ads

এআই কোম্পানিগুলো কেন দার্শনিকদের চাকরি দিচ্ছে?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এআই কোম্পানিগুলো কেন দার্শনিকদের চাকরি দিচ্ছে?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

দশ বছর আগে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিপ্লবের গতি বাড়ছিল, তখন কলা ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছিল যে, তারা যদি নিজেদের চাকরির বাজারে যোগ্য করে তুলতে চায়, তবে তাদের ‘কোডিং শেখা’ উচিত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, পরামর্শটি হয়তো ভুল ছিল। আজকাল, প্রোগ্রামাররাই উল্টো এআই তাদের চাকরি কেড়ে নেবে কি না তা নিয়ে শঙ্কিত। শুনতে অবাক লাগলেও বাস্তবে এমনটাই ঘটছে। কারণ বড় বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের টিমে ‘দার্শনিক’-দের নিয়োগ দিচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের দর্শন গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কম্পিউটার সায়েন্সের শিক্ষার্থীদের চেয়ে বেশি। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে দেখা গেছে, যারা কম্পিউটার সায়েন্স পড়েছেন তাদের ৭ শতাংশ বেকার ছিলেন। অন্যদিকে দর্শন নিয়ে পড়াদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ৫.১ শতাংশ। এদের অনেককেই এআই প্রতিষ্ঠানগুলো লুফে নিচ্ছে।

ইয়েল ইউনিভার্সিটির দার্শনিক লুসিয়ানো ফ্লোরিডি ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে জানান, শিক্ষার্থীরা স্নাতক শেষ করার আগেই চাকরির প্রস্তাব পেয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাবিদরাও দল পরিবর্তন করছেন। দর্শন বিভাগগুলো থেকে এই চলে যাওয়ার ব্যাপকতাকে ফ্লোরিডি ‘রক্তক্ষরণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

দর্শনশাস্ত্র এআই গবেষকদের যে পাঠগুলো দিতে পারে, তার কিছু কিছু বেশ প্রাচীন। এর মধ্যে অন্যতম হলো সক্রেটিক পদ্ধতি। যা প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক প্লেটো বর্ণনা করেছেন। এটি মূলত কৃত্রিম অজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে কোনো কিছুর অর্থ স্পষ্ট করতে, অসঙ্গতিগুলো চিহ্নিত করতে এবং এর প্রভাব বা পরিণতি উন্মোচন করতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানের অনেক এআই সিস্টেমেরই এক ধরনের চাটুকারিতার প্রবণতা রয়েছে।

মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটির দর্শন ও এআই বিশেষজ্ঞ ইয়র্গ নোলার দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “সক্রেটিক পদ্ধতিতে প্রশিক্ষিত মডেলগুলো মানুষকে খুশি করার ব্যাপারে কম আগ্রহী এবং সত্য অনুসন্ধানে বেশি তৎপর।”

এরপর আসে ‘সক্রেটিক অজ্ঞতা’-এর ধারণা। প্লেটোর ‘দ্য অ্যাপোলজি’ গ্রন্থে সক্রেটিস দাবি করেছেন যে, কারো প্রজ্ঞা মূলত নিহিত রয়েছে তিনি ‘কতটা জানেন না’—সেটি উপলব্ধি করার মধ্যে। একটি মডেলের মধ্যে এই বিনয় ঢুকিয়ে দিতে পারলে তা তার অতি-আত্মবিশ্বাস কমাতে সাহায্য করতে পারে। এই অতি-আত্মবিশ্বাসের সাধারণ ত্রুটিকে ড. নোলার ‘এআই-এর অপরিপক্কতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

লন্ডনের এআই গবেষণাগার গুগল ডিপমাইন্ডের একজন সিনিয়র দার্শনিক ইয়াসুন গ্যাব্রিয়েল মনে করেন, এই ধরনের প্রচেষ্টার ফলেই পুরো প্রযুক্তি-শিল্পজুড়ে এআই-এর কাল্পনিক বা ভুল তথ্য দেওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। আরও বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে তিনি জানান, এআই-এর দীর্ঘ যৌক্তিক প্রক্রিয়া বা ‘চেইন অব থট’ উন্নত করার জন্য দর্শনের পাঠগুলো একটি শক্তিশালী কার্যকর পদ্ধতি।

দার্শনিক প্রশিক্ষণ আরও সুনির্দিষ্ট উপায়ে একটি মডেলের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে পারে। ডেলাওয়্যার ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর সায়েন্স, এথিকস অ্যন্ড পাবলিক পলিসির পরিচালক থমাস পাওয়ারস বলেন, “একটি আইনি সহায়তাকারী এআই-কে যদি জন লকের লেখাগুলো ইনপুট দেওয়া হয়, তবে সেটি রাজনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী সম্পত্তির অধিকারের পক্ষ নেবে। কারো যদি সেই নীতিগুলো পছন্দ না হয়, তবে মডেল নির্মাতাদের কাছে অন্য বিকল্পও রয়েছে।”

মার্কিন কম্পিউটিং জায়ান্ট আইবিএম-এর গ্রানাইট সিরিজের মডেলগুলোতে এমন কিছু অপশন রয়েছে, যার মাধ্যমে করপোরেট গ্রাহকেরা তাদের নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের সাথে এআই-এর ফলাফলকে আরও ভালোভাবে মিলিয়ে নিতে পারেন।

আইবিএম-এর রেসপনসিবল এআই প্রধান ফ্রান্সেসকা রসি দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “এগুলো ব্যবহারকারীদের দার্শনিক দ্বন্দ্বগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার সুযোগ করে দেয়; যেমন—ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বনাম সামাজিক সম্প্রীতি।”

এআই-এর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দর্শন সাহায্য করতে পারে। গবেষকরা এআই মডেলগুলোর মধ্যে নানা ধরনের আশঙ্কাজনক আচরণ নথিবদ্ধ করেছেন। যার মধ্যে নজরদারি এড়ানোর চেষ্টা এবং এমনকি তাদের ব্যবহারকারীদের ব্ল্যাকমেইল করার প্রবণতাও রয়েছে। মডেল নির্মাতারা এই ধরনের অসদাচরণ ঠেকাতে যে পদ্ধতিগুলো চেষ্টা করছেন, তার একটি হলো ‘এআই সংবিধানবাদ’। এর আওতায় আইনি বা নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এমন সব দার্শনিক লেখা থেকে নিয়ম ও নীতিমালার একটি কাঠামো তৈরি করে, তার ওপর ভিত্তি করেই একটি মডেল গড়ে তোলা হয়।

সান ফ্রান্সিসকো-ভিত্তিক এআই গবেষণাগার অ্যানথ্রোপিক-এর অন্যতম একজন সমর্থক। এর ‘ক্লড’ মডেলগুলোর সংবিধানে ইমানুয়েল কান্টের দর্শন, অ্যাপলের পরিষেবার শর্তাবলী এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের মতো বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে উপাদান যুক্ত করা হয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান দার্শনিক অ্যামান্ডা আসকেলের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া এর সর্বশেষ সংস্করণটি ২১ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মী এই ৭৮ পৃষ্ঠার সংবিধানকে ক্লডের ‘সোল ডক’ নামে ডাকেন।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ‘এই সংবিধানগুলোতে আসলে কী ধরণের নিয়ম রাখা উচিত’। দার্শনিকরা মূলত দুটি প্রধান নৈতিক কাঠামোর ওপর আলোকপাত করেছেন। একটি হলো ‘ডিওন্টোলজি’ বা কর্তব্যবাদ। কান্টসহ অনেকের কাছেই জনপ্রিয় এই মতবাদটি এমন কিছু কঠোর নিয়ম আরোপ করে-যা মিথ্যা বলা, জোর-জবরদস্তি করা এবং বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে হলেও মানুষকে লক্ষ্য অর্জনের ‘উপায়’ হিসেবে ব্যবহার করাকে নিষিদ্ধ করে। অ্যানথ্রোপিকের সংবিধানে এই কর্তব্যবাদের অনেক কঠোর নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ড. পাওয়ারস বলেন, “এগুলো এআই-এর আচরণকে আরও সুসংগত ও ধারাবাহিক করতে পারে—যা বাসাবাড়ি এবং জনাকীর্ণ স্থানে রোবট মোতায়েনের ক্ষেত্রে একটি বড় সুবিধা।” 

জগতের প্রতি কর্তব্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা মডেলগুলোর অন্যান্য সুবিধাও রয়েছে। এর একটি হলো অধিকতর সততা, যা ক্লডের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা গেছে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির দার্শনিক নিক বোস্ট্রম দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “যে মডেলগুলো বেশি সত্যবাদী, সেগুলোর দ্বারা ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।”

সিলিকন ভ্যালির আরেকটি গবেষণাগার ‘ইনফ্লেকশন এআই’ তাদের ‘পাই’ চ্যাটবটের ওপর এই কর্তব্যবাদী সীমাবদ্ধতাগুলো আরোপ করেছে, যা মূলত ব্যবহারকারীদের মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর প্রধান শন হোয়াইট জানান, পাই ব্যবহারকারীর নিজের বা অন্যদের ক্ষতি করার ঝুঁকিপূর্ণ মানসিকতা শনাক্ত করতে বেশ পারদর্শী। কর্তব্যবাদী সংবিধানগুলো আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে চলার ক্ষেত্রেও সাহায্য করে। 

এআই দার্শনিকদের আগ্রহের অন্য নৈতিক পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘কনসিকোয়েনশিয়ালিজম’ বা পরিণামবাদ। এটি কী করা উচিত তা সিদ্ধান্ত নিতে লাভের বিপরীতে ক্ষতির দিকটি বিবেচনা করে। পরিণামবাদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল মডেলগুলোর মধ্যে রয়েছে ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি এবং গুগলের জেমিনি।

গুগলের এআই মডেলগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন তা সম্ভাব্য সার্বিক সুবিধা নিশ্চিত করে, যা অনুমেয় ঝুঁকিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি—আর এটিই হলো একটি ক্লাসিক পরিণামবাদী লক্ষ্য।

স্বয়ংক্রিয় বা চালকবিহীন যানবাহনের সফটওয়্যারের ক্ষেত্রেও পরিণামবাদী অ্যালগরিদমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো দুর্ঘটনা অনিবার্যই হয়ে পড়ে, তবে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর উপায়ে কীভাবে গাড়িটি দুর্ঘটনাকবলিত করা যায়, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। চালকবিহীন গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েইমো’-এর একজন সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ক্রিস জার্ডেস বলেন, বর্তমানে ড্রাইভিং সফটওয়্যারগুলোকে আরও বেশি পরিণামমুখী বা পরিণামবাদী করে তোলার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

এআই-চালিত অস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিণামবাদ একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এআই নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সেন্টার-এর সাবেক প্রধান জ্যাক শানাহান দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “সামরিক লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বকে সম্ভাব্য বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর ঝুঁকির বিপরীতে পরিমাপ করে দেখতে হয়।” 

এখানে জটিল ও কাঁটাছেড়া সমস্যার কোনো অভাব নেই—আর এগুলোই হলো দার্শনিকদের সবচেয়ে প্রিয় ক্ষেত্র। এমন কোনো পরিস্থিতি কি থাকতে পারে যেখানে কর্তব্যবাদের কঠোর নিয়মগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত? যখন কোনো সিদ্ধান্তের পরিণতি বা ফলাফল অস্পষ্ট থাকে, তখন আপনি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন? এআই সিস্টেমগুলোর কি পশুপাখির কল্যাণ বা পরিবেশের অবস্থার কথা বিবেচনা করা উচিত?

লরি এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের জন্য এআই-চালিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘নাউটো’-এর প্রধান এবং দার্শনিক স্টেফান হেক প্রশ্ন তোলেন—বয়স্ক পথচারীদের চেয়ে কম বয়সী পথচারীদের জীবন বাঁচানোকে অগ্রাধিকার দেওয়াটা কি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে? তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, এর ফলে নৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত জটিল কিছু মামলার সৃষ্টি হতে পারে; কারণ পরিণামবাদী অ্যালগরিদমগুলো মূলত আরও বড় কোনো ক্ষতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি ছোট ক্ষতিকে স্পষ্টভাবে অনুমতি দিয়ে থাকে।

সমালোচকরা অবশ্য ‘নৈতিক দক্ষতা হ্রাস’ নিয়ে বেশ চিন্তিত। কম্পিউটার যদি ক্রমেই নৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিতে শুরু করে, তবে মানুষ কি নিজস্ব বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ব্যাপারে আরও বেশি অনাগ্রহী হয়ে উঠবে? ইউনিভার্সিটি অফ লুইসভিল-এর এআই তাত্ত্বিক রোমান ইয়ামপোলস্কি যুক্তি দেন যে, “নৈতিকতা হলো ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তনশীল, সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন, কৌশলগতভাবে কারসাজিযোগ্য এবং অনেক সময় কেবল অতীত পর্যালোচনার মাধ্যমেই তা স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব।”

চাকরিহীন কোডাররা বিষয়টি নোট করে রাখতে পারেন। আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এআই ফিলোসোফার বা এআই দার্শনিকদের কাজের কোনো অভাব অন্তত হচ্ছে না।

সম্পর্কিত