ads

ওপেক থেকে আরব আমিরাত সরায় কি লাভ হলো চীনের?

ওপেক থেকে আরব আমিরাত সরায় কি লাভ হলো চীনের?
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

অস্থির মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক বড় বড় সিদ্ধান্ত আসছে। তাতে খাদের কিনারায় আরও একধাপ এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। কিন্তু প্রতিটা পদক্ষেপেই লাভ হচ্ছে একটি দেশের, চীন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধেও তাদের লাভ, যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলেও তাদের লাভ। এবার চীন হয়তো বিশ্ববাজারে আরও বড় লাফ দিচ্ছে। আর এ লাফেই তারা আমেরিকাকে দেখাতে চলেছে বুড়ো আঙুল।

ভূ-রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের সমীকরণ দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। একদিকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ, অন্যদিকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ‘ওপেক’ থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা–এ দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা নিতে যাচ্ছে চীন।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ওপেকের কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে আমিরাত এখন চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন এক ‘ভরসাস্থল’ হয়ে উঠতে পারে। সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাত গত কয়েক বছর ধরে তাদের দৈনিক তেল উৎপাদন ক্ষমতা ৫ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত করার জন্য কয়েক শ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু ওপেকের উৎপাদন কমানোর নীতির কারণে তারা এই সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারছিল না। ওপেকের ওপর সৌদি আরবের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে আবুধাবির দীর্ঘদিনের অসন্তোষও ছিল।

ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আরব আমিরাত। ছবি: রয়টার্স
ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আরব আমিরাত। ছবি: রয়টার্স

রয়টার্স আরও বলছে, ১ মে থেকে আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়লে তারা আর কোনো নিয়ম মানতে বাধ্য থাকবে না। এতে বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়বে, যার সরাসরি সুবিধা পাবে চীন। হয়তো হাফ ছেড়ে বাঁচবে আমিরাতও।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, চীন বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। তাদের প্রয়োজনীয় তেলের ৭০ শতাংশই বিদেশ থেকে আনতে হয়। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে যখন অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলারে পৌঁছেছে, তখন আমিরাতের মতো একটি বিশাল উৎপাদনকারী দেশের জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া চীনের জন্য ‘আশীর্বাদস্বরূপ’।

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন এখন চাইলেই আমিরাতের সঙ্গে বিশেষ ‘দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি’ করতে পারবে। ফলে ওপেকের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কারণে তেলের দাম বাড়লেও চীন হয়তো সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে কম মূল্যে তেল পাবে। কিন্তু চীন এই পথে হাঁটবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তবে চীনের এই বিশাল সম্ভাবনার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বিশ্ব তেলের ২০ শতাংশ যে ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে যাতায়াত করে, সেই এলাকাটি এখন ‘রণক্ষেত্র’।

আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে একটি সতর্কবার্তাও দিয়েছে। তারা বলছে, আমিরাত ওপেক ছেড়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যদি যুদ্ধের কারণে ইরান হরমুজ বন্ধ করে দেয়, তবে আমিরাতের অতিরিক্ত উৎপাদন কোনো কাজে আসবে না। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের তেল বাইরে পাঠানোর জন্য পর্যাপ্ত বিকল্প পাইপলাইন বা স্থলপথ নেই।

চীন এই ঝুঁকি কমাতে এখন থেকেই আরব আমিরাতের সঙ্গে ফুজাইরাহ বন্দরের মাধ্যমে বিকল্প পথ খোঁজার চেষ্টা করছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে সেই তথ্যও জানানো হয়েছে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মুদ্রাবাজার। আল জাজিরা ও ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আমিরাত ওপেকের বাইরে এলে তারা মার্কিন ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ তেল বিক্রির পদক্ষেপ নিতে পারে।

ওপেকের কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে আমিরাত এখন চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন এক ‘ভরসাস্থল’ হয়ে উঠতে পারে। ছবি: পেক্সেলস
ওপেকের কঠোর নিয়মের বাইরে গিয়ে আমিরাত এখন চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন এক ‘ভরসাস্থল’ হয়ে উঠতে পারে। ছবি: পেক্সেলস

বর্তমানে ওপেকের দেশগুলো মূলত ডলারেই লেনদেন করে। কিন্তু আমিরাত এই জোট থেকে বেরিয়ে গেলে চীনের বিশাল বাজারের নাগাল পেতে ইউয়ান গ্রহণ করতে শুরু করবে। এটি হবে বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থার জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আর এর মধ্য দিয়ে চীনের মুদ্রা আন্তর্জাতিক পথে আরও বড় লাফ দেবে।

ট্রেড ও লজিস্টিকস নিয়ে কাজ করা কনসালটেন্সি ফার্ম কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মুয়ু জু সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, “চীন সবসময় তার জ্বালানি উৎসকে বৈচিত্র্যময় করতে চায়। আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত বেইজিংয়ের জন্য একটি মোক্ষম সুযোগ। আমরা আশা করছি, ২০২৬ সালের শেষের দিকে চীন আমিরাত থেকে আমদানির পরিমাণ বর্তমানের চেয়ে আরও ২০-৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেবে।”

অন্যদিকে, স্পার্টা কমোডিটিসের বিশ্লেষক জুন গোহর ভাষ্য, “এবার বাজারের অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে চীন কম দামে তেল কিনে তাদের জাতীয় রিজার্ভ ভর্তি করে রাখতে চাইবে।”

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেকের সদস্যপদ ত্যাগ কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক চাল বলেই মনে হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের এই কঠিন সময়ে যখন পশ্চিমা বিশ্ব তেলের যোগান নিয়ে চিন্তিত, তখন চীন ও আমিরাতের এই সম্ভাব্য ‘ঘনিষ্ঠতা’ বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে। তবে তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির ওপর। তবে চীন হয়তো বিকল্প পথ বের করেই রেখেছে।

সম্পর্কিত