আরমান ভূঁইয়া

জুলাই অভ্যুত্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তুমুল সমালোচনার পরও বাহিনীটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।
আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, ভারী অস্ত্রের ব্যবহার এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ ১৩টি খাতে বিস্তৃত সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। তবে নির্বাচিত সরকার সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট ‘কোনো পদক্ষেপ নেয়নি’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পুলিশের ভূমিকার বদল হবে না।
পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে একটি স্বাধীন ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব ছিল পুলিশ সংস্কার কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ। একই সঙ্গে বাহিনীকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল সুপারিশে।
পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশে জুলাই অভ্যুত্থান দমনে মাঠে নামানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাবলী নিয়ে অনুসন্ধান করে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। বেশির ভাগই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল এবং শটগানের গুলিতে নিহত হন বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অভ্যুত্থান দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরির্বতনের পর পুলিশ সদস্যরা নিজেদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। অনেক পুলিশ সদস্য হতাহত হওয়া এবং পুলিশকে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার জন্য বাহিনীরই ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাকে দায়ী করছিলেন তারা। অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তারা পালিয়ে যান। সে সময় পুলিশের নিচের দিকের সদস্যদের মধ্য থেকে সংস্কারের দাবি উঠেছিল।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ১১০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। এতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের কার্যক্রমকে মানবাধিকারসম্মত করতে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনসের আলোকে পাঁচ ধাপের বলপ্রয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা জাতিসংঘের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না হলে বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা কঠিন। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আগ্রহের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় ঐকমত্য না থাকায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পাশাপাশি ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জনের সুপারিশ করা হয়, যা চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল, স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন গঠন। পরে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। যদিও সেটি নিয়ে সমালোচনা ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো যাচাই করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ ছিল ওই বিশেষ কমিটির। কিন্তু সেটা করা হয়নি। সংসদের অনুমোদন না হওয়ায় সেটি কার্যকারিতা হারায়।

পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি পদও সৃজন হয়নি, একটি পয়সাও খরচ হয়নি। এটা হেফাজতের প্রয়োজন নেই। এটা এই অধিবেশনে আনতে হবে–এমন বাধ্যবাধকতা নেই। পরে সংশোধিত আকারে এটা সংসদে আনা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না হলে বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা কঠিন। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আগ্রহের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় ঐকমত্য না থাকায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “পুলিশকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে বের করে আনার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও বাস্তবে তা এখনো পূরণ হয়নি।” তিনি আরও জানান, অন্যান্য কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকলেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সরকারের সময় ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় সংস্কারগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেনের সঙ্গে চরচা যোগাযোগ করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। আধুনিক, জনবান্ধব ও আস্থাশীল পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কমিশনের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমান সরকার পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে আগ্রহী নয়।” তার মতে, “আগের সরকারের মতোই প্রশাসনিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহারের প্রবণতা এখনো বিদ্যমান, যা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।”
ওই সদস্য আরও বলেন, “সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব এখনো কাটেনি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সব সংস্কারই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। উদাহারণ হিসেবে গত ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে পুলিশের উপস্থিতিতে ডাকসু নেতা-কর্মীদের ওপর ছাত্রদলের হামলার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে সরকার বলছে, পুলিশ সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। আধুনিক, জনবান্ধব ও আস্থাশীল পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ অনুবিভাগ) মো. আতাউর রহমান খান বলেন, “কমিশনের অনেক সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কিছু বিষয় প্রক্রিয়াধীন। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে আইন ও বিধি সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে।”
আতাউর রহমান জানান, পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং নতুন জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১০ হাজার কনস্টেবল ও প্রায় দুই হাজার সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না। দেশের মানুষ যেকোনো আইনি সহায়তার জন্য সরাসরি পুলিশের শরাণাপন্ন হয়। বিশেষ করে বাহিনীকে স্বচ্ছ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা জরুরি।
অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হকের মতে, শুধু ইউনিফর্ম পরিবর্তন বা জনবল বৃদ্ধি প্রকৃত সংস্কার নয়। চরচাকে তিনি বলেন, “মূল সমস্যা হলো দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাব। এগুলো দূর না করলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরীও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “সংস্কারের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।” তার মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত বা প্রভাবিত সদস্যদের সরিয়ে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে নাঈম আশফাক চৌধুরী চরচাকে বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে অতিরিক্ত দলীয়করণ রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। যত বেশি পলিটিসাইজেশন হবে, তত বেশি প্রফেশনালিজম নষ্ট হবে। আর পেশাদারত্ব না থাকলে কোনো রাষ্ট্র টেকসইভাবে চলতে পারে না।”

জুলাই অভ্যুত্থানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তুমুল সমালোচনার পরও বাহিনীটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।
আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, ভারী অস্ত্রের ব্যবহার এবং আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘পুলিশ সংস্কার কমিশন’ ১৩টি খাতে বিস্তৃত সংস্কারের সুপারিশ করেছিল। তবে নির্বাচিত সরকার সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট ‘কোনো পদক্ষেপ নেয়নি’ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পুলিশের ভূমিকার বদল হবে না।
পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে একটি স্বাধীন ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব ছিল পুলিশ সংস্কার কমিশনের অন্যতম প্রধান সুপারিশ। একই সঙ্গে বাহিনীকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জিজ্ঞাসাবাদ এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি আধুনিক কাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল সুপারিশে।
পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশে জুলাই অভ্যুত্থান দমনে মাঠে নামানো নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাবলী নিয়ে অনুসন্ধান করে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। বেশির ভাগই বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল এবং শটগানের গুলিতে নিহত হন বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অভ্যুত্থান দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরির্বতনের পর পুলিশ সদস্যরা নিজেদের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। অনেক পুলিশ সদস্য হতাহত হওয়া এবং পুলিশকে জনতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়ার জন্য বাহিনীরই ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাকে দায়ী করছিলেন তারা। অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত পুলিশ কর্মকর্তারা পালিয়ে যান। সে সময় পুলিশের নিচের দিকের সদস্যদের মধ্য থেকে সংস্কারের দাবি উঠেছিল।
পরে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ সংস্কার কমিশন গঠন করে। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ১১০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। এতে উল্লেখ করা হয়, পুলিশের কার্যক্রমকে মানবাধিকারসম্মত করতে ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন, ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনসের আলোকে পাঁচ ধাপের বলপ্রয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা জাতিসংঘের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না হলে বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা কঠিন। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আগ্রহের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় ঐকমত্য না থাকায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
পাশাপাশি ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জনের সুপারিশ করা হয়, যা চার ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। সুপারিশের মধ্যে অন্যতম ছিল, স্বতন্ত্র পুলিশ কমিশন গঠন। পরে অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করেছিল। যদিও সেটি নিয়ে সমালোচনা ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো যাচাই করে সংসদে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ ছিল ওই বিশেষ কমিটির। কিন্তু সেটা করা হয়নি। সংসদের অনুমোদন না হওয়ায় সেটি কার্যকারিতা হারায়।

পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি পদও সৃজন হয়নি, একটি পয়সাও খরচ হয়নি। এটা হেফাজতের প্রয়োজন নেই। এটা এই অধিবেশনে আনতে হবে–এমন বাধ্যবাধকতা নেই। পরে সংশোধিত আকারে এটা সংসদে আনা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন না হলে বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা কঠিন। তবে এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আগ্রহের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় ঐকমত্য না থাকায় প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।”
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “পুলিশকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে বের করে আনার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও বাস্তবে তা এখনো পূরণ হয়নি।” তিনি আরও জানান, অন্যান্য কিছু সুপারিশ বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকলেও বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। সরকারের সময় ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় সংস্কারগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেনের সঙ্গে চরচা যোগাযোগ করে। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। আধুনিক, জনবান্ধব ও আস্থাশীল পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কমিশনের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমান সরকার পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে আগ্রহী নয়।” তার মতে, “আগের সরকারের মতোই প্রশাসনিক স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহারের প্রবণতা এখনো বিদ্যমান, যা সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে।”
ওই সদস্য আরও বলেন, “সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব এখনো কাটেনি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে সব সংস্কারই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। উদাহারণ হিসেবে গত ২৩ এপ্রিল শাহবাগ থানার ভেতরে পুলিশের উপস্থিতিতে ডাকসু নেতা-কর্মীদের ওপর ছাত্রদলের হামলার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে সরকার বলছে, পুলিশ সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময় জানিয়েছেন, ধাপে ধাপে সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনার চেষ্টা চলছে। আধুনিক, জনবান্ধব ও আস্থাশীল পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ অনুবিভাগ) মো. আতাউর রহমান খান বলেন, “কমিশনের অনেক সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কিছু বিষয় প্রক্রিয়াধীন। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে আইন ও বিধি সংশোধন প্রয়োজন, সেগুলো নিয়ে কাজ চলছে।”
আতাউর রহমান জানান, পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি এবং নতুন জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১০ হাজার কনস্টেবল ও প্রায় দুই হাজার সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কাঠামোগত পরিবর্তন ছাড়া এসব উদ্যোগ টেকসই হবে না। দেশের মানুষ যেকোনো আইনি সহায়তার জন্য সরাসরি পুলিশের শরাণাপন্ন হয়। বিশেষ করে বাহিনীকে স্বচ্ছ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা জরুরি।
অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হকের মতে, শুধু ইউনিফর্ম পরিবর্তন বা জনবল বৃদ্ধি প্রকৃত সংস্কার নয়। চরচাকে তিনি বলেন, “মূল সমস্যা হলো দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাব। এগুলো দূর না করলে কোনো সংস্কারই কার্যকর হবে না।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরীও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “সংস্কারের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।” তার মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত বা প্রভাবিত সদস্যদের সরিয়ে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
সার্বিক বিষয়ে নাঈম আশফাক চৌধুরী চরচাকে বলেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে অতিরিক্ত দলীয়করণ রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। যত বেশি পলিটিসাইজেশন হবে, তত বেশি প্রফেশনালিজম নষ্ট হবে। আর পেশাদারত্ব না থাকলে কোনো রাষ্ট্র টেকসইভাবে চলতে পারে না।”

২০২৬ সালের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন ফুড ক্রাইসিস’ (জিআরএফসি) প্রতিবেদনে বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একটি অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরাসরি দুর্ভিক্ষ কিংবা চরম কোনো খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে না গেলেও, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা