Advertisement Banner

মুস্তাফা মনোয়ার: এক স্বভাবশিল্পীর শেষ যাত্রা

গোলাম শফিক
গোলাম শফিক
মুস্তাফা মনোয়ার: এক স্বভাবশিল্পীর শেষ যাত্রা
মুস্তাফা মনোয়ার। ফাইল ছবি

শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের গতকাল মৃত্যু হয়েছে। তিনি ছিলেন একজন জীবনশিল্পী, যার প্রতিভা ছিল বহুমুখী। তিনি ছিলেন যুগপৎ চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর। ছিলেন চারুকলার শিক্ষক। কাজের অভিজ্ঞতাও ছিল বিচিত্র। তিনটি শিল্প-সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের তিনি কর্ণধার ছিলেন—বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন।

কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান হিসেবে তিনি সুধীসমাজের কাছে বিশেষ সমীহের পাত্র ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মসূত্রে তিনি পারফরম্যান্সের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি বেতারে অভিনয় করলেও টেলিভিশনে অভিনয়ের কথা শুনিনি। তবে বহু দর্শকনন্দিত নাটকের তিনি নির্মাতা ছিলেন। এর মধ্যে শীর্ষে ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী (সাদাকালো)। জনপ্রিয়তায় নাটকটি দুই বাংলাতেই ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

সরাসরি শ্রবণ-অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, তিনি মানুষকে সুপরামর্শ দিতেন এবং অন্যের পরামর্শও মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। যেমন তার পরামর্শেই ম হামিদ ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ পেয়েও যোগদান করেননি। বাংলাদেশ টেলিভিশনকে একটি কাঙ্ক্ষিত উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য ম হামিদদের মতো সংস্কৃতি ও নাট্য-অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের প্রয়োজন ছিল—এ ছিল তার যুক্তি। ম হামিদ মুস্তাফা মনোয়ারের পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৮০ সালে টেলিভিশনে যোগ দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। আবার মুস্তাফা মনোয়ারও সৈয়দ মুজতবা আলীর পরামর্শে কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান অধ্যয়ন ছেড়ে সরকারি আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। শিল্পকলার ছাত্র হিসেবে তার ফলাফলও ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের। এভাবেই পারস্পরিক আদান-প্রদান, শ্রদ্ধা ও স্নেহের মধ্য দিয়ে অনেক অনুসরণীয় ঘটনার জন্ম হয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশনে তিন বছর প্রেষণে চাকরির (অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক ও উপমহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত) সুবাদে এই গুণী শিল্পী ও মহৎ মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ২০১৪ সালে বিটিভির রজতজয়ন্তী উপলক্ষে তিনি পরামর্শ দেওয়ার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং আমাদের অনুরোধে মাঝেমধ্যেই টেলিভিশনে আসতেন। তখন বিটিভির ইতিহাসনির্ভর শ্রুতিলোকনের গল্প নাটকটি রচনা ও নির্মাণের জন্য তার কাছ থেকে পাপেট শোর নানা উপাদান সংগ্রহ করেছিলাম। এ জন্য একাধিকবার তার বাসায় যেতে হয়েছিল। এই পাপেট শোর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে কলকাতার শরণার্থী শিবিরে। সে সময় নির্মিত হয়েছিল তিনটি অদ্ভুত চরিত্র—আগাছা, রাক্ষস ও সাহসী কৃষক। বিটিভির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে নির্মিত নাটকের জন্য যে অংশটি নির্বাচন করেছিলাম, সেখানে পাপেট চরিত্র ছিল মেনি ও বাঘা। তাদের কথোপকথন ছিল অত্যন্ত অর্থবহ, যেমন—

মেনি: বাঘা, একটা সুখবর দিই। আমার এক নতুন আপন বড় ভাই এদেশে এসেছে।

বাঘা: নতুন আপন ভাই! কী বলিস? আপন ভাই তো পুরোনোই হয়।

মেনি: নতুন আপন ভাই বলল, এ দেশে সবই ভালো, কিন্তু আমাদের মুখের কথা তেমন ভালো নয়।

বাঘা: থাম, বোকা। আমাদের কথা খুব সুন্দর।

মেনি: না, নতুন আপন ভাই বলেছে আমাদের কথা মোটেই সুন্দর নয়।

বাঘা: তুই থাম, গর্দভ। তোর নতুন আপন ভাইয়ের পিণ্ডি চটকাব।

মেনি: আমাকে ধমকাচ্ছিস কেন? একেই বলে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে।

বাঘা: আবার কথা! তোর পিণ্ডি চটকাব!

মেনি: বারবার পিণ্ডি পিণ্ডি। পিণ্ডি কী করে চটকায়, বল তো?

বাঘা: চুপ। ওসব কথা বলতে নেই।

উল্লেখ্য, ‘পিণ্ডি’ বলতে তিনি সে সময়কার রাওয়ালপিন্ডিকে বুঝিয়েছিলেন। এ ছিল শিল্পের মাধ্যমে শিল্পীর প্রতিবাদ ও বিদ্রুপ, যা বরাবরই ভিন্ন মাত্রার হয়ে থাকে।

সে সময় ব্যাপক মিথস্ক্রিয়ার ফলে জাতশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পভাবনা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার নানা অভিজ্ঞতা জানার সুযোগ হয়েছিল। একসময় এ দেশে শাসকগোষ্ঠীর পশ্চাৎপদ মানসিকতা রবীন্দ্রসংগীতকে বিতর্কিত করে তুলেছিল। তিনি তার শিল্পচর্চা ও অনুষ্ঠান নির্মাণের প্রতিটি বাঁকে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বিটিভির ডিআইটি ভবনে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গানের অনুষ্ঠানে তিনি অসাধারণ শিল্প-চাতুর্যের সঙ্গে সেট নির্মাণ করেছিলেন। কাগজ কেটে জোড়া দিয়ে তার ভেতর থেকে আলো ফেলে ছায়ার মাধ্যমে অবিকল রবীন্দ্রনাথের অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন। মনিটরে তা দেখে মোহরদি (কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) আবেগে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে গুরুদেবের পায়ের কাছে বসে আছি।’ সেই কূপমণ্ডূকতার সময়ে রবীন্দ্রনাট্য নিষিদ্ধ হলে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলনে মঞ্চস্থ করেছিলেন মুক্তধারা। তখন ফারাক্কা বাঁধ নির্মিত হচ্ছিল। তাই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল—এই নাটকে তো বাঁধ ভেঙে দেওয়ার কথাই আছে। আসলে কোনো কাজে শুধু আগ্রহই যথেষ্ট নয়, সাহসও প্রয়োজন।

পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশন (পরবর্তী বাংলাদেশ টেলিভিশন) প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সময়ে একের পর এক সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করে অগ্রণী ব্যক্তিদের সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। তাদেরই একজন ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। আরও ছিলেন জামিল চৌধুরী, কলিম শরাফী ও অন্যরা। সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের সময় আমরা জামিল চৌধুরীকেও কাছে পেয়েছিলাম। তাদের শ্রম ও নিষ্ঠাতেই একসময় গড়ে উঠেছিল বিটিভি নামের এক যাদুকরি প্রতিষ্ঠান।

তারা সেই গল্পগুলো শুনিয়ে গিয়েছেন। তখন না ছিল রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা, না ছিল এতগুলো স্টুডিও। কম্পিউটার না থাকায় সবই হাতে করতে হতো—টেলিপ লেখা থেকে শুরু করে ছবির প্রিন্ট তৈরি, সেটের মধ্যে সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, সমুদ্রের গর্জন, বৃষ্টির শব্দ, ঝড়-তুফান, সাগর, মরুভূমি, বিচিত্র আলো-আঁধারির খেলা—সবই একজন টেলিভিশনকর্মীর দশ আঙুল ও মস্তিষ্কের কারুকাজে প্রাণ পেত।

মুস্তাফা মনোয়ারের আদি পরিচয়, তিনি একজন শিল্পী—একজন আঁকিয়ে। শিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন স্বভাবশিল্পী। আমরা ‘স্বভাবশিল্পী’ কথাটি সচরাচর ব্যবহার করি না; সাধারণত কবিদের ক্ষেত্রেই বলি ‘স্বভাবকবি’। কিন্তু তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই স্বভাবশিল্পী। যেখানে-সেখানে, যখন-তখনই ছবি আঁকতেন, এবং অনায়াসে আঁকতে পারতেন। বিটিভি চত্বরে সুবর্ণজয়ন্তীর আর্ট ক্যাম্পে তাঁর ছবি আঁকার যাদুকরি বৈশিষ্ট্য আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম। তিনি পা থেকে ছবি আঁকা শুরু করে ধীরে ধীরে মাথার দিকে গিয়ে একটি মানব-অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছিলেন। অশিল্পী হিসেবে তা আমাদের কাছে ছিল বিস্ময়কর। এখন আমরা স্থপতি-শিল্পী হিসেবে তার নকশা করা ‘মিশুক’ মাসকটটিকেও প্রায় ভুলতে বসেছি। এটি ছিল ১৯৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাফ গেমসের সরকারি মাসকট। শিশুপার্কের সামনে স্থাপিত হরিণশিশুটিও সবার দৃষ্টি কেড়েছিল।

শিল্প, পাপেট, চিত্রকলা, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের এই বহুমাত্রিক স্রষ্টা কখনোই বিস্মৃত হবেন না। শাণিত নন্দনবোধের ধারক এই শিল্পস্রষ্টার প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার

সম্পর্কিত