চামরু রাম সালাম কবরে গিয়েও শান্তি পাননি। খ্রিস্টান রীতিতে তাকে কবরস্থ করায় একদল লোক বিক্ষোভ শুরু করলে, পুলিশ তার মরদেহ তুলে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যায়। মৃত ব্যক্তির ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আদিবাসী প্রথার টানাপোড়েনে চামরু রাম সালামের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি গ্রাম্য বিবাদে রূপ নেয়।
ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে এ ধরনের আরও কিছু ঘটনার রোমহর্ষক ভিডিও হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে পড়েছে। খ্রিস্টান পদ্ধতিতে কবর দেওয়া বন্ধ করতে স্থানীয়রা বেশ কিছু প্রার্থনালয় ভাঙচুর করেছে, ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে সেই মরদেহটি সরিয়ে ফেলতে হয়েছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংঘাতের পেছনে ‘ঘর ওয়াপসি’ (হিন্দিতে যার অর্থ ঘরে ফেরা) আন্দোলন কাজ করছে। শুনতে বেশ ইতিবাচক মনে হলেও এর প্রভাব বেশ ভয়াবহ।
‘ঘর ওয়াপসি’–এর মূল ধারণা হলো, যেহেতু মৃত ব্যক্তির পূর্বপুরুষেরা মূলত হিন্দু ছিলেন, তাই ইসলাম বা খ্রিস্টধর্মের মতো ‘বিদেশি’ ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া তাদের ‘আসল’ ভারতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করার শামিল। বাদেতেভদা গ্রামে এই ভীতিকর কৌশলগুলো কাজে দিয়েছে। সাতটি খ্রিস্টান পরিবার হিন্দু ধর্মে ফিরে এসেছে।
গত মার্চ মাসে ছত্তিশগড় রাজ্য ভারতের অন্যতম কঠোর ধর্মান্তরবিরোধী আইন পাস করেছে। অন্যান্য জায়গার মতো এটিকেও ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন নামে অভিহিত করা হচ্ছে, যেখানে ‘ঘর ওয়াপসি’-কে কোনোভাবেই ধর্মান্তর হিসেবে দেখা হয় না।
গত মাসে মহারাষ্ট্রও এমন একটি আইন পাস করেছে, যার ফলে ভারতের ২৮টি রাজ্যের মধ্যে ১৪টিতেই এখন এই ধরনের আইন বিদ্যমান। ২০১৭ সাল থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) শাসিত রাজ্যগুলোতে এই নতুন ও আক্রমণাত্মক আইনগুলো পাস করা হচ্ছে। এই আইনগুলো ব্যক্তিগত জীবনে সরকার ও পুলিশের হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিচ্ছে, কঠোর শাস্তির বিধান রাখছে এবং বিয়ের অধিকারকে সংকুচিত করছে।
এই আইনের একটি মূল দিক হলো ধর্মান্তরের জন্য প্রলোভন দেখানোকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। এটি প্রচারণার প্রায় সব মাধ্যমকেই আওতায় নিয়ে আসতে পারে। এই আইনের অধীনে ধর্মান্তরিতদের উন্নত জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতি দেওয়া অবৈধ। যার একটি লক্ষ্য হলো নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের ক্ষোভকে কাজে লাগানো বন্ধ করা।
যারা ধর্ম পরিবর্তন করতে চান, তাদের কয়েক মাস আগে নোটিশ দিতে হবে এবং জনসমক্ষে নিবন্ধন করতে হবে। অন্য নাগরিকেরা এতে আপত্তি জানাতে পারবেন, সেই আপত্তির ফলে পুলিশি তদন্ত শুরু হবে। সেখানে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি বাধ্য হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করছেন না। ছত্তিশগড়ে গণ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং প্রায় ২৬ হাজার ডলার জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, এই আইনগুলো দুর্বল জনগোষ্ঠীকে চাপ ও প্রতারণা থেকে রক্ষা করবে। ছত্তিশগড়ে তাদের মতে, খ্রিস্টধর্ম একটি বিপদ এবং আদিবাসী সংখ্যালঘূরা এর শিকার। রাজ্যের পুলিশ প্রধান অরুণ দেব গৌতম দাবি করেন, ধর্মান্তর এখানে অত্যন্ত গোপন এবং সুশৃঙ্খলভাবে ঘটছে।
তিনি খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরকে তার রাজ্যের অন্যতম বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন। গৌতমের উদ্বেগ হলো, খ্রিস্টানরা সেই সব সহজ-সরল মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে যারা ধর্মান্তরের প্রকৃত অর্থ বোঝেন না।
অন্যান্য স্থানে একটি সাধারণ ভীতি হলো ‘লাভ জিহাদ’। এটি একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যেখানে অভিযোগ করা হয় যে মুসলিম পুরুষেরা হিন্দু নারীদের বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ইসলামে ধর্মান্তরিত করছে, যাতে ভারতের জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য মুসলিমদের অনুকূলে নেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, মহারাষ্ট্রের আইনটিতে বিয়ের মাধ্যমে অবৈধ ধর্মান্তর নিষিদ্ধ করা হয়েছে, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিয়ের বিরুদ্ধে তৃতীয় পক্ষের অভিযোগ করার সুযোগ দিয়েছে এবং নির্দেশ দিয়েছে যে এ বিয়ের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের মায়ের ধর্ম গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুর্বলদের রক্ষা করার পরিবর্তে, ভারতের এই ধর্মান্তরবিরোধী আইনগুলো মানুষের জীবনে অনধিকার চর্চা শুরু করেছে। ছত্তিশগড়ের এক তরুণ খ্রিস্টান যাজক কমলেশ ধ্রুব বলেন, বিজেপি জনগণকে বশীভূত করতে চায়—তারা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। এই কমলেশ ধ্রুব নিজের গ্রামের মানুষের হামলার শিকার হয়েছেন। সেই হামলার চিহ্ন রয়েছে কমলেশের প্রার্থনা কক্ষের ছাদে। হামলার সম বিজেপি কর্মীরা নাকি সেখানে পাহারায় ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মান্তরবিরোধী আইনগুলো শিগগিরই আইনি জটিলতার মুখে পড়তে পারে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট খতিয়ে দেখছে যে এই আইনগুলো গোপনীয়তার অধিকার এবং বিবেকের স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে লঙ্ঘন করছে কি না।