ads

ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটগুলো কেন এত ত্রুটিপূর্ণ

দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারতের সরকারি ওয়েবসাইটগুলো কেন এত ত্রুটিপূর্ণ
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

লেখাটি পড়ার আগে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিতে পারেন। যে কাজটি করতে বলব, সেটি স্মার্টফোনে করা কিছুটা জটিল; তাই সম্ভব হলে ল্যাপটপের সামনে গিয়ে বসুন। এবার indianvisaonline.gov.in সাইটটিতে যান এবং দেখুন তো ভিসার আবেদনের কোনো উপায় খুঁজে পান কি না।

যদি সফল হয়ে থাকেন, তবে আপনাকে স্বাগতম! তবে সেই সাথে দুঃখও প্রকাশ করছি। কারণ এই মুহূর্তে আপনার বিভ্রান্ত মস্তিষ্কে নিশ্চয়ই একগাদা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

চলুন, একে একে সেগুলোর উত্তর দেওয়া যাক। প্রথম প্রশ্নের উত্তর হলো—না, ভারত সরকার বিদেশি পর্যটকদের ঘৃণা করে না। দেশটির নাগরিকদের জন্য নিজস্ব অনলাইন পরিষেবাগুলো যেমন: রেলের টিকিট কাটা, ভোটার নিবন্ধন বা আয়কর রিটার্ন দাখিল ঠিক সমানভাবেই কঠিন। আর এগুলো তো তাও তুলনামূলক ভালো সাইটগুলোর মধ্যে পড়ে!

বাকিগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেই সাইটগুলোতে পপ-আপ অ্যাড, লাইভ টেক্সট, ফ্ল্যাশিং গ্রাফিক্স, মন্ত্রীদের ছবি আর টেক্সট-ভিত্তিক ক্যাপচার এমন এক জগাখিচুড়ি মিশ্রণ থাকে, যা আজকাল বট ঠেকানোর চেয়ে মানুষকে বেশি নাস্তানাবুদ করছে। কোনো নাগরিক যদি অনেক কসরত করে সাইটের দরকারি অংশটি খুঁজেও পান, তবে তাকে ‘ব্রোকেন লিংকস’ অথবা রেলওয়ের সাইটে নামের ক্ষেত্রে মাত্র ১৬ অক্ষরের সীমাবদ্ধতার মতো বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়।

এমনকি পেছনের ব্যাক-এন্ড ব্যবস্থার অবস্থাও ভালো নয়। গত মে মাসে, ১৯ বছর বয়সী এক ‘এথিক্যাল হ্যাকার’ একটি স্কুল-সমাপনী পরীক্ষার সিস্টেমের বড় বড় ত্রুটিগুলো ফাঁস করে দেয়, যা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল।

এবার দ্বিতীয় প্রশ্নে আসা যাক। এখন ২০২৬ সাল, অথচ যে দেশটি বিশ্বজুড়ে তার নাগরিকদের আইটি দক্ষতার জন্য বিখ্যাত, তাদের ভিসার ওয়েবসাইটটি দেখতে ১৯৯৯ সালের কোনো ‘জিওসিটিস’ পেজের মতো লাগে কেন?

এর একটি প্রধান কারণ হলো, ভারত সরকারের দীর্ঘদিনের পদ্ধতিটি ছিল কাগজের প্রক্রিয়াগুলোকে পুরোপুরি নতুনভাবে সাজানোর পরিবর্তে কেবল ডিজিটাল ফর্মে রূপান্তর করা। ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সহজ করার জন্য ১৯৯৩ সালে তৈরি হওয়া ‘ইউএক্স’ বা ইউজার এক্সপেরিয়েন্স পরিভাষাটি ২০২৩ সালের আগে সরকারি ওয়েবসাইটের অফিশিয়াল নির্দেশিকাতেই যুক্ত হয়নি।

আরেকটি কারণ হলো, সরকারের নিজস্ব প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান—ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার (এনআইসি)-এর মন্ত্রণালয়গুলোর আবদার ঠেকানোর ক্ষমতা খুব কম থাকে। ফলে সাইটগুলোকে কাজের ফিচারের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিসে ভরিয়ে দিতে বাধ্য হতে হয়।

এনআইসি -এর ক্ষমতার বাইরের বড় প্রকল্পগুলোর জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের বেসরকারি খাতের দিকে তাকাতে হয়। সাধারণত এই কেনাকাটা বা আউটসোর্সিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন মধ্যস্তরের কর্মকর্তার ওপর, যার প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকে না বললেই চলে।

এই সমস্যার সমাধানে তখন বাজারের সেরা বিকল্পটিকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তারা প্রকল্পের নকশা তৈরি এবং প্রয়োজনীয়তার খসড়া সাজাতে নামী-দামী কনসালট্যান্ট বা পরামর্শকদের ওপর নির্ভর করেন। ফলে সবচেয়ে বড় কাজগুলোর দায়িত্ব পায় সেইসব আইটি পরিষেবা সংস্থা, যারা সাধারণত পশ্চিমা ক্লায়েন্টদের জন্য বিশ্বমানের পণ্য তৈরি করে।

তবুও, এই ব্যবস্থার ফলাফল প্রায়শই হতাশাজনক হয়। মুম্বাইয়ের থিংক-ট্যাংক ‘এক্সকেডিআর’-এর গবেষক সুসান থমাস একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে যুক্তি দিয়েছেন, আউটসোর্স করা প্রতিষ্ঠানের ওপর নকশা তৈরি এবং বাস্তবায়ন—উভয় বিষয়ের জন্য অতিরিক্ত নির্ভর করে সরকার নিজেকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে ফেলে দেয়। সরকার একটি সিস্টেম ঠিকই কেনে, ‘কিন্তু তারা আসলে কী কিনেছে বা কীভাবে এটিকে আরও উন্নত করতে হবে, তা বোঝার মতো অভ্যন্তরীণ দক্ষতা তাদের থাকে না। ফলে একটি কৌশলগত সম্পদ শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং অনিয়ন্ত্রিত এক দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়।’

সহজ কথায়, প্রযুক্তির এই গোলকধাঁধায় কর্মকর্তাদের নিজস্ব বোধশক্তি হারানোর জন্য কোনো উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রয়োজন পড়ে না; সিস্টেমের এই অব্যবস্থাপনাই তার জন্য যথেষ্ট।

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

একদম শেষ প্রশ্নে আসি—সরকারি সাইটগুলোর উন্নতির সম্ভাবনা আসলে খুবই কম। হয়তো খুব শিগগিরই তারা উন্নত ইউএক্স ব্যবহার করা শুরু করবে, কিন্তু আসল সমস্যাটি ওয়েব ডিজাইনের নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর।

পুরো আমলাতন্ত্র চলে মূলত ‘ঝুঁকি এড়ানোর’ নীতিতে। দুর্নীতি দমন সংস্থার ভয়ে কর্মকর্তারা অন্যান্য ভালো দিক বিবেচনা করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চোখ বুজে সবচেয়ে কম দরদাতাকে কাজ দিয়ে দেন। তারা নামী-দামী কনসালট্যান্টদের পেছনে প্রচুর অর্থ ঢালেন, কারণ কোনো সমস্যা হলে এই কনসালট্যান্টদের রিপোর্টই কর্মকর্তাদের জন্য আইনি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এই সিস্টেমে কোনো কর্মকর্তা যদি ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে অসাধারণ কোনো ফলাফলও এনে দেন, তার জন্য তিনি বাড়তি কোনো পুরস্কার পান না।

অথচ এর বিপরীত চিত্রটি দেখুন—যিনি ধারাবাহিকভাবে একটি বাজে বা ব্যর্থ প্রজেক্ট উপহার দিচ্ছেন, তাকে কোনো শাস্তি পেতে হয় না। যেমন, স্কুল-সমাপনী পরীক্ষার পুরো ডিজিটাল ব্যবস্থাটি যিনি লাটে তুলেছিলেন, সেই কর্মকর্তাকে শাস্তি না দিয়ে কেবল কৃষি মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে!

‘আধার’ নামক একটি জাতীয় বায়োমেট্রিক আইডি সিস্টেম তৈরি করার জন্য ভারত বিশ্বজুড়ে অনেক গর্ব করে; যা দেশটির সরকারি ও বেসরকারি খাতের অসংখ্য ডিজিটাল পরিষেবার মূল ভিত্তি হয়ে উঠেছে। কিন্তু আধারের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের একটি বড় কারণ ছিল—এটির নেতৃত্বে ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যার প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রশাসনিক ক্ষমতা দুই-ই ছিল।

তথ্যপ্রযুক্তি জায়ান্ট ‘ইনফোসিস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি এই শর্তেই প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়েছিলেন যে, তাকে একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক মর্যাদা দিতে হবে। এই ক্ষমতা ও মর্যাদা তাকে প্রচলিত লালফিতার দৌরাত্ম্যের বাইরে গিয়ে হিসাব-নিকাশ করে ঝুঁকি নেওয়ার, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করার এবং সিলিকন ভ্যালির প্রতিভাবান তরুণ প্রযুক্তিবিদদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিল।

খুব কম সরকারেরই বেসরকারি খাতের মতো বিপুল পারিশ্রমিক দিয়ে সেরা প্রযুক্তিবিদদের ধরে রাখার সামর্থ্য থাকে। তবে তারা মর্যাদা, কাজের স্বাধীনতা এবং দেশপ্রেমের অনন্য সুযোগ তৈরি করে এই প্রতিভাদের আকৃষ্ট করতে পারে; ভারত যা আধারের ক্ষেত্রে করে দেখিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সেই প্রজেক্টটি ঠিক কী কারণে সফল হয়েছিল, সেই শিক্ষাগুলো পরবর্তীতে অন্যান্য সরকারি প্রজেক্টে প্রয়োগ করতে ভারত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানে আইটি তৈরির নিয়মগুলো সংস্কার করার চেয়ে যে সংস্কৃতির অধীনে সেগুলো প্রয়োগ করা হয়, তা পরিবর্তন করা বেশি জরুরি। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

সম্পর্কিত