ads

এআই কঠিন কাজ পারে, সহজ কাজে পিছিয়ে কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
এআই কঠিন কাজ পারে, সহজ কাজে পিছিয়ে কেন?
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খুব দ্রুত বিশ্বকে বদলে দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মানবসভ্যতা কি আদৌ এই ঝড়ের সাথে তাল মেলাতে প্রস্তুত? বিশ্বজুড়ে এআই-এর নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং আইনি পরিকাঠামো এই প্রযুক্তির গতির কাছে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

এআই-এর অবিশ্বাস্য ক্ষমতা এবং মানুষের অপ্রস্তুত অবস্থার মধ্যকার এই আশঙ্কাজনক ফাটলকেই তুলে ধরেছে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘এআই ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৬’।

বিগত প্রায় এক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে নিখুঁত ও নিরপেক্ষ ডাটার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করছে এই ইনডেক্স। এবারের রিপোর্টে প্রথমবারের মতো বিজ্ঞান ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে এআই-এর বিপ্লব নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে থাকা আসল সত্য এবং শ্রমবাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে জেনারেটিভ এআই-এর প্রকৃত প্রভাব কেমন হতে যাচ্ছে—তার এক স্বাধীন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে হাজির হয়েছে এবারের বৈশ্বিক রিপোর্ট। এই ইন্ডেক্সে ১৫টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এআই-এর গতি কমছে না, বরং বাড়ছে: ২০২৫ সালে বিশ্বসেরা ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি তৈরি করেছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এই মডেলগুলো এখন পিএইচডি স্তরের বিজ্ঞান, মাল্টিমোডাল রিজনিং এবং গণিতে মানুষকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সফটওয়্যার কোডিংয়ের ক্ষেত্রে মাত্র এক বছরে এআই-এর কার্যকারিতা ৬০ শতাংশ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ব্যবধান শেষ: এআই মডেলের ক্ষমতায় আমেরিকা ও চীন এখন সমানে সমান। ২০২৫ সালের শুরুতে চীনের ‘ডিপসিক-আরওয়ান’ আমেরিকার শীর্ষ মডেলকে ছুঁয়ে ফেলেছিল। বর্তমানে আমেরিকার শীর্ষ মডেল থেকে মাত্র ২.৭% ব্যবধানে এগিয়ে। চীন পেটেন্ট, গবেষণা ও রোবট উৎপাদনে এগিয়ে, আর ইউএসএ শীর্ষ মডেল তৈরিতে। তবে মাথাপিছু এআই পেটেন্টের দিক থেকে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বে সবার ওপরে।

ডাটা সেন্টার ও চিপের একক নির্ভরতা: যুক্তরাষ্ট্রে ৫ হাজার ৪২৭টি ডেটা সেন্টার রয়েছে (অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে ১০ গুণ বেশি)। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, বিশ্বের প্রায় সব উন্নত এআই চিপ তৈরি হয় তাইওয়ানের একটিমাত্র কোম্পানি টিএসএমসিতে। 

কঠিন কাজ পারে, সহজ কাজে পিছিয়ে: এআই এখন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) স্বর্ণপদক জিততে পারে, কিন্তু সাধারণ অ্যানালগ ঘড়ি দেখে সময় বলতে পারে মাত্র ৫০.১ শতাংশ ক্ষেত্রে। অর্থাৎ, কঠিন কাজে পারদর্শী হলেও সাধারণ কিছু কাজে এআই এখনো পিছিয়ে।

ল্যাবে সেরা, ঘরের কাজে ফেল: রোবটগুলো ল্যাবের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ৮৯.৪% সফল হলেও, বাস্তব জীবনের ঘরকন্যার কাজে মাত্র ১২% সফল হচ্ছে। বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চয়তা তারা এখনো সামলাতে পারছে না।

নিরাপত্তার অভাব: এআই-এর ক্ষমতা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে তার নিরাপত্তা বা দায়িত্বশীলতা বাড়ছে না। এআই সংক্রান্ত দুর্ঘটনা ২০২৪ সালের ২৩৩টি থেকে বেড়ে ৩৬২টিতে দাঁড়িয়েছে। এআই-এর নিরাপত্তা বাড়াতে গেলে দেখা যাচ্ছে তার নির্ভুলতা কমে যাচ্ছে।

বিনিয়োগ বনাম প্রতিভার অভাব: যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালে এআই খাতে ২৮৫.৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা চীনের চেয়ে ২৩ গুণ বেশি। কিন্তু ২০১৭ সালের পর থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এআই গবেষকদের আমেরিকায় যাওয়ার হার ৮৯ শতাংশ কমে গেছে।

ঐতিহাসিক দ্রুততায় অ্যাডপশন: কম্পিউটার বা ইন্টারনেটের চেয়েও দ্রুত গতিতে এআই মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে । গত তিন বছরে মানুষের এআই ব্যবহার ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। 

উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি বনাম ছাঁটাই: কাস্টমার সাপোর্ট ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টে এআই-এর কারণে উৎপাদনশীলতা ১৪ শতাংশ থেকে ২৬ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু এর উল্টো পিঠ হলো, যুক্তরাষ্ট্রে ২২ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ সফটওয়্যার ডেভেলপারদের কর্মসংস্থান প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে।

পরিবেশের ওপর বড় আঘাত: এআই-এর কারণে কার্বন নিঃসরণ ও পানির অপচয় তীব্র হচ্ছে। গ্রোক ৪ মডেলটি ট্রেইন করতেই ৭২ হাজার ৮১৬ টন কার্বন নির্গত হয়েছে। আর জিপিটি-৪ চালাতে যে পরিমাণ পানি খরচ হচ্ছে, তা দিয়ে ১২ লাখ মানুষের বার্ষিক পানীয় জলের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

বিজ্ঞানে এআই: রসায়নের বিভিন্ন পরীক্ষায় এআই বিজ্ঞানীদের হারিয়ে দিচ্ছে। তবে এআই-এর ক্ষেত্রে বড় মডেল মানেই ভালো নয়; ছোট ছোট কিছু মডেল অনেক বড় মডেলকেও পারফরম্যান্সে হারিয়ে দিচ্ছে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে এআই: চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন ও নোট লেখার সময় এআই ৮৩% পর্যন্ত কমিয়ে দিয়েছে, যা তাদের মানসিক চাপ কমিয়েছে। তবে ৫০০টিরও বেশি মেডিকেল এআই স্টাডি ঘেঁটে দেখা গেছে, মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে আসল রোগীর ডেটা ব্যবহার করা হয়েছে, বাকিগুলো সব পরীক্ষার প্রশ্নের মতো ডামি ডেটা।

শিক্ষাক্ষেত্রে এআই: স্কুল-কলেজে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু কম স্কুলে এআই সংক্রান্ত নীতিমালা আছে। আর শিক্ষকরাও জানেন না কীভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।

এআই সার্বভৌমত্ব: প্রতিটি দেশ এখন নিজস্ব এআই পরিকাঠামো ও সুপারকম্পিউটার তৈরি করতে চাচ্ছে, যাতে অন্য দেশের ওপর নির্ভর করতে না হয়। এক্ষেত্রে ওপেন সোর্স কোডিংয়ে ইউরোপকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলো।

বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গির বিশাল ফাটল: কর্মক্ষেত্রে এআই-এর ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে ৭৩ শতাংশ বিশেষজ্ঞ আশাবাদী। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৩ শতাংশ। এআই নিয়ন্ত্রণে নিজ দেশের সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের আস্থা সবচেয়ে কম (৩১%) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ওপর বৈশ্বিক আস্থা সবচেয়ে বেশি।

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘এআই ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৬’-এর এই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এআই-এর বুদ্ধিমত্তা মানুষের চিরচেনা বিকাশ প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ উল্টো, যা গবেষকদের ভাষায় একটি ‘জ্যাগেড ফ্রন্টিয়ার’ বা অসম সীমানা।

মানুষ স্বভাবতই প্রথমে সহজ কাজ (যেমন: ঘড়ি দেখা বা ঘরের অগোছালো জিনিসপত্র গোছানো) শেখে এবং দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় কঠিন কাজ (যেমন: উচ্চতর গণিত বা কোডিং) আয়ত্ত করে, কিন্তু এআই তৈরি হয়েছে লজিক, ডাটা প্যাটার্ন এবং গাণিতিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে। ফলে যে কাজে কোটি কোটি ডাটা ও নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে (যেমন অলিম্পিয়াডের গণিত বা রসায়নের ফর্মুলা), সেখানে এআই মানুষের পিএইচডি লেভেলকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। অথচ, বাস্তব পৃথিবীর অনিশ্চয়তা, মানুষের সহজাত সাধারণ জ্ঞান বোঝার মতো কোনো ‘চেতনা’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক নমনীয়তা এআই-এর নেই। আর এই কারণেই  এআই কঠিন কাজ পারে, সহজ কাজে পিছিয়ে থাকে।

সম্পর্কিত