: গভীর মহাকাশে তেজস্ক্রিয়তা অনেক বেশি। দীর্ঘ ১০ দিনের এই যাত্রায় নভোচারীদের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, তা বোঝা প্রয়োজন। সে জন্য এই অভিযান।
ফের চাঁদের পথে মানুষ। ছবি: নাসার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়াভবিষ্যতের সোপান: আর্টেমিস-২ সফল হলে ২০২৭ সালে ‘আর্টেমিস-৩’ মিশনের মাধ্যমে মানুষ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করবে। এমনকি ২০২৮ সালের ‘আর্টেমিস-৪’ মিশনে একটি গেটওয়ে বা কক্ষপথ কেন্দ্র তৈরি করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরবর্তী ধাপ: আর্টেমিস-৩ এবং ২০২৭-এর লক্ষ্য
আর্টেমিস-২ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর নাসার পরবর্তী বড় লক্ষ্য হলো ‘আর্টেমিস-৩’। এটি ২০২৭ সালে শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই মিশনে ওরিয়ন ক্যাপসুল পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেসএক্স-এর ‘স্টারশিপ’ অথবা ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডারের সঙ্গে ডকিং বা যুক্ত হবে। এরপরই নভোচারীরা ল্যান্ডারে চড়ে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর বরফে ঢাকা অঞ্চলে অবতরণ করবেন। চাঁদে বরফ বা পানির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেলে সেখান থেকে জ্বালানি ও অক্সিজেন তৈরি করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে মানুষকে মঙ্গলে পাঠানোর ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করবে।
আর্টেমিস-২ কেবল একটি মহাকাশ যাত্রা নয়, এটি মানুষের অদম্য কৌতূহল এবং সাহসিকতার এক মূর্ত প্রতীক। তবে এর বাইরে চরম আকার ধারণ করছে প্রতিযোগিতা। রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন–এই চারজন ব্যক্তি এখন মানুষের পক্ষ থেকে মহাকাশের গভীরতম রহস্যের দুয়ারে কড়া নাড়ছেন। আরও ভালোভাবে বললে, পশ্চিমা নেতারা তাকিয়ে আছেন তাদের দিকে।
তবে সে যাই হোক, তাদের এই ১০ দিনের সফরের সফল সমাপ্তিই ঠিক করে দেবে, পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ পৃথিবীর বাইরে অন্য কোনো গ্রহে বসতি গড়তে পারবে কি না। সারা বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ১০ এপ্রিলের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যখন ওরিয়ন সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসবে।