পর্ব-১
সাইরুল ইসলাম

ঘটনাটা নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৫ সালের আগস্টে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তখন আমেরিকা সফর করেন। এমনকি সেখানে গিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখাও করেন তিনি। আলোচনা কিন্তু এটা নিয়ে নয়। সে সময় আসলে রুশ প্রেসিডেন্টের এক গোপন ব্যাপার নিয়ে পুরনো এক বিতর্ক নতুন করে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে।
প্রশ্নটা হলো–ট্রাম্পের সঙ্গে কি ‘আসল পুতিন’ দেখা করেছেন, নাকি তার মতো দেখতে অন্য কাউকে পাঠিয়েছিলেন তিনি? সেই সফরের বেশ কয়েকটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে পশ্চিমা ও ইউক্রেনের কিয়েভ পোস্টসহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, এটা কোনোভাবেই পুতিন হতে পারেন না। কেননা, পুতিন এভাবে হাঁটেনই না। এমনকি তার অবয়বও কিছুটা ফোলা ছিল বলে দাবি করা হয় এসব প্রতিবেদনে।
এমন আলাপ প্রতিবছরই ওঠে। আর তখনই আলোচনায় আসে ‘বডি ডাবল’ বা ‘ডুপ্লিকেট’ টার্মগুলো। সহজ এবং পরিচিত এই টার্মের মানে আসলে কী? এই বডি ডাবল বানাতে কতটা জটিল পথে হাঁটতে হয়? এ জন্য আলাদা কী প্রশিক্ষণ লাগে?
বডি ডাবল কী?
বিভিন্ন গবেষণামূলক জার্নাল থেকে জানা যায়, বডি ডাবল শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো–‘দেহের প্রতিরূপ’। এটি এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি শারীরিক গঠন, উচ্চতা, মুখাবয়ব এবং চলন-বলনে অন্য কোনো ব্যক্তির (সাধারণত কোনো বিখ্যাত বা প্রভাবশালী ব্যক্তি) সঙ্গে হুবহু মিল রাখেন।
বডি ডাবলের ধারণাটি মূলত চলচ্চিত্র জগত এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত।
সিনেমা বা নাটকের ক্ষেত্রে যখন মূল অভিনেতা বা অভিনেত্রী কোনো দৃশ্য করতে পারেন না, বা করতে চান না। তখন বডি ডাবল ব্যবহার করা হয়। এর কয়েকটি ধরন রয়েছে। যখন কোনো বিপজ্জনক দৃশ্য (যেমন–আগুন থেকে লাফ দেওয়া বা গাড়ি দুর্ঘটনা) চিত্রায়িত করতে হয়, তখন মূল অভিনেতার পরিবর্তে দক্ষ স্টান্টম্যানকে ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া যদি কোনো দৃশ্যে নগ্নতার প্রয়োজন হয় এবং মূল শিল্পী তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তবে তার পরিবর্তে বডি ডাবল ব্যবহার করা হয়। লাইটিং বা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করার সময় মূল অভিনেতাকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না; তার বদলে একই উচ্চতার একজন বডি ডাবল সেখানে দাঁড়ানো থাকেন।
রাজনীতিতে বডি ডাবল
রাজনীতির ময়দানে বডি ডাবলকে প্রায়ই ‘পলিটিক্যাল ডেকয়’ বলা হয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এর পেছনে আসলে কয়েকটি কারণ রয়েছে। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনসভা বা সফরের সময় মূল নেতার জীবন বাঁচাতে বডি ডাবলকে সামনে পাঠানো হয়। ঘাতকরা যেন বুঝতে না পারে–আসল ব্যক্তি কোনটি। শত্রুপক্ষ বা গোয়েন্দা সংস্থাকে বিভ্রান্ত করতে একই সময়ে দুটি ভিন্ন জায়গায় নেতার উপস্থিতি দেখানো হয়।
এ ছাড়া যদি কোনো নেতা গুরুতর অসুস্থ থাকেন, তবে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তার ডুপ্লিকেটকে দূর থেকে জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হয়।

বডি ডাবল কীভাবে বানানো হয়?
কাউকে বডি ডাবল হিসেবে গড়ে তোলা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এ জন্য প্রথমে এমন কাউকে খুঁজে বের করা হয়, যার হাড়ের গঠন, উচ্চতা এবং গায়ের রং মূল ব্যক্তির কাছাকাছি। সামান্য অমিল থাকলে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নাক, চিবুক বা কানের গঠন পরিবর্তন করা হয়।
এরপর মূল ব্যক্তি কীভাবে হাসেন, কীভাবে হাত নাড়েন বা কথা বলার সময় কোন শব্দে জোর দেন–এগুলো বডি ডাবলকে আয়ত্ত করতে হয়। এমনকি হাঁটার সময় পায়ের কদম কতটুকু ফেলবেন, সেটিও কঠোরভাবে অনুশীলন করা হয়। নির্মাতা অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় এমন দৃশ্য দেখানো হয় বেশ কয়েকবার। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী আরেকজনের হয়ে জেল খাটেন। সে জন্য তিনি সেই ব্যক্তির মতোই অঙ্গভঙ্গি আয়ত্ব করেন।
এর বাইরে উন্নত সিলিকন মাস্ক বা মেকআপ ব্যবহার করে চেহারার সূক্ষ্ম রেখাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। বর্তমানে বেশ কিছু হলিউড ও বলিউডের সিনেমায় এমন মেকআপ দেখা যায়। এমনকি প্রস্থেটিক আর্টের এই কাজের জন্য বিশেষ মেক-আপ আর্টিস্টও নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে সিনেমার ক্ষেত্রে এটি সহজ হলেও বাস্তবে বেশ জটিল। নির্মাতা ল্যারি চার্লসের ‘দ্য ডিকটেটর’ সিনেমায় রাজনীতি ও সিনেমায় বডি ডাবলের এক সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাতে প্রধান চরিত্রকে মেরে ফেলার পর দেখা যায়, এটা আসলে তার ডুপ্লিকেট। এমনকি আরেকটি ডুপ্লিকেট সরকারপ্রধান অংশ নেন আন্তর্জাতিক এক সভায়। তাতে হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয় বডি ডাবলের কার্যক্রম।
রাজনীতিতে বডি ডাবলের জন্য প্রথমেই এমন একজনকে খুঁজে বের করা হয় যার উচ্চতা, শরীরের গঠন এবং চেহারার হাড়ের কাঠামো নেতার সাথে অনেকটা মিলে যায়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই কাজটি করে।
এখানে শুধু চেহারা মিললেই হয় না, নেতার হাঁটার স্টাইল, হাত নাড়ানোর ধরন এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গিও ডাবলের মধ্যে থাকতে হয়। জনসমক্ষে কথা বলতে হতে পারে–এমন ক্ষেত্রে ডাবলকে নেতার কথা বলার টোন এবং আঞ্চলিকতা রপ্ত করতে হয়।
সিনেমাটোগ্রাফিতে মেকআপ দিয়ে কাজ চললেও বাস্তবে দীর্ঘক্ষণ মানুষের সামনে থাকার জন্য স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এ কারণে নাক, কান বা চিবুকের আকৃতি হুবহু মেলাতে অনেক সময় ছোটখাটো প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। নেতার শরীরে দৃশ্যমান কোনো তিল, আঁচিল বা ক্ষতচিহ্ন থাকলে তা লেজার বা ট্যাটু দিয়ে ডাবলের শরীরে হুবহু ফুটিয়ে তোলা হয়।
এ ছাড়া ডাবলকে কয়েক মাস ধরে নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাকে নেতার জীবনের খুঁটিনাটি, ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম এবং রাজনৈতিক আদর্শ মুখস্থ করানো হয়। নেতার সিগনেচার বা স্বাক্ষর নকল করার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় অনেক সময়। পাবলিক ইভেন্টে কীভাবে হাসতে হবে বা করমর্দন করতে হবে, তার জন্য পেশাদার কোচের সাহায্য নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক নেতাদের পোশাক সাধারণত খুব নির্দিষ্ট ধরনের হয়। নেতার দর্জিকেই ডাবলের পোশাক বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, যাতে সেলাই ও কাপড়ের মান একই থাকে। নেতা যে ব্র্যান্ডের এবং যে পাওয়ারের চশমা পরেন, ডাবলকেও ঠিক তাই দেওয়া হয়। এমনকি সুগন্ধি বা পারফিউমও একই ব্যবহার করা হয়, যাতে ঘ্রাণ থেকেও কেউ সন্দেহ না করে।
ইতিহাসে বিখ্যাত কিছু বডি ডাবল
জোসেফ স্তালিন: বলা হয় সোভিয়েত ‘একনায়ক’ স্তালিনের বেশ কয়েকজন বডি ডাবল ছিল। তাদের মধ্যে ফেলিক্স দাদায়েভ অন্যতম, যিনি ১৯৪০-এর দশকে স্তালিনের বদলে বহু অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সাদ্দাম হোসেন: ইরাকের এই নেতার একাধিক বডি ডাবল থাকার কথা শোনা যায়। তার বড় ছেলে উদয় হোসেনের একজন বডি ডাবল ছিলেন লতিফ ইয়াহইয়া, যিনি পরবর্তীকালে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছিলেন।
অ্যাডলফ হিটলার: ঐতিহাসিকদের মতে, হিটলারের নিরাপত্তায় ‘গুস্তাভ ওহেলার’ নামক এক ব্যক্তি বডি ডাবল হিসেবে কাজ করতেন।

শনাক্ত করার উপায়
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বডি ডাবল শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি জিনিস দেখেন:
কান: মানুষের কান কখনো পরিবর্তন হয় না। প্লাস্টিক সার্জারিতেও কানের ভেতরের তরুণাস্থির গঠন হুবহু নকল করা কঠিন।
চোখের আইরিশ: প্রতিটি মানুষের চোখের আইরিশ বা মণি আলাদা।
কণ্ঠস্বর: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে কণ্ঠস্বরের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে আসল-নকল চেনা সম্ভব।
সহজ কথায়, বডি ডাবল হলো একটি ‘জীবন্ত ঢাল’ বা ‘ছায়া’, যা মূল ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করতে বা জনমানসে তার নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়।
একটি সফল বডি ডাবল তৈরি করা কেবল একজন মানুষের ছায়া তৈরি করা নয়, বরং এটি প্রযুক্তি ও নিপুণ পরিকল্পনার সমন্বয়। দর্শকরা যখন মূল অভিনেতা এবং ডাবলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না, তখনই সেই বডি ডাবল তৈরির প্রক্রিয়াটি সার্থক হয়।
একজন বডি ডাবলের জীবন অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তায় মোড়ানো থাকে। তাকে বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাকে একটি ছায়া জীবনের মধ্যে কাটাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুল হলে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি বা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঘটনাটা নতুন করে আলোচনায় আসে ২০২৫ সালের আগস্টে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তখন আমেরিকা সফর করেন। এমনকি সেখানে গিয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখাও করেন তিনি। আলোচনা কিন্তু এটা নিয়ে নয়। সে সময় আসলে রুশ প্রেসিডেন্টের এক গোপন ব্যাপার নিয়ে পুরনো এক বিতর্ক নতুন করে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে।
প্রশ্নটা হলো–ট্রাম্পের সঙ্গে কি ‘আসল পুতিন’ দেখা করেছেন, নাকি তার মতো দেখতে অন্য কাউকে পাঠিয়েছিলেন তিনি? সেই সফরের বেশ কয়েকটি ভিডিও বিশ্লেষণ করে পশ্চিমা ও ইউক্রেনের কিয়েভ পোস্টসহ বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করে, এটা কোনোভাবেই পুতিন হতে পারেন না। কেননা, পুতিন এভাবে হাঁটেনই না। এমনকি তার অবয়বও কিছুটা ফোলা ছিল বলে দাবি করা হয় এসব প্রতিবেদনে।
এমন আলাপ প্রতিবছরই ওঠে। আর তখনই আলোচনায় আসে ‘বডি ডাবল’ বা ‘ডুপ্লিকেট’ টার্মগুলো। সহজ এবং পরিচিত এই টার্মের মানে আসলে কী? এই বডি ডাবল বানাতে কতটা জটিল পথে হাঁটতে হয়? এ জন্য আলাদা কী প্রশিক্ষণ লাগে?
বডি ডাবল কী?
বিভিন্ন গবেষণামূলক জার্নাল থেকে জানা যায়, বডি ডাবল শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো–‘দেহের প্রতিরূপ’। এটি এমন একজন ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি শারীরিক গঠন, উচ্চতা, মুখাবয়ব এবং চলন-বলনে অন্য কোনো ব্যক্তির (সাধারণত কোনো বিখ্যাত বা প্রভাবশালী ব্যক্তি) সঙ্গে হুবহু মিল রাখেন।
বডি ডাবলের ধারণাটি মূলত চলচ্চিত্র জগত এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত।
সিনেমা বা নাটকের ক্ষেত্রে যখন মূল অভিনেতা বা অভিনেত্রী কোনো দৃশ্য করতে পারেন না, বা করতে চান না। তখন বডি ডাবল ব্যবহার করা হয়। এর কয়েকটি ধরন রয়েছে। যখন কোনো বিপজ্জনক দৃশ্য (যেমন–আগুন থেকে লাফ দেওয়া বা গাড়ি দুর্ঘটনা) চিত্রায়িত করতে হয়, তখন মূল অভিনেতার পরিবর্তে দক্ষ স্টান্টম্যানকে ব্যবহার করা হয়।
এ ছাড়া যদি কোনো দৃশ্যে নগ্নতার প্রয়োজন হয় এবং মূল শিল্পী তাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করেন, তবে তার পরিবর্তে বডি ডাবল ব্যবহার করা হয়। লাইটিং বা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করার সময় মূল অভিনেতাকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না; তার বদলে একই উচ্চতার একজন বডি ডাবল সেখানে দাঁড়ানো থাকেন।
রাজনীতিতে বডি ডাবল
রাজনীতির ময়দানে বডি ডাবলকে প্রায়ই ‘পলিটিক্যাল ডেকয়’ বলা হয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়। এর পেছনে আসলে কয়েকটি কারণ রয়েছে। কোনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জনসভা বা সফরের সময় মূল নেতার জীবন বাঁচাতে বডি ডাবলকে সামনে পাঠানো হয়। ঘাতকরা যেন বুঝতে না পারে–আসল ব্যক্তি কোনটি। শত্রুপক্ষ বা গোয়েন্দা সংস্থাকে বিভ্রান্ত করতে একই সময়ে দুটি ভিন্ন জায়গায় নেতার উপস্থিতি দেখানো হয়।
এ ছাড়া যদি কোনো নেতা গুরুতর অসুস্থ থাকেন, তবে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তার ডুপ্লিকেটকে দূর থেকে জনসম্মুখে প্রদর্শন করা হয়।

বডি ডাবল কীভাবে বানানো হয়?
কাউকে বডি ডাবল হিসেবে গড়ে তোলা দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। এ জন্য প্রথমে এমন কাউকে খুঁজে বের করা হয়, যার হাড়ের গঠন, উচ্চতা এবং গায়ের রং মূল ব্যক্তির কাছাকাছি। সামান্য অমিল থাকলে প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে নাক, চিবুক বা কানের গঠন পরিবর্তন করা হয়।
এরপর মূল ব্যক্তি কীভাবে হাসেন, কীভাবে হাত নাড়েন বা কথা বলার সময় কোন শব্দে জোর দেন–এগুলো বডি ডাবলকে আয়ত্ত করতে হয়। এমনকি হাঁটার সময় পায়ের কদম কতটুকু ফেলবেন, সেটিও কঠোরভাবে অনুশীলন করা হয়। নির্মাতা অমিতাভ রেজার ‘আয়নাবাজি’ সিনেমায় এমন দৃশ্য দেখানো হয় বেশ কয়েকবার। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী আরেকজনের হয়ে জেল খাটেন। সে জন্য তিনি সেই ব্যক্তির মতোই অঙ্গভঙ্গি আয়ত্ব করেন।
এর বাইরে উন্নত সিলিকন মাস্ক বা মেকআপ ব্যবহার করে চেহারার সূক্ষ্ম রেখাগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়। বর্তমানে বেশ কিছু হলিউড ও বলিউডের সিনেমায় এমন মেকআপ দেখা যায়। এমনকি প্রস্থেটিক আর্টের এই কাজের জন্য বিশেষ মেক-আপ আর্টিস্টও নিয়োগ দেওয়া হয়।
তবে সিনেমার ক্ষেত্রে এটি সহজ হলেও বাস্তবে বেশ জটিল। নির্মাতা ল্যারি চার্লসের ‘দ্য ডিকটেটর’ সিনেমায় রাজনীতি ও সিনেমায় বডি ডাবলের এক সংমিশ্রণ দেখা যায়। তাতে প্রধান চরিত্রকে মেরে ফেলার পর দেখা যায়, এটা আসলে তার ডুপ্লিকেট। এমনকি আরেকটি ডুপ্লিকেট সরকারপ্রধান অংশ নেন আন্তর্জাতিক এক সভায়। তাতে হাস্যরসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয় বডি ডাবলের কার্যক্রম।
রাজনীতিতে বডি ডাবলের জন্য প্রথমেই এমন একজনকে খুঁজে বের করা হয় যার উচ্চতা, শরীরের গঠন এবং চেহারার হাড়ের কাঠামো নেতার সাথে অনেকটা মিলে যায়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এই কাজটি করে।
এখানে শুধু চেহারা মিললেই হয় না, নেতার হাঁটার স্টাইল, হাত নাড়ানোর ধরন এবং দাঁড়ানোর ভঙ্গিও ডাবলের মধ্যে থাকতে হয়। জনসমক্ষে কথা বলতে হতে পারে–এমন ক্ষেত্রে ডাবলকে নেতার কথা বলার টোন এবং আঞ্চলিকতা রপ্ত করতে হয়।
সিনেমাটোগ্রাফিতে মেকআপ দিয়ে কাজ চললেও বাস্তবে দীর্ঘক্ষণ মানুষের সামনে থাকার জন্য স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। এ কারণে নাক, কান বা চিবুকের আকৃতি হুবহু মেলাতে অনেক সময় ছোটখাটো প্লাস্টিক সার্জারি করা হয়। নেতার শরীরে দৃশ্যমান কোনো তিল, আঁচিল বা ক্ষতচিহ্ন থাকলে তা লেজার বা ট্যাটু দিয়ে ডাবলের শরীরে হুবহু ফুটিয়ে তোলা হয়।
এ ছাড়া ডাবলকে কয়েক মাস ধরে নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাকে নেতার জীবনের খুঁটিনাটি, ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নাম এবং রাজনৈতিক আদর্শ মুখস্থ করানো হয়। নেতার সিগনেচার বা স্বাক্ষর নকল করার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় অনেক সময়। পাবলিক ইভেন্টে কীভাবে হাসতে হবে বা করমর্দন করতে হবে, তার জন্য পেশাদার কোচের সাহায্য নেওয়া হয়।
রাজনৈতিক নেতাদের পোশাক সাধারণত খুব নির্দিষ্ট ধরনের হয়। নেতার দর্জিকেই ডাবলের পোশাক বানানোর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে, যাতে সেলাই ও কাপড়ের মান একই থাকে। নেতা যে ব্র্যান্ডের এবং যে পাওয়ারের চশমা পরেন, ডাবলকেও ঠিক তাই দেওয়া হয়। এমনকি সুগন্ধি বা পারফিউমও একই ব্যবহার করা হয়, যাতে ঘ্রাণ থেকেও কেউ সন্দেহ না করে।
ইতিহাসে বিখ্যাত কিছু বডি ডাবল
জোসেফ স্তালিন: বলা হয় সোভিয়েত ‘একনায়ক’ স্তালিনের বেশ কয়েকজন বডি ডাবল ছিল। তাদের মধ্যে ফেলিক্স দাদায়েভ অন্যতম, যিনি ১৯৪০-এর দশকে স্তালিনের বদলে বহু অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
সাদ্দাম হোসেন: ইরাকের এই নেতার একাধিক বডি ডাবল থাকার কথা শোনা যায়। তার বড় ছেলে উদয় হোসেনের একজন বডি ডাবল ছিলেন লতিফ ইয়াহইয়া, যিনি পরবর্তীকালে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছিলেন।
অ্যাডলফ হিটলার: ঐতিহাসিকদের মতে, হিটলারের নিরাপত্তায় ‘গুস্তাভ ওহেলার’ নামক এক ব্যক্তি বডি ডাবল হিসেবে কাজ করতেন।

শনাক্ত করার উপায়
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে বডি ডাবল শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়ে গেছে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মূলত তিনটি জিনিস দেখেন:
কান: মানুষের কান কখনো পরিবর্তন হয় না। প্লাস্টিক সার্জারিতেও কানের ভেতরের তরুণাস্থির গঠন হুবহু নকল করা কঠিন।
চোখের আইরিশ: প্রতিটি মানুষের চোখের আইরিশ বা মণি আলাদা।
কণ্ঠস্বর: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে কণ্ঠস্বরের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে আসল-নকল চেনা সম্ভব।
সহজ কথায়, বডি ডাবল হলো একটি ‘জীবন্ত ঢাল’ বা ‘ছায়া’, যা মূল ব্যক্তিকে নিরাপত্তা প্রদান করতে বা জনমানসে তার নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হয়।
একটি সফল বডি ডাবল তৈরি করা কেবল একজন মানুষের ছায়া তৈরি করা নয়, বরং এটি প্রযুক্তি ও নিপুণ পরিকল্পনার সমন্বয়। দর্শকরা যখন মূল অভিনেতা এবং ডাবলের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না, তখনই সেই বডি ডাবল তৈরির প্রক্রিয়াটি সার্থক হয়।
একজন বডি ডাবলের জীবন অত্যন্ত কঠোর গোপনীয়তায় মোড়ানো থাকে। তাকে বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাকে একটি ছায়া জীবনের মধ্যে কাটাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুল হলে তা বড় ধরনের রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি বা জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।