চেইতিজ বাজপেয়ী

বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা বর্তমানে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতায় আসা এই দেশগুলোর তুলনামূলক নতুন সরকারগুলোর প্রতি এখনো জনগণের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে জনপ্রিয়তার এই ম্যান্ডেট থাকলেও, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক সংকট এবং ভারতের সাথে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে এখন তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মিল ও অমিল
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় এক বিশাল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকশে। সে দেশে এই আন্দোলনকে বলা হয় ‘আরাগালায়া’ বা সংগ্রাম। এরপর ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে ‘বর্ষা বিপ্লব’, যার জেরে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। আর সবশেষে ২০২৫ সালে নেপালে তরুণদের ‘জেন-জি বিপ্লব’ প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়।
এই তিনটি আন্দোলনের পেছনেই ছিল মূলত তিনটি বড় কারণ- তীব্র অর্থনৈতিক সংকট (তিনটি দেশই এখন আইএমএফ-এর ঋণের ওপর ভর করে চলছে), বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বৈরাচারী শাসনের কারণে সাধারণ মানুষের মনে শাসকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছিল। এই আগুন আরও ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা খুব সহজেই সরকারের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে একজোট করতে পেরেছিল।
অবশ্যই দেশগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্যও ছিল। যেমন, শ্রীলঙ্কায় আন্দোলনের মূল কারণ ছিল বিদেশি ঋণের সংকট, লাগামহীন দাম বৃদ্ধি আর নিত্যপণ্যের চরম অভাব। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থাটিই সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর নেপালের ক্ষেত্রে আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।

আন্দোলনের পর দেশগুলোতে যে নির্বাচন হয়, তার ফলাফলও ছিল আলাদা। নেপাল বেছে নেয় আমূল পরিবর্তন। তারা বালেন্দ্র শাহ নামের একজন সাবেক র্যাপারকে তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বেছে নেয় চেনা পথ। তারা দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ছেলে তারেক রহমানকে নির্বাচিত করে। আবার নেপাল যেখানে তাদের পুরোনো বামপন্থী দলগুলোকে ছুড়ে ফেলেছে, শ্রীলঙ্কায় দেখা গেছে উল্টো চিত্র। সেখানকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে এখন ‘জেভিপি’ নামের একটি মার্ক্সবাদী দলের জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়
সম্প্রতি এই এলাকায় গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, চারপাশে ইতিবাচক আশা থাকা সত্ত্বেও তিনটি দেশই এখন প্রায় একই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
অবশ্য নতুন করে সবকিছু শুরু করার একটা আশা ও বিশ্বাস এখনো মানুষের মনে টিকে আছে। নতুন সরকারগুলো বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসায় সবার মনেই একটা বড় সুযোগ তৈরি হওয়ার অনুভূতি কাজ করছে। এমনকি বাংলাদেশে কিছুটা চেনা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলেও, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মানুষের মনে গণতন্ত্রের এক নতুন আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে।
তবে শুরুর সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। মানুষের মনে এখন এমন একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে না পারা বা সদিচ্ছার অভাবে সরকারগুলো জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন হাতছাড়া করছে। সেই সাথে নতুন সরকারগুলোর অভিজ্ঞতার অভাবজনিত নানা ভুলত্রুটি এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যেমন নেপালে, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও, তার নতুন সরকারের দুজন মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায়, সরকারের কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বা মিতব্যয়িতার কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল।
গত বছর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ মোকাবিলায় সরকারের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ সেই ক্ষোভ আরও উসকে দিয়েছে। এমনকি এই বছরের শুরুর দিকে দেশটির স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভোট পাওয়ার হারও বেশ কমে গেছে।
বাংলাদেশেও সহিংস অপরাধ বেড়েই চলেছে। আর এটা এখন এদেশের মানুষের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর পাশাপাশি মানুষের মনে এই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, বিএনপি সরকার হয়তো জুলাই সনদের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কারগুলোর কেবল কিছু অংশই বাস্তবায়ন করবে, যাতে তাদের নিজেদের ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বড় কোনো পরিবর্তন এড়ানো যায়। চলতি বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা হবে এই নতুন সরকারের জনপ্রিয়তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
স্থিতিশীলতার কোনো গ্যারান্টি নেই
তাই বিপুল জনসমর্থন বা ম্যান্ডেট থাকলেই যে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে সমাজের বৃহত্তর সমস্যাগুলোর সমাধান করা না হলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এই তিনটি দেশেরই দীর্ঘ সময় ধরে চলা সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার ইতিহাস রয়েছে। যেমন নেপাল এক দশক ধরে মাওবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের কবলে পড়েছিল, সেখানে এখনো জাতপাত, প্রজন্ম, আঞ্চলিকতা ও আদর্শগত নানা সামাজিক বিভাজন রয়ে গেছে। ২০১৫ সালে পাস হওয়া দেশটির সংবিধানের মাধ্যমে এই বিভেদগুলো দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, নতুন সরকার কেবল তাদের তরুণ শহরের ভোটারদের খুশি করার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এর ফলে সমাজের অন্যান্য অংশ বা গোষ্ঠীগুলো উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক সম্প্রীতিকে নষ্ট করার বড় কারণ হতে পারে।
শ্রীলঙ্কায় বর্তমান সরকার নিজেদের জাতিগত রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর সিংহলী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ দেশটির সমাজে এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে। ফলে সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলিম তামিল সম্প্রদায়ের সাথে দীর্ঘমেয়াদী মেলবন্ধন বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল বিভাজনটি দেশের ঐতিহ্যবাহী দুটি পারিবারিক রাজনৈতিক দল-বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে। নির্বাচনে তরুণদের নেতৃত্বে একটি নির্ভরযোগ্য ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আপাতত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কারণে এই দুই দলের চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা থমকে আছে। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। দেশের চিরচেনা প্রতিশোধের রাজনীতি ভাঙতে হলে কোনো না কোনো ফর্মে দলটিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হবে।
ইরান যুদ্ধ ও ভারতের সাথে সম্পর্ক
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে এই অভ্যন্তরীণ চাপগুলো আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের রেশনিং বা সীমিত সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় এই তিনটি দেশই চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এর ওপর তারা সবাই উপসাগরীয় দেশগুলো (মিডল ইস্ট) থেকে আসা রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও কষ্টের কারণে নির্বাচনের পর নতুন সরকারগুলোর প্রতি জনগণের যে অন্ধ ভালোবাসা বা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ থাকে, তা একঝটকায় শেষ হয়ে গেছে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা এই দেশগুলোর জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনটি দেশের নতুন সরকারই এখন দিল্লির সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে, যা আগের সরকারগুলোর আমলে কিছুটা তিক্ত হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা-তিনটি দেশের জন্যই জরুরি সাহায্য, উন্নয়নের জন্য টাকা এবং বড় বড় রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো তৈরির প্রধান উৎস হলো ভারত। এমনকি ইরান যুদ্ধের কারণে যখন এই দেশগুলোতে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, তখন ভারত জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়ে দিয়ে তাদের আরও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই অঞ্চলে ভারতের এই বিশাল ক্ষমতা বা দাদাগিরি প্রতিবেশী দেশগুলোর মনে একটা অবিশ্বাস আর ভয়েরও জন্ম দেয়। তাই এই বড় প্রতিবেশীর সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা তাদের জন্য সবসময়ই বেশ কঠিন।
এদিকে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি জয়ী হয়েছে। এই জয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য একই সাথে ভালো ও মন্দ উভয় খবরই এনেছে। একদিকে, এর ফলে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে কাজের মিল বা সমন্বয় অনেক বাড়বে। আর এই মিলটি ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নতুন করে সই করার জন্য খুবই দরকারি হতে পারে, যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে বিজেপির জয় সম্পর্কে নতুন করে একটা ভয়ও তৈরি করেছে। দলটির মাঝে মাঝে করা ধর্মভিত্তিক বা বিভাজনমূলক রাজনীতি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে দিতে পারে। বিশেষ করে, সম্প্রতি বিজেপি অবৈধভাবে থাকা মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেশ বেড়ে গেছে।
নেপালেও প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ’র খামখেয়ালী বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বভাব ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যেমন তিনি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে দেখা করতে রাজি হননি, আবার দুই দেশের সীমান্ত এলাকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা করে তুলেছেন। অবশ্য বিজেপি সম্প্রতি নেপালের ক্ষমতাসীন দল রাস্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং দুই দেশের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলগুলোর ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ভারতের এমন আচরণ নেপালের ভেতরের মানুষের মধ্যে নতুন করে বিভেদ বা ফাটল তৈরি করার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
লেখক: লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো
(লেখাটি চ্যাথাম হাউজের ওয়েবসাইটের সৌজন্যে প্রকাশিত)

বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কা বর্তমানে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বাধীন গণ-আন্দোলনের জোয়ারে ক্ষমতায় আসা এই দেশগুলোর তুলনামূলক নতুন সরকারগুলোর প্রতি এখনো জনগণের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। তবে জনপ্রিয়তার এই ম্যান্ডেট থাকলেও, সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক সংকট এবং ভারতের সাথে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে এখন তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কঠিন সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
মিল ও অমিল
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় এক বিশাল গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকশে। সে দেশে এই আন্দোলনকে বলা হয় ‘আরাগালায়া’ বা সংগ্রাম। এরপর ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ঘটে ‘বর্ষা বিপ্লব’, যার জেরে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান। আর সবশেষে ২০২৫ সালে নেপালে তরুণদের ‘জেন-জি বিপ্লব’ প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে দেয়।
এই তিনটি আন্দোলনের পেছনেই ছিল মূলত তিনটি বড় কারণ- তীব্র অর্থনৈতিক সংকট (তিনটি দেশই এখন আইএমএফ-এর ঋণের ওপর ভর করে চলছে), বিপুলসংখ্যক বেকার তরুণ এবং অস্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বৈরাচারী শাসনের কারণে সাধারণ মানুষের মনে শাসকদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জমা হয়েছিল। এই আগুন আরও ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা খুব সহজেই সরকারের নানা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে একজোট করতে পেরেছিল।
অবশ্যই দেশগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্যও ছিল। যেমন, শ্রীলঙ্কায় আন্দোলনের মূল কারণ ছিল বিদেশি ঋণের সংকট, লাগামহীন দাম বৃদ্ধি আর নিত্যপণ্যের চরম অভাব। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থাটিই সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর নেপালের ক্ষেত্রে আন্দোলনের আগুন জ্বলে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করার একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।

আন্দোলনের পর দেশগুলোতে যে নির্বাচন হয়, তার ফলাফলও ছিল আলাদা। নেপাল বেছে নেয় আমূল পরিবর্তন। তারা বালেন্দ্র শাহ নামের একজন সাবেক র্যাপারকে তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বেছে নেয় চেনা পথ। তারা দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ছেলে তারেক রহমানকে নির্বাচিত করে। আবার নেপাল যেখানে তাদের পুরোনো বামপন্থী দলগুলোকে ছুড়ে ফেলেছে, শ্রীলঙ্কায় দেখা গেছে উল্টো চিত্র। সেখানকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে এখন ‘জেভিপি’ নামের একটি মার্ক্সবাদী দলের জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
বিপ্লব-পরবর্তী সময়
সম্প্রতি এই এলাকায় গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, চারপাশে ইতিবাচক আশা থাকা সত্ত্বেও তিনটি দেশই এখন প্রায় একই ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।
অবশ্য নতুন করে সবকিছু শুরু করার একটা আশা ও বিশ্বাস এখনো মানুষের মনে টিকে আছে। নতুন সরকারগুলো বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসায় সবার মনেই একটা বড় সুযোগ তৈরি হওয়ার অনুভূতি কাজ করছে। এমনকি বাংলাদেশে কিছুটা চেনা রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসলেও, জুলাই জাতীয় সনদে যেসব রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে, তা মানুষের মনে গণতন্ত্রের এক নতুন আশার আলো জাগিয়ে তুলেছে।
তবে শুরুর সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। মানুষের মনে এখন এমন একটা ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো করতে না পারা বা সদিচ্ছার অভাবে সরকারগুলো জনগণের ভালোবাসা ও সমর্থন হাতছাড়া করছে। সেই সাথে নতুন সরকারগুলোর অভিজ্ঞতার অভাবজনিত নানা ভুলত্রুটি এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যেমন নেপালে, প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও, তার নতুন সরকারের দুজন মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসের মধ্যেই কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায়, সরকারের কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ বা মিতব্যয়িতার কারণে মানুষের মনে ক্ষোভ আগে থেকেই ছিল।
গত বছর আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় দিতওয়াহ মোকাবিলায় সরকারের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ সেই ক্ষোভ আরও উসকে দিয়েছে। এমনকি এই বছরের শুরুর দিকে দেশটির স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের ভোট পাওয়ার হারও বেশ কমে গেছে।
বাংলাদেশেও সহিংস অপরাধ বেড়েই চলেছে। আর এটা এখন এদেশের মানুষের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর পাশাপাশি মানুষের মনে এই আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে যে, বিএনপি সরকার হয়তো জুলাই সনদের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক সংস্কারগুলোর কেবল কিছু অংশই বাস্তবায়ন করবে, যাতে তাদের নিজেদের ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বড় কোনো পরিবর্তন এড়ানো যায়। চলতি বছরের শেষের দিকে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা হবে এই নতুন সরকারের জনপ্রিয়তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
স্থিতিশীলতার কোনো গ্যারান্টি নেই
তাই বিপুল জনসমর্থন বা ম্যান্ডেট থাকলেই যে দেশে স্থিতিশীলতা আসবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে সমাজের বৃহত্তর সমস্যাগুলোর সমাধান করা না হলে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এই তিনটি দেশেরই দীর্ঘ সময় ধরে চলা সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার ইতিহাস রয়েছে। যেমন নেপাল এক দশক ধরে মাওবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের কবলে পড়েছিল, সেখানে এখনো জাতপাত, প্রজন্ম, আঞ্চলিকতা ও আদর্শগত নানা সামাজিক বিভাজন রয়ে গেছে। ২০১৫ সালে পাস হওয়া দেশটির সংবিধানের মাধ্যমে এই বিভেদগুলো দূর করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এখন আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, নতুন সরকার কেবল তাদের তরুণ শহরের ভোটারদের খুশি করার দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এর ফলে সমাজের অন্যান্য অংশ বা গোষ্ঠীগুলো উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সামাজিক সম্প্রীতিকে নষ্ট করার বড় কারণ হতে পারে।
শ্রীলঙ্কায় বর্তমান সরকার নিজেদের জাতিগত রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে ঠিকই, তবে কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পর সিংহলী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ দেশটির সমাজে এখনো গভীরভাবে গেঁথে আছে। ফলে সংখ্যালঘু হিন্দু ও মুসলিম তামিল সম্প্রদায়ের সাথে দীর্ঘমেয়াদী মেলবন্ধন বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতির মূল বিভাজনটি দেশের ঐতিহ্যবাহী দুটি পারিবারিক রাজনৈতিক দল-বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে। নির্বাচনে তরুণদের নেতৃত্বে একটি নির্ভরযোগ্য ‘তৃতীয় শক্তি’ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। আপাতত আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কারণে এই দুই দলের চিরন্তন প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা থমকে আছে। তবে এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে পারে না। দেশের চিরচেনা প্রতিশোধের রাজনীতি ভাঙতে হলে কোনো না কোনো ফর্মে দলটিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন হবে।
ইরান যুদ্ধ ও ভারতের সাথে সম্পর্ক
চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে এই অভ্যন্তরীণ চাপগুলো আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের রেশনিং বা সীমিত সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর মতো পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় এই তিনটি দেশই চরম সংকটের মুখে পড়েছে। এর ওপর তারা সবাই উপসাগরীয় দেশগুলো (মিডল ইস্ট) থেকে আসা রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও কষ্টের কারণে নির্বাচনের পর নতুন সরকারগুলোর প্রতি জনগণের যে অন্ধ ভালোবাসা বা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ থাকে, তা একঝটকায় শেষ হয়ে গেছে।
ভারতের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা এই দেশগুলোর জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনটি দেশের নতুন সরকারই এখন দিল্লির সাথে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে, যা আগের সরকারগুলোর আমলে কিছুটা তিক্ত হয়ে গিয়েছিল।

বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা-তিনটি দেশের জন্যই জরুরি সাহায্য, উন্নয়নের জন্য টাকা এবং বড় বড় রাস্তাঘাট বা অবকাঠামো তৈরির প্রধান উৎস হলো ভারত। এমনকি ইরান যুদ্ধের কারণে যখন এই দেশগুলোতে তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, তখন ভারত জ্বালানি রপ্তানি বাড়িয়ে দিয়ে তাদের আরও পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই অঞ্চলে ভারতের এই বিশাল ক্ষমতা বা দাদাগিরি প্রতিবেশী দেশগুলোর মনে একটা অবিশ্বাস আর ভয়েরও জন্ম দেয়। তাই এই বড় প্রতিবেশীর সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা তাদের জন্য সবসময়ই বেশ কঠিন।
এদিকে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি জয়ী হয়েছে। এই জয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জন্য একই সাথে ভালো ও মন্দ উভয় খবরই এনেছে। একদিকে, এর ফলে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মধ্যে কাজের মিল বা সমন্বয় অনেক বাড়বে। আর এই মিলটি ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নতুন করে সই করার জন্য খুবই দরকারি হতে পারে, যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে বিজেপির জয় সম্পর্কে নতুন করে একটা ভয়ও তৈরি করেছে। দলটির মাঝে মাঝে করা ধর্মভিত্তিক বা বিভাজনমূলক রাজনীতি বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে দিতে পারে। বিশেষ করে, সম্প্রতি বিজেপি অবৈধভাবে থাকা মানুষদের তাড়িয়ে দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তে উত্তেজনা বেশ বেড়ে গেছে।
নেপালেও প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ’র খামখেয়ালী বা হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বভাব ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যেমন তিনি ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাথে দেখা করতে রাজি হননি, আবার দুই দেশের সীমান্ত এলাকা নিয়ে পুরোনো বিতর্ক নতুন করে চাঙ্গা করে তুলেছেন। অবশ্য বিজেপি সম্প্রতি নেপালের ক্ষমতাসীন দল রাস্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং দুই দেশের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিলগুলোর ওপর জোর দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে ভারতের এমন আচরণ নেপালের ভেতরের মানুষের মধ্যে নতুন করে বিভেদ বা ফাটল তৈরি করার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
লেখক: লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউজের এশিয়া-প্যাসিফিক প্রোগ্রামের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র রিসার্চ ফেলো
(লেখাটি চ্যাথাম হাউজের ওয়েবসাইটের সৌজন্যে প্রকাশিত)

২০২০ সালে কারাবন্দী হওয়ার পর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে নিজের এই কষ্টের অনুভূতি বোঝাতে বিখ্যাত লেখক দস্তয়েভস্কির প্রসঙ্গ টেনেছেন উমর খালিদ। তিনি বলেন, কারাগারে সূর্যাস্তের সময়কার মানসিক অবস্থার কথা দস্তয়েভস্কিও তার জেলের স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন।