তাসীন মল্লিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে বৃহস্পিতবার (৩০ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১২টায় একটি অবস্থান কর্মসূচি পালন করে প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। কর্মসূচিটি সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসুর কার্যক্রমের একটি প্রতীকী চিত্র হয়ে উঠেছে।
আবাসন সংকটসহ তিন দফা দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ডাকসুর দুই সম্পাদক নেতৃত্ব দেন। পরে যুক্ত হন সাধারণ সম্পাদক ও এজিএস। এ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসুর সক্রিয়তাকে সামনে আনলেও এতে উপস্থিত জমায়েত এর প্রভাব ও বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। কর্মসূচির ধরন ও অংশগ্রহণের মাত্রা ইঙ্গিত দেয় যে, ডাকসু এখন আর বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে পারছে না।
ওই কর্মসূচি শেষে ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ তোলেন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না ডাকসু। শিক্ষার্থী-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা ডাকসুর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
অথচ মাত্র দুই মাস আগেও ডাকসু জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ছিল। ৭ ফেব্রুয়ারি টি-২০ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ দলের বাদ পড়া নিয়ে কর্মসূচি পালন এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা’- এসব কর্মকাণ্ড ডাকসুকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। তখন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ‘মিনি পার্লামেন্ট’ খ্যাত এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং উল্টোভাবে নির্বাচনের পর ডাকসুর দৃশ্যমান প্রভাব কমতে দেখা গেছে।
২০১৯ সালের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর ডাকসু নির্বাচন হয়। এই ভোটে বিপুল ভোটে জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
‘‘জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডাকসুর ভূমিকা থাকে। এখনো পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি যে, তারা (বর্তমান ডাকসু) ব্রডলি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা বা ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। শুধু ক্যাম্পাসে আধিপত্যের প্রশ্ন ছাড়া ছাত্রদের পক্ষে এখনো তারা কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেনি।’’
শিক্ষার্থী ও সাবেক নেতাদের ভাষ্য, একসময় জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত ডাকসু এখন সেই অবস্থান হারিয়েছে। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও বদলে গেছে। ফলে আগের মতো আবেগনির্ভর সমর্থনের বদলে এখন কার্যকারিতা ও আস্থার প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মুশতাক হোসেনের বক্তব্য এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডাকসুর ভূমিকা থাকে। এখনো পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি যে, তারা (বর্তমান ডাকসু) ব্রডলি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা বা ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। শুধু ক্যাম্পাসে আধিপত্যের প্রশ্ন ছাড়া ছাত্রদের পক্ষে এখনো তারা কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেনি।’’

১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের ডাকসু জিএসের এই মন্তব্যে বর্তমান ডাকসুর কার্যক্রমে একটি মৌলিক ঘাটতির ইঙ্গিত রয়েছে–জাতীয় ও শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে সক্রিয় অবস্থানের অভাব।
তবে ডাকসুর সাবেক এই নেতা পুরোপুরি হতাশ নন। তার ভাষায়, ‘‘তাদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে যদি তারা কোনো ভূমিকা রাখে, সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে যদি তারা আদর্শিক অবস্থান নেয়, তাহলে নিশ্চয়ই তারা জনগণের সহানুভূতি পাবে।’’ অর্থাৎ, সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
নীরব ডাকসু নেতারা
জাতীয় নির্বাচনের পর ডাকসুকে ঘিরে আলোচনা কমে যাওয়ার বিষয়টি এখন প্রায় সর্বজনস্বীকৃত। এই নীরবতা শুধু কার্যক্রমে নয়, যোগাযোগেও প্রতিফলিত হয়েছে। ডাকসুর শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে মন্তব্য জানতে চাইলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ভিপি সাদিক কায়েম এবং এজিএস মহিউদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তারা সাড়া দেননি।
গণমুখী কর্মসূচির ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের রূপান্ত–সব মিলিয়ে সংগঠনটির প্রভাব কমেছে। এটি সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা–সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
‘দলীয় এজেন্ডা’ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি: যা বলছে বিরোধীরা
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ডাকসুতে ভূমিধ্বস বিজয় পায়। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৪টির মধ্যে ২৩টি পদ এবং হল সংসদের ৫৪টির মধ্যে ৫৩টি পদে জয় পাওয়ার ফলে প্রায় একক প্রভাবশালী কাঠামো তৈরি হয়।
‘‘৫ আগস্টের পর থেকে শিবির কোভার্ট পলিটিক্স করেছে, যেটা ডাকসুতেও দেখেছি…। কিন্তু দিনের পর দিন যখন এই মুখোশটা খসে পড়তে শুরু করল, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসের ফলে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা কমে যায়।’’
বিরোধী পক্ষগুলোর অভিযোগ, ডাকসু প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে ‘দলীয় এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী। তাদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং প্রকৃত ছাত্রস্বার্থ আড়াল হয়ে গেছে।
সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবিদুর রহমান মিশুর বক্তব্যে এই অভিযোগই উঠে এসেছে। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর থেকে শিবির কোভার্ট পলিটিক্স করেছে, যেটা ডাকসুতেও দেখেছি…। কিন্তু দিনের পর দিন যখন এই মুখোশটা খসে পড়তে শুরু করল, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসের ফলে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা কমে যায়।’’
আবিদুর রহমানের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে যে সমর্থন ছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়নি–মূলত আস্থার সংকটের কারণে।

একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ রিফাত। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় ইস্যুগুলোতে আমরা ডাকসু বা অন্যান্য ছাত্রসংসদের কাছ থেকে একটি শক্ত অবস্থান দেখতে পাই না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার কোনো চেষ্টা এখানে দেখা যায় না। কিছু কার্যক্রম করেছে। কিন্তু সেগুলো তাদের দলীয় গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।’’ তার মতে, সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংগঠনিকও; বিশেষ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির অভাব বড় একটি কারণ।
‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচেটিয়া ছাত্রশিবির জয়ী হয়েছে। সব জায়গায়, হলগুলোতে ছাত্রী প্রতিনিধিরাও জয়ী হয়েছে। আমরা বরং সবাইকে সাথে নিয়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, সেভাবেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাইরে কোনো কোনো হলে বা কোনো কোনো প্যানেলে দেখা গেছে যে, প্রায় ৯৫% আমাদের, হয়তো ৫% ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা অন্য কোনো পার্টি থেকে জয়ী হয়েছে। তারপরও সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
যদিও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচেটিয়া ছাত্রশিবির জয়ী হয়েছে। সব জায়গায়, হলগুলোতে ছাত্রী প্রতিনিধিরাও জয়ী হয়েছে। আমরা বরং সবাইকে সাথে নিয়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, সেভাবেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাইরে কোনো কোনো হলে বা কোনো কোনো প্যানেলে দেখা গেছে যে, প্রায় ৯৫% আমাদের, হয়তো ৫% ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা অন্য কোনো পার্টি থেকে জয়ী হয়েছে। তারপরও সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
বিরোধীদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো–পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরনো ধাঁচের রাজনীতি আর কার্যকর নয়। শিক্ষার্থীরা এখন বেশি সচেতন, তারা প্রতীকী কর্মসূচির চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। ফলে সংগঠনগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো–কীভাবে তারা আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
শিবির ব্যতীত ভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর একমাত্র সদস্য হেমা চাকমার মন্তব্য এই পরিবর্তনের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় নির্বাচনের পর একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতি এসেছে। ডাকসু থেকে ফোকাসটাও সরে গেছে। ইভেন (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) সংসদের গ্রুপগুলোতে রি-অ্যাকশন পর্যন্ত চেঞ্জ হয়ে গেছে। আগে যেখানে সবাই লাভ (রি-অ্যাক্ট) দিত, এখন সেখানে ‘হা হা’ রি-অ্যাক্ট দেয়। এটা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে।’’
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডাকসুর বর্তমান সংকট বহুমাত্রিক–রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক দুর্বলতা, আস্থার ঘাটতি এবং পরিবর্তিত সামাজিক মনোভাব–সবকিছু মিলেই এর প্রভাব কমিয়েছে। একসময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোই হবে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে বৃহস্পিতবার (৩০ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১২টায় একটি অবস্থান কর্মসূচি পালন করে প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। কর্মসূচিটি সাম্প্রতিক সময়ে ডাকসুর কার্যক্রমের একটি প্রতীকী চিত্র হয়ে উঠেছে।
আবাসন সংকটসহ তিন দফা দাবিতে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে ডাকসুর দুই সম্পাদক নেতৃত্ব দেন। পরে যুক্ত হন সাধারণ সম্পাদক ও এজিএস। এ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ডাকসুর সক্রিয়তাকে সামনে আনলেও এতে উপস্থিত জমায়েত এর প্রভাব ও বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। কর্মসূচির ধরন ও অংশগ্রহণের মাত্রা ইঙ্গিত দেয় যে, ডাকসু এখন আর বড় পরিসরে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে পারছে না।
ওই কর্মসূচি শেষে ডাকসুর এজিএস মুহা. মহিউদ্দিন খান প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ তোলেন। এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করতে পারছে না ডাকসু। শিক্ষার্থী-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা ডাকসুর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে।
অথচ মাত্র দুই মাস আগেও ডাকসু জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয় ছিল। ৭ ফেব্রুয়ারি টি-২০ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ দলের বাদ পড়া নিয়ে কর্মসূচি পালন এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারণা’- এসব কর্মকাণ্ড ডাকসুকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে আসে। তখন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, ‘মিনি পার্লামেন্ট’ খ্যাত এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং উল্টোভাবে নির্বাচনের পর ডাকসুর দৃশ্যমান প্রভাব কমতে দেখা গেছে।
২০১৯ সালের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছর ডাকসু নির্বাচন হয়। এই ভোটে বিপুল ভোটে জয় পায় ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল।
‘‘জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডাকসুর ভূমিকা থাকে। এখনো পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি যে, তারা (বর্তমান ডাকসু) ব্রডলি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা বা ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। শুধু ক্যাম্পাসে আধিপত্যের প্রশ্ন ছাড়া ছাত্রদের পক্ষে এখনো তারা কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেনি।’’
শিক্ষার্থী ও সাবেক নেতাদের ভাষ্য, একসময় জাতীয় রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত ডাকসু এখন সেই অবস্থান হারিয়েছে। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। জাতীয় রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা নতুনভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও বদলে গেছে। ফলে আগের মতো আবেগনির্ভর সমর্থনের বদলে এখন কার্যকারিতা ও আস্থার প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে।
ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ডা. মুশতাক হোসেনের বক্তব্য এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ডাকসুর ভূমিকা থাকে। এখনো পর্যন্ত তেমন কিছু দেখা যায়নি যে, তারা (বর্তমান ডাকসু) ব্রডলি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা বা ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। শুধু ক্যাম্পাসে আধিপত্যের প্রশ্ন ছাড়া ছাত্রদের পক্ষে এখনো তারা কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখেনি।’’

১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষের ডাকসু জিএসের এই মন্তব্যে বর্তমান ডাকসুর কার্যক্রমে একটি মৌলিক ঘাটতির ইঙ্গিত রয়েছে–জাতীয় ও শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে সক্রিয় অবস্থানের অভাব।
তবে ডাকসুর সাবেক এই নেতা পুরোপুরি হতাশ নন। তার ভাষায়, ‘‘তাদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। গণতন্ত্রের প্রশ্নে যদি তারা কোনো ভূমিকা রাখে, সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে যদি তারা আদর্শিক অবস্থান নেয়, তাহলে নিশ্চয়ই তারা জনগণের সহানুভূতি পাবে।’’ অর্থাৎ, সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। তবে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
নীরব ডাকসু নেতারা
জাতীয় নির্বাচনের পর ডাকসুকে ঘিরে আলোচনা কমে যাওয়ার বিষয়টি এখন প্রায় সর্বজনস্বীকৃত। এই নীরবতা শুধু কার্যক্রমে নয়, যোগাযোগেও প্রতিফলিত হয়েছে। ডাকসুর শীর্ষ নেতাদের কাছ থেকে মন্তব্য জানতে চাইলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ভিপি সাদিক কায়েম এবং এজিএস মহিউদ্দিন খানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তারা সাড়া দেননি।
গণমুখী কর্মসূচির ঘাটতি, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের রূপান্ত–সব মিলিয়ে সংগঠনটির প্রভাব কমেছে। এটি সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা–সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
‘দলীয় এজেন্ডা’ ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি: যা বলছে বিরোধীরা
গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ডাকসুতে ভূমিধ্বস বিজয় পায়। কেন্দ্রীয় সংসদের ২৪টির মধ্যে ২৩টি পদ এবং হল সংসদের ৫৪টির মধ্যে ৫৩টি পদে জয় পাওয়ার ফলে প্রায় একক প্রভাবশালী কাঠামো তৈরি হয়।
‘‘৫ আগস্টের পর থেকে শিবির কোভার্ট পলিটিক্স করেছে, যেটা ডাকসুতেও দেখেছি…। কিন্তু দিনের পর দিন যখন এই মুখোশটা খসে পড়তে শুরু করল, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসের ফলে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা কমে যায়।’’
বিরোধী পক্ষগুলোর অভিযোগ, ডাকসু প্রকাশ্যে নিরপেক্ষতার কথা বললেও বাস্তবে ‘দলীয় এজেন্ডা’ বাস্তবায়নে বেশি মনোযোগী। তাদের মতে, এই দ্বৈত অবস্থান সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এবং প্রকৃত ছাত্রস্বার্থ আড়াল হয়ে গেছে।
সূর্যসেন হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব আবিদুর রহমান মিশুর বক্তব্যে এই অভিযোগই উঠে এসেছে। চরচাকে তিনি বলেন, ‘‘৫ আগস্টের পর থেকে শিবির কোভার্ট পলিটিক্স করেছে, যেটা ডাকসুতেও দেখেছি…। কিন্তু দিনের পর দিন যখন এই মুখোশটা খসে পড়তে শুরু করল, তখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই অবিশ্বাসের ফলে ধীরে ধীরে সম্পৃক্ততা কমে যায়।’’
আবিদুর রহমানের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট হয়, প্রাথমিক পর্যায়ে যে সমর্থন ছিল, তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা যায়নি–মূলত আস্থার সংকটের কারণে।

একই ধরনের পর্যবেক্ষণ দেন আইন বিভাগের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ রিফাত। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় ইস্যুগুলোতে আমরা ডাকসু বা অন্যান্য ছাত্রসংসদের কাছ থেকে একটি শক্ত অবস্থান দেখতে পাই না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার কোনো চেষ্টা এখানে দেখা যায় না। কিছু কার্যক্রম করেছে। কিন্তু সেগুলো তাদের দলীয় গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।’’ তার মতে, সমস্যাটি শুধু রাজনৈতিক নয়, সাংগঠনিকও; বিশেষ করে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির অভাব বড় একটি কারণ।
‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচেটিয়া ছাত্রশিবির জয়ী হয়েছে। সব জায়গায়, হলগুলোতে ছাত্রী প্রতিনিধিরাও জয়ী হয়েছে। আমরা বরং সবাইকে সাথে নিয়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, সেভাবেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাইরে কোনো কোনো হলে বা কোনো কোনো প্যানেলে দেখা গেছে যে, প্রায় ৯৫% আমাদের, হয়তো ৫% ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা অন্য কোনো পার্টি থেকে জয়ী হয়েছে। তারপরও সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
যদিও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ চরচাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচেটিয়া ছাত্রশিবির জয়ী হয়েছে। সব জায়গায়, হলগুলোতে ছাত্রী প্রতিনিধিরাও জয়ী হয়েছে। আমরা বরং সবাইকে সাথে নিয়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, সেভাবেই কাজ করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বাইরে কোনো কোনো হলে বা কোনো কোনো প্যানেলে দেখা গেছে যে, প্রায় ৯৫% আমাদের, হয়তো ৫% ইন্ডিপেন্ডেন্ট বা অন্য কোনো পার্টি থেকে জয়ী হয়েছে। তারপরও সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি।”
বিরোধীদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো–পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরনো ধাঁচের রাজনীতি আর কার্যকর নয়। শিক্ষার্থীরা এখন বেশি সচেতন, তারা প্রতীকী কর্মসূচির চেয়ে বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়। ফলে সংগঠনগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো–কীভাবে তারা আস্থা পুনর্গঠন করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করবে।
শিবির ব্যতীত ভিন্ন প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর একমাত্র সদস্য হেমা চাকমার মন্তব্য এই পরিবর্তনের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘‘জাতীয় নির্বাচনের পর একটি পরিবর্তিত পরিস্থিতি এসেছে। ডাকসু থেকে ফোকাসটাও সরে গেছে। ইভেন (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে) সংসদের গ্রুপগুলোতে রি-অ্যাকশন পর্যন্ত চেঞ্জ হয়ে গেছে। আগে যেখানে সবাই লাভ (রি-অ্যাক্ট) দিত, এখন সেখানে ‘হা হা’ রি-অ্যাক্ট দেয়। এটা ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে।’’
সব মিলিয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডাকসুর বর্তমান সংকট বহুমাত্রিক–রাজনৈতিক অবস্থান, সাংগঠনিক দুর্বলতা, আস্থার ঘাটতি এবং পরিবর্তিত সামাজিক মনোভাব–সবকিছু মিলেই এর প্রভাব কমিয়েছে। একসময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানের ঘুরে দাঁড়ানোই হবে তাদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

খনিজ সম্পদ কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়, এটি আগামী দিনের বিশ্ব ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি। যদি বিশ্বনেতারা সময় থাকতে একটি স্থিতিশীল এবং নিয়ম-ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারেন, তবে এই খনিজ সম্পদ বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন যুদ্ধ, অভ্যুত্থান এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক বড় বড় সিদ্ধান্ত আসছে। তাতে খাদের কিনারায় আরও একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপেই লাভ হচ্ছে একটি দেশের, চীন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধেও তাদের লাভ, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের লাভ। এবার চীন হয়তো বিশ্ববাজারে আরও বড় লাফ দিচ্ছে। আর এ লাফেই তারা আমেরিকাকে দেখাতে