সুদীপ্ত সালাম
মিষ্টিমুখ ছাড়া উৎসব ঠিক উৎসব মনে হয় না। বাঙালির উৎসব মানেই তো মিষ্টি। কিন্তু কিছু মিষ্টি কি হারিয়ে যাচ্ছে? কারণ, এমন কিছু মিষ্টি আছে, যা আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না।
অবাঙালি একটি মিষ্টি বাংলায় এসে হয়ে গেল ‘মনসুর’। এর শেকড় যদি খুঁজতে থাকি, দেখব–এটি ভারতের কর্ণাটকে মহীশূর প্যালেসের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৩৫ সালের দিকে মহারাজা কৃষ্ণরাজা ওদেয়ারের প্রধান বাবুর্চি কাকসুর মাদাপ্পা এটি তৈরি করেছিলেন। সেখান থেকেই এটি বাংলায় এসে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। এখন অবশ্য খুব একটা দেখা যায় না। সম্ভবত ‘মনসুর’ নামটি এসেছে ওই মহীশূর থেকে। এর আসল নাম ‘মহীশূর পাক’। কন্নড় ভাষায় ‘পাক’ অর্থ মিষ্টি। শুকনো এই মিষ্টি তৈরি হয় ঘি, বেসন ও চিনি দিয়ে।
মিহিদানা মূলত পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের সুখ্যাত মিষ্টান্ন। প্রায় শত বছর আগে এই মিষ্টি তৈরি করা হয়েছিল। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, বাংলার গভর্নর ও কলকাতার হাইকোর্টের দুই বিচারপতি বর্ধমান রাজার এক ভোজসভায় যোগ দেন। তখন মিষ্টান্নশিল্পী ভৈরব নাগকে ভালো ভালো মিষ্টি তৈরি করতে বলা হলে তিনি এই মিহিদানা প্রস্তুত করে দেন। মহারাজাই নাকি এই নাম দিয়েছিলেন। বেসন, সবেদা, ঘি ও চিনি দিয়ে তৈরি এই মিষ্টিকে বুন্দিয়া বা বুঁদিয়ার ক্ষুদ্র ভার্সন বলা যায়। এককালে এই মিষ্টি ‘খাস’ নামেও বিখ্যাত ছিল।

গজার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। ময়দা, ঘি ও চিনির শিরা দিয়ে তৈরি হয় এই রসালো এবং মুচমুচে মিষ্টি। নানা আকারের হয়, আকার ভেদে নামও ভিন্ন, যেমন চৌকো গজা, রাজ গজা, পান গজা, এম্প্রেস গজা, জুবিলি গজা, খাস্তা গজা ইত্যাদি। অনেকে মনে করেন, গজা এই বাংলার মিষ্টি নয়। আবার পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর শহরে গজার সঙ্গে ক্ষীর যোগ করে ‘ক্ষীরের গজা’ নামে আরেক ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। পুরীর জগন্নাথ দেবের প্রসাদ হিসেবেও গজা পাওয়া যায়। এই মিষ্টি কিন্তু বেশ প্রাচীন, সংস্কৃত গ্রন্থ ‘দ্রব্যগুণ’-এ এর উল্লেখ আছে। সেই গ্রন্থে বলা হয়েছে গজা রুচিকর তো বটেই, ভীষণ স্বাস্থ্যকরও।
বাংলার প্রায় বিলুপ্ত মিষ্টান্নগুলোর একটি গঙ্গাজলি। এটি এক ধরনের নাড়ু। তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল। মিহি করে নারকেল কুরে চিপে দুধ আলাদা করে নিতে হয়। শুকনো নারকেল কোরা এমন করে ভেজে নিতে হবে, যাতে মুচমুচে হবে কিন্তু লালচে হবে না। এর সঙ্গে গুঁড়ো করে নেওয়া চিনি ও কর্পূর মিশিয়ে নিতে হয়। এই মিশ্রণ চেপে চেপে গোল গোল ছাঁচে ভরতে হবে। শুকিয়ে গেলে তুলে নিলেই গঙ্গাজলি নাড়ু! এটি মাঙ্গলিক মিষ্টান্ন হিসেবে পরিচিত। নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই নাড়ু তৈরি করা হতো। মধ্যযুগের বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এ এই মিষ্টির উল্লেখ আছে। এক সময় এই মিষ্টিকে ‘গঙ্গাজলি সন্দেশ’ও বলা হতো।

মিষ্টির নামটি খুব সুন্দর–‘বাবরশা’। না, না মুঘল বাদশা বাবরের নামে নয়, এর নামকরণ করা হয়েছিল মেদিনীপুরে ক্ষীরপাইয়ের রেশমকুঠির রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড বাবরের নামে। এই সাহেবকে আপ্যায়ন করাতেই পরান আটা নামে এক কারিগর উনিশ শতকের দিকে মিষ্টিটি প্রথম তৈরি করেছিলেন। ময়দা, ঘি ও চিনির শিরা দিয়ে এই মিষ্টি তৈরি হয়। প্রথমে ময়দায় প্রচুর ঘি দিয়ে ময়ান দিতে হয়, তারপর তাতে ময়দা মাখা অল্প পানি দিয়ে খামি তৈরি করে নিতে হয়। কড়াইয়ে একটা গোলাকার লোহার ছাঁচ রাখতে হবে। ময়দার গোলাগুলো নারকেল মালায় নিয়ে সরু ছিদ্র দিয়ে এমন করে ফেলতে হয়, যাতে ভাজা হওয়ার পর দেখলে মনে হবে অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত মৌচাক! এই জিনিসটিকে চিনির শিরায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় জিভে পানি আসা বাবরশা। এক সময় ‘ঘিওর’ নামে যে মিষ্টি পাওয়া যেত, তার সঙ্গে এই মিষ্টির অনেক মিল। ঘিওরের নাম আবার পাওয়া যায় মধ্যযুগের অন্নদামঙ্গল কাব্যে।
তথ্যসূত্র: বাঙালির খাদ্যকোষ, মিলন দত্ত; টাইমস অব ইন্ডিয়া, কর্ণাটক ডট জিওভি ডট ইন
মিষ্টিমুখ ছাড়া উৎসব ঠিক উৎসব মনে হয় না। বাঙালির উৎসব মানেই তো মিষ্টি। কিন্তু কিছু মিষ্টি কি হারিয়ে যাচ্ছে? কারণ, এমন কিছু মিষ্টি আছে, যা আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না।
অবাঙালি একটি মিষ্টি বাংলায় এসে হয়ে গেল ‘মনসুর’। এর শেকড় যদি খুঁজতে থাকি, দেখব–এটি ভারতের কর্ণাটকে মহীশূর প্যালেসের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৩৫ সালের দিকে মহারাজা কৃষ্ণরাজা ওদেয়ারের প্রধান বাবুর্চি কাকসুর মাদাপ্পা এটি তৈরি করেছিলেন। সেখান থেকেই এটি বাংলায় এসে ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল। এখন অবশ্য খুব একটা দেখা যায় না। সম্ভবত ‘মনসুর’ নামটি এসেছে ওই মহীশূর থেকে। এর আসল নাম ‘মহীশূর পাক’। কন্নড় ভাষায় ‘পাক’ অর্থ মিষ্টি। শুকনো এই মিষ্টি তৈরি হয় ঘি, বেসন ও চিনি দিয়ে।
মিহিদানা মূলত পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের সুখ্যাত মিষ্টান্ন। প্রায় শত বছর আগে এই মিষ্টি তৈরি করা হয়েছিল। প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, বাংলার গভর্নর ও কলকাতার হাইকোর্টের দুই বিচারপতি বর্ধমান রাজার এক ভোজসভায় যোগ দেন। তখন মিষ্টান্নশিল্পী ভৈরব নাগকে ভালো ভালো মিষ্টি তৈরি করতে বলা হলে তিনি এই মিহিদানা প্রস্তুত করে দেন। মহারাজাই নাকি এই নাম দিয়েছিলেন। বেসন, সবেদা, ঘি ও চিনি দিয়ে তৈরি এই মিষ্টিকে বুন্দিয়া বা বুঁদিয়ার ক্ষুদ্র ভার্সন বলা যায়। এককালে এই মিষ্টি ‘খাস’ নামেও বিখ্যাত ছিল।

গজার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত। ময়দা, ঘি ও চিনির শিরা দিয়ে তৈরি হয় এই রসালো এবং মুচমুচে মিষ্টি। নানা আকারের হয়, আকার ভেদে নামও ভিন্ন, যেমন চৌকো গজা, রাজ গজা, পান গজা, এম্প্রেস গজা, জুবিলি গজা, খাস্তা গজা ইত্যাদি। অনেকে মনে করেন, গজা এই বাংলার মিষ্টি নয়। আবার পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর শহরে গজার সঙ্গে ক্ষীর যোগ করে ‘ক্ষীরের গজা’ নামে আরেক ধরনের মিষ্টি তৈরি হয়। পুরীর জগন্নাথ দেবের প্রসাদ হিসেবেও গজা পাওয়া যায়। এই মিষ্টি কিন্তু বেশ প্রাচীন, সংস্কৃত গ্রন্থ ‘দ্রব্যগুণ’-এ এর উল্লেখ আছে। সেই গ্রন্থে বলা হয়েছে গজা রুচিকর তো বটেই, ভীষণ স্বাস্থ্যকরও।
বাংলার প্রায় বিলুপ্ত মিষ্টান্নগুলোর একটি গঙ্গাজলি। এটি এক ধরনের নাড়ু। তৈরির প্রক্রিয়া বেশ জটিল। মিহি করে নারকেল কুরে চিপে দুধ আলাদা করে নিতে হয়। শুকনো নারকেল কোরা এমন করে ভেজে নিতে হবে, যাতে মুচমুচে হবে কিন্তু লালচে হবে না। এর সঙ্গে গুঁড়ো করে নেওয়া চিনি ও কর্পূর মিশিয়ে নিতে হয়। এই মিশ্রণ চেপে চেপে গোল গোল ছাঁচে ভরতে হবে। শুকিয়ে গেলে তুলে নিলেই গঙ্গাজলি নাড়ু! এটি মাঙ্গলিক মিষ্টান্ন হিসেবে পরিচিত। নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই নাড়ু তৈরি করা হতো। মধ্যযুগের বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য এবং কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর ‘চৈতন্যচরিতামৃত’-এ এই মিষ্টির উল্লেখ আছে। এক সময় এই মিষ্টিকে ‘গঙ্গাজলি সন্দেশ’ও বলা হতো।

মিষ্টির নামটি খুব সুন্দর–‘বাবরশা’। না, না মুঘল বাদশা বাবরের নামে নয়, এর নামকরণ করা হয়েছিল মেদিনীপুরে ক্ষীরপাইয়ের রেশমকুঠির রেসিডেন্ট এডওয়ার্ড বাবরের নামে। এই সাহেবকে আপ্যায়ন করাতেই পরান আটা নামে এক কারিগর উনিশ শতকের দিকে মিষ্টিটি প্রথম তৈরি করেছিলেন। ময়দা, ঘি ও চিনির শিরা দিয়ে এই মিষ্টি তৈরি হয়। প্রথমে ময়দায় প্রচুর ঘি দিয়ে ময়ান দিতে হয়, তারপর তাতে ময়দা মাখা অল্প পানি দিয়ে খামি তৈরি করে নিতে হয়। কড়াইয়ে একটা গোলাকার লোহার ছাঁচ রাখতে হবে। ময়দার গোলাগুলো নারকেল মালায় নিয়ে সরু ছিদ্র দিয়ে এমন করে ফেলতে হয়, যাতে ভাজা হওয়ার পর দেখলে মনে হবে অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত মৌচাক! এই জিনিসটিকে চিনির শিরায় নামিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই তৈরি হয় জিভে পানি আসা বাবরশা। এক সময় ‘ঘিওর’ নামে যে মিষ্টি পাওয়া যেত, তার সঙ্গে এই মিষ্টির অনেক মিল। ঘিওরের নাম আবার পাওয়া যায় মধ্যযুগের অন্নদামঙ্গল কাব্যে।
তথ্যসূত্র: বাঙালির খাদ্যকোষ, মিলন দত্ত; টাইমস অব ইন্ডিয়া, কর্ণাটক ডট জিওভি ডট ইন