নিঃস্ব বিজেপির নির্বাচনে একমাত্র অস্ত্র ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’

নিঃস্ব বিজেপির নির্বাচনে একমাত্র অস্ত্র ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’
সামনেই আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাডু, কেরালা ও পুদুচেরিতে বিধানসভা ভোট। বিজেপি বিভাজনের রাজনীতিকে পুরোমাত্রায় কাজে লাগাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বিজেপির বড় ইস্যু ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। ভোট এলেই তাদের মাথায় দাপিয়ে বেড়ায় ঘুষপেটিয়া বা অনুপ্রবেশের ভূত। তবে ভারতের প্রতিবেশী চীন, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান বা মিয়ানমার নয়; বিজেপির চাই শুধু ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে আম আদমি পার্টির সাংসদ সঞ্জয় সিং যথার্থই বলেছেন, “ভোট এলেই অনুপ্রবেশের ভূত বিজেপির মাথায় চাপে।” অথচ, অনুপ্রবেশ বন্ধের দায়িত্ব তাদের সরকারের। দায়িত্বে আছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির হেভিওয়েট নেতা অমিত শাহ। বিএসএফ তার মন্ত্রণালয়ের অধীনেই কাজ করে।

প্রায়ই শোনা যায়, পাকিস্তানি জঙ্গিরা ভারতে ঢুকে হামলা চালাচ্ছে কাশ্মীর কিংবা অন্যত্র। কিন্তু তাদের প্রতিহত করতে কেন ব্যর্থ ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা, সেই প্রশ্নের কোনও জবাব নেই। এমনকি, পাকিস্তানিদের বেআইনি অনুপ্রবেশ নিয়েও নীরব ভারত সরকার। মিয়নামারের বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা এখনও অনেকে মিজোরাম সরকারি আতিথেয়তায় রয়ে গেছেন। তা নিয়েও বিজেপির মাথাব্যাথা নেই। যত অভিযোগ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে। কারণ এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি।

বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরাই ভারতীয়দের (পড়ুন হিন্দুদের) সবকিছু দখল করে নিচ্ছে। তাই সদ্য সমাপ্ত বিহারের নির্বাচনেও অমিত শাহেরা অনুপ্রবেশকেই বড় ইস্যু বানান। নির্বাচনে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা, বিভিন্ন জনমুখী প্রতিশ্রুতি, দুর্নীতি ও স্বচ্ছতা, দ্রব্যমূল বৃদ্ধি বা রোধ, বেকার সমস্যা বা কর্মসংস্থান, এমন মৌলিক সমস্যার বদলে অনুপ্রবেশকেই হাতিয়ার করছেন বিজেপির ভোট প্রচারকেরা। ভারতীয় ভোটারদের মধ্যে সংখ্যাগুরু হিন্দু এবং মুসলিমরা সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরুর মন জয় করাটাকেই বিজেপি একমাত্র টার্গেট করে নিয়েছে। তাই বিভাজনের রাজনীতি বাড়ছে। সেই বিভাজনের রাজনীতিতেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ বিজেপির পছন্দের ইস্যু। বিজেপি বিরোধীরাও বাধ্য হচ্ছে তার জবাব দিতে।

সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, কেরালা, তামিলনাডু ও পুদুচেরি রাজ্যে বিধানসভা ভোট। পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম তো বটেই বাকি রাজ্যগুলোতেও অনুপ্রবেশকেই বড় ইস্যু করেছে বিজেপি। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা চলছে, অনুপ্রবেশকারীরাই তাদের একমাত্র সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এই প্রচারটা চলছে অত্যন্ত চড়া সুরে। বিজেপির এই প্রচারের বিপরীতে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল তৃণমূলও শুরু করেছে পাল্টা প্রচার। অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রচারের এই ডামাডোলে ভারতের ১২টি রাজ্যে চলছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া। অভিযোগ, বৈধ ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে এসআইআরে। হয়রানির বিচার চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নিজে সুপ্রিম কোর্টে হাজির হয়েছেন। তাই নিয়েও শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক।

অনুপ্রবেশ নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও মমতা ব্যানার্জিকে আক্রমণ করা শুরু করে দিয়েছেন। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তার অভিযোগ, মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) অনুপ্রবেশকারীদের আগলে রাখছে। মোদি বলেছেন,‘‘টিএমসি অনুপ্রবেশকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে এবং আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে তাদের বাঁচাতে।’’ অনুপ্রবেশ সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, ‘‘অনুপ্রবেশকারীরা (পড়ুন মুসলিম অনুপ্রবেশকারীরা) আমাদের যুব সমাজের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছে, রুজিরুটি ছিনিয়ে নিচ্ছে, আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু ওদের (টিএমসির) কিছু যায়-আসে না। নারীদের ওপরে অত্যাচার হলে হতে থাক, ক্ষমতা-নীতির বাইরে কিছু করবেই না! আর তারা এখানে (দিল্লি) এসে আমাদের উপদেশ দিচ্ছেন!’’

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

অথচ, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সরকারেরই দায়িত্ব অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। বিজেপির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার জমি না দেওয়ায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ শেষ করতে পারছেন না তারা। মমতার পাল্টা জবাব, “কেন্দ্র টাকা দিয়ে দিক, সীমান্তে আমরা ফেন্সিং করে দেব।” উল্লেখ্য, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বিজেপি শাসিত আসাম ও ত্রিপুরাতেও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ আজও শেষ হয়নি।

বিজেপির অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে ছেয়ে গিয়েছে বাংলাদেশি মুসলিম আর রোহিঙ্গায়। তাদের ভোটেই নাকি মমতা জেতেন। এই অভিযোগের জবাবে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মমতার বিজেপিকে পাল্টা কটাক্ষ, “একটা রোহিঙ্গা খুঁজে পেয়েছেন? ২০২৪ সালে এই ভোটার লিস্টে ভোট হয়েছে। তা হলে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলুন।” সেইসঙ্গে তার প্রশ্ন, “যদি বাংলায় অনুপ্রবেশ ঘটেই থাকে, তবে সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কী করছে?’’

এরপরেও থেমে নেই অনুপ্রবেশ নিয়ে নির্বাচনী প্রচার। খোদ অমিত শাহ বিজেপির হয়ে প্রচারে এসে পশ্চিমবঙ্গে বলছেন, “বাংলায় সরকার তৈরি খালি পশ্চিমবঙ্গের জন্য জরুরি। এখানকার অনুপ্রবেশকারীরা পুরো দেশের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জন্য জমি দিচ্ছেন না মমতা। অনুপ্রবেশকারীদের আটকায় না পুলিশ। ভুয়া নথি তৈরি করে দেশে (দেশের বিভিন্ন জায়গায়) পাঠাচ্ছেন।’’ পাল্টা জবাব মমতার, “বাংলাকে অপবাদ দেওয়া বন্ধ করুন। আগে নিজের সরকারের পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতাগুলোর দায় নিতে শিখুন।”

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী একসময় তৃণমূলেরও খুব প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন। এখন দলবদলে তিনি বিজেপিতে। তিনি প্রতিদিনই অনুপ্রবেশকেই ইস্যু করে মমতার বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন। আর বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের বলে চলেছেন, “কেবল অনুপ্রবেশই নয়, অনুপ্রবেশকারীদের ভারতীয় জাল পরিচয়পত্র করিয়ে দিয়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার পিছনে তৃণমূলের চক্র সক্রিয় রয়েছে।’’ পাল্টা জবাব দিচ্ছে তৃণমূলও। আর রাজ্যের দুই ক্ষয়িষ্ণু শক্তি কংগ্রেস ও বামেদের প্রচারেও রাজ্যের জ্বলন্ত সমস্যা ভুলে বড় অংশ জুড়ে থাকছে অনুপ্রবেশ এবং এসআইআর।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত

আসামে তো আরও কঠোর ভাষায় অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছে বিজেপি। তাদের প্রচারে মুসলিমদেরকেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপির স্লোগান, “হাতত বিড়ি মুখত পান ভাগৌ মিঞা পাকিস্তান।’’ খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা রাজ্যবাসীকে মুসলিম রিকশাওয়ালাদের কম ভাড়া দিতে বলেছেন। এই নিয়ে মামলাও হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। বিজেপির অভিযোগ, মুসলিম অনুপ্রবেশকারীরাই নাকি দখল করে নিচ্ছে অসমিয়াদের সবকিছু। অথচ, গত ১০ বছর ধরে আসামে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। কেন্দ্রেও তাদেরই সরকার। তাই বিরোধী দল কংগ্রেসের প্রশ্ন, অনুপ্রবেশরোধে ‘ডাবল ইঞ্জিনের সরকার’ কী করেছে? প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তথা সাংসদ গৌরব গগৈয়ের অভিযোগ, মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছেন হিমন্ত। জবাবে হিমন্ত আবার গৌরবকে বলেছেন ‘পাকিস্তান চর’। ঘৃণ্য ভাষণের কারণে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে গুয়াহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি দিয়ে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা করার অনুরোধ করেছেন আসামের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী। তাদের অভিযোগ, ঘৃণা ছড়াচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী।

কিন্তু আদালতে মামলা করেও প্রচার বন্ধ করা যায়নি। ভোট আসে, ভোট যায়। কিন্তু অনুপ্রবেশ নিয়ে প্রচার বা পাল্টা প্রচার বন্ধ হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। কারণ অনুপ্রবেশের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে ধর্মীয় ও ভাষিক বিভাজন। বিজেপির কাছে আসামে আক্রমণের লক্ষ্য হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে শুধুই বাঙালি। আর পশ্চিমবঙ্গে শুধুই মুসলিম।

হিন্দুরা তাদের চোখে ভোট ব্যাংক, অনুপ্রবেশকারী হলেও সাত খুন মাফ!

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলকাতা (ভারত)

সম্পর্কিত