বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলোর ক্ষেত্রে আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি বরাবরই একপেশে হয়ে থাকে, তবে ট্রাম্পের আমলে তা একেবারেই বৈরী রূপ নিয়েছে। আমেরিকা এখন তার মিত্র বা প্রতিদ্বন্দ্বী–উভয়ের সঙ্গেই স্বার্থকেন্দ্রিক, বর্জনমূলক এবং লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক অনুসরণ করছে।
ট্রাম্পের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মনোভাবও ইতিবাচক নয়। ন্যাটোভুক্ত দেশ ডেনমার্ক এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ডেনমার্কের মালিকানাধীন গ্রিনল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রাসী আচরণ এই সম্পর্কে চিড় ধরিয়েছে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী দেশ কানাডা নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে চলে আসছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, কানাডার নিজের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত। এছাড়া ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনার ফলে আমেরিকার প্রতিবেশী দেশগুলো সার্বভৌমত্বের ঝুঁকিতে আছে।
‘ওয়ার্ল্ড মাইনাস ওয়ান’ কল্পনার কি অবসান হবে? এটা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বহিরাগত চাপ–উভয়ের ওপরই। ট্রাম্প যতই বহুপাক্ষিক চুক্তি প্রত্যাহার করুক বা বৈদেশিক সাহায্য কমিয়ে দিন, বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার প্রভাব হ্রাস পবে না। কারণ ট্রাম্প আর আমেরিকা এক নয়। ২০২৫ সালের মার্চে পরিচালিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ৪৭ শতাংশ বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সম্পৃক্ততাকে সমর্থন করেন, ৬৪ শতাংশ মনে করেন প্রধান আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আমেরিকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে খাদ্য, ওষুধ ও পোশাক সরবরাহের জন্য বৈদেশিক সহায়তা দেওয়ার পক্ষে।
আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের প্রভাব ঝেড়ে ফেলতে পারে, তখন বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত? এটা নির্ভর করবে নতুন যিনি দায়িত্বে আসবেন তিনি আগের ক্ষতি পোষাতে কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করবেন তার ওপর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশটি কত দ্রুত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পুনরায় যোগ দেবে যেখান থেকে তারা সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নিয়েছিল, বিভিন্ন সংগঠনের আটকে রাখা চাঁদা পরিশোধ করবে, অথবা আমেরিকার পুরনো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মনোযোগী হবে, ট্রাম্পের কারণে যে সম্পর্কে ছেদ পড়েছিল। ওয়াশিংটন যাই পদক্ষেপ নিক, বিভিন্ন অঞ্চলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়া ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের হুমকির কারণে আমেরিকার আধিপত্য মেনে নিতে আগ্রহী হতে পারে। বিপরীতে, ব্রিকস দেশগুলো আমেরিকার পূর্ববর্তী অর্থনৈতিক ভূমিকা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে।
বিশ্বব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের প্রত্যাবর্তন কেমন হতে পারে সম্ভাব্য দুটি দৃশ্যপটের মাধ্যমে তা অনুমান করা যায়। প্রথমত, পথভ্রষ্ট পুত্র ভুল শুধরে ফিরে আসলে পরিবার তাকে যেভাবে গ্রহণ করে, বিশ্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্রকে সেভাবে গ্রহণ করতে পারে। ওয়াশিংটনের উদারপন্থী অভিজাতরা এরকম কিছুর প্রত্যাশা করছেন। কিন্তু এই দৃশ্যপট বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব হয়তো আমেরিকাকে ক্ষমা করে দেবে, কিন্তু ট্রাম্পের বছরগুলোতে সৃষ্ট ক্ষতির কথা ভুলে যাবে না। ফলে আমেরিকার পক্ষে তার সাবেক মিত্র ও অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হবে– এমনকি পশ্চিমা বিশ্বেও।
দ্বিতীয় পরিস্থিতির ক্ষেত্রে যা হতে পারে বিশ্ব তখন আমেরিকার সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে অনেক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করবে। কিন্তু ওয়াশিংটনকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের মুকুট পরতে দেখতে চাইবে না।
সংক্ষেপে বলা যায়, আমেরিকার ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বা উদার আধিপত্য ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই। ট্রাম্পের পরে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন– সে রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট যেই হোক, ট্রাম্প বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার প্রতি আস্থা ও নির্ভরতার ভিত্তি ভেঙে দিয়েছেন।
এর ফল হবে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা– যেখানে শুধু আমেরিকা না, বরং অন্যান্য বৃহৎ ও মধ্যম শক্তিও প্রভাব বিস্তার করবে, যারা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের জালে পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।
অর্থাৎ আমেরিকা যখন আবার বহুপাক্ষিক সম্পর্কে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হবে, ততদিনে বিশ্ব অনেকটা এগিয়ে যাবে। এমনও হতে পারে যে ওয়াশিংটনের সামনে একমাত্র পথ থাকবে–আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে দুর্বল এক সত্তা হিসেবে টিকে থাকা।
(প্রখ্যাত মার্কিন সাময়িকী ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত নিবন্ধ অনুসারে)