দীর্ঘদিন ধরেই তুরস্ক ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক হুমকি ও কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। তবে ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই বৈরিতা চরম রূপ ধারণ করেছে, যা বর্তমানে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে এখন তুরস্ককে ইরানের সমপর্যায়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
গত ২৩ জুন এক ইসরায়েলি মন্ত্রী দাবি করেন, ইরানের চেয়েও সিরিয়া ও তুরস্ক এখন তাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ১৯১৫ সালে অটোমান সাম্রাজ্যের আমলে সংঘটিত আর্মেনীয় হত্যাকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে উত্তেজনা আরও উস্কে দেয় ইসরায়েল। যদিও তুরস্ক এই ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে মানতেও নারাজ।
পাল্টা জবাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলা তুরস্কের সার্বভৌমত্বের জন্যও হুমকিস্বরূপ। এমনকি জুনের শুরুতে তুর্কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক বক্তৃতায় আশা প্রকাশ করেন যে, জেরুজালেম পুনরায় তুরস্কের অধীনে এলে তিনি সেখানকার গভর্নর হতে চান। উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালে পতনের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ চার শতক ধরে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিন অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তীব্র বাগাড়ম্বর আদতে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও জনমতকে প্রভাবিত করার কৌশল। আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে ভোটারদের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু প্রমাণ করতে মরিয়া যে, দেশ এখন চতুর্মুখী সংকটে অবরুদ্ধ এবং তা মোকাবিলায় তার মতো একজন কঠোর নেতার বিকল্প নেই। অন্যদিকে, ২০২৮ সালের নির্ধারিত নির্বাচন এগিয়ে আনার ভাবনায় থাকা এরদোয়ান তুরস্কের ৩০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ সুদের হারের মতো চরম অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে ইসরায়েলকে একটি জুতসই ‘রাজনৈতিক জুজু’ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
পারস্পরিক কৌশলগত শঙ্কা এবং মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দি-ইরান সমীকরণ
বর্তমান বাগযুদ্ধের নেপথ্যে রয়েছে দুই দেশেরই একে অপরকে ঘিরে ফেলার বা অবরুদ্ধ করার ভূরাজনৈতিক আশঙ্কা। ইসরায়েলের মূল উদ্বেগ—সিরিয়ায় তুরস্কের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাব এবং একইসঙ্গে মিশর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সাথে আঙ্কারার উদীয়মান প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব। বিপরীতে তুরস্কের মূল আপত্তি—গাজা, ইরান ও লেবাননে ইসরায়েলের উপর্যুপরি সামরিক অভিযান এবং সিরিয়া-ইরাকের কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে তেল আবিবের গোপন সহযোগিতা।

মার্কিন থিংক-ট্যাঙ্ক ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর বিশ্লেষক আসলি আয়দিনতাসবাসের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ক যে সমস্ত কূটনৈতিক বা সামরিক প্রক্রিয়ায় জড়িত, তার প্রতিটিতেই ইসরায়েলকে তারা একটি প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখে। এই মুহূর্তে দুই দেশের সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কা ক্ষীণ হলেও, একে আর কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আঞ্চলিক সংকট ও আঙ্কারার বহুমাত্রিক উদ্বেগ
ইরান ভূখণ্ডে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা তুরস্কের জন্য নতুন করে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আঙ্কারা বরাবরই ইরানে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধী। কারণ তেহরানের পতন ঘটলে তুর্কি সীমান্তে যেমন নজিরবিহীন শরণার্থী সংকট তৈরি হবে, তেমনই স্থবির হয়ে পড়বে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানি।
তুরস্কের আরেকটি বড় ভয় হলো, তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা (যার সাথে আঙ্কারার সম্পর্ক মোটামুটি বন্ধুত্বপূর্ণ) যদি কখনো ভেঙে পড়ে, তবে সেখানে ইসরায়েলের একটি পুতুল সরকার বা বন্ধুভাবাপন্ন কোনো শক্তি ক্ষমতায় চলে আসতে পারে।
এছাড়া সিরিয়া, ইরান ও ইরাকে সক্রিয় কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েলের সুদূরপ্রসারী সমর্থন জোগান দেওয়াটাও তুরস্কের জন্য অন্যতম মাথাব্যথার কারণ। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতে কুর্দি যোদ্ধাদের সরাসরি ব্যবহার করার একটি যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি পরিকল্পনা তুরস্কের দীর্ঘদিনের আশঙ্কাকে বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছিল। তবে জানা যায়, এরদোয়ানের সরাসরি ও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেছিলেন।
ভূমধ্যসাগরীয় সমীকরণ এবং সিরিয়াকে কেন্দ্র করে কৌশলগত দ্বন্দ্ব
পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের একচ্ছত্র প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সাথে ইসরায়েলের কৌশলগত অংশীদারত্ব দুই দেশের বৈরিতাকে আরও উস্কে দিয়েছে। এই ত্রিপক্ষীয় অক্ষ কেবল গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ নৌ ও বিমান মহড়াই বৃদ্ধি করেনি, বরং সমুদ্রের জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষায় সমন্বিত পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে।
এরই অংশ হিসেবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল গ্রিসকে নিখুঁত নিশানাযুক্ত রকেট আর্টিলারি এবং সাইপ্রাসকে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের চুক্তি করেছে। এর জবাবে তুরস্কও ভূমধ্যসাগরের বিতর্কিত জলসীমা ও সেখানকার খনিজ গ্যাসক্ষেত্রের ওপর নিজের একাধিপত্যের দাবি আরও জোরালো করেছে।
এদিকে, ৭ই অক্টোবরের হামলার মূল কারিগর হামাসকে আঙ্কারার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমর্থন নিয়ে ইসরায়েল আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। তবে বর্তমানে তেল আবিবের মূল মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা।

আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ভঙ্গুর সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই ইসরায়েলের মতো আগ্রাসী প্রতিবেশীকে চটাতে চাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও, ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা বর্তমান সিরিয়াকে একটি ‘টাইম-বোমা’ হিসেবে দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, আল-কায়েদার সাবেক কমান্ডার শারার এই সরকারের ওপর তুর্কি নেতৃত্বের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাব রয়েছে, যা যেকোনো সময় ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
যদিও ২০২৫ সালের পর থেকে সিরিয়া সীমান্ত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে, তবুও সেখানে দুই দেশের বিপরীতমুখী স্বার্থের কারণে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুর্কি এবং দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। আঙ্কারা একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী সিরিয়া রাষ্ট্র দেখতে আগ্রহী। তেল আবিব সিরিয়াকে দুর্বল ও খণ্ডিত রাখতে মরিয়া।
এই কৌশলের অংশ হিসেবেই ইসরায়েল সিরিয়ার অভ্যন্তরে শত শত বিমান হামলা চালিয়েছে, যার অন্যতম লক্ষ্য ছিল আঙ্কারার কাছে হস্তান্তরযোগ্য সামরিক বিমান ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করা। তবে আশার কথা হলো, দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার নিয়মিত ব্যাক-চ্যানেল যোগাযোগের ফলে তুর্কি ও ইসরায়েলি সেনারা এখন পর্যন্ত সরাসরি কোনো রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ায়নি।
ট্রাম্প-এরদোয়ান রসায়ন এবং ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ
ইরানকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের কাছে আঙ্কারার ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে তুরস্ক নিজেকে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, অন্যদিকে ন্যাটোর অভ্যন্তরেও নিজেদের অবস্থান মজবুত করেছে। এমনকি ট্রাম্পের নীতিতে সরাসরি অংশ না নিয়েও তার সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বজায় রাখতে সফল হয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
একইসাথে, ইরান বা ইসরায়েলের পক্ষ থেকে আসতে পারে এমন যেকোনো সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে আঙ্কারা। বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে মিশর, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সাথে তুরস্কের চলমান কৌশলগত আলোচনা গত এক বছরে বেশ গতি পেয়েছে।
বিপরীতে, ইরানে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল। এর ওপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের (বিশেষ করে সিরিয়ার) সংকটে আঙ্কারার সঙ্গে ওয়াশিংটনের যৌথভাবে কাজ করার প্রবণতা নেতানিয়াহুকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ট্রাম্প যখন সিরিয়ার নতুন সরকারকে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরামর্শ দেন, তেল আবিব তখন একে দেখছে শারার প্রধান পৃষ্ঠপোষক তুরস্ককে পিছনের দরজা দিয়ে সিরিয়ায় স্থায়ীভাবে জায়গা করে দেওয়ার মার্কিন প্রচেষ্টা হিসেবে।

নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প যখন আসাদ সরকারের পতনের পুরো কৃতিত্ব তুর্কি প্রেসিডেন্টকে দেন, তখন নেতানিয়াহুর ক্ষোভের সীমা থাকে না। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি—ইসরায়েলি বাহিনী হিজবুল্লাহকে সামরিকভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কারণেই সিরিয়ায় এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়েছিল।
এরই মধ্যে ইসরায়েলের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এক দশক আগে আমেরিকার কাছে অর্ডার করা ‘এফ-৩৫’ স্টিলথ ফাইটার জেট ফিরে পাওয়ার জন্য তুরস্কের নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা। উল্লেখ্য, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে কেবল ইসরায়েলের কাছেই এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে।
২০১৯ সালে তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনায় আমেরিকা এই চুক্তি বাতিল করেছিল। তবে বর্তমান ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে পারেন। গত ২৪শে জুন এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, আমেরিকা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পুনর্বিবেচনা করছে এবং এরদোয়ান প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “আমি সম্ভবত এমন কিছু করতে যাচ্ছি যা তাকে খুব খুশি করবে।”
এফ-৩৫ বিতর্ক, পরোক্ষ সম্পর্ক এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ঝুঁকি
কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ইসরায়েলের এই আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণের মূল নেপথ্য কারণ হলো তুরস্কের ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমান পাওয়ার সম্ভাবনা। আর এই বাগযুদ্ধের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মূলত মার্কিন কংগ্রেসের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছেন। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির গবেষক সোনার কাগাপতাইয়ের ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, “ইসরায়েল স্পষ্ট বুঝতে পারছে যে ট্রাম্প তুরস্কের সাথে এফ-৩৫ চুক্তির অচলাবস্থা কাটানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাই তারা চুক্তিটি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই কূটনৈতিকভাবে তা নসাৎ করতে চাইছে।”
তবে এত উত্তেজনার মাঝেও দুই দেশ কিন্তু একে অপরের সাথে সম্পর্কের সব পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়নি। ২০২৩ সালে পারস্পরিক রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করা হলেও তেল আবিবে তুর্কি এবং আঙ্কারায় ইসরায়েলি দূতাবাস এখনো সচল রয়েছে। এমনকি দুই বছর আগে এরদোয়ান ইসরায়েলের ওপর আনুষ্ঠানিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিলেও, তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে কিংবা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাত ঘুরে তুর্কি পণ্য ঠিকই ইসরায়েলে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি, আজারবাইজান ও উত্তর ইরাক থেকে উৎপাদিত খনিজ তেল তুরস্কের জেহান বন্দর হয়ে এখনো নিয়মিত ইসরায়েলে পৌঁছাচ্ছে।
অনেকে মনে করেন, নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান যুগের অবসান ঘটলে দুই দেশের এই বৈরিতা হয়তো কেটে যেতে পারে। তুর্কি ও ইসরায়েলি কর্মকর্তাদেরও মত—মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ধারার অনারব শক্তি হিসেবে দুই দেশের কৌশলগত মিল এত বেশি যে, দীর্ঘমেয়াদে তাদের পক্ষে এভাবে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকা অসম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০-এর দশকেও মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল এই তুরস্ক।
তবে এই পারস্পরিক অবিশ্বাস কেবল বর্তমান দুই শীর্ষ নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা আরও গভীর। ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা তুরস্কের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা সাবেক গোয়েন্দা প্রধান হাকান ফিদানকে (যিনি এরদোয়ানের সম্ভাব্য উত্তরসূরি) একজন কট্টর ইসরায়েল-বিরোধী হিসেবে দেখেন এবং তেহরানের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন।
এমনকি একজন ইসরায়েলি গোয়েন্দা বিশ্লেষক ফিদানকে এই অঞ্চলে ইসরায়েলের জন্য ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র (ইসরায়েল) এবং ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির (তুরস্ক) মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ লাগার বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তব মনে হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, একসময় যা কল্পনাতীত ছিল, তা-ও বাস্তবে ঘটে যেতে পারে—আর তেমন কিছু হলে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।
(তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন)