ফজলুল কবির

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে; অর্থাৎ, নির্বাচনের ঠিক আগে আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা উঠেই আবার স্তিমিত হয়ে যায়। দেশের বামপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী অংশ এবং পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মজার বিষয় হচ্ছে নির্বাচনে বিজয়ী ও প্রধান বিরোধী দল হওয়ার ম্যান্ডেট পাওয়া কোনো দল থেকেই কোনো রা নেই। তাদের ভঙ্গি অনেকটা, ‘যা হয়েছে ভালো হয়েছে, যা হবে ভালোই হবে’। একটা নিয়তিবাদী ব্যাপার আরকি!
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিটি প্রকাশ করেছে মার্কিন ইউএসটিআর। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো চুক্তি নেই। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দেড় হাজার পণ্যে শুল্ক তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার কৃষি, জ্বালানি ও উড়োজাহাজ আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি কমানোর শর্ত। একইসঙ্গে অন্য দেশের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিনিময়ে শুল্কহার কমেছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে, যা আগের সাড়ে ১৫ শতাংশের সাথে মিলে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ!
এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে নির্বাচনের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভ্যারিফায়েড পেজ থেকে। সেখানে এই চুক্তির প্রেক্ষাপট হিসেবে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের রাপ্তানি গন্তব্যকে অক্ষুণ্ন রাখতেই নাকি এমন করা হয়েছে! পাশাপাশি চুক্তির বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা আটটি পয়েন্টে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, চুক্তিটি কেন বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক।
দেখা যাক–আসলে চুক্তিতে কী আছে, আর তা দেশের জন্য কতটা মঙ্গল বয়ে আনবে। কিংবা বোঝার চেষ্টা করা যাক যে, দেশ কি সত্যিই বিক্রি হয়েছে। হলে সস্তায়, নাকি কিছুটা দাম নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ সংক্ষেপে এআরটি বা আর্ট। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের খেলার অংশ হিসেবেই এ আর্ট। গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্কারোপ করেন। এর পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আলোচনায় ডাকে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব দেশ এ আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্কহার কমিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশ অংশ নিলে আরোপিত শুল্ক ২০ শতাংশে নামে। এ হার আরও নামিয়ে আনতে চেষ্টা চালায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ চেষ্টার পর কথিত ‘সফল’ আলোচনায় ১ শতাংশ শুল্ক কমাতে সমর্থ্য হয় ঢাকা। বিনিময়?
এ বিনিময় নিয়েই প্রশ্ন। যাবতীয় আলোচনা এই বিনিময় নিয়েই। সঙ্গে থাকা বিচিত্র শর্ত নিয়ে কপাল না কুঁচকে কোনো উপায় নেই।
কারণ, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে অর্জনের গপ্পো আমাদের শোনানো হয়েছে, তার কেন্দ্রে আছে–যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে, তাতে কোনো পাল্টা শুল্ক লাগবে না বলে দেওয়া মার্কিন আশ্বাস। বলা হচ্ছে, এতে দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের রমরমা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার পাওয়া আমাদের তৈরি পোশাক দেশটির বাজার দখল করে ফেলবে।
বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এটিকেই সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অঞ্চলটিতে মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে ১৯ শতাংশের বেশি।
এই যে তৈরি পোশাক, এর যে কাঁচামাল, তা বাংলাদেশ মূলত আমদানি করে আফ্রিকা, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সবচেয়ে বেশি তুলা আমদানি হয় আফ্রিকা অঞ্চল থেকে। আফ্রিকার তুলা মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে। এর পর আমদানি উৎস হিসেবে রয়েছে ভারত ও চীন। তারপর যুক্তরাষ্ট্র। ইদানীং চোখ রাঙানিতেই হোক বা যে কারণেই হোক যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ছে। তবে বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকার তুলার চেয়ে প্রতি পাউন্ডে মার্কিন তুলায় খরচ বেশি পড়ছে ১০ থেকে ১২ সেন্ট বেশি।
বাংলাদেশ সর্বশেষ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর পুরোটা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে হলে এই পোশাক হতে হবে মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম তন্তুতে তৈরি। না হলে শুল্ক গুণতে হবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮২ লাখ ৮০ হাজার বেল (প্রতি বেল ২১৮ কেজি) তুলা আমদানি করেছে। আমদানি উৎস হিসেবে শীর্ষে আছে ব্রাজিল, তারপর ভারত। আর অঞ্চল হিসেবে আফ্রিকা। সে যাই হোক। এই আমদানি করা তুলা থেকে তৈরি পোশাকের ১৯ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই রপ্তানি পণ্যের পুরোটায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে সাধারণ গণিত মেনে বাংলাদেশকে অন্তত ১৯ শতাংশ তুলার আমদানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে করতে হবে। এতটা সরল নয়। তবু, বোঝার সুবিধার জন্যই এমন হিসাব করে নেওয়া গেল।
আসা যাক, এই ১৯ শতাংশে। এই ১৯ শতাংশ মানে–৭৫ কোটি ৪৫ লাখ ৬ হাজার ৭২০ পাউন্ড তুলা। প্রতি পাউন্ডে ১০ সেন্ট করে শুধু বাড়তি তুলার দাম গুনলে তা সাড়ে ৭ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাদ রইল দূরত্ব বিচারে এই তুলা বঙ্গমূলুকে আনার পথ খরচা। সাড়ে ৭ কোটি ডলার মানে কত? ৯১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। কম নয় কিন্তু। শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে মার্কিন তুলার পেছনেই বাড়তি ব্যয় করতে হবে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগী দেশগুলো বসে থাকবে বলেই কি আমরা ধরে নিচ্ছি? ভারত কিন্তু এরই মধ্যে বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
এ তো গেল চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। তৈরি পোশাক খাতকে অন্তর্বর্তী সরকার রীতিমতো উদ্ধার করেছে বলে যে প্রচার সর্বশেষ প্রধান উপদেষ্টার পেজ থেকে দেওয়া হলো–তার অন্দরমহলটা খুব একটা আশ্বস্ত করছে কি? এবার এই মূলোটি দেখে যে সরল মানুষেরা কমেন্টবক্স ভোসিয়ে দিয়েছেন, তাদের বলি–একটু থামুন। আরও মজা বাকি আছে।
চুক্তির এই বিরাট অর্জন এবং শুল্কহার ১ শতাংশ পয়েন্ট কমাতে গিয়ে বাংলাদেশকে যা যা গিলতে হয়েছে, বা সুবোধ বালকের মতো বাংলাদেশ যা গিলে বসে আছে, তা হলো–বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু দেশ থেকে কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এই কিছু দেশ কারা হতে পারে বলে ধারণা আপনার? নামগুলো মনে মনে না জপে উচ্চারণ করুন–চীন, রাশিয়া…। এবার সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস চীন পাল্টা হিসেবে কী করতে পারে, ভাবুন।
প্রধান উপদষ্টোর পেজে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, এসব শর্ত নাকি আগে থেকেই বাংলাদেশের অনুস্বাক্ষর করা বিভিন্ন চুক্তিতে শর্ত হিসেবে ছিল। কী সেই সনদগুলো? ডব্লিউটিও, আইএলও, ট্রিপস ইত্যাদি। এগুলো একটু পড়ে দেখবেন দয়া করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তৃতীয় দেশের প্রবশোধিকার রোধে এসব চুক্তি বা সনদের কোথায় কী আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি, যার সংক্ষিপ্ত নাম প্রধান উপদেষ্টার পেজ থেকে দেওয়া পোস্টেই বলা হয়েছে আর্ট, তা আসলেই শৈল্পিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে। নির্বাচনের দুদিন আগে সম্পাদিত এ চুক্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সকল পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধু উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তুলার হিসাবটি তো সবিস্তারে দেওয়াই হলো। এবার চুক্তিতে প্রবেশ করা যাক। চুাক্তির সেকশন ২-এ অনুচ্ছেদ ২-এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–বাংলাদেশ এমন কোনো লাইসেন্সিং আরোপ করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা হতে পারে। এই পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আবার মার্কিন অথবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদণ্ড মেনে চললেই হবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি মানদণ্ড স্থাপন করতে পারবে না। কোনো বাড়তি বাধা বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য তার নিয়মে প্রবেশ করবে। এখানে বাংলাদেশের কোনো আইন, বিধি কিছুই খাটবে না।
এই ২ অনুচ্ছেদেই কৃষি সম্পর্কিত ধারাগুলো আছে। এসব ধারা অনুসারে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত (এসপিএস বা স্যানিটারি ও ফাইটো-স্যানিটারি) ব্যবস্থা বিজ্ঞান ও ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতির হতে হবে, যেন তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে বাধা তৈরি না করে। শুধু তাই না, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যেখানে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, বৈষম্যমূলক বা পক্ষপাতমূলক কারিগরি মানদণ্ড থাকবে। আর এই ‘বৈষম্যমূলক’, ‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন’ বা ‘পক্ষপাতমূলক’ ব্যবস্থা কে শনাক্ত করবে? অহেতুক প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আবার কে? শুধু তাই নয়, এই ধারা অনুযায়ী এমন কোনো স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ, অথবা যার ফলে তৃতীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, চুক্তিটিতে বাংলাদেশ আছে শুধু ‘জি হুজুর’ বলতেই। পণ্য কার? যুক্তরাষ্ট্রের। স্বার্থ কার? যুক্তরাষ্ট্রের। তৃতীয় দেশে কার স্বার্থ রক্ষিত হবে? যুক্তরাষ্ট্রের।
তৃতীয় দেশের প্রসঙ্গ যখন এলোই–এই চুক্তি তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর সর্বদা ছড়ি ঘোরানোর একচেটিয়া অধিকার দিয়ে বসে আছে যুক্তরাষ্ট্রকে। অনুচ্ছেদ ৪-এ বলা হয়েছে–বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট কন্ট্রোল মেনে চলবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকেও সেই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুপক্ষীয় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মেনে চলবে। এ ধরনের প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। পাশাপাশি এও নিশ্চিত করতে হবে যে, দেশের কোনো কোম্পানি এসব নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে না। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেয়ার করবে।

এই একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত কেনাকাটা বাড়াবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়–এমন কোনো দেশ থেকে (পড়ুন চীন, রাশিয়া ইত্যাদি) নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর বা এ সম্পর্কিত সরঞ্জাম কিনতে পারবে না। এর ব্যত্যয় হলে এবং আলোচনায় এর কোনো সমাধান না এলে সঙ্গে সঙ্গেই ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল আরোপিত শুল্কহার পুনঃপ্রযুক্ত হবে।
এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ গ্যাস, বিরল খনিজ ইত্যাদির রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারবে না। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে অনুমোদন দেবে এবং এ প্রক্রিয়াকে সহজ করবে। কারণ কী? এই সহজ বিনিয়োগের পথ খোলা হবে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করা যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো সেবা প্রদান করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একই ধরনের পরিস্থিতিতে নিজ দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যে সুবিধা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদেরও তেমন সুবিধা দেবে।
খেয়াল করুন, তালিকায় ঢুকে বসে আছে জ্বালানি ও ভবষ্যিতের জ্বালানি (বিরল খনিজ)। আর সুবিধা দেওয়া হবে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুরূপ। এ ক্ষেত্রে বাপেক্স বা পেট্রোবাংলার মতো প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করার বদলে তার হাত-পা বাঁধার পথ খোলা হয়েছে। কীভাবে? চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিশেষত ‘পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিবেচনা অনুসরণ করবে’ এবং ‘যেসব প্রতিষ্ঠান অ-বাণিজ্যিক জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করে না, সেসব ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেবে না’ বলে ধারা যুক্ত করা হয়েছে চুক্তিতে। ফলে দেশের ভেতরের বাজারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ চুক্তি নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু নির্বাচনের উত্তাপ এই আলোচনা-সমালোচনা থেকে নজর সরিয়ে নেয়। মুখ্যত বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন–নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার কেন এমন একটি বিতর্কিত চুক্তি করল? এত তাড়াহুড়ো কেন? নির্বাচিত সরকারই তো চুক্তিটি করতে পারত। এর আগে বন্দর নিয়ে সরকারের নানা বক্তব্য আমরা দেখেছি। প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং বন্দর চুক্তির বিরোধিতাকারীদের প্রতিহতের ডাক দিয়েছিলেন। শ্রমিকদের আন্দোলনে সে চুক্তি শেষ পর্যন্ত হয়নি। সরে এসেছে বলা যাবে না আবার। কারণ, তৎপরতা চলছে। এখন এই চুক্তি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো-এ চুক্তি নিয়ে এত তরফে এত এত কথা হলেও বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে একেবারে ‘স্পিকটি নট’। কেন?
তাহলে এ চুক্তি কি নির্বাচন অনুষ্ঠান বা ক্ষমতার সমীকরণের অন্যতম শর্ত ছিল? প্রশ্নটি উঠছে কারণ, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রকে রীতিমতো ‘করদ রাষ্ট্রের’ অনুভূতি দিচ্ছে। আর মহান ইন্টেরিম বলছেন–“কিচ্ছুটি হবে না, দেখ না কত ভালো চুক্তি এনেছি।” যেনবা লেবেঞ্চুশ। আর ক্ষমতার সমীকরণে উঠে আসা দুই দল ও জোটের ভাবটা হলো–“কই আমি তো কিছু জানি না। যখন হলো, আমি তো ছিলাম না। এই যে এখনো শপথই তো নিইনি।”
আর এই দেশের মানুষেরা একবার এদিক, একবার ওদিক তাকাচ্ছে। একবার দেখছে ইন্টেরিম প্রেমে অন্ধ একদল লোক এই চুক্তি দেখে শীৎকার দিয়ে দিয়ে উঠছে–আহা কী চুক্তি গো। সঙ্গে আবার আবেগমথিত প্রশ্ন–আরও কিছুকাল কেন থাকলে না। আরেকবার দেখছে–চুক্তি নাকি গোটা দেশটাই বেচে দিল।
বাণিজ্য চুক্তির খোলশে একটা বেচাকেনা যে হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের প্রশ্ন বরং–বিক্রিটা ভালো হলো তো? দাম ভালো পেলাম তো আমরা? নাকি দেশটা পানির দরেই বিক্রি হলো? ঠিক কত দামে–একটু বলবেন কি? যাবার আগে কিছু তো অন্তত বলে যান।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে; অর্থাৎ, নির্বাচনের ঠিক আগে আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা উঠেই আবার স্তিমিত হয়ে যায়। দেশের বামপন্থী রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী অংশ এবং পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ইত্যাদি বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মজার বিষয় হচ্ছে নির্বাচনে বিজয়ী ও প্রধান বিরোধী দল হওয়ার ম্যান্ডেট পাওয়া কোনো দল থেকেই কোনো রা নেই। তাদের ভঙ্গি অনেকটা, ‘যা হয়েছে ভালো হয়েছে, যা হবে ভালোই হবে’। একটা নিয়তিবাদী ব্যাপার আরকি!
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তিটি প্রকাশ করেছে মার্কিন ইউএসটিআর। দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো চুক্তি নেই। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দেড় হাজার পণ্যে শুল্ক তুলে নিয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশটি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার কৃষি, জ্বালানি ও উড়োজাহাজ আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে দেশীয় প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি কমানোর শর্ত। একইসঙ্গে অন্য দেশের সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিনিময়ে শুল্কহার কমেছে ১ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে, যা আগের সাড়ে ১৫ শতাংশের সাথে মিলে দাঁড়াচ্ছে সাড়ে ৩৪ শতাংশ!
এ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে নির্বাচনের পর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভ্যারিফায়েড পেজ থেকে। সেখানে এই চুক্তির প্রেক্ষাপট হিসেবে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার, বিশেষত তৈরি পোশাক খাতের রাপ্তানি গন্তব্যকে অক্ষুণ্ন রাখতেই নাকি এমন করা হয়েছে! পাশাপাশি চুক্তির বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা আটটি পয়েন্টে বলার চেষ্টা করা হয়েছে যে, চুক্তিটি কেন বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক।
দেখা যাক–আসলে চুক্তিতে কী আছে, আর তা দেশের জন্য কতটা মঙ্গল বয়ে আনবে। কিংবা বোঝার চেষ্টা করা যাক যে, দেশ কি সত্যিই বিক্রি হয়েছে। হলে সস্তায়, নাকি কিছুটা দাম নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে হওয়া চুক্তিটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ সংক্ষেপে এআরটি বা আর্ট। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপের খেলার অংশ হিসেবেই এ আর্ট। গত বছরের এপ্রিলে ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্কারোপ করেন। এর পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে আলোচনায় ডাকে যুক্তরাষ্ট্র। যেসব দেশ এ আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্কহার কমিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশ অংশ নিলে আরোপিত শুল্ক ২০ শতাংশে নামে। এ হার আরও নামিয়ে আনতে চেষ্টা চালায় বাংলাদেশ। দীর্ঘ চেষ্টার পর কথিত ‘সফল’ আলোচনায় ১ শতাংশ শুল্ক কমাতে সমর্থ্য হয় ঢাকা। বিনিময়?
এ বিনিময় নিয়েই প্রশ্ন। যাবতীয় আলোচনা এই বিনিময় নিয়েই। সঙ্গে থাকা বিচিত্র শর্ত নিয়ে কপাল না কুঁচকে কোনো উপায় নেই।
কারণ, প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যে অর্জনের গপ্পো আমাদের শোনানো হয়েছে, তার কেন্দ্রে আছে–যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে, তাতে কোনো পাল্টা শুল্ক লাগবে না বলে দেওয়া মার্কিন আশ্বাস। বলা হচ্ছে, এতে দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের রমরমা হবে। যুক্তরাষ্ট্রে বিনা শুল্কে প্রবেশাধিকার পাওয়া আমাদের তৈরি পোশাক দেশটির বাজার দখল করে ফেলবে।
বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এটিকেই সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়। দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়। দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অঞ্চলটিতে মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে ১৯ শতাংশের বেশি।
এই যে তৈরি পোশাক, এর যে কাঁচামাল, তা বাংলাদেশ মূলত আমদানি করে আফ্রিকা, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সবচেয়ে বেশি তুলা আমদানি হয় আফ্রিকা অঞ্চল থেকে। আফ্রিকার তুলা মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে। এর পর আমদানি উৎস হিসেবে রয়েছে ভারত ও চীন। তারপর যুক্তরাষ্ট্র। ইদানীং চোখ রাঙানিতেই হোক বা যে কারণেই হোক যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ছে। তবে বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, আফ্রিকার তুলার চেয়ে প্রতি পাউন্ডে মার্কিন তুলায় খরচ বেশি পড়ছে ১০ থেকে ১২ সেন্ট বেশি।
বাংলাদেশ সর্বশেষ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এর পুরোটা শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেতে হলে এই পোশাক হতে হবে মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম তন্তুতে তৈরি। না হলে শুল্ক গুণতে হবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮২ লাখ ৮০ হাজার বেল (প্রতি বেল ২১৮ কেজি) তুলা আমদানি করেছে। আমদানি উৎস হিসেবে শীর্ষে আছে ব্রাজিল, তারপর ভারত। আর অঞ্চল হিসেবে আফ্রিকা। সে যাই হোক। এই আমদানি করা তুলা থেকে তৈরি পোশাকের ১৯ শতাংশের বেশি রপ্তানি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এই রপ্তানি পণ্যের পুরোটায় শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে হলে সাধারণ গণিত মেনে বাংলাদেশকে অন্তত ১৯ শতাংশ তুলার আমদানি যুক্তরাষ্ট্র থেকে করতে হবে। এতটা সরল নয়। তবু, বোঝার সুবিধার জন্যই এমন হিসাব করে নেওয়া গেল।
আসা যাক, এই ১৯ শতাংশে। এই ১৯ শতাংশ মানে–৭৫ কোটি ৪৫ লাখ ৬ হাজার ৭২০ পাউন্ড তুলা। প্রতি পাউন্ডে ১০ সেন্ট করে শুধু বাড়তি তুলার দাম গুনলে তা সাড়ে ৭ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়। বাদ রইল দূরত্ব বিচারে এই তুলা বঙ্গমূলুকে আনার পথ খরচা। সাড়ে ৭ কোটি ডলার মানে কত? ৯১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। কম নয় কিন্তু। শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে মার্কিন তুলার পেছনেই বাড়তি ব্যয় করতে হবে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। আর এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগী দেশগুলো বসে থাকবে বলেই কি আমরা ধরে নিচ্ছি? ভারত কিন্তু এরই মধ্যে বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপের সঙ্গে চুক্তি করেছে।
এ তো গেল চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। তৈরি পোশাক খাতকে অন্তর্বর্তী সরকার রীতিমতো উদ্ধার করেছে বলে যে প্রচার সর্বশেষ প্রধান উপদেষ্টার পেজ থেকে দেওয়া হলো–তার অন্দরমহলটা খুব একটা আশ্বস্ত করছে কি? এবার এই মূলোটি দেখে যে সরল মানুষেরা কমেন্টবক্স ভোসিয়ে দিয়েছেন, তাদের বলি–একটু থামুন। আরও মজা বাকি আছে।
চুক্তির এই বিরাট অর্জন এবং শুল্কহার ১ শতাংশ পয়েন্ট কমাতে গিয়ে বাংলাদেশকে যা যা গিলতে হয়েছে, বা সুবোধ বালকের মতো বাংলাদেশ যা গিলে বসে আছে, তা হলো–বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে কিছু দেশ থেকে কমানোর অঙ্গীকার করেছে। এই কিছু দেশ কারা হতে পারে বলে ধারণা আপনার? নামগুলো মনে মনে না জপে উচ্চারণ করুন–চীন, রাশিয়া…। এবার সবচেয়ে বড় আমদানি উৎস চীন পাল্টা হিসেবে কী করতে পারে, ভাবুন।
প্রধান উপদষ্টোর পেজে দেওয়া পোস্টে বলা হয়েছে, এসব শর্ত নাকি আগে থেকেই বাংলাদেশের অনুস্বাক্ষর করা বিভিন্ন চুক্তিতে শর্ত হিসেবে ছিল। কী সেই সনদগুলো? ডব্লিউটিও, আইএলও, ট্রিপস ইত্যাদি। এগুলো একটু পড়ে দেখবেন দয়া করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তৃতীয় দেশের প্রবশোধিকার রোধে এসব চুক্তি বা সনদের কোথায় কী আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য চুক্তি, যার সংক্ষিপ্ত নাম প্রধান উপদেষ্টার পেজ থেকে দেওয়া পোস্টেই বলা হয়েছে আর্ট, তা আসলেই শৈল্পিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছে। নির্বাচনের দুদিন আগে সম্পাদিত এ চুক্তিতে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে সকল পণ্য ক্রয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেসব পণ্য অন্য উৎস হতে ক্রয় করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য বিধায় সে বাজার ধরে রাখার জন্য তাদের বাজার থেকে ক্রয়ের অঙ্গীকার করা হয়েছে; এতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হবে না। শুধু উৎসের পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের রপ্তানি বাজার সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তুলার হিসাবটি তো সবিস্তারে দেওয়াই হলো। এবার চুক্তিতে প্রবেশ করা যাক। চুাক্তির সেকশন ২-এ অনুচ্ছেদ ২-এর বিভিন্ন ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়–বাংলাদেশ এমন কোনো লাইসেন্সিং আরোপ করতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা হতে পারে। এই পণ্য বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে আবার মার্কিন অথবা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানদণ্ড মেনে চললেই হবে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি মানদণ্ড স্থাপন করতে পারবে না। কোনো বাড়তি বাধা বা বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বাজারে মার্কিন পণ্য তার নিয়মে প্রবেশ করবে। এখানে বাংলাদেশের কোনো আইন, বিধি কিছুই খাটবে না।
এই ২ অনুচ্ছেদেই কৃষি সম্পর্কিত ধারাগুলো আছে। এসব ধারা অনুসারে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত (এসপিএস বা স্যানিটারি ও ফাইটো-স্যানিটারি) ব্যবস্থা বিজ্ঞান ও ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতির হতে হবে, যেন তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যে বাধা তৈরি না করে। শুধু তাই না, বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যেখানে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন, বৈষম্যমূলক বা পক্ষপাতমূলক কারিগরি মানদণ্ড থাকবে। আর এই ‘বৈষম্যমূলক’, ‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন’ বা ‘পক্ষপাতমূলক’ ব্যবস্থা কে শনাক্ত করবে? অহেতুক প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আবার কে? শুধু তাই নয়, এই ধারা অনুযায়ী এমন কোনো স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদস্বাস্থ্য-সংক্রান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যা যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ, অথবা যার ফলে তৃতীয় দেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, চুক্তিটিতে বাংলাদেশ আছে শুধু ‘জি হুজুর’ বলতেই। পণ্য কার? যুক্তরাষ্ট্রের। স্বার্থ কার? যুক্তরাষ্ট্রের। তৃতীয় দেশে কার স্বার্থ রক্ষিত হবে? যুক্তরাষ্ট্রের।
তৃতীয় দেশের প্রসঙ্গ যখন এলোই–এই চুক্তি তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর সর্বদা ছড়ি ঘোরানোর একচেটিয়া অধিকার দিয়ে বসে আছে যুক্তরাষ্ট্রকে। অনুচ্ছেদ ৪-এ বলা হয়েছে–বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের এক্সপোর্ট কন্ট্রোল মেনে চলবে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা দিলে বাংলাদেশকেও সেই নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও পণ্যের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুপক্ষীয় রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মেনে চলবে। এ ধরনের প্রযুক্তি ও পণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে। পাশাপাশি এও নিশ্চিত করতে হবে যে, দেশের কোনো কোম্পানি এসব নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে না। অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেয়ার করবে।

এই একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত কেনাকাটা বাড়াবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়–এমন কোনো দেশ থেকে (পড়ুন চীন, রাশিয়া ইত্যাদি) নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর বা এ সম্পর্কিত সরঞ্জাম কিনতে পারবে না। এর ব্যত্যয় হলে এবং আলোচনায় এর কোনো সমাধান না এলে সঙ্গে সঙ্গেই ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল আরোপিত শুল্কহার পুনঃপ্রযুক্ত হবে।
এই চুক্তি মোতাবেক বাংলাদেশ গ্যাস, বিরল খনিজ ইত্যাদির রপ্তানি নিষিদ্ধ করতে পারবে না। চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে অনুমোদন দেবে এবং এ প্রক্রিয়াকে সহজ করবে। কারণ কী? এই সহজ বিনিয়োগের পথ খোলা হবে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, উত্তোলন, পরিশোধন, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন, বিতরণ ও রপ্তানি করা যায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ও অবকাঠামো সেবা প্রদান করা যায়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একই ধরনের পরিস্থিতিতে নিজ দেশের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যে সুবিধা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদেরও তেমন সুবিধা দেবে।
খেয়াল করুন, তালিকায় ঢুকে বসে আছে জ্বালানি ও ভবষ্যিতের জ্বালানি (বিরল খনিজ)। আর সুবিধা দেওয়া হবে দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুরূপ। এ ক্ষেত্রে বাপেক্স বা পেট্রোবাংলার মতো প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করার বদলে তার হাত-পা বাঁধার পথ খোলা হয়েছে। কীভাবে? চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। বিশেষত ‘পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক বিবেচনা অনুসরণ করবে’ এবং ‘যেসব প্রতিষ্ঠান অ-বাণিজ্যিক জনকল্যাণমূলক সেবা প্রদান করে না, সেসব ক্ষেত্রে দেশীয় পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেবে না’ বলে ধারা যুক্ত করা হয়েছে চুক্তিতে। ফলে দেশের ভেতরের বাজারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ চুক্তি নিয়ে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু নির্বাচনের উত্তাপ এই আলোচনা-সমালোচনা থেকে নজর সরিয়ে নেয়। মুখ্যত বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে কথা বলছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন–নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার কেন এমন একটি বিতর্কিত চুক্তি করল? এত তাড়াহুড়ো কেন? নির্বাচিত সরকারই তো চুক্তিটি করতে পারত। এর আগে বন্দর নিয়ে সরকারের নানা বক্তব্য আমরা দেখেছি। প্রধান উপদেষ্টা স্বয়ং বন্দর চুক্তির বিরোধিতাকারীদের প্রতিহতের ডাক দিয়েছিলেন। শ্রমিকদের আন্দোলনে সে চুক্তি শেষ পর্যন্ত হয়নি। সরে এসেছে বলা যাবে না আবার। কারণ, তৎপরতা চলছে। এখন এই চুক্তি। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো-এ চুক্তি নিয়ে এত তরফে এত এত কথা হলেও বিএনপি বা জামায়াতে ইসলামীর তরফ থেকে একেবারে ‘স্পিকটি নট’। কেন?
তাহলে এ চুক্তি কি নির্বাচন অনুষ্ঠান বা ক্ষমতার সমীকরণের অন্যতম শর্ত ছিল? প্রশ্নটি উঠছে কারণ, চুক্তির বিভিন্ন শর্ত বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রকে রীতিমতো ‘করদ রাষ্ট্রের’ অনুভূতি দিচ্ছে। আর মহান ইন্টেরিম বলছেন–“কিচ্ছুটি হবে না, দেখ না কত ভালো চুক্তি এনেছি।” যেনবা লেবেঞ্চুশ। আর ক্ষমতার সমীকরণে উঠে আসা দুই দল ও জোটের ভাবটা হলো–“কই আমি তো কিছু জানি না। যখন হলো, আমি তো ছিলাম না। এই যে এখনো শপথই তো নিইনি।”
আর এই দেশের মানুষেরা একবার এদিক, একবার ওদিক তাকাচ্ছে। একবার দেখছে ইন্টেরিম প্রেমে অন্ধ একদল লোক এই চুক্তি দেখে শীৎকার দিয়ে দিয়ে উঠছে–আহা কী চুক্তি গো। সঙ্গে আবার আবেগমথিত প্রশ্ন–আরও কিছুকাল কেন থাকলে না। আরেকবার দেখছে–চুক্তি নাকি গোটা দেশটাই বেচে দিল।
বাণিজ্য চুক্তির খোলশে একটা বেচাকেনা যে হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের প্রশ্ন বরং–বিক্রিটা ভালো হলো তো? দাম ভালো পেলাম তো আমরা? নাকি দেশটা পানির দরেই বিক্রি হলো? ঠিক কত দামে–একটু বলবেন কি? যাবার আগে কিছু তো অন্তত বলে যান।
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট