ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি ও বৃহত্তর ভূরাজনীতি
চরচা ডেস্ক
ইরান: মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি ও বৃহত্তর ভূরাজনীতি
চরচা ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮: ৩৩
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সংকটের প্রতিফলন নয়; এর পেছনে রয়েছে জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা বাড়ছে, তা একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার হিসাব, অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইসরায়েল ফ্যাক্টর: নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কৌশল
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ। তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, হামাস কিংবা সিরিয়া-ভিত্তিক মিলিশিয়াদের উপস্থিতি ইসরায়েলের উত্তরের ও দক্ষিণের সীমান্তে চাপ তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ইসরায়েলের জন্য একটি পরোক্ষ নিরাপত্তা ছাতা হিসেবে কাজ করতে পারে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা নজরদারি অবকাঠামো–সবই ইরানের সম্ভাব্য আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করার কৌশলগত বার্তা বহন করে।
তবে একই সঙ্গে এটি ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে। যদি ইসরায়েল নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
চীন ও রাশিয়ার অবস্থান: নীরব পর্যবেক্ষক নাকি সক্রিয় খেলোয়াড়?
ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়; এটি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরান রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দিয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করেছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, রাশিয়া হয়তো সরাসরি সামরিকভাবে জড়াবে না, তবে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দিতে পারে–যা সংঘাতের আন্তর্জাতিক মাত্রা বাড়াতে পারে।
চীন: চীন ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল ক্রেতাদের একটি এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়। কারণ, অঞ্চলটি তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চায়, অন্যদিকে বড় আকারের সংঘাত এড়াতে আগ্রহী। ফলে তারা কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যেমনটি সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে দেখা গিয়েছিল।
সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ইরান অতীতে ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা এই কৌশলগত জলপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
যদি উত্তেজনা বাড়ে:
তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে
জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো চাপে পড়তে পারে
বিশেষ করে ইউরোপ, চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো সরাসরি প্রভাবিত হবে।
এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত কেবল সামরিক নয়; অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটেও রূপ নিতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য
উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত–একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক। তারা অতীতে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছে। ফলে বৃহত্তর সংঘাত তাদের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে জটিল করে তোলে। কারণ, সামরিক ঘাঁটি থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
শক্তি প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকা: মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কেবল প্রতিরোধের বার্তা দেবে।
সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নির্দিষ্ট স্থাপনায় আঘাত করতে পারে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়।
প্রক্সি সংঘাত বৃদ্ধি: সরাসরি যুদ্ধের বদলে ইরান, মিলিশিয়া ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘাত বাড়াতে পারে।
জ্বালানি ও বাণিজ্যিক চাপ বৃদ্ধি: ইরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি
বহুমাত্রিক সংঘাতের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন শুধু একটি সামরিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক সংকেত। ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব, রাশিয়া-চীনের কৌশলগত ভারসাম্য, উপসাগরীয় মিত্রদের দ্বিধা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার–সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা একটি বহুস্তরীয় সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত এখন শুধু যুদ্ধ বা শান্তির প্রশ্ন নয়; বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি কতটা?
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা, গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও নৌঘাঁটি এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে।
কোথায় কোথায় রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি?
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
বাহরাইন: বাহরাইনে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ তদারক করে।
কাতার: দোহার উপকণ্ঠে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর কৌশলগত সদর দপ্তর। এটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। এখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে।
কুয়েত: ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুয়েরিং কুয়েতের প্রধান মার্কিন ঘাঁটি। এ ছাড়া ইরাক সীমান্তবর্তী আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিও গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েতে মোট প্রায় ১৩,৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৩,৫০০ মার্কিন সেনা এবং আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এখানে অবস্থিত। ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন নজরদারি মিশনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরাক ও সিরিয়া: ইরাকের আইন আল-আসাদ ও এরবিল বিমানঘাঁটি মার্কিন উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু। ইরাকে প্রায় ২,৫০০ এবং সিরিয়ায় ২ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।
সৌদি আরব: প্রায় ২,৭০০ সেনা সৌদি আরবে অবস্থান করছে। রাজধানী রিয়াদের কাছে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, যেখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে।
জর্ডান: আজরাকের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি লেভান্ত অঞ্চলে মার্কিন মিশনের মূল কেন্দ্র। জর্ডানে প্রায় ৩,৮০০ সেনা রয়েছে।
তুরস্ক: দক্ষিণ আদানায় ইনসিরলিক বিমানঘাঁটি তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হয়। সেখানে মার্কিন পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে জানা যায়।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিমানবাহী রণতরী ও নৌবহর: ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন–একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। একে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। এতে রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান, স্টেলথ জেট ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা। জাহাজটিতে প্রায় ৫,৬৮০ জন ক্রু রয়েছে।
আরও কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার ও বিশেষায়িত যুদ্ধজাহাজ অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও ভূমধ্যসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আকাশপথে শক্তি বৃদ্ধি: এফ-১৫, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাঙ্কার এবং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান অঞ্চলে এসেছে। ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা সক্ষমতাসম্পন্ন আরসি-১৩৫ রিভেট জয়েন্ট বিমান কাতারে অবতরণ করেছে। এ ছাড়া থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
আঞ্চলিক ঘাঁটি কি ইরানে হামলায় ব্যবহৃত হবে?
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইতোমধ্যে এমন অবস্থান জানিয়েছে। কাতার, ওমান ও তুরস্কও সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরান আল-উদেইদ ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। তবে আগাম সতর্কবার্তার কারণে বড় ক্ষতি হয়নি সে সময়।
ঝুঁকি ও আশঙ্কা
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে তারা লোহিত সাগরে পুনরায় জাহাজে হামলা শুরু করবে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারাও প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জর্ডান-ইরাক সীমান্তে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে গোটা অঞ্চল বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সংকটের প্রতিফলন নয়; এর পেছনে রয়েছে জটিল আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। ইরানকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা বাড়ছে, তা একদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তার হিসাব, অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ইসরায়েল ফ্যাক্টর: নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ কৌশল
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগ। তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ, হামাস কিংবা সিরিয়া-ভিত্তিক মিলিশিয়াদের উপস্থিতি ইসরায়েলের উত্তরের ও দক্ষিণের সীমান্তে চাপ তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ইসরায়েলের জন্য একটি পরোক্ষ নিরাপত্তা ছাতা হিসেবে কাজ করতে পারে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গোয়েন্দা নজরদারি অবকাঠামো–সবই ইরানের সম্ভাব্য আগ্রাসনকে নিরুৎসাহিত করার কৌশলগত বার্তা বহন করে।
তবে একই সঙ্গে এটি ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনাকে আরও উসকে দিতে পারে। যদি ইসরায়েল নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে একতরফা পদক্ষেপ নেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
চীন ও রাশিয়ার অবস্থান: নীরব পর্যবেক্ষক নাকি সক্রিয় খেলোয়াড়?
ইরান শুধু একটি আঞ্চলিক শক্তি নয়; এটি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
রাশিয়া: ইউক্রেন যুদ্ধের পর মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইরান রাশিয়াকে ড্রোনসহ সামরিক সহায়তা দিয়েছে বলে পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করেছে। এর বিনিময়ে রাশিয়া ইরানকে সামরিক প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, রাশিয়া হয়তো সরাসরি সামরিকভাবে জড়াবে না, তবে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দিতে পারে–যা সংঘাতের আন্তর্জাতিক মাত্রা বাড়াতে পারে।
চীন: চীন ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল ক্রেতাদের একটি এবং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে। বেইজিং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়। কারণ, অঞ্চলটি তার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চায়, অন্যদিকে বড় আকারের সংঘাত এড়াতে আগ্রহী। ফলে তারা কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যেমনটি সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে দেখা গিয়েছিল।
সম্ভাব্য সংঘাতের সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের বাজারে। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়। ইরান অতীতে ইঙ্গিত দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা এই কৌশলগত জলপথে চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
যদি উত্তেজনা বাড়ে:
তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে
বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে
জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতিগুলো চাপে পড়তে পারে
বিশেষ করে ইউরোপ, চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো সরাসরি প্রভাবিত হবে।
এমন পরিস্থিতিতে সংঘাত কেবল সামরিক নয়; অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংকটেও রূপ নিতে পারে।
আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য
উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত–একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক। তারা অতীতে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছু শিখেছে। ফলে বৃহত্তর সংঘাত তাদের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে জটিল করে তোলে। কারণ, সামরিক ঘাঁটি থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে সীমাবদ্ধ হতে পারে।
শক্তি প্রদর্শনেই সীমাবদ্ধ থাকা: মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কেবল প্রতিরোধের বার্তা দেবে।
সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নির্দিষ্ট স্থাপনায় আঘাত করতে পারে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়।
প্রক্সি সংঘাত বৃদ্ধি: সরাসরি যুদ্ধের বদলে ইরান, মিলিশিয়া ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে সংঘাত বাড়াতে পারে।
জ্বালানি ও বাণিজ্যিক চাপ বৃদ্ধি: ইরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি
বহুমাত্রিক সংঘাতের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখন শুধু একটি সামরিক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি ভূরাজনৈতিক সংকেত। ইসরায়েলের নিরাপত্তা হিসাব, রাশিয়া-চীনের কৌশলগত ভারসাম্য, উপসাগরীয় মিত্রদের দ্বিধা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার–সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা একটি বহুস্তরীয় সমীকরণে পরিণত হয়েছে।
তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত এখন শুধু যুদ্ধ বা শান্তির প্রশ্ন নয়; বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৃহৎ শক্তির প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি কতটা?
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। হাজার হাজার মার্কিন সেনা, গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও নৌঘাঁটি এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এ অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে।
কোথায় কোথায় রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি?
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
বাহরাইন: বাহরাইনে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যা উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের কিছু অংশ তদারক করে।
কাতার: দোহার উপকণ্ঠে অবস্থিত আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)-এর কৌশলগত সদর দপ্তর। এটি অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। এখানে প্রায় ১০ হাজার সেনা রয়েছে।
কুয়েত: ক্যাম্প আরিফজান ও ক্যাম্প বুয়েরিং কুয়েতের প্রধান মার্কিন ঘাঁটি। এ ছাড়া ইরাক সীমান্তবর্তী আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিও গুরুত্বপূর্ণ। কুয়েতে মোট প্রায় ১৩,৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ৩,৫০০ মার্কিন সেনা এবং আল-ধাফরা বিমানঘাঁটি এখানে অবস্থিত। ইসলামিক স্টেটবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন নজরদারি মিশনে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরাক ও সিরিয়া: ইরাকের আইন আল-আসাদ ও এরবিল বিমানঘাঁটি মার্কিন উপস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু। ইরাকে প্রায় ২,৫০০ এবং সিরিয়ায় ২ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে।
সৌদি আরব: প্রায় ২,৭০০ সেনা সৌদি আরবে অবস্থান করছে। রাজধানী রিয়াদের কাছে প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা কেন্দ্র, যেখানে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে।
জর্ডান: আজরাকের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি লেভান্ত অঞ্চলে মার্কিন মিশনের মূল কেন্দ্র। জর্ডানে প্রায় ৩,৮০০ সেনা রয়েছে।
তুরস্ক: দক্ষিণ আদানায় ইনসিরলিক বিমানঘাঁটি তুর্কি বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হয়। সেখানে মার্কিন পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে জানা যায়।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিমানবাহী রণতরী ও নৌবহর: ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন–একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী। একে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে আরব সাগরে মোতায়েন করা হয়েছে। এতে রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত ডেস্ট্রয়ার, যুদ্ধবিমান, স্টেলথ জেট ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সক্ষমতা। জাহাজটিতে প্রায় ৫,৬৮০ জন ক্রু রয়েছে।
আরও কয়েকটি ডেস্ট্রয়ার ও বিশেষায়িত যুদ্ধজাহাজ অঞ্চলটিতে অবস্থান করছে। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডও ভূমধ্যসাগরের দিকে অগ্রসর হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
আকাশপথে শক্তি বৃদ্ধি: এফ-১৫, এফ-২২ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, আকাশে জ্বালানি ভরার ট্যাঙ্কার এবং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমান অঞ্চলে এসেছে। ইলেকট্রনিক গোয়েন্দা সক্ষমতাসম্পন্ন আরসি-১৩৫ রিভেট জয়েন্ট বিমান কাতারে অবতরণ করেছে। এ ছাড়া থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও মোতায়েনের প্রস্তুতি চলছে।
আঞ্চলিক ঘাঁটি কি ইরানে হামলায় ব্যবহৃত হবে?
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ স্পষ্ট জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড, আকাশসীমা বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ইতোমধ্যে এমন অবস্থান জানিয়েছে। কাতার, ওমান ও তুরস্কও সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর তেহরান আল-উদেইদ ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানে। তবে আগাম সতর্কবার্তার কারণে বড় ক্ষতি হয়নি সে সময়।
ঝুঁকি ও আশঙ্কা
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে তারা লোহিত সাগরে পুনরায় জাহাজে হামলা শুরু করবে। ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়ারাও প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে জর্ডান-ইরাক সীমান্তে ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪০ জনের বেশি আহত হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলো আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করলে গোটা অঞ্চল বৃহত্তর সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।