মোদি জমানায় প্রশ্নবিদ্ধ ভারতের নির্বাচন কমিশন

মোদি জমানায় প্রশ্নবিদ্ধ ভারতের নির্বাচন কমিশন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: বিবিসির সৌজন্যে

বহুকাল ভারতের নির্বাচন কমিশন ছিল যাবতীয় সন্দেহের ঊর্ধ্বে। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর খোলামেলা সমালোচনা হচ্ছে তাদের নিয়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিস কুমার’ বলে কটাক্ষ করা হচ্ছে। সংসদে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে কমিশনকেই বিজেপির শাখা সংগঠন বলে কটাক্ষ করেছেন বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক ব্যানার্জি নাকি আঙুল তুলে তর্কও করেছেন জ্ঞাণেশ কুমারের সঙ্গে। অথচ, অতীতে নিরপেক্ষতার কারণে সব দলের কাছেই প্রশংসিত ছিল দেশের নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এখন তাদের ভূমিকাই প্রশ্নবিদ্ধ।

গত বছরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘অ্যাটম বোম’ ফাটিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন রাহুল। কমিশনের কড়া সমালোচনায় ব্যস্ত সব বিরোধী দলই। তাদের অভিযোগ, কমিশন অতীতে কোনো রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দিতে এভাবে কাজ করেনি। অতীতের কথা উঠলেই সবার আগে আসেন টি এন শেষন। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকার সময় কমিশনকে আরও বেশি সক্রিয় করে তুলেছিলেন। সেই সুনাম ধরে রেখেছিলেন তার উত্তরসূরীরাও। কিন্তু মোদির আমলে কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। আগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্যানেলে থাকতেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা। কিন্তু ২০২৩ সালে আইন বদলে প্যানেল থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন মন্ত্রীকে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই প্রধান্য পায় কমিশনারদের নিয়োগে। রাহুল গান্ধীর প্রশ্ন, “কেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগের প্যানেল থেকে সরিয়ে দেওয়া হল? আমরা কি তাকে বিশ্বাস করি না?” জবাব দেওয়ার নেই কোনো রীতি!

সম্প্রতি বিহারের বিধানসভা ভোটেও হেরেছে কংগ্রেসের জোট। সেই প্রসঙ্গে রাহুলের প্রতিক্রিয়া, “ফলাফল বিস্ময়কর। নির্বাচন শুরু থেকেই সুষ্ঠুভাবে হয়নি।” হরিয়ানার নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ তুলে ‘তদন্ত রিপোর্ট’ দেখিয়ে বলেছিলেন, “কমিশন বিজেপির পক্ষে ভোট চুরিতে সহায়তা করছে– এ কথা আমি ১০০% নিশ্চিত হয়ে বলছি। আমরা আমাদের নিজস্ব তদন্ত করেছি, ৬ মাস ধরে। যে তথ্য আমরা পেয়েছি, সেটাই সেই ‘অ্যাটম বোম’। এই প্রমাণ সামনে এলে নির্বাচন কমিশন দৃশ্যমানই থাকবে না।” তার অভিযোগ, হরিয়ানায় ব্রাজিলিয়ান মডেল ম্যাথিউস ফেরেরোর ছবি ব্যবহার করে অন্তত ২২ বার ভোট দেওয়া হয়েছে। রাহুল বলেছিলেন, “আমাদের হাতে এমন প্রমাণ আছে যা পরমাণু বোমার মতো বিস্ফোরণ ঘটাবে– এতে পুরো দেশ বুঝে যাবে কমিশন কীভাবে বিজেপিকে জেতাতে ভোট চুরির সুবিধা করে দিচ্ছে।”

রাহুল ও তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদরা সমানে ভোটচুরির অভিযোগ তুলে সংসদ ও সংসদের বাইরে মোদি সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করে চলেছেন। রাহুলের কথায়, “নির্বাচন কমিশন নাগরিকদের বিভ্রান্ত করায় আমাদের গণতন্ত্রের ওপরে আস্থা ভেঙে পড়েছে। ভোট চুরি একটি দেশবিরোধী কাজ।” ভারতের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনেও কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলে হট্টগোল চালাচ্ছেন।

বসে নেই বিজেপিও। রাহুলের অভিযোগের জবাবে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাল্টা আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছেন। তার অভিযোগ, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী ভোটচুরি করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। সংসদে রাহুলের তোলা অভিযোগের জবাব না দিলেও পাল্টা অভিযোগে তিনি বলেছেন, “আপনার পরিবার ভোটচোর।” সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা, তামিলনাডু ও পুদুচেরি রাজ্যে ভোট। এই পাঁচ রাজ্যের ভোট-প্রস্তুতিতেও নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অতীতে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশংসিত হলেও এখন সেদিন আর নেই। শাসক দলের মতো তারাও এখন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছে।

নির্বাচন কমিশন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজ। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্টের অভিযোগ তুলে কংগ্রেসের সমালোচনায় সরব হয়েছেন শ তিনেক প্রাক্তন বিচারপতি, আমলা, সেনা অধিকর্তা। ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, ১০৯ জন সাবেক আমলা, ১৪ জন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও ১৩৩ জন অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার খোলা চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা জানিয়ে কংগ্রেসের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অনুচিত। গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা থাকাটাও জরুরি।

এদিকে, বিহারের পর পশ্চিমবঙ্গসহ ১২টি রাজ্যে চলছে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)। এই এসআইআর নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশন। কারণ বৈধ নাগরিকদেরও ভোটার তালিকায় নাম রাখার পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। প্রক্রিয়া চলাকালে নাগরিকত্বের পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদবের মতে, “গণতন্ত্রে নাগরিকেরা সরকার নির্বাচিত করেন। কিন্তু ভারতে সরকারই নির্বাচিত করছে নাগরিকদের।” ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামণের স্বামী তথা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পরকলা প্রভাকরের উদ্বেগ, “যখন কাউকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় বা রাজনৈতিক সম্প্রদায় থেকে বহিষ্কার করা হয়, তখন তারা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যান।”

এসআইআর নিয়ে বিতর্কে কাল সোমবার মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল নেতারা দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনে বৈঠক করতে যাচ্ছেন। কমিশনের ঘোষিত ‘মৃত ভোটার’রাও তাদের সঙ্গে যাবেন। বৈঠকের আগে, ২৫ জানুয়ারি ভারতের জাতীয় নির্বাচন দিবস উদ্‌যাপন নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে কটাক্ষ করেন মমতা। তিনি বলেন, “হিজ মাস্টার্স (ইঙ্গিত মোদির দিকে) ভয়েস হিসেবে কমিশন এই মুহূর্তে মানুষের ভোটাধিকার লুণ্ঠন করতে ব্যস্ত, এবং তাদের ঔদ্ধত্য হচ্ছে জাতীয় ভোটার দিবস পালন করার– আমি এতে স্তম্ভিত, বিস্মিত, বিচলিত।”

নির্বাচন কমিশনের খুল্লমখুল্লা সমালোচনা হলেও তারা কিন্তু নীরব। রাহুল গান্ধী গত বছর প্রকাশ্যে হুমকি দিলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের প্রতিক্রিয়া ছিল, “শপথপত্র দিন বা জাতির কাছে ক্ষমা চান।” এর বাইরে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা তিনি বা তার দুই নির্বাচন কমিশনার ড. সুখবীর সিং সান্ধু এবং ড. বিবেক যোশী নেননি। সমালোচনার জবাবে তাদের প্রতিক্রিয়া, “সব দলই আমাদের কাছে সমান, কারণ কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বৈষম্য করে না। কমিশন সব ধর্মের, সব শ্রেণির ভোটদাতাদের পাশে রয়েছে ও থাকবে। ধনী, দরিদ্র, বয়স্ক, যুবা বা মহিলা– কারোর প্রতিই কোন রকম বৈষম্য করা হবে না।”

কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতের প্রতিবেশীদের মধ্যে নির্বাচিত সরকার বা নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর বহুদিন ধরে অনাস্থা প্রকট হলেও এ দেশে সেটা ছিল ব্যতিক্রম। ভোট প্রক্রিয়ায় তাদের আস্থা ছিল অটল। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যেভাবে প্রশ্ন উঠছে তাতে মানুষের আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে। সেই ফাটল কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

সম্পর্কিত