‘মাকু’ নয়, পশ্চিমবঙ্গে এখন ভোটের গালি ‘সেকু’!

‘মাকু’ নয়, পশ্চিমবঙ্গে এখন ভোটের গালি ‘সেকু’!
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে বানানো

তাঁতীদের খুবই পরিচিত ‘মাকু’ শব্দটি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টদের সৌজন্যে মাকু সাধারণ মানুষের কাছেও খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছিল। তাঁতকলে শাড়ি বা গামছা বুনতে মাকু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আবার হাত বোমা বানাতেও ব্যবহার করা হতো মাকু। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আগে কমিউনিস্টদের জন্য এই শব্দটি ব্যবহৃত হতো ব্যাঙ্গ করে। দুধারে ধারালো লোহা আর মাঝখানে মোটা, ফুট খানেকের এই বস্তুটির চল আজও রয়েছে হস্তচালিত এবং বিদ্যুৎচালিত তাঁতকলে। তবে কমিউনিস্টদের উদ্দেশ্যে আজ আর খুব একটা মাকু শব্দটির ব্যবহার হয় না। কারণ সামাজিক বা গণমাধ্যম বাদ দিলে ‘মাকু’-দের অস্তীত্বই তো এখন সংকটে! বরং ইদানিং খুব শোনা যায় নতুন গালি, ‘সেকু’!

‘সেকু’ শব্দটি এসেছে সেকুলার থেকে। অসাম্প্রদায়িক বা ধর্মনিরপেক্ষ। যে পশ্চিমবঙ্গ এক সময় সাম্যবাদের কথা বলতো, আগলে ধরেছিল বাম রাজনীতিকে, সেখানেই এখন চাষ হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে গালি দেওয়া হচ্ছে ‘সেকু’ বলে! কেউ ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কথা বললে সেই ‘সেকু’! এমনকি মাকুরাও সেকু বলে গালি দিচ্ছে! ভোট যত এগিয়ে আসছে, তত বেশি করে চলছে সেকুদের কোণঠাসা করার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। বদলে রাজনৈতিক প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে ধর্ম। মানুষকে কাছে টানতে মন্দির আর মসজিদ বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। লাখো কণ্ঠে ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের প্রতিযোগিতা চলছে। উন্নয়ন নয়, ধর্মই হয়ে উঠছে ভোটে জেতার সহজ সমীকরণ!

পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা, তামিলনাডু ও পুদুচেরিতে সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। নির্বাচনে জয়লাভের জন্য জনসাধারণকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা দেওয়াটা ভারতের রীতিমতো দস্তুর হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা না করে ভোটারদের দানধ্যান করাটাই হয়ে উঠছে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্য। বিনা পয়সায় চালডাল, বিভিন্ন ভাতা দেওয়ার পাশাপাশি গরীব মানুষকে খুশি করতে মরিয়া সব রাজনৈতিক দল। অর্থনীতিবিদরা উদ্বিগ্ন হলেও পরিস্থিতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। বরং দিন দিন বাড়ছে সরকারি অর্থে ভোট কেনার প্রতিযোগিতা। এতেও মন ভরছে না নেতাদের। তাই আর্থিক সুবিধার পাশাপাশি ধর্মীয় সুড়সুড়িও ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বামেদের পরিবর্তে বিজেপির উত্থানের পর ধর্মীয় উন্মাদনা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে। প্রায় ৩৫ শতাংশ মুসলিম ভোটব্যাংক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের বড় ভরসা হলেও তিনিও বাকি ৬৫ শতাংশের মন জয়ে ঢিলেমি দিতে নারাজ। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠছে বিভিন্ন মন্দির। পর্যটনের উন্নয়নের কথা বলে সমুদ্র সৈকত দীঘায় ২০০ কোটি রুপি খরচ করে গত বছর নির্মিত হয়েছে জগন্নাথ দেবের মন্দির। ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ঘটা করে মন্দিরটির উদ্বোধন করেন মমতা নিজে। কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ কিমি দূরে দীঘার এই মন্দিরের পাশাপাশি কলকাতার নিউ টাউনে ‘দুর্গা অঙ্গন’ গড়ে তুলছে মমতার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২৬২ কোটি রুপির এই প্রকল্পের মমতা শিলন্যাস করেছেন গত বছর ২৯ ডিসেম্বর। দুর্গার মূল মন্দির ছাড়াও কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর আলাদা মন্দির থাকবে এখানে। ২০২৭ সালে নির্মাণ শেষ হলে বারোমাস মানুষ দুর্গা দর্শন করতে পারবেন। এবছর ১৬ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে ১১ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকার বাজেট বরাদ্দ করে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিব মন্দির ‘মহাকাল মহাতীর্থ’-এর শিলান্যাস করেছেন মমতা। ভারতের ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের প্রতিরূপ থাকবে মন্দিরটিতে। নতুন তীর্থক্ষেত্র হবে শিলিগুড়ি।

পিছিয়ে নেই মমতার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপিও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিমবঙ্গ সফরকালে এখন ‘মা দুর্গা’র পাশাপাশি ‘মা কালী’রও স্মরণ নিচ্ছেন। নিয়ম করে লক্ষ কণ্ঠে গীতপাঠের আসর বসাচ্ছে বিজেপি। অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় মোদির হাত ধরে ২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি স্থাপিত হয়েছে নতুন রাম মন্দির। গত বছর সেই ২২ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদের অলংকার গ্রামে প্রায় ২ বিঘা জমির ওপর রাম-মন্দিরের ভূমি পূজা করে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা, বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী সেখানেই ঘোষণা করেছিলেন তার বিধানসভা কেন্দ্র মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ায় সাড়ে চার বিঘা জমিতে গড়ে উঠবে আরও একটি রাম মন্দির। গত বছর রামনবমীতে সাধু-সন্তদের উপস্থিতিতে সেই মন্দিরের ঘটা করে করেছেন শিলান্যাস।

শুধু মন্দির নির্মাণই নয়, বিভিন্ন পুজোর আয়োজকদের আর্থিক অনুদান দেওয়াটাকেও রীতিমতো নিয়মে পরিণত করেছে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারত সরকার। মৌলভী ও পুরোহিতদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। ধর্মীয় আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টায় বিরাম নেই শাসক বা বিরোধীদের। কারণ ভোট বড় বালাই! তবে কমিউনিস্টরা সেই দৌড়ে নেই। সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ জানিয়েছেন, তারা ক্ষমতায় এলে পুজো কমিটিকে অনুদান বা পুরোহিত ও মোল্লা ভাতা তুলে দেবেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ আপাতত আর নেই। গত বছর ফুরফুরা শরিফের উত্তরসূরী নওশাদ সিদ্দিকির হাতে গড়া আইএসএফের সঙ্গে কংগ্রেস ও সিপিএম অবশ্য জোট করেছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। বরং সমালোচিত হয়েছিলেন বামপন্থীরা।

আসন্ন নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু রাজনীতিতে বেশ চর্চিত নাম হুমায়ুন কবীর। তিনি তৃণমূল থেকে বরখাস্ত হওয়া বিধায়ক। নিজেই দল গড়েছেন। তার দলের নাম ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’। বিধানসভা ভোটে লড়বেন তারা। মন্দির-মসজিদের রাজনীতিতেও তাই তিনি জড়িত। হুমায়ুন জানিয়েছেন, মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় গড়ে তুলবেন বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভাঙা হয়েছিল অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। আর ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর হুমায়ুন শিলান্যাস করলেন নতুন বাবরি মসজিদের। কলকাতা থেকে ১৯০ কিমি দূরে ৩০ বিঘা জমিতে তৈরি হবে এই মসজিদ। ১৫ ফেব্রুয়ারির আগেই নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এই মসজিদ নির্মাণের জন্য মোট বাজেট ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি রুপি। অনুদান সংগ্রহ করা হচ্ছে। হুমায়ুন জানান, ইতিমধ্যেই সংগৃহীত নগদ অর্থের জন্য তার ১১টি ট্রাঙ্ক লেগেছে। এছাড়া অনলাইনেও প্রচুর দানের অর্থ পেয়েছেন।

এপ্রিল-মে মাসে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা ভোট। রাজনৈতিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে গত বছর থেকেই। খোদ প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে নিয়মিত রাজ্য সফর করছেন। আসছেন দিল্লির থেকে বিজেপির অন্য নেতা-মন্ত্রীরাও। স্বাভাবিক কারণেই মমতা ব্যানার্জি ও তার ভাইপো, দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জিসহ অন্যরাও প্রচারে ব্যস্ত। কিন্তু গত এক বছর ধরে নেতাদের প্রচারে ধর্মচর্চা অভূতপূর্ব গুরুত্ব পাচ্ছে। সেই প্রচার পৌঁছে যাচ্ছে মানুষের রান্নাঘরেও। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কলরবেও শোনা যাচ্ছে ‘সেকু’ গর্জন। সেই কলরবে ‘মাকু’র গুঞ্জন এখন বড়ই দুর্বল!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)।

সম্পর্কিত