সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট ভারতে পালানোর সময় ধরা পড়েছিলেন। অবৈধভাবে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় তাকে আটক করে বিজিবি। পরদিন ভোরে তাকে কানাইঘাট থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় কানাইঘাট থানা-পুলিশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার একাধিক থানায় বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। এমনকি ঢাকার সেসব থানার পুলিশও তাকে গ্রেপ্তার করেনি। করেছে অন্য একটি থানার পুলিশ।
এবার ৫৪ ধারা প্রয়োগের জন্য উদাহরণস্বরুপ একটি ঘটনার অনুমান করা যাক–
পুলিশের উপস্থিতিতে সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অথবা মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করার পর, ঘর ভাঙা সরঞ্জাম ও চোরাই মাল নিয়ে পালানোর সময় ওই অপরাধীকে পুলিশ ধরতে গেলে সে পালিয়ে যায়। পলাতক থাকা অবস্থায় ওই অপরাধী সশস্ত্র বাহিনী থেকে পলাতক একজন, বিদেশে অপরাধ করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একজন এবং ৫৬৫ (৩) ধারার বিধান ভঙ্গের অভিযোগে দুবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া মুক্তিপ্রাপ্ত একজনের সাথে গোপন বৈঠক করে। সে বৈঠকে অভিযান চালিয়ে তাদের ধরতে পারবে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে আসামিরা পরোয়ানা দেখতে চাইলে, পুলিশ বলবে, অন্য থানার রিক্যুজিশন আছে। তাই কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লাগবে না।
এই উদাহরণের সঙ্গে সাবেক বিচারপতি মানিকের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলনা করলে সহজেই বোঝা যায় ৫৪ ধারার প্রয়োগ কীভাবে হয়। বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও কোনো পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট ছিল না। কিংবা থাকলেও তা কানাইঘাট থানা-পুলিশের কাছে ছিল না। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ হয়েছে, তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার মতো অপরাধ করতে যাচ্ছিলেন। তাই তারা পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল। এটাই হলো ৫৪ ধারার কার্যক্ষমতা।
অপরাধ প্রতিরোধ কিংবা অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে এই বিধান তৈরি হলেও এর অপব্যবহারের কারণে সমালোচনাও হয়েছে ব্যাপক। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। ৯টি ক্ষেত্র দিয়ে এই ৫৪ ধারাকে বর্ণনা করা হয়েছিল। ক্ষেত্রগুলো হলো–
কোনো আমলযোগ্য অপরাধের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি।
আইনসঙ্গত কারণ ব্যতীত যার নিকট ঘর ভাঙার যন্ত্রপাতি থাকে।
এই আইন অনুযায়ী বা সরকারি আদেশ দ্বারা যাকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়েছে।
চোরাই বলে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে–এমন মালামাল যার কাছে আছে।
পুলিশ অফিসারের কাজে বাধাদানকারী ব্যক্তি অথবা যে আইনসঙ্গত হেফাজত হতে পালায় বা চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হতে পলায়নকারী বলে যাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে করা হলে অপরাধ হতো–এমন অপরাধ বাংলাদেশের বাইরে করা হলে।
কোনো মুক্তিপ্রাপ্ত আসামি, যে অত্র আইনের ৫৬৫(৩) ধারার নিয়ম লঙ্ঘন করে।
যাকে গ্রেপ্তারের জন্য অন্য কোনো পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে অনুরোধ পাওয়া গেছে।
তবে ধারাটি প্রণয়নের ১২৭ বছর পর ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর মাধ্যমে এই আইনের ক্ষমতায় কিছুটা লাগাম টানে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যাতে, আগের ৯টি ক্ষেত্রের পরিবর্তে ১১টি ক্ষেত্র যুক্ত করা হয়েছে। আগের ৯টি ক্ষেত্রের মধ্যে প্রথমটি বাদে বাকি আটটি ক্ষেত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। আমলযোগ্য অপরাধে সম্পৃক্ত থাকা কিংবা অভিযোগ বা তথ্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা–এই প্রথম ক্ষেত্রটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আর নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে অপর একটি ক্ষেত্র।
সংশোধিত ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত এবং পরোয়ানা ছাড়া পুলিশ অফিসার নিম্নোক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন–
প্রথমত, পুলিশ অফিসারের উপস্থিতিতে আমলযোগ্য অপরাধ সংগঠনকারী যেকোনো ব্যক্তিকে; দ্বিতীয়ত, এমন যেকোনো ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে সাত বছরের কম অথবা সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় আমলযোগ্য অপরাধ সংগঠনের যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ করা হয় অথবা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় অথবা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বিদ্যমান থাকে এবং নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়; যথা–
(১) এরূপ অভিযোগ, তথ্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ অফিসারের বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, ওই ব্যক্তি অপরাধটি করেছেন; এবং (২) পুলিশ অফিসারকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে–(ক) আর কোনো অপরাধ করা থেকে ওই ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (খ) মামলার যথাযথ তদন্তের জন্য; অথবা (গ) অপরাধের সাক্ষ্য-প্রমাণ যেকোনো উপায়ে গোপন করা কিংবা প্রভাব বিস্তার করা থেকে ওই ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (ঘ) মামলার ঘটনাবলি সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিকে আদালত কিংবা পুলিশ অফিসারের কাছে ওই ঘটনাবলী প্রকাশ করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে প্ররোচনা, হুমকি বা প্রতিশ্রুতি প্রদান থেকে এরূপ ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (ঙ) ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার না করা হলে যখন প্রয়োজন হবে, তখন আদালতে উক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে না।
তৃতীয়ত, এমন যেকোনো ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে সাত বছরের অধিক কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ অথবা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় এবং এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অফিসারের বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, ওই ব্যক্তি এমন অপরাধ করেছে।
অর্থাৎ, ৫৪ ধারার পরিধি বা কার্যকারিতা না কমলেও কিছু শর্ত দিয়ে এর অপব্যবহার রোধের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, পুলিশ যদি কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে আসে, তবে ওয়ারেন্ট দেখতে চাইলেও কোনো কাজ হবে না। তারা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। তখন অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী?
আইনের সংশোধনীতে স্পষ্ট বলা আছে, যে পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করবেন, তার পরিষ্কার পরিচয় থাকতে হবে। তার ইউনিফর্মে নেমপ্লেট থাকতে হবে, পরিচয়পত্র থাকতে হবে। যে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তার চাহিদামাত্র পুলিশ কর্মকর্তার আইডি কার্ড দেখাতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক। এরপর গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে যখন থানায় নিয়ে আসা হবে, যত দ্রুত সম্ভব তার পরিবার, বন্ধু, কিংবা আইনজীবীকে যোগাযোগ করে জানাতে হবে। এই কাজে কোনো অবস্থাতেই ১২ ঘণ্টার বেশি সময় নেওয়া যাবে না।
কারাদণ্ড। ছবি: চরচা
আইনজীবীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই পুলিশ সদস্যের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে। এরপর নিজের অপরাধ সম্পর্কে জানতে চাইতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব চরচাকে বলেন, “৫৪ ধারায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলে, তা করে সন্দেহের ভিত্তিতে। তাই পোশাকে থাকা পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে, তিনি কোন থানার পুলিশ সদস্য, তার নাম-পদবি জেনে প্রয়োজনে ওই থানায় ফোন করে মিলিয়ে নিতে হবে। সাদা পোশাকে গেলে তার পরিচয়পত্র যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রেও নিশ্চিত হতে হবে। তারপর কোনো অপরাধে জড়িত থাকার জন্য তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তা জানতে হবে। নিজেদের পরিচয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ না জানালে ওই পুলিশ সদস্য নিজেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন।”
গ্রেপ্তার প্রতীকী। ছবি: চরচা
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট ভারতে পালানোর সময় ধরা পড়েছিলেন। অবৈধভাবে সিলেটের কানাইঘাট সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় তাকে আটক করে বিজিবি। পরদিন ভোরে তাকে কানাইঘাট থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় কানাইঘাট থানা-পুলিশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার একাধিক থানায় বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে মামলা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। এমনকি ঢাকার সেসব থানার পুলিশও তাকে গ্রেপ্তার করেনি। করেছে অন্য একটি থানার পুলিশ।
এবার ৫৪ ধারা প্রয়োগের জন্য উদাহরণস্বরুপ একটি ঘটনার অনুমান করা যাক–
পুলিশের উপস্থিতিতে সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অথবা মৃত্যুদণ্ডের অপরাধ করার পর, ঘর ভাঙা সরঞ্জাম ও চোরাই মাল নিয়ে পালানোর সময় ওই অপরাধীকে পুলিশ ধরতে গেলে সে পালিয়ে যায়। পলাতক থাকা অবস্থায় ওই অপরাধী সশস্ত্র বাহিনী থেকে পলাতক একজন, বিদেশে অপরাধ করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একজন এবং ৫৬৫ (৩) ধারার বিধান ভঙ্গের অভিযোগে দুবার দোষী সাব্যস্ত হওয়া মুক্তিপ্রাপ্ত একজনের সাথে গোপন বৈঠক করে। সে বৈঠকে অভিযান চালিয়ে তাদের ধরতে পারবে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে আসামিরা পরোয়ানা দেখতে চাইলে, পুলিশ বলবে, অন্য থানার রিক্যুজিশন আছে। তাই কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লাগবে না।
এই উদাহরণের সঙ্গে সাবেক বিচারপতি মানিকের গ্রেপ্তারের বিষয়টি তুলনা করলে সহজেই বোঝা যায় ৫৪ ধারার প্রয়োগ কীভাবে হয়। বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে মামলা থাকলেও কোনো পরোয়ানা বা ওয়ারেন্ট ছিল না। কিংবা থাকলেও তা কানাইঘাট থানা-পুলিশের কাছে ছিল না। কিন্তু পুলিশের সন্দেহ হয়েছে, তিনি অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার মতো অপরাধ করতে যাচ্ছিলেন। তাই তারা পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পেরেছিল। এটাই হলো ৫৪ ধারার কার্যক্ষমতা।
অপরাধ প্রতিরোধ কিংবা অপরাধীর বিচার নিশ্চিতে এই বিধান তৈরি হলেও এর অপব্যবহারের কারণে সমালোচনাও হয়েছে ব্যাপক। ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তারের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। ৯টি ক্ষেত্র দিয়ে এই ৫৪ ধারাকে বর্ণনা করা হয়েছিল। ক্ষেত্রগুলো হলো–
কোনো আমলযোগ্য অপরাধের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তি।
আইনসঙ্গত কারণ ব্যতীত যার নিকট ঘর ভাঙার যন্ত্রপাতি থাকে।
এই আইন অনুযায়ী বা সরকারি আদেশ দ্বারা যাকে অপরাধী ঘোষণা করা হয়েছে।
চোরাই বলে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে–এমন মালামাল যার কাছে আছে।
পুলিশ অফিসারের কাজে বাধাদানকারী ব্যক্তি অথবা যে আইনসঙ্গত হেফাজত হতে পালায় বা চেষ্টা করে।
বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হতে পলায়নকারী বলে যাকে যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্দেহ করা যেতে পারে।
বাংলাদেশে করা হলে অপরাধ হতো–এমন অপরাধ বাংলাদেশের বাইরে করা হলে।
কোনো মুক্তিপ্রাপ্ত আসামি, যে অত্র আইনের ৫৬৫(৩) ধারার নিয়ম লঙ্ঘন করে।
যাকে গ্রেপ্তারের জন্য অন্য কোনো পুলিশ অফিসারের কাছ থেকে অনুরোধ পাওয়া গেছে।
তবে ধারাটি প্রণয়নের ১২৭ বছর পর ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধনী) অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর মাধ্যমে এই আইনের ক্ষমতায় কিছুটা লাগাম টানে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যাতে, আগের ৯টি ক্ষেত্রের পরিবর্তে ১১টি ক্ষেত্র যুক্ত করা হয়েছে। আগের ৯টি ক্ষেত্রের মধ্যে প্রথমটি বাদে বাকি আটটি ক্ষেত্র অপরিবর্তিত রয়েছে। আমলযোগ্য অপরাধে সম্পৃক্ত থাকা কিংবা অভিযোগ বা তথ্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা–এই প্রথম ক্ষেত্রটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। আর নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে অপর একটি ক্ষেত্র।
সংশোধিত ৫৪ ধারায় বলা হয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত এবং পরোয়ানা ছাড়া পুলিশ অফিসার নিম্নোক্ত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবেন–
প্রথমত, পুলিশ অফিসারের উপস্থিতিতে আমলযোগ্য অপরাধ সংগঠনকারী যেকোনো ব্যক্তিকে; দ্বিতীয়ত, এমন যেকোনো ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে সাত বছরের কম অথবা সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় আমলযোগ্য অপরাধ সংগঠনের যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ করা হয় অথবা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় অথবা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ বিদ্যমান থাকে এবং নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হয়; যথা–
(১) এরূপ অভিযোগ, তথ্য বা সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ অফিসারের বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, ওই ব্যক্তি অপরাধটি করেছেন; এবং (২) পুলিশ অফিসারকে সন্তুষ্ট হতে হবে যে–(ক) আর কোনো অপরাধ করা থেকে ওই ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (খ) মামলার যথাযথ তদন্তের জন্য; অথবা (গ) অপরাধের সাক্ষ্য-প্রমাণ যেকোনো উপায়ে গোপন করা কিংবা প্রভাব বিস্তার করা থেকে ওই ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (ঘ) মামলার ঘটনাবলি সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিকে আদালত কিংবা পুলিশ অফিসারের কাছে ওই ঘটনাবলী প্রকাশ করা থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে প্ররোচনা, হুমকি বা প্রতিশ্রুতি প্রদান থেকে এরূপ ব্যক্তিকে প্রতিহত করার জন্য; অথবা (ঙ) ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার না করা হলে যখন প্রয়োজন হবে, তখন আদালতে উক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাবে না।
তৃতীয়ত, এমন যেকোনো ব্যক্তিকে, যার বিরুদ্ধে সাত বছরের অধিক কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ অথবা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ সংগঠনের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় এবং এমন তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ অফিসারের বিশ্বাস করার কারণ থাকে যে, ওই ব্যক্তি এমন অপরাধ করেছে।
অর্থাৎ, ৫৪ ধারার পরিধি বা কার্যকারিতা না কমলেও কিছু শর্ত দিয়ে এর অপব্যবহার রোধের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, পুলিশ যদি কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে আসে, তবে ওয়ারেন্ট দেখতে চাইলেও কোনো কাজ হবে না। তারা ওয়ারেন্ট ছাড়াই আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। তখন অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী?
আইনের সংশোধনীতে স্পষ্ট বলা আছে, যে পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করবেন, তার পরিষ্কার পরিচয় থাকতে হবে। তার ইউনিফর্মে নেমপ্লেট থাকতে হবে, পরিচয়পত্র থাকতে হবে। যে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তার চাহিদামাত্র পুলিশ কর্মকর্তার আইডি কার্ড দেখাতে হবে। এটা বাধ্যতামূলক। এরপর গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে যখন থানায় নিয়ে আসা হবে, যত দ্রুত সম্ভব তার পরিবার, বন্ধু, কিংবা আইনজীবীকে যোগাযোগ করে জানাতে হবে। এই কাজে কোনো অবস্থাতেই ১২ ঘণ্টার বেশি সময় নেওয়া যাবে না।
কারাদণ্ড। ছবি: চরচা
আইনজীবীদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই পুলিশ সদস্যের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে। এরপর নিজের অপরাধ সম্পর্কে জানতে চাইতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. হুমায়ুন কবির পল্লব চরচাকে বলেন, “৫৪ ধারায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করলে, তা করে সন্দেহের ভিত্তিতে। তাই পোশাকে থাকা পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত হতে হবে, তিনি কোন থানার পুলিশ সদস্য, তার নাম-পদবি জেনে প্রয়োজনে ওই থানায় ফোন করে মিলিয়ে নিতে হবে। সাদা পোশাকে গেলে তার পরিচয়পত্র যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্মক্ষেত্রেও নিশ্চিত হতে হবে। তারপর কোনো অপরাধে জড়িত থাকার জন্য তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তা জানতে হবে। নিজেদের পরিচয় এবং গ্রেপ্তারের কারণ না জানালে ওই পুলিশ সদস্য নিজেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করবেন।”