Advertisement Banner

ইরান নিয়ে কানাডার দ্বিচারিতা যেভাবে বিশ্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে

জেরেমি ওয়াইল্ডম্যান
জেরেমি ওয়াইল্ডম্যান
ইরান নিয়ে কানাডার দ্বিচারিতা যেভাবে বিশ্বকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ছবি: রয়টার্স

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত ২০ জানুয়ারি দাভোসে তার ভাষণের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তিনি কানাডার মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা, টেকসই উন্নয়ন, সংহতি, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার মতো মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

কানাডা দীর্ঘকাল ধরে যে নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে সমর্থন দিয়ে আসছে, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরার প্রেক্ষাপটে তিনি এই ভাষণ দেন। আমেরিকা তাদেরই গড়ে তোলা এই নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থাটি কার্যত পরিত্যাগ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং কানাডাসহ তাদের পশ্চিমা মিত্রদের ভূখণ্ড দখলের হুমকি দিচ্ছে—মূলত এ কারণেই এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

কার্নি সতর্ক করে বলেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থায় যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মনে হচ্ছে, সেখানে পারস্পরিক সুরক্ষার জন্য মধ্যম শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি পরামর্শ দেন যে, এই দেশগুলোর উচিত সম্মিলিতভাবে আরও বড়, উন্নত, শক্তিশালী এবং অধিকতর ন্যায়সঙ্গত কিছু গড়ে তোলা।

তাহলে কেন তার সরকার মাত্র এক মাস পরেই ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি অবৈধ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধকে অবিলম্বে সমর্থন জানাল?

ইরানের তথাকথিত দুর্বল মানবাধিকার রেকর্ডের বিষয়টি (যা কিনা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের রেকর্ডের সাথেও তুলনীয়) একপাশে সরিয়ে রাখলেও, এই যুদ্ধ জাতিসংঘের সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) লঙ্ঘন করে। যেখানে যেকোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি মার্কিন সাংবিধানিক আইনকেও লঙ্ঘন করে, কারণ সেখানে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য কংগ্রেসের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন হয়।

যুদ্ধ জীবন-ধারণের ন্যূনতম ব্যবস্থা এবং জীবন রক্ষাকারী অবকাঠামো ধ্বংস করা, অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধের পথ সুগম করে। ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল একটি ইরানি স্কুলে মার্কিন বোমাবর্ষণের মাধ্যমে, যেখানে ১৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। যাদের অধিকাংশ ছিল শিশু। এরপর থেকে দেশটির স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পদ্ধতিগতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো কানাডাতেও এই যুদ্ধটি জনসমর্থনহীন। এই পরিস্থিতি এবং দাভোস পরবর্তী তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে সরকার তাদের প্রাথমিক সমর্থনে কিছুটা সংযত হতে বাধ্য হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় আমেরিকা-ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় আমেরিকা-ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

গত ৩ মার্চ কার্নি স্বীকার করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়াই কিংবা মিত্রদের সাথে কোনো পরামর্শ না করেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে তার এই সমালোচনা যুদ্ধের বিরুদ্ধে হওয়ার চেয়ে বরং প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতির বিষয়েই বেশি ছিল। তবুও তিনি এই সংঘাতে ইরানের ভূমিকার ওপরই জোর দেন, যদিও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইরানই এখানে আক্রান্ত পক্ষ।

চরম বৈপরীত্য

গত এক মাসে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ ইরান, ইউক্রেন এবং লেবানন সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ যে বিবৃতিগুলো দিয়েছেন, তা থেকে এটাই মনে হয় যে, কানাডা এই যুদ্ধের জন্য প্রকৃত আক্রমণকারীদের চেয়ে ইরানকেই বেশি দায়ী করছে।

সংঘাতের উৎসের বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে আনন্দের বিবৃতিগুলো পদ্ধতিগতভাবে মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের মূল ঘটনাটিকে আড়াল করেছে। তার পরিবর্তে তিনি ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর আলোকপাত করেছেন—যার মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলা এবং হরমুজ প্রণালী অবরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের এই কর্মকাণ্ডগুলোকে নিন্দনীয় হিসেবে অভিহিত করা হলেও মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণগুলোকে বর্ণনা করা হচ্ছে ‘আক্রমণাত্মক অভিযান’ হিসেবে।

ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দেওয়া হলেও প্রকৃত আক্রমণকারীদের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না। কানাডা উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের হামলা এবং সেসব দেশের নাগরিকদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানালেও, ইরানি অবকাঠামো বা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ক্ষেত্রে একই ভূমিকা পালন করছে না।

এই আচরণ গত ১৩ মার্চ ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আনন্দের ব্যবহৃত ভাষার সাথে চরম বৈপরীত্য তৈরি করে। সেখানে রাশিয়াকে স্পষ্টভাবে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কানাডা রুশ সংস্থাগুলোর ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা তুলে ধরা হয়েছে। অথচ ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে কানাডা এর কিছুই করছে না।

গত ২৪ মার্চ আনন্দ যখন ইউক্রেনীয় অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘সুস্পষ্ট’ লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন। জোর দিয়ে বলেন যে, দায়ী ব্যক্তিদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, তখন এই বৈপরীত্য আরও গভীর হয়। কিন্তু ইরান আক্রমণে একই ব্লুপ্রিন্ট ব্যবহৃত হলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো শব্দ ব্যবহার করেননি কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এই ধারা ২৬ মার্চও অব্যাহত থাকে, যখন কানাডার সরকার ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। কিন্তু যে আক্রমণকারীরা এই যুদ্ধ শুরু করেছিল তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এর পর দিন, আনন্দ সংহতি প্রকাশের উদ্দেশ্যে জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে তাদের ইউক্রেনীয় প্রতিপক্ষের একটি ছবি রিপোস্ট করেন।

তার সমস্ত বিবৃতি এবং ভিডিওজুড়ে আনন্দ কার্নির দাভোস রূপরেখাটিই টেনে আনছেন; যেখানে কানাডাকে এক বিপজ্জনক বিশ্বে ‘নির্মল দৃষ্টি এবং অবিচল লক্ষ্য’ নিয়ে কাজ করা একটি মধ্যম শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের ভাষা কানাডা সরকারকে তাদের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানকে চরম ভণ্ডামির বদলে বাস্তববাদী হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মৌলিক নীতিগত লঙ্ঘনগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে কেবল ইরানের বিরুদ্ধে বেছে বেছে আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ দেখায় যে, এই ‘নীতিগত বাস্তববাদ’ আসলে কৌশলগত সখ্যের একটি ছদ্মবেশ মাত্র। দাভোসে কার্নির বাগাড়ম্বর সত্ত্বেও, এই তথাকথিত ‘নীতিগত বাস্তববাদ’কে একটি কৌশলগত মিত্রতার ছদ্মবেশ হিসেবে উন্মোচিত করে। কানাডা আদতে সেই নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ওপরই বাজি ধরছে—যে ব্যবস্থাটি বিশ্বের বাকি অংশের বিনিময়ে কেবল গুটি কয়েক পশ্চিমা দেশ এবং তাদের মিত্রদের বিশেষ সুবিধা দেয়।

তারা নিজেদের সুবিধার জন্য বৈশ্বিক নীতিগুলোকে বেছে বেছে প্রয়োগ করছে, যা কার্যত একটি বর্ণবাদী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করছে। যেখানে শোষিত গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন নিয়ম রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনকে অবমূল্যায়ন

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে কানাডার অবস্থান সংগতিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সক্রিয় সমর্থন হোক কিংবা নীরবতা; তথ্য গোপন ও বাছাইকৃত গুরুত্বারোপের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে জড়িত থাকা হোক—ইরান ইস্যুতে কানাডার দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ভেনেজুয়েলা, কিউবা, গাজা এবং লেবাননে মার্কিন-ইসরায়েলি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের প্রতি তাদের আগের আগের প্রতিক্রিয়ারই প্রতিফলন।

কার্নি যখন মধ্যম শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলেছিলেন, তখন এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তিনি আসলে সেই পশ্চিমা শক্তিগুলোকেই বুঝিয়েছেন যারা নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে-যারা গ্লোবাল সাউথে লুণ্ঠন, নিপীড়ন এবং গণ-নৃশংসতা চালিয়েছে। এই সম্পদশালী কিন্তু পুরনো সমাজগুলো এখনো তাদের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা সস্তা শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদের বিশাল সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। আর এই সম্পদ শোষণের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র্রে ওপর নির্ভর করে।

সুতরাং, কানাডার নীতিনির্ধারকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার দিকে মনোযোগ দেওয়া স্বাভাবিক। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গোষ্ঠী ইরান বিষয়ে এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ছবি: রয়টার্স

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বক্তব্যে অন্যান্য পশ্চিমা শক্তিগুলোকে নতুন বৈশ্বিক উপনিবেশবাদের লুটের মালের ভাগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেটি হয়ত কানাডাকে এই আশায় উদ্বুদ্ধ করেছে যে, ইরান যুদ্ধে সমর্থন দিলে তারা ওয়াশিংটনকে পুনরায় নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বে ফিরিয়ে আনতে পারবে।

কার্নি সরকার যে নতুন বিশ্বব্যবস্থার স্বপ্ন দেখছে বলে মনে হচ্ছে, তা আসলে আয়তনে ক্ষুদ্র এবং ন্যায়বিচারের দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল। বিষয়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণও। কারণ আন্তর্জাতিক আইন যখন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা হয় না, তখন তা বিশ্বব্যবস্থাকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর এমন এক ব্যবস্থা যেখানে আগ্রাসনের কোনো সীমা নেই, সেখানে প্রত্যেকেই বিপদের মুখে থাকে।

ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক এবং কানাডিয়ান অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করেছে। তার ওপর পারমাণবিক ঝুঁকি সম্পন্ন এই যুদ্ধের কারণে অগণিত কানাডিয়ান নাগরিক ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক সম্পর্কের সূত্রে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

এদিকে, কানাডা নিজেও ভূখণ্ড হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে—তা জ্বালানি-সমৃদ্ধ আলবার্টার বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা সরাসরি দখল হওয়ার মাধ্যমেই হোক না কেন। কানাডার জন্য সর্বোত্তম সুরক্ষা হলো আন্তর্জাতিক আইনের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা, যা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পরিণামকে দুঃসাধ্য করে তুলবে।

এই ধরনের ব্যবস্থার জন্য মধ্যম শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন, যেমনটি স্পেনের কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে। স্পেন আন্তর্জাতিক আইনের একজন প্রকৃত রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যারা ইউক্রেন, গাজা এবং ইরান—সব ক্ষেত্রেই একই নীতি প্রয়োগ করছে। অন্যদিকে, কার্নি সরকার একে অবমূল্যায়ন করার পথ বেছে নিয়েছে।

লেখক: রাজনৈতিক গবেষক

(নিবন্ধটি মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত)

সম্পর্কিত