চরচা ডেস্ক

শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনব্যবস্থা এখন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগে তারা কোনো দ্বিধা দেখাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতিগুলো এমন এক কৌশলের প্রতিফলন, যা সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা অশান্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ট্রাম্পের উত্তেজনা বৃদ্ধি ও চাপ প্রয়োগের কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এমনকি এই পরিস্থিতি তাকে রাজনৈতিকভাবে জটিল অবস্থায় ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। যা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন তিনি ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে এমন হামলা শুরু করেছেন। কিন্তু তেহরান ট্রাম্পের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি সংঘাত আরও বাড়িয়ে ইরানকে তার শর্ত মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারেন, তবে এতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং তীব্র অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। আবার তিনি বিজয়ের দাবি করে সরেও দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বজায় থাকায় সেই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সিএনএন বলছে, এই জটিলতা থেকে বের হতে ট্রাম্প এমন একটি পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে মার্কিন সামরিক শক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের সামনে নতি স্বীকার না করার অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। হরমুজে অবরোধ আরোপ করে তিনি ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে চান। যদিও এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান সংকটের সমাধান খোঁজা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ যুদ্ধ পরিচালনায় বারবার ট্রাম্পের স্থিরতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে তার এই প্রবণতা দেখা গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের এক করতে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি জোট ছাড়ার হুমকিও সদস্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ থেকে সরে আসতে রাজি করাতে পারেনি। ফলে অতীতে যেসব বিকল্প যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারত, সেগুলোর কিছু এখন আর তার হাতে নেই।
কখনো কখনো ট্রাম্পের কঠোর ও সরাসরি কৌশল কার্যকর হয়েছে, যেমন শুল্কযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে কিছু চুক্তি আদায় করতে পেরেছিলেন। অবশ্য সেখানেও চীন ছিল ব্যতিক্রম। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাবে নিজেদের বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয় চীন। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা দেখিয়ে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে বেইজিং এবং ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই অভিজ্ঞতা থেকে ইরান শিখেছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হতে পারে। তাই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
সিএনএন বলছে, ট্রাম্পের ক্ষমতা যে কিছু ক্ষেত্রে কমে আসছে, এমন ধারণা শুধু ইরান ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানকে সমর্থন দিতে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগালেও তা ব্যর্থ হন ট্রাম্প। ভোটে হেরেছেন অরবান, এটি ইউরোপে ট্রাম্পের নীতিতে বড় ধাক্কা।
একইভাবে ট্রাম্পের কিছু অভ্যন্তরীণ নীতিও প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে। মিনেসোটায় এ বছরের শুরুতে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই আমেরিকানের মৃত্যুর পর জনমতের চাপে তিনি তার গণ-নির্বাসন কর্মসূচি থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের শাস্তি দিতে আইনের ব্যবহার করার তার বেশিরভাগ প্রচেষ্টার ব্যর্থ হয়েছে। যেকারণে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে অপসারণ করা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে সংবিধানিক কিছু সীমারেখা এখনো তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এমনকি মার্কিন নাগরিক পোপ লিও চতুর্দশ ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসনকে আমি ভয় পাই না।”তার এই অবস্থানে ট্রাম্প বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
ট্রাম্প বারবারই জানিয়েছেন যে তিনি নিজেকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন। গত আগস্টে তিনি বলেন, “আমি যা চাই তা করার অধিকার আমার আছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।”
এ বছর এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বিদেশে তার কর্মকাণ্ডের একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো ‘নিজের নৈতিকতা’।
কংগ্রেসের মতামত না নেওয়া এবং ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ শুরুর আগে দেশকে প্রস্তুত না করার সিদ্ধান্তে তার এই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
ইরান ইস্যুতে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, “শুধু প্রেসিডেন্টই জানেন তিনি কী করবেন।” তাদের এমন বক্তব্য ক্ষমতা ভাগাভাগির গণতান্ত্রিক নীতিকে উপেক্ষার একটি প্রবণতা তুলে ধরে।
দ্বিতীয় মেয়াদে শক্তি ও উত্তেজনা বৃদ্ধির নীতিকে ট্রাম্প যেভাবে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তা ব্যাখ্যা করেছেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার। গত জানুয়ারিতে তিনি সিএনএনকে বলেন, “আমরা এমন এক বাস্তব দুনিয়ায় বাস করি, যা শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত।”

বিশ্লেষকরা বলেন, ট্রাম্পের প্রভাব খাটানোর কৌশল তার প্রেসিডেন্সির শুরুর দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ছিল। তিনি রিপাবলি
কান পার্টিকে নিজের ইচ্ছার বাহন হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যা জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তার সিদ্ধান্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে অনীহা দেখিয়েছে।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে আটক করার ঘটনাকে ট্রাম্পের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। পাশাপাশি, তার তথাকথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’ অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে তিনি আর্জেন্টিনা ও হন্ডুরাসে সমমনা নেতাদের নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেন।
তবে ইরান ইস্যুতে এসে ট্রাম্পের ভাগ্য যেন বদলাতে শুরু করেছে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ শতকের অন্যান্য সব সংঘাতের মতো ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে শক্তির প্রদর্শন দেখা গেলেও দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক বাস্তবতা। সেটি হলো, শুধু আকাশপথে আধিপত্য দিয়ে নিশ্চিত বিজয় বা শাসন পরিবর্তন আনা যায় না।
সিএনএন বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের অবরোধকে একদিকে দেখা যায় তার নিজের এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে। এতে আলোচনায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। ইরানের তেল বিক্রি ও আমদানি বন্ধ করে দিলে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে এবং তখন তারা ট্রাম্পের শর্তে শান্তি চাইতে বাধ্য হতে পারে। তবে যুদ্ধের একটি বড় শিক্ষা হলো-ইরানের নেতৃত্ব এটিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে এবং প্রয়োজনে জনগণকে চরম কষ্টের মুখে ঠেলে দিতেও প্রস্তুত। তারা হয়তো ধারণা করছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বাড়লে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা সীমিত হবে। অবরোধের প্রভাব পুরোপুরি পড়তে কয়েক মাস লাগতে পারে, যে সময়টা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বিলাসিতা।
একইভাবে, ইউরোপেও ট্রাম্পের পক্ষে নিজের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ‘মাগা (মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ, তাকে এই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ নেতা হিসেবে দেখা হতো। তিনি ট্রম্পের অভিবাসন ও গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং ব্যবসা ও আইনব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার নীতির সমর্থক ছিলেন।
তার বিদায়ের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ট্রাম্পের একটি ঘনিষ্ঠ মিত্রও কমে গেল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্যও এটি হতাশার বিষয়, কারণ তিনি সম্প্রতি হাঙ্গেরিতে গিয়ে অরবানের পক্ষে সমর্থন চেয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলেন, এ ঘটনার মধ্যে মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। হাঙ্গেরির ফলাফল কোনোভাবেই বামপন্থী প্রগতিশীল আদর্শের জয় নয়। বিজয়ী প্রার্থী পিটার মাজিয়ার নিজেও একজন মধ্য-ডানপন্থী নেতা, যিনি একসময় অরবানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আর যদি তিনি ইউরোপের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো (দুর্বল অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা) সমাধান করতে না পারেন, তাহলে পপুলিজম বা জনমুখী রাজনীতির প্রভাব ভবিষ্যতেও থেকে যেতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহত্তর অর্থে অরবানের পতনের মানে হলো, যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা নেতৃত্বে একজন ‘শক্তিশালী নেতা’ অনেক ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন, তার দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে টিকে থাকা কঠিন। কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সমস্যা বা রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। এগুলো শেষ পর্যন্ত এমন নেতাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
ট্রাম্পের সীমাহীন ক্ষমতার বিশ্বাস কখনোই সংবিধান বা আমেরিকার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্সির স্বাভাবিক ক্ষয়ও তাকে আরও দুর্বল করতে পারে। একইসঙ্গে ইরান বাইরের দিক থেকে তার শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
তবে এতে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন উঠে আসে–তার ক্ষমতা যে কমে যাচ্ছে না, তা প্রমাণ করতে তিনি কী করতে পারেন?

শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনব্যবস্থা এখন দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে যে অর্থনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগে তারা কোনো দ্বিধা দেখাননি।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের নীতিগুলো এমন এক কৌশলের প্রতিফলন, যা সংঘাত ও উত্তেজনা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা অশান্তি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ট্রাম্পের উত্তেজনা বৃদ্ধি ও চাপ প্রয়োগের কৌশলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এমনকি এই পরিস্থিতি তাকে রাজনৈতিকভাবে জটিল অবস্থায় ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। যা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন তিনি ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে এমন হামলা শুরু করেছেন। কিন্তু তেহরান ট্রাম্পের দাবির কাছে নতি স্বীকার না করায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি সংঘাত আরও বাড়িয়ে ইরানকে তার শর্ত মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করতে পারেন, তবে এতে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে এবং তীব্র অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। আবার তিনি বিজয়ের দাবি করে সরেও দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বজায় থাকায় সেই দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সিএনএন বলছে, এই জটিলতা থেকে বের হতে ট্রাম্প এমন একটি পথ বেছে নিয়েছেন, যেখানে মার্কিন সামরিক শক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের সামনে নতি স্বীকার না করার অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। হরমুজে অবরোধ আরোপ করে তিনি ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে চান। যদিও এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে গুরুতর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান সংকটের সমাধান খোঁজা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। কারণ যুদ্ধ পরিচালনায় বারবার ট্রাম্পের স্থিরতার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে তার এই প্রবণতা দেখা গেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে ন্যাটো মিত্রদের এক করতে ব্যর্থ হয়েছেন ট্রাম্প। এমনকি জোট ছাড়ার হুমকিও সদস্য দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ থেকে সরে আসতে রাজি করাতে পারেনি। ফলে অতীতে যেসব বিকল্প যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারত, সেগুলোর কিছু এখন আর তার হাতে নেই।
কখনো কখনো ট্রাম্পের কঠোর ও সরাসরি কৌশল কার্যকর হয়েছে, যেমন শুল্কযুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে কিছু চুক্তি আদায় করতে পেরেছিলেন। অবশ্য সেখানেও চীন ছিল ব্যতিক্রম। ট্রাম্পের শুল্ক হুমকির জবাবে নিজেদের বিরল খনিজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দেয় চীন। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কা দেখিয়ে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে বেইজিং এবং ট্রাম্পকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই অভিজ্ঞতা থেকে ইরান শিখেছে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ধাক্কায় যুক্তরাষ্ট্র দুর্বল হতে পারে। তাই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
সিএনএন বলছে, ট্রাম্পের ক্ষমতা যে কিছু ক্ষেত্রে কমে আসছে, এমন ধারণা শুধু ইরান ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। হাঙ্গেরিতে ভিক্টর অরবানকে সমর্থন দিতে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগালেও তা ব্যর্থ হন ট্রাম্প। ভোটে হেরেছেন অরবান, এটি ইউরোপে ট্রাম্পের নীতিতে বড় ধাক্কা।
একইভাবে ট্রাম্পের কিছু অভ্যন্তরীণ নীতিও প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছে। মিনেসোটায় এ বছরের শুরুতে ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই আমেরিকানের মৃত্যুর পর জনমতের চাপে তিনি তার গণ-নির্বাসন কর্মসূচি থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। এছাড়া রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের শাস্তি দিতে আইনের ব্যবহার করার তার বেশিরভাগ প্রচেষ্টার ব্যর্থ হয়েছে। যেকারণে অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে অপসারণ করা হয়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে সংবিধানিক কিছু সীমারেখা এখনো তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
এমনকি মার্কিন নাগরিক পোপ লিও চতুর্দশ ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, “ট্রাম্প প্রশাসনকে আমি ভয় পাই না।”তার এই অবস্থানে ট্রাম্প বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
ট্রাম্প বারবারই জানিয়েছেন যে তিনি নিজেকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতার অধিকারী মনে করেন। গত আগস্টে তিনি বলেন, “আমি যা চাই তা করার অধিকার আমার আছে। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।”
এ বছর এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বিদেশে তার কর্মকাণ্ডের একমাত্র নিয়ন্ত্রণ হলো ‘নিজের নৈতিকতা’।
কংগ্রেসের মতামত না নেওয়া এবং ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধ শুরুর আগে দেশকে প্রস্তুত না করার সিদ্ধান্তে তার এই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা যায়।
ইরান ইস্যুতে পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা প্রায়ই বলেন, “শুধু প্রেসিডেন্টই জানেন তিনি কী করবেন।” তাদের এমন বক্তব্য ক্ষমতা ভাগাভাগির গণতান্ত্রিক নীতিকে উপেক্ষার একটি প্রবণতা তুলে ধরে।
দ্বিতীয় মেয়াদে শক্তি ও উত্তেজনা বৃদ্ধির নীতিকে ট্রাম্প যেভাবে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছেন তা ব্যাখ্যা করেছেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার। গত জানুয়ারিতে তিনি সিএনএনকে বলেন, “আমরা এমন এক বাস্তব দুনিয়ায় বাস করি, যা শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত।”

বিশ্লেষকরা বলেন, ট্রাম্পের প্রভাব খাটানোর কৌশল তার প্রেসিডেন্সির শুরুর দিকে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর ছিল। তিনি রিপাবলি
কান পার্টিকে নিজের ইচ্ছার বাহন হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, যা জনপ্রিয়তা কমে গেলেও তার সিদ্ধান্তগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে অনীহা দেখিয়েছে।
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বিশেষ বাহিনীর অভিযানে আটক করার ঘটনাকে ট্রাম্পের বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। পাশাপাশি, তার তথাকথিত ‘ডনরো ডকট্রিন’ অনুযায়ী পশ্চিম গোলার্ধে প্রভাব বিস্তারের অংশ হিসেবে তিনি আর্জেন্টিনা ও হন্ডুরাসে সমমনা নেতাদের নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেন।
তবে ইরান ইস্যুতে এসে ট্রাম্পের ভাগ্য যেন বদলাতে শুরু করেছে। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের ২১ শতকের অন্যান্য সব সংঘাতের মতো ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে শক্তির প্রদর্শন দেখা গেলেও দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এক বাস্তবতা। সেটি হলো, শুধু আকাশপথে আধিপত্য দিয়ে নিশ্চিত বিজয় বা শাসন পরিবর্তন আনা যায় না।
সিএনএন বলছে, হরমুজ প্রণালিতে ট্রাম্পের অবরোধকে একদিকে দেখা যায় তার নিজের এবং যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে। এতে আলোচনায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। ইরানের তেল বিক্রি ও আমদানি বন্ধ করে দিলে দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়তে পারে এবং তখন তারা ট্রাম্পের শর্তে শান্তি চাইতে বাধ্য হতে পারে। তবে যুদ্ধের একটি বড় শিক্ষা হলো-ইরানের নেতৃত্ব এটিকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে এবং প্রয়োজনে জনগণকে চরম কষ্টের মুখে ঠেলে দিতেও প্রস্তুত। তারা হয়তো ধারণা করছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বাড়লে ট্রাম্পের রাজনৈতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা সীমিত হবে। অবরোধের প্রভাব পুরোপুরি পড়তে কয়েক মাস লাগতে পারে, যে সময়টা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বিলাসিতা।
একইভাবে, ইউরোপেও ট্রাম্পের পক্ষে নিজের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ‘মাগা (মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের জন্য একটি বড় ধাক্কা। কারণ, তাকে এই আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শ নেতা হিসেবে দেখা হতো। তিনি ট্রম্পের অভিবাসন ও গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং ব্যবসা ও আইনব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার নীতির সমর্থক ছিলেন।
তার বিদায়ের ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে ট্রাম্পের একটি ঘনিষ্ঠ মিত্রও কমে গেল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্যও এটি হতাশার বিষয়, কারণ তিনি সম্প্রতি হাঙ্গেরিতে গিয়ে অরবানের পক্ষে সমর্থন চেয়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা বলেন, এ ঘটনার মধ্যে মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। হাঙ্গেরির ফলাফল কোনোভাবেই বামপন্থী প্রগতিশীল আদর্শের জয় নয়। বিজয়ী প্রার্থী পিটার মাজিয়ার নিজেও একজন মধ্য-ডানপন্থী নেতা, যিনি একসময় অরবানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আর যদি তিনি ইউরোপের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো (দুর্বল অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা) সমাধান করতে না পারেন, তাহলে পপুলিজম বা জনমুখী রাজনীতির প্রভাব ভবিষ্যতেও থেকে যেতে পারে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহত্তর অর্থে অরবানের পতনের মানে হলো, যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা নেতৃত্বে একজন ‘শক্তিশালী নেতা’ অনেক ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেন, তার দীর্ঘদিন স্থায়ীভাবে টিকে থাকা কঠিন। কারণ সময়ের সঙ্গে মানুষের অসন্তোষ, অর্থনৈতিক সমস্যা বা রাজনৈতিক চাপ বাড়ে। এগুলো শেষ পর্যন্ত এমন নেতাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।
ট্রাম্পের সীমাহীন ক্ষমতার বিশ্বাস কখনোই সংবিধান বা আমেরিকার রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্সির স্বাভাবিক ক্ষয়ও তাকে আরও দুর্বল করতে পারে। একইসঙ্গে ইরান বাইরের দিক থেকে তার শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
তবে এতে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন উঠে আসে–তার ক্ষমতা যে কমে যাচ্ছে না, তা প্রমাণ করতে তিনি কী করতে পারেন?

ইরানের কিছু সমুদ্রপথনির্ভর আমদানি আছে। আগে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তার গমের পঞ্চমাংশ আসত। ব্রাজিল ও ইউক্রেন থেকে বেশির ভাগ ভুট্টা আসে উপসাগরের বন্দর দিয়ে। কিছু শস্য ক্যাস্পিয়ান বন্দর বা তুরস্ক ও মধ্য এশিয়া হয়ে রাশিয়া ও কাজাখস্তান থেকে আসতে পারে, তবে বেশি খরচে।

মার্কিন ডলারের প্রতি বিশ্বের আস্থা টলমল করছে। আর ঠিক এই মুহূর্তটিকেই চীনের মুদ্রা ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য সোনালি সুযোগ হিসেবে দেখছেন চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়নার সাবেক গভর্নর ঝোউ শিয়াওচুয়ান। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত শিনয়ি উ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা থিঙ্কট্যা