আমাদের মতো ভাতপ্রধান দেশে স্যান্ডউইচের মতো খাবার দিয়ে দুপুর কিংবা রাতে উদরপূর্তি খুব একটা হয় না। যদিও বড় বড় শহরে যদিও স্ন্যাকস হিসেবে মোটামুটি জনপ্রিয়। কিন্তু সাহেবদের দেশে স্যান্ডউইচ বস্তুটি দিয়ে অনায়াসে এক বেলার খাবার হয়ে যায়। বিশেষ করে প্রচুর কাজের চাপে থাকেন এমন মানুষের কাছে বস্তুটি বেশ দরকারি। টুক করে খেয়ে নেওয়া যায়। কাজ করতে করতেই খেয়ে ফেলা যায়। স্যান্ডউইচের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে খাওয়ার আগে পরে হাত না ধুলেও চলে।
সাহেবদের দেশে এমনিতেও চামচ-ছুরি-কাঁটার কারণে হাত ধোয়ার বালাই না থাকলেও চলে। আর এ কারণেই স্যান্ডউইচ খাবারটি জনপ্রিয় কি না জানি না, তবে উৎপত্তির হেতু হতে পারে।
দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের স্যান্ডউইচ শহরের ‘আর্ল’ ছিলেন জন মন্টেগু। তিনি ছিলেন ভয়ানক জুয়াড়ি। জুয়া খেলার নেশায় একটুও সময় নষ্ট করতে চাইতেন না। একদিন খেলতে বসে সাহেবের খাওয়ার সময় চলে যাচ্ছিল। খানসামা এসে তাগাদা দিলেন। কিন্তু সাহেবের ওঠার কোনো নামই নেই। শেষমেষ বলে দিল দু টুকরো পাউরুটির মধ্যে মাংস দিয়ে যেন তাকে দেওয়া হয়। হুজুরের হুকুম তামিল হলো। জুয়া খেলতে খেলতে উদরপূর্তিও হয়ে গেল। আর এভাবে মাঝে মাঝেই চলতে লাগলো। তো, এমন জুয়াড়ির সঙ্গীরা অন্যরকম হবে সেরকম অনাসৃষ্টিতো হতে পারে না। তারাও খেতে লাগলেন আর্ল অব স্যান্ডউইচের মস্তিকপ্রসূত খাবার। যার নাম হয়ে গেল ‘স্যান্ডউইচ’।
কিন্তু স্যান্ডউইচ কাকে বলে? এ প্রশ্ন আদালত অবধি গড়িয়েছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে স্যান্ডউইচ কী? সাধারণভাবে উত্তরটি খুব স্পষ্ট। মাংস, পনিরসহ রুটির দুটি টুকরো বা স্লাইসের মধ্যে কিছু ভরে দেওয়াই হলো স্যান্ডউইচ। তাহলে ‘হট ডগ’ কি স্যান্ডউইচ? মেরিয়াম-ওয়েবস্টার অভিধান যখন বললো, হট ডগ একটি স্যান্ডউইচ। তখন বিতর্কের সূচনা হলো। মেরিয়াম-ওয়েবস্টার একটি ‘স্যান্ডউইচ’ কে সংজ্ঞায়িত করেছে ‘দুই বা ততোধিক রুটির টুকরো বা একটি স্প্লিট রোল যার মাঝখানে কিছু ভরা থাকে’ বা ‘এক টুকরো রুটি যা খাদ্যে আবৃত।’
আমেরিকান টিভি উপস্থাপক স্টিফেন কোলবার্ট এক অনুষ্ঠানে বিচারপতি রুথ ব্যাডার গিন্সবার্গকে প্রশ্ন করেছিলেন, হট ডগ কি স্যান্ডউইচ? কোলবার্টকে বিচারপতির পাল্টা প্রশ্ন ছিলো স্যান্ডউইচের সংজ্ঞা কী? স্টিফেন যে উত্তর দিয়েছিলেন, তার ভিত্তিতে বিচারপতি মহোদয়া হট ডগকে স্যান্ডউইচ হিসেবে ধার্য করেছিলেন। আজ অবশ্য আমরা সেদিকে যাব না। আদালতের একটি ঘটনা সম্পর্কে জানব।
ঘটনাটি ২০০৬ সালে আমেরিকার বস্টনের একটি আদালতে। হোয়াইট সিটি শপিং সিটি, এলপি বনাম পিআর রেস্তোরাঁ, এলএলসির মধ্যে একটি মামলা চলছিল। যার একটি সমাধান স্যান্ডউইচের সংজ্ঞার উপর নির্ভর করছিল। পি আর রেস্তোরাঁ, এল এল সি আমেরিকার জনপ্রিয় চেইন পানেরা ব্রেডের ২২টি শাখার কর্ণধার। হোয়াইট সিটি শপিং মলে এই পানেরা ব্রেডেরই আরেকটি শাখা খোলার সময় তাদের চুক্তিপত্রে পি আর রেস্তোরাঁ একটি সংযুক্তি যোগ করেছিল, যেন তাদের প্রতিযোগী রেস্তোরাঁগুলো হোয়াইট সিটি শপিং মলে তাদের সাথে টক্কর দিতে না পারে। সেই সংযুক্তিতে বলা ছিল, পানেরা ব্রেডের সাথে চুক্তির পর হোয়াইট সিটি তাদের শপিং মলে এমন কোনো রেস্তোরাঁকে জায়গা দিতে পারবে না, যারা তাদের বার্ষিক আয়ের ১০% এর বেশি স্যান্ডউইচ বিক্রির মাধ্যমে আয় করেছে। এই চুক্তির কিছুদিন পরই হোয়াইট সিটি শপিং মল চেয়ার ফাইভ রেস্তোরাঁর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়, যারা সেখানে জনপ্রিয় মেক্সিকান খাবারের চেইন, কিউডোবার শাখা খুলতে চাচ্ছিল। পি আর রেস্তোরাঁ দাবি করে, কিউডোবার খাবারগুলো, বিশেষ করে তাদের বুরিটো, কেসাডিয়া, আর টাকোস আসলে স্যান্ডউইচ, অর্থাৎ চেয়ার ফাইভের সঙ্গে এই চুক্তির মাধ্যমে হোয়াইট সিটি আরও একটি স্যান্ডউইচ রেস্তোরাঁকে জায়গা দিচ্ছে, যা চুক্তির বিরুদ্ধে যায়।
স্যান্ডউইচএই মামলায় পি আর রেস্তোরাঁ হেরে যায়, কারণ তারা চুক্তিতে স্যান্ডউইচের কোনো সংজ্ঞা দেয়নি। আদালতের মতে, স্যান্ডউইচের সংজ্ঞা খুব জটিল কিছু না। স্যান্ডউইচ হলো এমন একটি খাবার, যাতে দুটো পাতলা পাউরুটির টুকরোয় মাখন দিয়ে, মাংস, পনির অথবা নোনতা কোনো খাবারের পুর দেওয়া থাকে। আদালত আরও জানান, যেকোনো কাণ্ডজ্ঞান সম্পন্ন মানুষই বুঝবে, যে বুরিটো বা কেসাডিয়া কোনো স্যান্ডউইচ না। পি আর রেস্তোরাঁ যেহেতু স্যান্ডউইচের কোনো সংজ্ঞা চুক্তিতে উল্লেখ করেনি, এবং অন্যান্য অনেক রেস্তোরাঁ, যেমন স্টারবাকস বা ডাংকিন ডোনাটসের সঙ্গে হোয়াইট সিটির চুক্তিতে বাধা দিলেও সেখানে আগে থেকে থাকা একটি মেক্সিকান রেস্টুরেন্টের সঙ্গে ব্যবসা নিয়ে কিছু বলেনি, তাই পি আর রেস্তোরাঁর উকিলরা স্যান্ডউইচের শত সংজ্ঞা দেখালেও, আদালতের মতে তাদের এই দাবি অযৌক্তিক হিসাবে প্রমাণিত হয়।
এই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও, স্যান্ডউইচ সংজ্ঞা নিয়ে কিন্তু এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। আমেরিকার দুটি রাজ্য, ক্যালিফোর্নিয়া আর নিউ ইয়র্কে অবশ্য স্যান্ডউইচের সংজ্ঞায় মিল রয়েছে। ক্যালিফর্নিয়ার সংজ্ঞায়, বার্গার আর হটডগ, সবই আদতে স্যান্ডউইচ। অন্যদিকে, নিউ ইয়র্কের সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত। বেকন-লেটুস-টমেটো, পিনাট বাটার-জেলি, ক্লাব কিংবা গ্রিলড চিজ যাই হোক সেটা মুড়িয়ে, বা এক দিক খোলা হলেও তাদের মতে সেটা স্যান্ডউইচ। এছাড়াও, কিছু খাবার আছে যেগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে স্যান্ডউইচ মনে না হলেও তারা স্যান্ডউইচ। এই তালিকায় আছে মেক্সিকান বুরিটো, গ্রিক গিরো, হট ডগ আর হ্যামবার্গার, এমনকি র্যাপ আর পিটাকেও স্যান্ডউইচ হিসেবে অভিহিত করেছে নিউ ইয়র্কের কর্তৃপক্ষ।
স্যান্ডউইচআমাদের আলোচ্য অভিধানও কিন্তু বলছে, একটি রুটির ওপর যদি খাবার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় তবে সেটাও স্যান্ডউইচ। সুতরাং বুঝতেই পারছেন খাবার নিয়ে কাজ-কারবার আদালতেও গড়ায়। শুধু জমি-জমা কিংবা অন্য বিষয় নয়।
সবচেয়ে দামী স্যান্ডউইচ
পৃথিবীর সবচেয়ে দামী স্যান্ডউইচ বানানো হয় হয় মার্কিন মুলুকের নিউইয়র্ক শহরের সেরেনডিপিটি থ্রি রেস্তরাঁয়। ডম পেরিইনিয়ন শ্যাম্পেন দিয়ে বানানো খামির থেকে তৈরি রুটির এই স্যান্ডউইচে থাকে কুইনটেসেনশিয়াল গ্রিলড চিজ। ভোজ্য সোনা, হোয়াইট ট্রাফেল বাটার, খুব দুর্লভ কাসিওকাভাল্লো পোডোলিকো চিজ। এই চিজ যে গরুর দুধ থেকে হয় তা আবার ইতালির একটি বিশেষ জাতের গরু যার নাম ‘পোডালিকা’। জাতটি দুর্লভ তাতে আবার দুধ দেয় অল্প। আর সেই দুধ থেকে বানানো চিজ যে এক ‘চিজ’ হবে সেতো স্বাভাবিক। এই চিজ সাধারণত ১০-১৫ মাস বয়সী হয় আবার পাঁচ বছর বয়সীও হয়। চিজের বয়স! হ্যাঁ, ওই ইংরেজিতে যাকে বলে ‘Aged’। এই যে দামি স্যান্ডউইচ তার জন্য ডিপিং সস হিসেবে থাকবে ‘সাউথ আফ্রিকান লবস্টার টম্যাটো বিস্ক’। ওহ এর দাম কত? ২১৪ মার্কিন ডলার, আজকের দরের সঙ্গে অঙ্ক করে মিলিয়ে নিন তাহলে টাকায় কত হয়।