চরচা ডেস্ক

নতুন সন্তান পৃথিবীতে আসার পর একজন মায়ের জীবনে যে আনন্দঘন মুহূর্ত তৈরি হয়, তার সমান্তরালেই শুরু হয় এক নীরব ও কঠিন সংগ্রাম। অনেক নারীর কাছেই মাতৃত্বের শুরুর দিনগুলোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা। বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও চিকিৎসাগত একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, স্তন্যদান একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই একটু চেষ্টা করলেই যে কেউ এটি পারবেন।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময়ই এই সহজ-সরল ধারণার মতো হয় না।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করলেও, তাদের এক-চতুর্থাংশ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ, পর্যাপ্ত দুধ না হওয়ার ভয় এবং তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসকেরা মনে করতেন, প্রকৃতপক্ষে দুধ কম হওয়ার ঘটনা বিরল এবং তা অনধিক ৫ শতাংশ মায়ের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। ফলে কোনো মা দুধের ঘাটতির কথা বললে ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো থেকেও একই গৎবাঁধা পরামর্শ দেওয়া হতো, “শিশুকে বারবার স্তন্যপান করান অথবা ব্রেস্ট-পাম্প ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করুন।”
ভালো উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও পরামর্শটি যে কতটা অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্মম, তা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। বহু নারী দিন-রাত এক করে এই কঠোর নিয়ম মেনে চলার পরও দেখা যাচ্ছে শিশুর ওজন আশানুরূপ বাড়ছে না, যা পর্যাপ্ত দুধ না হওয়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ। অথচ এর সমাধান হিসেবে মায়েদের কেবল ‘আরো বেশি চেষ্টা’ করার উপদেশ দিয়ে এক ধরনের সামাজিক অপবাদ ও অপরাধবোধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দোষটি মায়ের চেষ্টার নয়। আর ত্রুটিটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার এবং নারীর শরীরের এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়ায়, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ল্যাকটোলজির অভাব
চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ এক অবিশ্বাস্য সুবিন্যস্ত শাখা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা ‘স্পেশালিজম’ রয়েছে। হার্টের জন্য কার্ডিওলজি, মস্তিষ্কের জন্য নিউরোলজি, পুরুষ যৌনাঙ্গের জন্য ইউরোলজি, এমনকি মনস্তত্ত্বের জন্য রয়েছে সাইকিয়াট্রি। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্তন্যগ্রন্থির চিকিৎসার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট খাত নেই।
বিজ্ঞান এতদিন শরীরে এই গ্রন্থির কার্যকারিতাকে চরমভাবে অবহেলা করেছে। এই ‘ল্যাকটোলজি’ বা স্তন্যদান বিজ্ঞানের অভাব আজ শিশু এবং মা উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছে।
প্রতি বছর বিশ্বে ১৩ কোটিরও বেশি নারী সন্তান জন্ম দেন। বর্তমানে জীবিত থাকা প্রায় ২০০ কোটি নারী ও মেয়ের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি জীবনে কখনো না কখনো মা হবেন। পরিসংখ্যান বলছে, স্তন্যপান করাতে গিয়ে প্রতি পাঁচজন মায়ের মধ্যে অন্তত দুজন কোনো না কোনো গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হন। কারও ক্ষেত্রে এটি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক, আবার কারও ক্ষেত্রে শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হওয়াই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই অবহেলার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিসংখ্যান দেখলে। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনটি বলছে, ৪০ মিলিয়নেরও বেশি চিকিৎসা-গবেষণা পত্রের আন্তর্জাতিক ডেটাবেজ ‘পাবমেড’-এ ‘লো মিল্ক সাপ্লাই’ বা ‘লো মিল্ক প্রোডাকশন’ লিখে অনুসন্ধান করলে মাত্র ১৪ হাজারটি গবেষণাপত্র পাওয়া যায়। এর বিপরীতে পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামান্য আকারে দেখা দেয়) তার ওপর রয়েছে ৩২ হাজারের বেশি গবেষণা।

এই বিশাল শূন্যতার কারণে চিকিৎসকেরা প্রায়শই নতুন মায়েদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ফলে হাসপাতাল ছাড়ার আগেই ইউরোপের মতো জায়গায় ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ নবজাতককে গুঁড়ো দুধ (ফরমুলা) দেওয়া শুরু হয়। অথচ ২০১৬ সালে চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সব শিশুকে যদি সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো যেত, তবে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৫ বছরের কম বয়সী ৮ লাখ ২৩ হাজার শিশুর অকালমৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই ব্যর্থতার স্থানটি এখন পূরণ করছেন ব্রেস্টফিডিং হেল্পলাইনের ল্যাকটেশন কনসালট্যান্টরা (যাদের কোনো মেডিকেল ডিগ্রি নেই), যারা সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে অনেক সময় কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই পরামর্শ দিতে বাধ্য হন।
সংখ্যাটি ৫ শতাংশ নয়, বরং ২০ শতাংশ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার শত শত নারীর ওপর পরিচালিত বুকের দুধ উৎপাদনের আধুনিক গবেষণাগুলো চিকিৎসকদের পুরনো ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। নতুন উপাত্ত ইঙ্গিত করে যে, যেসকল মায়েরা খুব কম দুধ উৎপাদন করেন, তাদের অনুপাত আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি–প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ।
গবেষকেরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন, এর কারণ মায়েরা কীভাবে স্তন্যপান করাচ্ছেন তার মধ্যে নয়, বরং লুকিয়ে আছে তাদের স্তন্যগ্রন্থির (ম্যামারি গ্ল্যান্ড) অনন্য কোষগুলোর গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির মানব দুগ্ধ উৎপাদন-বিষয়ক গবেষক ইয়ার্দেন গোলান মাওর ইকোনমিস্টকে বলেন, “গত দশ বছরে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও বেশি স্বীকৃত হয়েছে যে এই ঘটনাগুলোর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট জৈবিক কারণ রয়েছে। এবং বিষয়টি এমন নয় যে, আপনি যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না।”
ল্যাকটোসাইট ও ‘তরল বায়োপসি’
এই জৈবিক রহস্যের মূলে রয়েছে ‘ল্যাকটোসাইট’ নামক বিশেষ কোষ। স্তন্যগ্রন্থির এই কোষগুলো গর্ভাবস্থায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সন্তান প্রসবের প্রায় তিন দিন পর থেকে বুকের দুধ নিঃসরণ শুরু করে। অতীতে এই কোষগুলো নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত জটিল ছিল, কারণ এর জন্য স্তন্যদানকারী মায়ের স্তন থেকে টিস্যু বায়োপসি বা সুঁচ ফুটিয়ে কোষ সংগ্রহ করতে হতো।
তবে ২০১০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি আবিষ্কার এই গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারা দেখেন যে, মায়ের বুকের কোষ থেকে আসা ‘মাইক্রো-আরএনএ’ অণুগুলো বুকের দুধে প্রচুর পরিমাণে ভেসে বেড়ায়। এই অণুগুলো ল্যাকটোসাইটের কার্যকারিতা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য বহন করে। ফলে, এখন মায়ের বুকের দুধের নমুনাকেই ‘তরল বায়োপসি’ হিসেবে ব্যবহার করে ভেতরের কোষের অবস্থা জানা সম্ভব হচ্ছে।
এই গবেষণাই উন্মোচন করেছে যে, মূলত দুটি কারণে দুধের উৎপাদন ব্যাহত হয়–ল্যাকটোসাইটের সংখ্যার ঘাটতি এবং কোষগুলোর অদক্ষতা।
ত্রুটিপূর্ণ ল্যাকটোসাইট এবং WEE1 এনজাইম
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, সান্টা ক্রুজের বিজ্ঞানী লিন্ডসে হিঙ্ক ল্যাকটোসাইটের সংখ্যার ঘাটতি নিয়ে কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, ল্যাকটোসাইট বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করে। কিন্তু কিছু কোষ নতুন কোষ তৈরির পরিবর্তে নিজের ভেতরেই ডিএনএর একাধিক অনুলিপি জমা করে রাখে, যা পরে বেশি দুধ তৈরিতে সাহায্য করে।
এই দুই ধরনের কোষেরই আকস্মিক ডিএনএ মিউটেশনের কারণে কোষগুলো মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। মানবশরীরে কোষ-মেরামত প্রক্রিয়া থাকলেও তা সবসময় ঠিকঠাক কাজ করে না। ২০২৪ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় হিঙ্কের দল ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে, শরীরে ‘WEE1’ নামক একটি এনজাইমের স্বল্পতা থাকলে এই কোষ-মেরামত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কার্যকর ল্যাকটোসাইটের সংখ্যা কমে যায় এবং দুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি একটি প্রধান কারণ হতে পারে।
প্লাসেন্টার ভূমিকা এবং উগান্ডার গবেষণা
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির রেচেল ওয়াকার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মেকানিজম বা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। ল্যাকটোসাইটগুলোকে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে এবং স্তন্যগ্রন্থিকে দুধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করতে যে হরমোনগুলো নির্দেশ দেয়, সেগুলোর একটি বড় অংশ তৈরি হয় গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা থেকে। পশুর ওপর গবেষণায় প্লাসেন্টার ক্ষতির সাথে দুধের কম উৎপাদনের সংযোগ পাওয়া গেছে। গবেষক ওয়াকার এবং তার দল বর্তমানে উগান্ডার নতুন মায়েদের প্লাসেন্টা নিয়ে গবেষণা করছেন, যাতে দেখা যায় কোনো ইনফেকশন বা সংক্রমণ প্লাসেন্টার ক্ষতি করে দুধের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে কি না। এটি সফল হলে সন্তান প্রসবের মুহূর্তেই ল্যাকটেশনের ভবিষ্যৎ অনুমান করা সম্ভব হবে।

ত্রুটিপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ
ল্যাকটোসাইট থাকার পরও তারা কেন অদক্ষ হতে পারে, তার পেছনে রয়েছে স্তন্যগ্রন্থিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব। এটি সবসময় মায়ের খাদ্যাভ্যাসের জন্য হয় না; বরং জিনের মিউটেশন এর জন্য দায়ী। যেমন, কিছু নারীর শরীরে এমন একটি জিন মিউটেশন থাকে যা রক্ত থেকে বুকের দুধে জিঙ্ক (দস্তা) স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে দেয়। জিঙ্ক শুধু শিশুর পুষ্টিই নয়, স্তন্যগ্রন্থির বিকাশের জন্যও অপরিহার্য।
এছাড়া আরেকটি বড় শত্রু হলো ‘ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। ২০২২ সালে ওয়াকারের গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতা, প্রিটক্ল্যাম্পসিয়া (প্লাসেন্টার রোগ) এবং ডায়াবেটিসের মতো অটো-ইমিউন রোগের কারণে শরীরে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়, তা রক্তে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ও কার্বোহাইড্রেটকে স্তন্যগ্রন্থিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে ল্যাকটোসাইটগুলো দুধ তৈরির জ্বালানি পায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক মা-ই পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনে সংকটের মুখোমুখি হন–যা কোনো মায়ের ইচ্ছাশক্তির জোরে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
নতুন আশার আলো
বিজ্ঞানীরা এখন এই ত্রুটিগুলো দ্রুত সনাক্তকরণের চেষ্টা করছেন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে অস্ট্রেলীয় গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, হাতে ধরা যায় এমন ছোট একটি যন্ত্র বা প্রোব দিয়ে বুকের দুধে সোডিয়ামের মাত্রা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা সম্ভব। সাধারণত দুধ নিঃসরণ শুরু হলে স্তন্যগ্রন্থির ভেতরের কোষগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা বন্ধ হয়ে যায়, যা সোডিয়ামকে দুধে চুইয়ে পড়া থেকে আটকায়। কিন্তু ল্যাকটোসাইট ত্রুটিপূর্ণ হলে বা ম্যাসটাইটিস (স্তনপ্রদাহ) হলে দুধে অস্বাভাবিক উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম পাওয়া যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই ধরা পড়বে সমস্যাটি কোথায়।
স্তন্যদানের এই জটিল জীববিদ্যাকে সঠিকভাবে উন্মোচন করা গেলে তা নতুন মায়েদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মায়েরা ব্রেস্ট-পাম্পের সাথে নিজেদের দিনে আটবার বেঁধে রাখার যন্ত্রণাদায়ক ও প্রমাণহীন নিয়ম থেকে মুক্তি পাবেন। যেসব মায়েরা আজ পর্যাপ্ত দুধ হচ্ছে না বলে সমাজ ও নিজের কাঠগড়ায় অপরাধী বোধ করছেন, বিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে তারা ব্যর্থ নন; বরং তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানই। ল্যাকটোলজি যদি এই গতিতে এগিয়ে চলে, তবে খুব শীঘ্রই নারীরা মাতৃত্বের শুরুতেই সঠিক রোগনির্ণয় ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার অধিকার পাবেন এবং দূর হবে স্তন্যদানের নিয়ে হওয়া গ্লানি বা সামাজিক অপবাদ।

নতুন সন্তান পৃথিবীতে আসার পর একজন মায়ের জীবনে যে আনন্দঘন মুহূর্ত তৈরি হয়, তার সমান্তরালেই শুরু হয় এক নীরব ও কঠিন সংগ্রাম। অনেক নারীর কাছেই মাতৃত্বের শুরুর দিনগুলোর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর চেষ্টা। বিশ্বজুড়ে সামাজিক ও চিকিৎসাগত একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, স্তন্যদান একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তাই একটু চেষ্টা করলেই যে কেউ এটি পারবেন।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময়ই এই সহজ-সরল ধারণার মতো হয় না।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করলেও, তাদের এক-চতুর্থাংশ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ, পর্যাপ্ত দুধ না হওয়ার ভয় এবং তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসকেরা মনে করতেন, প্রকৃতপক্ষে দুধ কম হওয়ার ঘটনা বিরল এবং তা অনধিক ৫ শতাংশ মায়ের ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। ফলে কোনো মা দুধের ঘাটতির কথা বললে ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশের স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো থেকেও একই গৎবাঁধা পরামর্শ দেওয়া হতো, “শিশুকে বারবার স্তন্যপান করান অথবা ব্রেস্ট-পাম্প ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করুন।”
ভালো উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও পরামর্শটি যে কতটা অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্মম, তা এখন বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হচ্ছে। বহু নারী দিন-রাত এক করে এই কঠোর নিয়ম মেনে চলার পরও দেখা যাচ্ছে শিশুর ওজন আশানুরূপ বাড়ছে না, যা পর্যাপ্ত দুধ না হওয়ার একটি স্পষ্ট লক্ষণ। অথচ এর সমাধান হিসেবে মায়েদের কেবল ‘আরো বেশি চেষ্টা’ করার উপদেশ দিয়ে এক ধরনের সামাজিক অপবাদ ও অপরাধবোধের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, দোষটি মায়ের চেষ্টার নয়। আর ত্রুটিটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা দরকার এবং নারীর শরীরের এমন এক জৈবিক প্রক্রিয়ায়, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
ল্যাকটোলজির অভাব
চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ এক অবিশ্বাস্য সুবিন্যস্ত শাখা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অঙ্গের জন্য আলাদা ‘স্পেশালিজম’ রয়েছে। হার্টের জন্য কার্ডিওলজি, মস্তিষ্কের জন্য নিউরোলজি, পুরুষ যৌনাঙ্গের জন্য ইউরোলজি, এমনকি মনস্তত্ত্বের জন্য রয়েছে সাইকিয়াট্রি। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, স্তন্যগ্রন্থির চিকিৎসার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট খাত নেই।
বিজ্ঞান এতদিন শরীরে এই গ্রন্থির কার্যকারিতাকে চরমভাবে অবহেলা করেছে। এই ‘ল্যাকটোলজি’ বা স্তন্যদান বিজ্ঞানের অভাব আজ শিশু এবং মা উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছে।
প্রতি বছর বিশ্বে ১৩ কোটিরও বেশি নারী সন্তান জন্ম দেন। বর্তমানে জীবিত থাকা প্রায় ২০০ কোটি নারী ও মেয়ের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি জীবনে কখনো না কখনো মা হবেন। পরিসংখ্যান বলছে, স্তন্যপান করাতে গিয়ে প্রতি পাঁচজন মায়ের মধ্যে অন্তত দুজন কোনো না কোনো গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হন। কারও ক্ষেত্রে এটি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক, আবার কারও ক্ষেত্রে শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার মতো পর্যাপ্ত দুধ তৈরি হওয়াই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এই অবহেলার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিসংখ্যান দেখলে। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনটি বলছে, ৪০ মিলিয়নেরও বেশি চিকিৎসা-গবেষণা পত্রের আন্তর্জাতিক ডেটাবেজ ‘পাবমেড’-এ ‘লো মিল্ক সাপ্লাই’ বা ‘লো মিল্ক প্রোডাকশন’ লিখে অনুসন্ধান করলে মাত্র ১৪ হাজারটি গবেষণাপত্র পাওয়া যায়। এর বিপরীতে পুরুষদের ইরেকটাইল ডিসফাংশন (যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামান্য আকারে দেখা দেয়) তার ওপর রয়েছে ৩২ হাজারের বেশি গবেষণা।

এই বিশাল শূন্যতার কারণে চিকিৎসকেরা প্রায়শই নতুন মায়েদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেন না। ফলে হাসপাতাল ছাড়ার আগেই ইউরোপের মতো জায়গায় ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ নবজাতককে গুঁড়ো দুধ (ফরমুলা) দেওয়া শুরু হয়। অথচ ২০১৬ সালে চিকিৎসা সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সব শিশুকে যদি সঠিকভাবে বুকের দুধ খাওয়ানো যেত, তবে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৫ বছরের কম বয়সী ৮ লাখ ২৩ হাজার শিশুর অকালমৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই ব্যর্থতার স্থানটি এখন পূরণ করছেন ব্রেস্টফিডিং হেল্পলাইনের ল্যাকটেশন কনসালট্যান্টরা (যাদের কোনো মেডিকেল ডিগ্রি নেই), যারা সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে অনেক সময় কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই পরামর্শ দিতে বাধ্য হন।
সংখ্যাটি ৫ শতাংশ নয়, বরং ২০ শতাংশ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার শত শত নারীর ওপর পরিচালিত বুকের দুধ উৎপাদনের আধুনিক গবেষণাগুলো চিকিৎসকদের পুরনো ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। নতুন উপাত্ত ইঙ্গিত করে যে, যেসকল মায়েরা খুব কম দুধ উৎপাদন করেন, তাদের অনুপাত আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি–প্রায় ১০ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ।
গবেষকেরা এখন বুঝতে শুরু করেছেন, এর কারণ মায়েরা কীভাবে স্তন্যপান করাচ্ছেন তার মধ্যে নয়, বরং লুকিয়ে আছে তাদের স্তন্যগ্রন্থির (ম্যামারি গ্ল্যান্ড) অনন্য কোষগুলোর গঠন ও কার্যকারিতার মধ্যে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির মানব দুগ্ধ উৎপাদন-বিষয়ক গবেষক ইয়ার্দেন গোলান মাওর ইকোনমিস্টকে বলেন, “গত দশ বছরে এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে আরও বেশি স্বীকৃত হয়েছে যে এই ঘটনাগুলোর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট জৈবিক কারণ রয়েছে। এবং বিষয়টি এমন নয় যে, আপনি যথেষ্ট চেষ্টা করছেন না।”
ল্যাকটোসাইট ও ‘তরল বায়োপসি’
এই জৈবিক রহস্যের মূলে রয়েছে ‘ল্যাকটোসাইট’ নামক বিশেষ কোষ। স্তন্যগ্রন্থির এই কোষগুলো গর্ভাবস্থায় দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সন্তান প্রসবের প্রায় তিন দিন পর থেকে বুকের দুধ নিঃসরণ শুরু করে। অতীতে এই কোষগুলো নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত জটিল ছিল, কারণ এর জন্য স্তন্যদানকারী মায়ের স্তন থেকে টিস্যু বায়োপসি বা সুঁচ ফুটিয়ে কোষ সংগ্রহ করতে হতো।
তবে ২০১০ সালে বিজ্ঞানীদের একটি আবিষ্কার এই গবেষণার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তারা দেখেন যে, মায়ের বুকের কোষ থেকে আসা ‘মাইক্রো-আরএনএ’ অণুগুলো বুকের দুধে প্রচুর পরিমাণে ভেসে বেড়ায়। এই অণুগুলো ল্যাকটোসাইটের কার্যকারিতা সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য বহন করে। ফলে, এখন মায়ের বুকের দুধের নমুনাকেই ‘তরল বায়োপসি’ হিসেবে ব্যবহার করে ভেতরের কোষের অবস্থা জানা সম্ভব হচ্ছে।
এই গবেষণাই উন্মোচন করেছে যে, মূলত দুটি কারণে দুধের উৎপাদন ব্যাহত হয়–ল্যাকটোসাইটের সংখ্যার ঘাটতি এবং কোষগুলোর অদক্ষতা।
ত্রুটিপূর্ণ ল্যাকটোসাইট এবং WEE1 এনজাইম
ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, সান্টা ক্রুজের বিজ্ঞানী লিন্ডসে হিঙ্ক ল্যাকটোসাইটের সংখ্যার ঘাটতি নিয়ে কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন। গর্ভাবস্থায় স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, ল্যাকটোসাইট বিভাজিত হয়ে নতুন কোষ তৈরি করে। কিন্তু কিছু কোষ নতুন কোষ তৈরির পরিবর্তে নিজের ভেতরেই ডিএনএর একাধিক অনুলিপি জমা করে রাখে, যা পরে বেশি দুধ তৈরিতে সাহায্য করে।
এই দুই ধরনের কোষেরই আকস্মিক ডিএনএ মিউটেশনের কারণে কোষগুলো মারা যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। মানবশরীরে কোষ-মেরামত প্রক্রিয়া থাকলেও তা সবসময় ঠিকঠাক কাজ করে না। ২০২৪ সালে ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় হিঙ্কের দল ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে, শরীরে ‘WEE1’ নামক একটি এনজাইমের স্বল্পতা থাকলে এই কোষ-মেরামত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কার্যকর ল্যাকটোসাইটের সংখ্যা কমে যায় এবং দুধের তীব্র ঘাটতি দেখা দেয়। মানুষের ক্ষেত্রেও এটি একটি প্রধান কারণ হতে পারে।
প্লাসেন্টার ভূমিকা এবং উগান্ডার গবেষণা
পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির রেচেল ওয়াকার সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মেকানিজম বা প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছেন। ল্যাকটোসাইটগুলোকে সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে এবং স্তন্যগ্রন্থিকে দুধ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করতে যে হরমোনগুলো নির্দেশ দেয়, সেগুলোর একটি বড় অংশ তৈরি হয় গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা থেকে। পশুর ওপর গবেষণায় প্লাসেন্টার ক্ষতির সাথে দুধের কম উৎপাদনের সংযোগ পাওয়া গেছে। গবেষক ওয়াকার এবং তার দল বর্তমানে উগান্ডার নতুন মায়েদের প্লাসেন্টা নিয়ে গবেষণা করছেন, যাতে দেখা যায় কোনো ইনফেকশন বা সংক্রমণ প্লাসেন্টার ক্ষতি করে দুধের উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে কি না। এটি সফল হলে সন্তান প্রসবের মুহূর্তেই ল্যাকটেশনের ভবিষ্যৎ অনুমান করা সম্ভব হবে।

ত্রুটিপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ
ল্যাকটোসাইট থাকার পরও তারা কেন অদক্ষ হতে পারে, তার পেছনে রয়েছে স্তন্যগ্রন্থিতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব। এটি সবসময় মায়ের খাদ্যাভ্যাসের জন্য হয় না; বরং জিনের মিউটেশন এর জন্য দায়ী। যেমন, কিছু নারীর শরীরে এমন একটি জিন মিউটেশন থাকে যা রক্ত থেকে বুকের দুধে জিঙ্ক (দস্তা) স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে দেয়। জিঙ্ক শুধু শিশুর পুষ্টিই নয়, স্তন্যগ্রন্থির বিকাশের জন্যও অপরিহার্য।
এছাড়া আরেকটি বড় শত্রু হলো ‘ইনফ্ল্যামেশন’ বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ। ২০২২ সালে ওয়াকারের গবেষণায় দেখা গেছে, স্থূলতা, প্রিটক্ল্যাম্পসিয়া (প্লাসেন্টার রোগ) এবং ডায়াবেটিসের মতো অটো-ইমিউন রোগের কারণে শরীরে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়, তা রক্তে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড ও কার্বোহাইড্রেটকে স্তন্যগ্রন্থিতে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে ল্যাকটোসাইটগুলো দুধ তৈরির জ্বালানি পায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক মা-ই পর্যাপ্ত দুধ উৎপাদনে সংকটের মুখোমুখি হন–যা কোনো মায়ের ইচ্ছাশক্তির জোরে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
নতুন আশার আলো
বিজ্ঞানীরা এখন এই ত্রুটিগুলো দ্রুত সনাক্তকরণের চেষ্টা করছেন। ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে অস্ট্রেলীয় গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, হাতে ধরা যায় এমন ছোট একটি যন্ত্র বা প্রোব দিয়ে বুকের দুধে সোডিয়ামের মাত্রা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা সম্ভব। সাধারণত দুধ নিঃসরণ শুরু হলে স্তন্যগ্রন্থির ভেতরের কোষগুলোর মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা বন্ধ হয়ে যায়, যা সোডিয়ামকে দুধে চুইয়ে পড়া থেকে আটকায়। কিন্তু ল্যাকটোসাইট ত্রুটিপূর্ণ হলে বা ম্যাসটাইটিস (স্তনপ্রদাহ) হলে দুধে অস্বাভাবিক উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম পাওয়া যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই ধরা পড়বে সমস্যাটি কোথায়।
স্তন্যদানের এই জটিল জীববিদ্যাকে সঠিকভাবে উন্মোচন করা গেলে তা নতুন মায়েদের জন্য এক আশীর্বাদ হয়ে উঠবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে মায়েরা ব্রেস্ট-পাম্পের সাথে নিজেদের দিনে আটবার বেঁধে রাখার যন্ত্রণাদায়ক ও প্রমাণহীন নিয়ম থেকে মুক্তি পাবেন। যেসব মায়েরা আজ পর্যাপ্ত দুধ হচ্ছে না বলে সমাজ ও নিজের কাঠগড়ায় অপরাধী বোধ করছেন, বিজ্ঞান প্রমাণ করছে যে তারা ব্যর্থ নন; বরং তাদের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে চিকিৎসা বিজ্ঞানই। ল্যাকটোলজি যদি এই গতিতে এগিয়ে চলে, তবে খুব শীঘ্রই নারীরা মাতৃত্বের শুরুতেই সঠিক রোগনির্ণয় ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার অধিকার পাবেন এবং দূর হবে স্তন্যদানের নিয়ে হওয়া গ্লানি বা সামাজিক অপবাদ।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ মা বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করলেও, তাদের এক-চতুর্থাংশ মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ, পর্যাপ্ত দুধ না হওয়ার ভয় এবং তীব্র শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি।