Advertisement Banner

কাঁটাতারের রাজনীতি: ভারত কি সীমান্ত রক্ষা করছে, নাকি বন্ধুত্বে দেয়াল তুলছে?

কাঁটাতারের রাজনীতি: ভারত কি সীমান্ত রক্ষা করছে, নাকি বন্ধুত্বে দেয়াল তুলছে?
সিলেট সীমান্ত। ছবি: চরচা

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বললে ভুল হবে। এই সম্পর্কের ভেতরে আছে ভাষার মিল, সংস্কৃতির আত্মীয়তা, ইতিহাসের গভীর সংযোগ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তমাখা স্মৃতি। পৃথিবীতে খুব কম রাষ্ট্রই আছে, যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এতটা আবেগ, ইতিহাস ও আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই যখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নবগঠিত বিজেপি সরকার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে, এটি কি সত্যিই নিরাপত্তার প্রয়োজনে, নাকি রাজনৈতিক বার্তা? এটি কি প্রতিবেশী সম্পর্কের সুরক্ষা, নাকি বিভেদের নতুন স্থাপত্য?

ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়। বাণিজ্য বাড়ানো, আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধি, নৌ ও রেল সংযোগ সম্প্রসারণ–এসবই দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক দিক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু একই সময়ে সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ এক ধরনের দ্বৈত বার্তা বহন করে। একদিকে বন্ধুত্বের ভাষণ, অন্যদিকে শারীরিক দূরত্বের প্রাচীর–এই দুই অবস্থান কি একই সঙ্গে সত্য হতে পারে?

রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রশ্নকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক পাচার, মানব পাচার কিংবা চোরাচালান–এসব বাস্তব সমস্যা। প্রতিটি রাষ্ট্রেরই সীমান্ত সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। ভারতও সেই অধিকার প্রয়োগ করতে চাইবে, সেটি স্বাভাবিক। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, কাঁটাতারের বেড়া কি সত্যিই সমস্যার কার্যকর সমাধান?

বিশ্বের নানা অভিজ্ঞতা বলে, দেয়াল কখনো অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে না; বরং অপরাধের ধরন বদলে দেয়। সীমান্তে বেড়া থাকলেও পাচারকারীরা নতুন রুট খুঁজে নেয়, আরও ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করে এবং অপরাধ আরও সংগঠিত রূপ পায়। বাস্তবে কাঁটাতারের বেড়া সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত করে সাধারণ মানুষকে, যাদের জীবন, সংস্কৃতি এবং আত্মীয়তার বন্ধন সীমান্তের দুই পাশে বিস্তৃত।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বহু অঞ্চলে এমন পরিবার আছে, যাদের আত্মীয় একপাশে, জমি অন্যপাশে; ব্যবসা এক দেশে, বাজার আরেক দেশে। কাঁটাতারের বেড়া সেখানে শুধু একটি নিরাপত্তা অবকাঠামো নয়, এটি মানুষের মনোজগতেও বিভেদের রেখা টেনে দেয়। সীমান্তের মানুষ রাষ্ট্রের কৌশলগত ভাষা বোঝে না, তারা বোঝে সম্পর্কের উষ্ণতা কিংবা দূরত্ব।

এখানেই পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক মাত্রা পায়।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: ফেসবুক
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: ফেসবুক

বিজেপির রাজনীতিতে সীমান্ত সবসময়ই একটি শক্তিশালী আবেগঘন ইস্যু। বিশেষ করে বাংলাদেশকে ঘিরে অভিবাসন ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের প্রশ্নকে দলটি বহু বছর ধরে নির্বাচনী রাজনীতিতে ব্যবহার করে আসছে। ফলে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ কেবল নিরাপত্তার সিদ্ধান্ত নয়, বরং একটি প্রতীকী রাজনৈতিক বার্তাও। এটি এমন এক রাজনীতির অংশ, যেখানে জাতীয়তাবাদকে দৃশ্যমান করতে সীমান্তকে কঠোর এবং সশস্ত্র দেখানো জরুরি হয়ে ওঠে।

কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির লাভ সবসময় আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।

আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ এক নয়। গত বিশ বছরে এই দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতায় বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। পোশাক শিল্প, কৃষি উৎপাদন, রেমিট্যান্স এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ নিজেকে আর কারও অনুগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায় না; বরং সমমর্যাদার সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। তাই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে অবিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেই ধরা পড়ে।

আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ এক নয়। গত বিশ বছরে এই দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতায় বিশ্বকে বিস্মিত করেছে। পোশাক শিল্প, কৃষি উৎপাদন, রেমিট্যান্স এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।

বিশ্বের অন্য অঞ্চলগুলোর দিকে তাকালে ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যায়।

ইউরোপ বহু শতকের যুদ্ধ ও সংঘাত পেরিয়ে অবশেষে সীমান্ত উন্মুক্ত করার মধ্য দিয়ে সহযোগিতার নতুন রাজনীতি তৈরি করেছে। শেনজেন চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলো মানুষের চলাচল সহজ করে বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্ত বিশ্বের দীর্ঘতম শান্তিপূর্ণ সীমান্তগুলোর একটি, যেখানে পারস্পরিক বিশ্বাস সম্পর্ককে আরও মজবুত করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোও সীমান্তকে সংঘাতের জায়গা না বানিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।

অথচ দক্ষিণ এশিয়া এখনও উল্টো পথে হাঁটছে।

এই অঞ্চলে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস এবং সামাজিক বাস্তবতায় এত মিল থাকার পরও রাজনৈতিক অবিশ্বাস আঞ্চলিক সহযোগিতাকে দুর্বল করে রেখেছে। সীমান্তে বেড়া, কড়া ভিসানীতি এবং নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়াকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ভারত ও বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে দুঃখজনক। কারণ, দুই দেশের সামনে সহযোগিতার অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি সত্যিই সীমান্তকে নিরাপদ করতে হয়, তবে শুধু বেড়া নির্মাণ যথেষ্ট নয়। সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, বৈধ বাণিজ্য সহজ করা, আধুনিক কাস্টমস ব্যবস্থা তৈরি, যৌথ টহল জোরদার এবং সীমান্তবাসীর জীবনমান উন্নয়নের মতো উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি সহজ ভিসা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বাড়ানো দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দেশের মধ্যে যেসব দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধানে আন্তরিক অগ্রগতি দরকার।

তিস্তা চুক্তি এখনও ঝুঁলে আছে। সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাণিজ্য বৈষম্য ও অশুল্ক বাধাও বাংলাদেশে অসন্তোষ তৈরি করে। এসব ইস্যু সমাধান না করে শুধু বন্ধুত্বের ভাষণ দিলে সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হয় না।

ভারত যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়, তাহলে কাঁটাতারের চেয়ে বিশ্বাসের রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ ইতিহাস বলে, দেয়াল কখনো স্থায়ী সমাধান নয়।

বার্লিন প্রাচীর একদিন ভেঙে পড়েছিল। কারণ, মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিভেদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। পৃথিবীর নানা প্রান্তে সীমান্ত দেয়াল নির্মাণের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, দেয়াল সাময়িক নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসও বাড়ায়।

বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে আজ আসল প্রশ্ন হলো, তারা কেমন দক্ষিণ এশিয়া গড়তে চায়? একটি অঞ্চল, যেখানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো একে অপরকে সন্দেহ করবে, সীমান্তে কাঁটাতার বাড়াবে, রাজনৈতিক লাভের জন্য ভয়ের রাজনীতি করবে? নাকি এমন একটি অঞ্চল, যেখানে সহযোগিতা, আস্থা এবং পারস্পরিক সম্মান উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে?

কাঁটাতারের বেড়া হয়তো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ফায়দা দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো হৃদয়ের দূরত্ব কমাতে পারে না। কারণ, সীমান্তের প্রকৃত নিরাপত্তা অস্ত্র বা বেড়ায় নয় বরং পারস্পরিক বিশ্বাসে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দেয়ালের নয়, সেতুর পক্ষেই রায় দেয়।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ

সম্পর্কিত