Advertisement Banner

আমেরিকাতেও ছড়াচ্ছে হাম, কিন্তু কেন?

হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং নিয়ন্ত্রণে না আনলে মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে প্রথম টিকা নেওয়ার আগের শিশুদের জন্য এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
আমেরিকাতেও ছড়াচ্ছে হাম, কিন্তু কেন?
টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে হামের প্রার্দুভাব বাড়ছে। ছবি: রয়টার্স

আমেরিকা মহাদেশে ২০১৬ সালে হাম নির্মূল একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল। জাতিসংঘের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো এলাকায় এক বছর ধরে রোগটির স্থায়ী সংক্রমণ না থাকলে তাকে নির্মূল ধরা হয় এবং সে কৃতিত্ব অর্জন করেছিল এই অঞ্চল।

তবে সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০১৭ সালে আংশিক টিকা দেওয়া ভেনেজুয়েলায় আবারও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। অতিমুদ্রাস্ফীতি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষজন ব্রাজিলে হাম নিয়ে যায়। এরপর দরিদ্র আমাজন অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হাম এবং পরে জনবহুল সাও পাওলোতেও পৌঁছে যায়।

ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই ঘটনার তিন বছর পর কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হলে লকডাউন ও মাস্ক ব্যবহারের কারণে সংক্রমণ কিছুটা কমে আসে। তবে ততদিনে হাম কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষকে সংক্রমিত করে এবং শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে–যাদের বেশিরভাগই শিশু ও নবজাতক। এটি ছিল গত ২২ বছরের মধ্যে আমেরিকায় হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ সময়।

বর্তমান প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশনের (পিএএইচও) তথ্যমতে, আমেরিকা অঞ্চলে ১৮ হাজার ৩৫২টি নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য পাওয়া গেছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৫০৩। ইতোমধ্যে অন্তত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।

শিশু। ছবি: চরচা
শিশু। ছবি: চরচা

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সংক্রমণের বড় অংশ মেক্সিকো ও গুয়াতেমালায় হলেও বলিভিয়া ও পেরুতেও বিস্তার ঘটেছে। যদিও টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ কিছুটা কমেছে। তবে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, হাম অত্যন্ত সংক্রামক এবং নিয়ন্ত্রণে না আনলে মারাত্মক হতে পারে। বিশেষ করে প্রথম টিকা নেওয়ার আগের শিশুদের জন্য এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ক্ষতি, অন্ধত্ব কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।

হাম এমন একটি রোগ, যা মোকাবিলায় কোনো দেশই এক মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক হতে পারে না।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সর্বশেষ এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত হয়, ২০২৪ সালের অক্টোবরে কানাডার একটি বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে। সেখানে মেনোনাইট সম্প্রদায়ের লোকজন অংশ নেন, যাদের মধ্যে অনেকেই টিকা এড়িয়ে চলেন। থাইল্যান্ড থেকে আগত এক অতিথির মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। পরে সংক্রমিত ব্যক্তিরা নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলে গত বছরের শুরুতে তা টেক্সাস ও মেক্সিকোর মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে চলমান প্রাদুর্ভাব মূলত মেনোনাইট সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও, মেক্সিকোসহ আমেরিকার তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতার কারণে সাধারণ জনগণ সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।

দ্য ইকোনমিস্টের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে মেক্সিকোর প্রায় ৯৬ শতাংশ শিশু হাম টিকার দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছিল, যা ‘হার্ড ইমিউনিটি’ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু ২০২৪ সালে সেই হার নেমে আসে ৭০ শতাংশের নিচে। একই সময়ে লাতিন আমেরিকার আরও অনেক দেশেও টিকাদানের হার কমেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেক্সিকো সরকার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দিচ্ছেন, পাশাপাশি দোকান ও বাসস্টেশনে অস্থায়ী টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

পিএএইচও-এর কর্মকর্তা জন অ্যান্ড্রাসের মতে, আপাতত সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায় অতিক্রম করেছে বলে মনে হচ্ছে, তবে সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

আগামী ১১ জুন মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার যৌথ আয়োজনে ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। আয়োজক সংস্থা ফিফা জানিয়েছে, প্রায় ৫৫ লাখ দর্শক এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবেন। এ প্রেক্ষাপটে আয়োজক দেশগুলোকে হাম শনাক্তে নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন, যাতে নতুন সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মেক্সিকোতে সংক্রমণ কমার ইঙ্গিত মিললেও গুয়াতেমালায় তা এখনো বাড়ছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৩৯৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং অন্তত চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের শেষদিকে ২ হাজারের বেশি মানুষের অংশগ্রহণে একটি ধর্মীয় সমাবেশ থেকে এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত হয়। ওই অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এসেছিলেন। সামনে আরও বড় ধর্মীয় সমাবেশের পরিকল্পনা থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় টিকা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে কর্মশালা আয়োজন করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমেরিকা অঞ্চলে আবারও হাম ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং টিকাদান কর্মসূচি থেকে জনবল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশু টিকাদানের বাজেট কমানো হয়েছে। ধনী দেশগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভ্রান্ত তথ্যের কারণে টিকা নিয়ে অনীহাও বেড়েছে। কানাডায় গত এক দশকে শিশুদের টিকাদানের হার ৮৬ শতাংশ থেকে কমে ৭৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশেষেজ্ঞরা বলেন, একদিকে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে এমন অঞ্চল থেকে হাম ছড়াচ্ছে যেখানে এখনো এই রোগের প্রার্দুভাব বেশি। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ টিকাদানের হার যত কমে, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ততই বাড়ে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এক সময় আমেরিকা মহাদেশে টিকাদানের হার বেশি থাকায় মেনোনাইটদের মতো গোষ্ঠীগুলোও ‘হার্ড ইমিউনিটি’র সুরক্ষা পেত। কিন্তু সামগ্রিক হার কমে যাওয়ায় কম টিকা পাওয়া গোষ্ঠীগুলো এখন নিজেরা যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি অন্যদেরও বিপদে ফেলছে।

পরিস্থিতিতে করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রাদুর্ভাব চলাকালে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং বা আক্রান্তদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা সংক্রমণ বিস্তার ঠেকাতে কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে টিকাদান অবকাঠামো আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করেন প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশনের কর্মকর্তা ড্যানিয়েল সালাস।

বর্তমানে এই সংস্থার আওতাধীন ৩৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৯টিতে এমন ইলেকট্রনিক টিকাদান নিবন্ধন ব্যবস্থা রয়েছে, যা শিশুদের টিকার সময় হলে অভিভাবকদের সতর্ক করতে পারে। সেই সঙ্গে সংবেদনশীল ও ধর্মভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে টিকাদান প্রচার আরও কার্যকর হতে পারে বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এ ক্ষেত্রে উরুগুয়ের উদাহরণ দেওয়া যায়। এটি লাতিন আমেরিকার প্রথম দেশ, যেখানে টিকাদান নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হয়। দেশটিতে শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগ মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কখনও দুর্বল হয়নি বলে উল্লেখ করেন জন অ্যান্ড্রাস।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের কঠোর নীতির কারণে টিকাদানের হার দ্রুত কমে গেছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দেশটিতে বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

জন অ্যান্ড্রাসের ভাষ্য, “হাম এমন একটি রোগ, যা মোকাবিলায় কোনো দেশই এক মুহূর্তের জন্যও অসতর্ক হতে পারে না।”

সম্পর্কিত