ads

বাংলাদেশের ভিসা নীতিতে কী আছে, বদল আসছে কোথায়?

বাংলাদেশের ভিসা নীতিতে কী আছে, বদল আসছে কোথায়?
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ছবি: বাসস

প্রতিটি দেশেরই আলাদা একটি ভিসা নীতি রয়েছে, বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশেরও নিজস্ব একটি ভিসা নীতি রয়েছে। ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশের ভিসা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার।

প্রায় দুই দশক ধরে একই কাঠামো অনুসরণ করে চলছে বাংলাদেশের ভিসা ব্যবস্থা। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বাস্তবতা বদলে যাওয়ায় এবার সেই নীতিতেই বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার।

প্রথমবার ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ভিসা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়, ঠিক দুই দশক পর আবারও বিএনপি সরকারের আমলে সেই নীতিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য, এটি শুধু ভিসা দেওয়ার নিয়ম পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কৌশলেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

ভিসা নীতি কী?

কোনো বিদেশি নাগরিক কী উদ্দেশ্যে, কত দিনের জন্য এবং কী ধরনের অনুমতি নিয়ে একটি দেশে প্রবেশ করবেন এসব বিষয় নির্ধারণ করে যে সরকারি নীতিমালা, সেটিই ভিসা নীতি। এতে ভিসার ধরন, আবেদনপ্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, মেয়াদ, নবায়নের নিয়ম, নিরাপত্তা যাচাই এবং কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেবে এসব বিষয় নির্ধারণ করা থাকে।

একটি দেশের ভিসা নীতি শুধু অভিবাসন ব্যবস্থার অংশ নয়; এটি একই সঙ্গে কূটনীতি, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, পর্যটন ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত দলিল।

বাংলাদেশের বর্তমান ভিসা নীতি

বর্তমানে বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে ভিসা নীতিমালা-২০০৬। তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময় প্রণীত এই নীতিমালার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বিদেশিদের বাংলাদেশে প্রবেশ ও অবস্থানের জন্য একটি সমন্বিত নীতিগত কাঠামো তৈরি করা হয়।

এই নীতিমালায় কূটনৈতিক, সরকারি, ব্যবসায়িক, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, পর্যটন, সাংবাদিকতা, গবেষণা, শিক্ষা, চিকিৎসা, এনজিও কার্যক্রম, ধর্মীয় সফর, ট্রানজিটসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আসা বিদেশিদের জন্য পৃথক ভিসা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি কোন ক্ষেত্রে কত দিনের ভিসা দেওয়া হবে, কীভাবে নবায়ন হবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ অনুমোদন দেবে সেসব বিষয়ও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রায় দুই দশক ধরে এই নীতিমালার আলোকেই বাংলাদেশে বিদেশিদের ভিসা দেওয়া হচ্ছে।

কেন বদলানো হচ্ছে ভিসা নীতিমালা?

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছে, নতুন ভিসা নীতির প্রধান উদ্দেশ্য হলো বিদেশিদের বাংলাদেশে আগমন ও প্রস্থান সহজ ও সুশৃঙ্খল করা; বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা ও দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করা; পর্যটন ও আতিথেয়তা শিল্পকে উৎসাহিত করা; প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা; জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা; পারস্পরিকতা নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা করা; এবং আধুনিক সেবামুখী ও সময়োপযোগী অভিবাসন কাঠামো গড়ে তোলা।

গত ২ জুলাই সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তবে খসড়াটি তাৎক্ষণিক অনুমোদন না দিয়ে আরও পরিমার্জনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিকে সচিবিক সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নতুন ভিসা নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি বলেন, “এতদিন বাংলাদেশের ভিসা নীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল পারস্পরিকতা (Reciprocity)। অর্থাৎ কোনো দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের যত দিনের বা যে ধরনের ভিসা দিত, বাংলাদেশও সেই দেশের নাগরিকদের প্রায় একই সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করত।”

বাংলাদেশের ভিসা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ভিসা। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় শুধু পারস্পরিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে অনেক সময় দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নাসিমুল গনি আরও বলেন, “কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী যদি বাংলাদেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে সেই বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুধু পারস্পরিকতার হিসাব না করে দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।”

তার ভাষায়, সরকার চায় ভিসা নীতি আরও সহজ হোক এবং এর মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে একটি ‘ইকোনমিক থ্রাস্ট’ তৈরি হোক।

অর্থাৎ নতুন ভিসা নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকছে বিনিয়োগবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্যবসায়িক ভিসায় কী পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

নতুন ভিসা নীতির পূর্ণাঙ্গ খসড়া এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে সরকারের বক্তব্য এবং নীতির উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করলে ধারণা করা যায়, সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসতে পারে ব্যবসায়িক বা ‘বি’ (Business) শ্রেণির ভিসায়।

কারণ নতুন নীতির মূল লক্ষ্যই বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও দক্ষ জনশক্তিকে বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত করা। ফলে ব্যবসায়িক ভিসাকে আরও কার্যকর ও সময়োপযোগী করার দিকেই সরকার বেশি গুরুত্ব দেবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, “আগে ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে পারস্পরিকতার নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখন দেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায় আনা হচ্ছে। কোনো বিদেশি ব্যবসায়ী যদি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে সেটি দেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তাই ভিসা নীতিকে আরও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

২০০৬ সালের নীতিতে কী ছিল?

বর্তমানে কার্যকর ভিসা নীতিমালা-২০০৬ অনুযায়ী, বিদেশি ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, আমদানিকারক-রপ্তানিকারক, বাণিজ্যিক প্রতিনিধি এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘বি’ (Business) শ্রেণির ভিসার বিধান রয়েছে। এই ভিসার মাধ্যমে বিদেশিরা বাংলাদেশে এসে ব্যবসায়িক বৈঠক, বিনিয়োগের সম্ভাবনা যাচাই, যৌথ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রের ভিত্তিতে বিদেশি নাগরিককে সর্বোচ্চ ছয় মাসের ব্যবসায়িক ভিসা দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে একাধিকবার বাংলাদেশে প্রবেশের (মাল্টিপল এন্ট্রি) সুবিধাও দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করলে এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর ব্যবসায়িক ভিসার মেয়াদ বাড়াতে পারে। নীতিমালা অনুযায়ী, বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় একই শর্তে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

তবে এই ভিসা শুধু ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে চাকরি বা বেতনভিত্তিক কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। বিদেশি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশে চাকরি করতে চাইলে তাঁকে পৃথক কর্মভিসা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়।

কী কী পরিবর্তন আসছে?

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, নতুন নীতিমালায় ৩৪ ধরনের ভিসা ক্যাটাগরি রাখা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে আগত বিদেশিদের জন্য প্রক্রিয়াটি আরও স্পষ্ট ও সহজ হয়।

এ ছাড়া নতুন নীতিতে যেসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সেগুলো হলো, বিদেশিদের বাংলাদেশে আসা ও যাওয়া আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করা; বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা উৎসাহিত করা; দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করা; পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটানো; প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা; আধুনিক ও সেবামুখী অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা; জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

পুরনো ও নতুন নীতির মূল পার্থক্য কোথায়?

২০০৬ সালের নীতিমালার মূল দর্শন ছিল পারস্পরিকতা। অর্থাৎ অন্য দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের যে ধরনের ভিসা সুবিধা দিত, বাংলাদেশও সেই অনুযায়ী সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করত।

কিন্তু নতুন নীতিতে সেই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থ।

অর্থাৎ কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী, শিল্পোদ্যোক্তা বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের বাংলাদেশে আসা দেশের জন্য লাভজনক হলে, সেই বিষয়টিও ভিসা নীতিতে গুরুত্ব পাবে।

এ ছাড়া নতুন নীতিতে বিনিয়োগ, ব্যবসা, পর্যটন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনশক্তির চলাচলকে উৎসাহিত করার বিষয়টি আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, “আগে হিসাব ছিল পারস্পরিকতার ভিত্তিতে। তোমরা আমাদের যতদিনের ভিসা দেবে, আমরাও তোমাদের ততদিনের ভিসা দেব। ওরা যা দেবে, আমরাও তাই করব বা দেব। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের কিছু জায়গায় প্রয়োজন বেশি। একজন ব্যবসায়ী যদি বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসে, তা আমাদের জন্য সুবিধাজনক। সে এ দেশে বিনিয়োগ করতে পারবে। তো এ নিরিখে এই বোধটা আমাদের হয়েছে। সে কারণে বর্তমান সরকার চাচ্ছে একটা ইকোনমিক থ্রাস্ট হোক।”

বাংলাদেশের নতুন ভিসা নীতির প্রস্তাব শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারেরও প্রতিফলন। ২০ বছর আগে যখন ভিসা নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখন মূল গুরুত্ব ছিল বিদেশিদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং কূটনৈতিক পারস্পরিকতা। এখন সেই জায়গায় যুক্ত হয়েছে বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, পর্যটন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ মানবসম্পদের মতো নতুন বাস্তবতা।

সম্পর্কিত