Advertisement Banner

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট আছে, নাকি নেই?

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ: বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট আছে, নাকি নেই?
পাম্পে তেল নিতে দীর্ঘ লাইন। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের জেরে দেশের জ্বালানি বাজারে এক ধরনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ সারি নিয়ে প্রতিদিনই খবর ও ছবি প্রকাশ হচ্ছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানিতে কোনো সংকট নেই। সবাইকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে আবার এমন সব পদক্ষেপ ও নির্দেশনা আসছে, যা জ্বালানি সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করে।

মঙ্গলবার জ্বালানি বিভাগ জানায়, দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সন্তোষজনক এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন, যা মোট জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় ৬৩ শতাংশ।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মজুত রয়েছে ডিজেলের, যা কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অকটেনের মজুত দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৯৪০ মেট্রিক টনে, যা চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত। এ ছাড়া পেট্রোলের মজুত ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন। পাশাপাশি জেট ফুয়েলের মজুত রয়েছে ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন, যা বর্তমান চাহিদা পূরণে যথেষ্ট।

জ্বালানি বিভাগের এই হিসাবের দিকে তাকালে মানতেই হয় যে, শঙ্কার কিছু নেই। কিন্তু সংশয় তৈরি হয়, যখন বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ এখন জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি নিশ্চিত করতে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক অর্থায়নের চেষ্টা করছে। নতুন সরকার অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে এই উদ্যোগ নিয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের জ্বালানি খাত সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাসের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এই পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি রেশনিং চালু করেছিল। আবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রেশনিং শিথিলও করে। সামনে আসছে ‘প্যানিক বাইয়িংয়ের’ মতো বিষয়। এটা অনেকটা চেইন ইফেক্টের মতো কাজ করছে। সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখা গেছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ফলে লাইন আরও দীর্ঘ হয়েছে।

এ অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানি নিশ্চিতে ২০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক অর্থায়নের চেষ্টা করছে সরকার। এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক, ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। এসব বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে চালকেরা। ছবি: চরচা
তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে চালকেরা। ছবি: চরচা

সরকার আশা করছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে বিদ্যমান কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ২৫০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। এ ছাড়া এডিবি থেকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সফর করছে। সরকার চাইছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই এই অর্থ ছাড় করা হোক, যাতে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই তা ব্যবহার করা যায়।

জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটাতে সরকার দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, তেল ও গ্যাস আমদানির অর্থায়ন যেন কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

তিতুমীর আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, নাইজেরিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি সংগ্রহের নতুন সুযোগ খুঁজছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও সরকার আপাতত দেশের ভোক্তাদের ওপর এর চাপ বাড়াতে চায় না। জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান এই উপদেষ্টা। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় বা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ

এ তো গেল পরিস্থিতি সামাল দিতে নেওয়া পদক্ষেপের কথা। এর বাইরে আগেই অবশ্য জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিং চালুর মতো এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা জ্বালানি সংকটের দিকেই ইঙ্গিত করে। এ ক্ষেত্রে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণার কথা উল্লেখ করা যায়।

বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার কমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় সে সময়। শুধু তাই নয় ঈদুল ফিতরের ছুটি এগিয়ে এনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ ছুটির পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে শুরু করলেও আজ মঙ্গলবারই শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সব মহানগরীর স্কুলের ক্লাস অনলাইন ও অফলাইনে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স
হরমুজ প্রণালি। ছবি: রয়টার্স

প্রাথমিকভাবে অনলাইনে করার বিষয়ে আলোচনা উঠলেও পরে সপ্তাহে অনলাইন–অফলাইন মিলিয়ে ক্লাস পরিচালনার ঘোষণা আসে সরকারের তরফ থেকে।

একইসঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশে অপ্রয়োজনীয় আলো বন্ধ রাখা, দিনের আলো বেশি ব্যবহার করা এবং বিদ্যুৎ খরচ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

শুধু তাই নয়, গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটির কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এই গ্যাস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এতে সার উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে কৃষিতে।

মধ্যপ্রাচ্যে হামলায় এলএনজি সংকট

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইতোমধ্যেই তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা বেড়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র কাতারের রাস লাফান শিল্প এলাকায় সম্প্রতি হামলা হয়েছে। এই কেন্দ্রটি বিশ্বে মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের চাহিদা মেটায়। একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় স্থাপনাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় বলে জানায় সিএনএন। তার আগেই অবশ্য হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এই হামলা বৈশ্বিক গ্যাস বাজারের চিত্র বদলে দিয়েছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল সংকট স্বল্পমেয়াদি হবে। কিন্তু এখন মনে করা হচ্ছে–সরবরাহ ব্যাহত থাকার সময়কাল দীর্ঘ হতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম দ্রুত বাড়ছে।

এশিয়ার দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে উৎপাদিত এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশই এ অঞ্চলে যায়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান বিশেষভাবে নির্ভরশীল এসব সরবরাহের ওপর।

বাংলাদেশের ঝুঁকিটি বেশি। কারণ, গ্যাসের ওপর অতিনির্ভরতা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন খাতে গ্যাস রেশনিং শুরু হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে থাকার পর তেল পাওয়া। ছবি: রয়টার্স
দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে থাকার পর তেল পাওয়া। ছবি: রয়টার্স

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো–বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা গত কয়েক বছর ধরে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংকট সেই পরিকল্পনাকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ডিপ্লোমেটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের শুরুতে পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল। পাকিস্তানের এলএনজি সরবরাহ বাড়ছিল, বাংলাদেশ নতুন ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় প্রথম গ্যাস চালান পেয়েছিল, আর শ্রীলঙ্কা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চিত্র পুরো বদলে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ে কাতারএনার্জির ওপর, যারা বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান থেকে সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করে, যার ফলে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

পরে ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে কাতার এনার্জির সিইও রয়টার্সকে জানান, “এই ক্ষতির ফলে প্রতি বছর ১ কোটি ২৮ লাখ টন উৎপাদন বন্ধ থাকবে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত।” এতে চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ নির্ধারিত সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

চড়া দামে এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ দামে এলএনজি কিনছে। বাংলাদেশের এক জ্বালানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ইকোনমিক টাইমস জানায়, সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় ইতোমধ্যে তিনটি এলএনজি কার্গো কেনা হয়েছে, যার দাম আগের তুলনায় বেশি।

ওই জ্বালানি কর্মকর্তা আরও জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা মূলত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ওপর নির্ভর করলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের কারণে কিছু সরবরাহকারী গ্যাস পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

এলএনজি বহন করা জাহাজ। ছবি: বাসস
এলএনজি বহন করা জাহাজ। ছবি: বাসস

প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রায় ১০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দামে এলএনজি কিনতে পেরেছিল। যা অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে।

হাওয়া লেগেছে জেট ফুয়েলেও

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জেট ফুয়েলের দাম লিটারে বেড়েছে ৯০ টাকা। গত ২৪ মার্চ এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এ দাম ঘোষণা করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলটরি কমিশন (বিইআরসি)।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ রুটে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বেড়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। এতে লিটারপ্রতি দাম প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের মূল্য শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার করা হয়েছে, যা প্রায় ৭৯ শতাংশ।

তবু সংকট নেই!

তবু বাংলাদেশ সরকার বলছে, তেলের সংকট নেই দেশে। সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ গত সপ্তাহেই পেট্রোল পাম্পে অযথা ভিড় না করার আহ্বান জানিয়েছেন। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি এবং সরবরাহও কমানো হয়নি। ফলে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইনের কোনো যৌক্তিকতা নেই।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকেও একই কথা বলা হচ্ছে। এ সম্পর্কিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকার চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় তেল কিনেছে। ফলে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই। অন্যদিকে দেশের জ্বালানি খাত সৃষ্ট চাপে কেউ যেন অবৈধ তেলের কারবার করতে না পারে, সেজন্য সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করেছে সরকার।

এদিকে আবার দেশে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত এবং পাচারকারীদের সম্পর্কে তথ্য দিলে তথ্যদাতার জন্য পুরস্কারের ঘোষণা সম্বলিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।

সরকার বারবার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে, পাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। মন্ত্রীদের বক্তব্যেও একই কথা, ডিপোগুলোতে তেল আছে, সরবরাহ স্বাভাবিক, জনগণ যেন আতঙ্কিত না হয়। কিন্তু সরকারের সেই কথার একদম উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে রাস্তায়। আজ মঙ্গলবারও সে চিত্রের কোনো বদল হয়নি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ছবি: সংগৃহীত
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। ছবি: সংগৃহীত

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঈদের ছুটির সময় কিছু ডিপো বন্ধ থাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই ছুটি শেষ হলেও সেই চাপ আর কমেনি। বাস্তবে এই চাপ শুধু এক-দুই দিনের ছিল না, কয়েকদিন ধরেই মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করেছে। পেট্রোল পাম্প ওনার’স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সম্প্রতি চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তেল পর্যাপ্ত আছে। কিন্তু মানুষ অত্যধিক কিনছে। ভয় থেকেই হয়তো কিনছে। এদিকে সরকার একেক সময় একেক কথা বলায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। যে যত খুশি তেল কিনতে পারবে–এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ায় মানুষ অত্যধিক পরিমাণে তেল কিনছে, কিন্তু ডিপো আবার ২০২৫ সালের হিসাবেই পাম্পে তেল সরবরাহ করছে। ফলে পাম্পে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে।

মানুষ ভাবছে, সামনে হয়তো আরও বড় সংকট আসতে পারে। সেই কারণেই অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করেছেন। এটিকে শুধু ‘প্যানিক’ বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না সরকারের।

সমন্বয়হীনতার সংকট যে আছে, তার প্রমাণ তো সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যেই আছে। একদিকে ডিজেলের মজুত ‘পর্যাপ্ত’ বলে জানান দিচ্ছে সরকার, অন্যদিকে গ্যাস স্বল্পতায় সার কারখানা বন্ধ ঘোষণা করছে। ডিজেলের সরবরাহ কৃষিতে সেচকে আশ্বস্ত করলেও সার কারখানা বন্ধ করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কৃষিকেই আবার বিপদে ফেলে। ফলে এক কৃষির ক্ষেত্রেই বিভ্রান্ত দশা দেখা যাচ্ছে। বাকি ক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনায় নিলে একই ধরনের অসামঞ্জস্যতা নজরে আসতে পারে। এ বিষয়কে বিবেচনায় নিয়ে সত্যিকারের সংকট কতটা, আর সে জন্য কতটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ও হচ্ছে–তা সবাইকে অবহিত করাটা হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, হাজার চাপা দিলেও বিদেশি গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট, পাম্পে দীর্ঘ লাইন এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার খবর প্রকাশ করছে। এসব প্রতিবেদন আন্তর্জাতিকভাবে দেশের পরিস্থিতিকে সামনে আনছে। মানুষ জানছে এবং জানবেই। তাই পাড়া পড়শি থেকে নয়, নিজেই নিজের মানুষকে সংকট ও সম্ভাবনা জানিয়ে দেওয়া ভালো।

সম্পর্কিত