Advertisement Banner

ফিফার ময়দানে সরব উপস্থিতি গাজার

সাঈদ মার্কোস তেনোরিও
সাঈদ মার্কোস তেনোরিও
ফিফার ময়দানে সরব উপস্থিতি গাজার
গত ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের সিয়াটলে অবস্থিত লুমেন ফিল্ডে (সিয়াটল স্টেডিয়াম) ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রথম পর্বের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে মিশর ও ইরানের মুখোমুখি লড়াইয়ের আগে দর্শকরা একটি ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করছেন। ছবি: সামাহ জিদান/আনাদোলু এজেন্সি

ফিলিস্তিন জাতীয় দল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন এই টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান এবং সরব উপস্থিতিতে পরিণত হয়েছে। তবে তা কোনো গোল বা জয়ের মাধ্যমে নয়, বরং গ্যালারিতে ফিলিস্তিনি পতাকার নিরন্তর প্রদর্শন, গাজার সাথে সংহতি প্রকাশ এবং বিশ্বজুড়ে স্টেডিয়াম, আয়োজক শহর ও উন্মুক্ত প্রদর্শনী স্থানগুলোতে প্রতিধ্বনিত হওয়া স্লোগানের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি সমর্থনের বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকাশ ছিল না। ২০২৬ বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে যে ফিলিস্তিন বৈশ্বিক রাজনৈতিক চেতনায় একটি স্থায়ী স্থান করে নিয়েছে। ইসরায়েলের প্রধান সামরিক ও কূটনৈতিক মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রে হাজার হাজার ফুটবল ভক্ত স্টেডিয়ামগুলোকে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোর এবং ফিলিস্তিনি জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশের মঞ্চে পরিণত করেছেন।

এটি অবশ্য নজিরবিহীন কিছু ছিল না। ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সময়ও ফিলিস্তিনি পতাকা টুর্নামেন্টের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। সেই সময়ে অনেক বিশ্লেষক এই ঘটনাকে একটি আরব দেশে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রভাব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের টুর্নামেন্ট সেই ব্যাখ্যাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর স্টেডিয়ামগুলোতে এই ধরনের বিক্ষোভের পুনরাবৃত্তি ইঙ্গিত করে যে ফিলিস্তিনের প্রতি জনসমর্থন আঞ্চলিক অভিব্যক্তি থেকে এখন একটি সত্যিকারের বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

এই প্রবণতাটি পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সরকারের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক জনমতের বিশাল অংশের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি ক্রমবর্ধমান ব্যবধানকেও উন্মোচন করে। যুক্তরাষ্ট্র যখন ইসরায়েলকে রাজনৈতিক, সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, তখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ফিলিস্তিনকে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখছে। দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েল তাদের পাবলিক ডিপ্লোম্যাসি বা ‘হাসবারা’ (প্রচারণা)-এর পেছনে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে, যার উদ্দেশ্য ছিল এই সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজেদের অনুকূলে রূপ দেওয়া।

বিশ্বকাপ চলাকালে দেখা দৃশ্যগুলো ইঙ্গিত করে যে এই কৌশলটি এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক দেখা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফিলিস্তিনি পতাকার এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রদর্শন প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক জনমতের যুদ্ধ একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে সরকারগুলো আর বর্ণনার বা প্রচারের প্রবাহকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে যে এটি কখনোই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল না। ইতিহাস জুড়ে বিশ্বকাপগুলো আদর্শিক বিরোধ, বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানবাধিকারের পক্ষে প্রচার এবং দখলদারত্ব বা বৈষম্যের শিকার মানুষের সাথে সংহতি প্রকাশের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। খেলাধুলাকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখার জন্য ক্রীড়া কর্তৃপক্ষের অনড় অবস্থান স্টেডিয়ামের গ্যালারির বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত রূপ ধারণ করেছে, যেখানে সমর্থকেরা সার্বজনীন মনে করা বিভিন্ন মূল্যবোধ ও আন্দোলনের পক্ষে কথা বলতে এই টুর্নামেন্টের বিশাল প্রচারমাধ্যমকে ব্যবহার করছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ ফিফার দ্বিমুখী নীতিকেও উন্মোচিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে ইরানের কোচিং স্টাফদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং বারবার বাধার সম্মুখীন হওয়াসহ ইরান যখন উল্লেখযোগ্য বিধিনিষেধের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, তখন ফিফা গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক অভিযোগের মুখে মূলত নীরব ছিল। সম্ভবত এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার হবে এক নতুন ধরনের গণ-কূটনীতির উত্থান, যেখানে সমর্থক, ক্রীড়াবিদ, শিল্পী এবং সামাজিক আন্দোলনগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে রূপ দিচ্ছে।

হাজার হাজার ভক্ত সংহতির প্রতীক হিসেবে ফিলিস্তিনের পতাকা উত্তোলন করেছেন এবং বিশ্বকাপকে রাজনৈতিক অভিব্যক্তির এমন এক মঞ্চে রূপান্তরিত করেছেন যা ফিফা নিজে এড়াতে চেয়েছিল। টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে উত্তোলিত একটি একক পতাকা কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, যা সীমানা, ভাষা এবং সংস্কৃতিকে ছাড়িয়ে একটি বার্তা বহন করে। ফিলিস্তিন হয়তো মূল প্রতিযোগিতায় অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু এটি এমন কিছুতে উপস্থিত ছিল যা কোনো ক্রীড়া পরিসংখ্যান পরিমাপ করতে পারে না। কিন্তু মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করার ক্ষমতা রাখে। স্টেডিয়ামগুলোকে আন্তর্জাতিক সংহতির স্থানে পরিণত করার মাধ্যমে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিল যে, লাখ লাখ মানুষের কাছে গাজাকে ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। বৈশ্বিক জনমতের এই লড়াইয়ে ফিলিস্তিন এমন এক বিজয় অর্জন করেছে যা কোনো স্কোরবোর্ড রেকর্ড করতে পারবে না।

লেখক: ইতিহাসবিদ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ এবং ব্রাজিল-প্যালেস্টাইন ইনস্টিটিউট (ইব্রাসপাল)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সহ-সভাপতি।

লেখাটি মিডল ইস্ট মনিটর–এর সৌজন্যে।

সম্পর্কিত