ads

মোদি সরকারের রোষের শিকার

বিনা বিচারে ৬ বছর কারাবন্দী উমর খালিদ: ‘নীরবতা শাসকগোষ্ঠীকে আরও সাহসী করছে’

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বিনা বিচারে ৬ বছর কারাবন্দী উমর খালিদ: ‘নীরবতা শাসকগোষ্ঠীকে আরও সাহসী করছে’
ছবি: সংগৃহীত

দিল্লির কুখ্যাত ‘তিহার জেল’-এর নাম এখন অনেকটাই পরিচিত। এই কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন বিকেলে হাজারো বন্দীকে তাদের সেল বা কুঠুরি থেকে বের করে দেওয়া হয়।

অন্ধকার নামার আগ পর্যন্ত তাদের সময় কাটাতে হয় জেলের স্যাঁতসেঁতে উঠানে। ঠিক তখনই এক তীব্র আতঙ্ক ও মানসিক কষ্ট গ্রাস করতে থাকে ৬২৬৭১৪ নম্বর বন্দীকে। এই কয়েদির নাম উমর খালিদ-যাকে অনেকেই চেনে।

২০২০ সালে কারাবন্দী হওয়ার পর দেওয়া প্রথম সাক্ষাৎকারে নিজের এই কষ্টের অনুভূতি বোঝাতে বিখ্যাত লেখক দস্তয়েভস্কির প্রসঙ্গ টেনেছেন উমর খালিদ। তিনি বলেন, “কারাগারে সূর্যাস্তের সময়কার মানসিক অবস্থার কথা দস্তয়েভস্কিও তার জেলের স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন। আমার মনে হয় এর কারণ হলো, সূর্যাস্তের সময় এই অনুভূতিটা বুকের ভেতর চেপে বসে যে জীবনের আরও একটি মূল্যবান দিন বন্দিদশাতেই কেটে গেল।”

গত এক দশকে উমর খালিদ প্রথমে একজন তুখোড় ছাত্রনেতা এবং তার আগে ২০১৯ সালে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া নরেন্দ্র মোদি সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ হিসেবে পরিচিতি পান। এটিই ছিল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়। দিল্লির ভয়াবহ ধর্মীয় দাঙ্গার ‘প্রধান ষড়যন্ত্রকারী’ এবং সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পতনের ছক কষার অভিযোগে তাকে উগ্রবাদী তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী করা হয়।

আজও ভারতের মূল ধারার টেলিভিশন টকশোতে উপস্থাপকেরা তাকে ‘মুসলিম সন্ত্রাসী’ ও ‘দেশদ্রোহী’ বলে আক্রমণ করেন। অন্যদিকে, প্রগতিশীল ও বামপন্থী অধিকারকর্মীরা বিভিন্ন প্রতিবাদ সভায় তার মুক্তির দাবি তোলেন এবং তার ছবি দেওয়া টি-শার্ট পরেন।

মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীদের কাছে উমর খালিদ এখন মোদি সরকারের ভিন্নমত দমনের এক জীবন্ত প্রতীক। ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি গত এক যুগ ধরে ক্ষমতায় রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, বিজেপি বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করতে দেশের বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

একজন মুসলিম ও বামপন্থী অধিকারকর্মী হিসেবে খালিদ বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদী’ এজেন্ডার তীব্র সমালোচক। তার অভিযোগ, মোদি সরকার ভারতের ২০ কোটি মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন ও হেনস্থায় উসকানি দিচ্ছে। তবে বিজেপি বরাবরই ধর্মীয় বৈষম্যের এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

কোনো বিচার ছাড়াই উমর খালিদের প্রায় ছয় বছরের এই কারাবাসকে অন্যায় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো। এমনকি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি তার প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যা নিয়ে ভারত সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। অবশ্য বিজেপির দাবি, ভারতের বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং খালিদের মামলার সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।

গত ৩০ জুন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান উমর খালিদের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে। তবে জেলের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে তার সাথে সরাসরি দেখা করা সম্ভব হয়নি। পরিবার ও বন্ধুদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর আদান-প্রদান করা হয়েছে।

এক্স থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া
এক্স থেকে স্ক্রিনশট নেওয়া

সেই সাক্ষাৎকারে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে ৩৮ বছর বয়সী এই অধিকারকর্মী জানান, বছরের পর বছর ধরে চলা সরকারি অপপ্রচার এবং এই বৈরী পরিবেশের মধ্যে নিজেকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রাখা কতটা কঠিন ছিল।

খালিদ বলেন, “আপনাকে যখন সমাজের চোখে কেবল একটি ‘নেতিবাচক’ বা ‘ইতিবাচক’ চরিত্রে আটকে ফেলা হয়, তখন নিজের মানবিকতা তো বটেই, এমনকি মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। যারা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল, তারাও অনেক সময় ভুলে যান যে আমি একজন সাধারণ মানুষ-যার নিজস্ব দুর্বলতা, ভয় আর খামতি রয়েছে। কারাগারের এই দীর্ঘ বছরগুলো আমার শরীর ও মনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে এবং ভেতরের মানসিক উদ্বেগগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”

তবে এত বছর জেলে কাটিয়েও মোদি সরকারের প্রতি উমর খালিদের রাজনৈতিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ভারতকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তুলতে চাওয়া এই দলটির মূল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থানে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে খালিদ বলেন, “তাদের বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, আর জাতিগত নিধনের ভাষাকে এভাবে স্বাভাবিক করে তোলা ও মহিমান্বিত করা আমাকে আতঙ্কিত করে।” তার মতে, “আজ ভারতকে একটি ‘পোস্ট ট্রুথ’ সমাজে পরিণত করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ।”

তার আইনি মামলা বা তিহার জেলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা না করার শর্ত থাকলেও, খালিদ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, চুপ থাকা কোনো সমাধান নয়।

নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এমনকি জেলের যেসব বন্দীদের সাথে আমি বসে খাবার খাই, তাদের মুখ থেকেও আড়ালে নিজেকে ‘সন্ত্রাসী’ বলে ফিসফাস শুনতে হয়। এই পরিকল্পিত অপপ্রচার সাধারণ মানুষের চোখে আমাকে অমানুষ বানিয়ে তোলে। আসলে আমার মতো মানুষদের জন্য ‘মানবিকতা’ এমন এক অধিকার, যা সমাজ সহজে দিতে চায় না।”

‘নীরবতা এই শাসকগোষ্ঠীকে আরও সাহসী করে তুলছে’

দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জামিয়া নগর এলাকায় বেড়ে ওঠার স্মৃতিচারণ করে খালিদ জানান, হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান কীভাবে সমাজকে ধর্মীয় ভিত্তিতে বিভক্ত করেছে এবং মুসলিমদের অধিকার ও মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে, তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। খালিদ বলেন, “আমি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছি, যেখানে মুসলিমদের ক্রমাগত দানবীয় ও ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছিল। যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে এই পরিস্থিতি দেখে প্রভাবিত না হয়ে থাকা অসম্ভব।”

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করার সময় খালিদ সেখানকার প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তবে জেএনইউ যখন দক্ষিণপন্থী শিবিরের নিশানায় পরিণত হয়, তখন তিনি সবার নজরে চলে আসেন। ২০১৬ সালে জেএনইউ-এর একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর ভারতের একপেশে গণমাধ্যমগুলো তাকে ‘দেশদ্রোহী’ ও দেশের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে প্রচার করে এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। খালিদ বলেন, “তারপর থেকে আমার জীবন আর আগের মতো থাকেনি।”

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার পিএইচডি গবেষণাপত্র (থিসিস) জমা দিতেও বাধা দিয়েছিল, যার বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে লড়াই করে জয়ী হন। চলতি মাসেই তার সেই গবেষণাপত্রটি ‘ফ্র্যাকচার্ড কমিউনিটিজ’ (Fractured Communities) নামে বই আকারে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে।

জেএনইউতে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ। ছবি: রয়টার্স
জেএনইউতে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ। ছবি: রয়টার্স

২০১৯ সালে মোদি সরকারের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় খালিদ ও জেএনইউ ক্যাম্পাস প্রতিরোধের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়। লাখ লাখ মানুষ ভারতের রাস্তায় নেমে আসে, যা ছিল বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম কোনো বড় গণআন্দোলন। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে এক বিখ্যাত ভাষণে খালিদ বলেছিলেন, “আমরা সহিংসতার জবাব সহিংসতা দিয়ে দেব না। আমরা ঘৃণার জবাব ঘৃণা দিয়ে দেব না। তারা ঘৃণা ছড়ালে আমরা ভালোবাসার মাধ্যমে তার জবাব দেব।”

তবে রাষ্ট্র এর জবাবে অত্যন্ত কঠোর রূপ ধারণ করে। পুলিশের সহিংসতা এবং বিজেপি নেতাদের উসকানিমূলক বক্তব্যের জেরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লিতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। তিন দিন ধরে চলা এই দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। কিন্তু দিল্লি পুলিশ যখন চার্জশিট দেয়, তখন তাতে কোনো বিজেপি নেতা বা প্রধান দাঙ্গাকারীদের নাম ছিল না। উল্টো দাঙ্গা চলাকালীন এক হাজার মাইল দূরে থাকা উমর খালিদকে এই দাঙ্গার ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়।

এর পরপরই তার সাথে আরও এক ডজনেরও বেশি মানবাধিকার কর্মী ও ছাত্রনেতাকে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে (ইউএপিএ) গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে সাক্ষী ও প্রমাণ জালিয়াতির বহু অভিযোগ উঠলেও তারা এর কোনো সদুত্তর দেয়নি।

একই মামলার অন্য আসামিরা জামিন পেলেও খালিদের জামিনের আবেদন বছরের পর বছর ধরে ঝুলে রয়েছে। বিচারকেরা বারবার শুনানি পিছিয়ে দিয়েছেন বা মামলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। মুক্তির এই ক্রমাগত আশার আলো নিভে যাওয়া প্রসঙ্গে খালিদ বলেন, “ধীরে ধীরে আশা ফুরিয়ে আসছিল। আর আশা ছাড়া কারাগারে টিকে থাকা মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।”

বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের কারাগারগুলোতে রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি ফাদার স্ট্যান স্বামীর মতো প্রবীণ অধিকারকর্মী কারাগারেই মারা গেছেন। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজের নীরবতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে খালিদ বলেন, “ছয় বছর পর আজ আমি সত্যিই হতাশ এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করছি। বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ এবং সেলিব্রিটি অ্যাক্টিভিস্টদের এই নীরবতা-যারা জনগণের আন্দোলনকে পুঁজি করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়েছেন-এই শাসকগোষ্ঠীকে আরও বেশি করে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চড়াও হতে সাহসী করে তুলছে।”

তবে রাতের নিস্তব্ধতাতেই খালিদ কিছুটা শান্তি খুঁজে পান। সেলের ভেতরে যখন প্রহরীর চাবির ঝনঝনানি থামে, তখন ডায়েরির পাতা থেকে নিজের সেলের দেয়ালে লিখে রাখা কিছু উক্তি তাকে সান্ত্বনা দেয়। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী ভগৎ সিংয়ের ছবির পাশে দেয়ালে খালিদ লিখে রেখেছেন সেই বিখ্যাত উক্তি, “আমি সেই অবাধ্য উন্মাদ বন্দী হয়েও যে চির-স্বাধীন।”

সম্পর্কিত