সোহরাব হাসান

বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্য-এই তিন দেশে অসামান্য সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন যে সাংবাদিক, তার নাম স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। তিনি নিজ দেশ যুক্তরাজ্যে নাইটহুড উপাধি পেয়েছেন। যে দেশে তার জন্ম ও কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, সেই ভারতে পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। আর বাংলাদেশ তাকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
মার্ক টালি নামটি এ দেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। তিনি তখন ছিলেন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা। তার পাঠানো খবরগুলো বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর যাতে বহির্বিশ্ব না জানতে পারে, সে জন্য পাকিস্তান সরকার সব বিদেশি সাংবাদিককে বের করে দেয়। এরপরও সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সারা বিশ্ব পাকিস্তানিদের অপকর্মের কথা জেনে যায়। সে সময়ে ভারতে অবস্থানরত সাংবাদিকেরা শরণার্থীদের বরাতে পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রচার করতে থাকেন।
এই পটভূমিতে পাকিস্তান সরকার কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিককে ‘তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে’ পাঠায় সরেজমিনে সবকিছু দেখে যাওয়ার জন্য। মার্ক টালি ছিলেন সেই সাংবাদিক দলের সদস্য। পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য ছিল, ‘সব কিছু স্বাভাবিক দেখানো।’ কিন্তু পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তা গ্রহণকারী সাংবাদিকেরা নিজ নিজ দেশে গিয়ে যা লিখলেন, সেটা ইসলামাবাদের জন্য বুমেরাং হলো।
মার্ক টালি সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, যখন ঢাকার বাইরে গেলাম– যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি, দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে।
“আমি তখন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য কাজ করছিলাম। ছিলাম দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ব পরিষেবার প্রধান ভাষ্যকার। কাজটি ছিল লন্ডনভিত্তিক। তবে আমাকে নিয়মিত দক্ষিণ এশিয়ায় ভ্রমণ করতে হতো। ১৯৭১ সালে সামরিক হামলার পরে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে যে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রথম দলে আমি ছিলাম। সারা দেশে আমাদের মোটামুটিভাবে অবাধে ভ্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর আগে সাংবাদিকদের আরেকটি দল এসেছিল। কিন্তু তারা একদমই স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারেনি। সেটা ছিল, যাকে বলে, একরকমের নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সে সময় আমরা যা দেখেছি, যা শুনেছি, তা ছিল হামলার প্রমাণ। সেনারা সেনানিবাস থেকে যে গুলি করতে করতে বের হয়ে এসেছিল, আমরা স্পষ্ট তা বুঝতে পেরেছি। যে ক্ষতি তারা করেছিল, তা আমরা দেখেছি। দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে যখন ঢাকার বাইরে গেলাম– যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি– দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে। বল প্রয়োগ করে বাসিন্দাদের গ্রামছাড়া করেছে যেন তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে।”

একাত্তরে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্ক টালির আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটি আজীবন অটুট ছিল। পেশাগত কারণে তিনি বহুবার এখানে এসেছেন, অনেক রাজনীতিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। ২০১২ সালে তাকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
বাংলাদেশ নিয়ে মার্ক টালির আগ্রহের আরেকটি কারণ তার মায়ের জন্ম আখাউড়ায়। মনে পড়ে, ১৯৯৪ সালে তিনি বিবিসির কোনো কাজে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময়ে বিবিসির হয়ে ঢাকায় কাজ করতেন আতাউস সামাদ। তিনিই আমাকে তার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। শেরাটন হোটেলে তার কক্ষে আমাদের কথোপকথন শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি উপমহাদেশ জুড়ে মৌলবাদী শক্তির উত্থান নিয়েও কথা হয়। এর বছর দুই আগে ভারতে হিন্দু মৌলবাদীরা বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে যার অভিঘাত এসে পড়ে এখানেও। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় দুই দেশেই। মার্ক টালির একটি কথা আজও কানে বাজে। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যে যে মৌলবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটছে, তার পেছনে বঞ্চনাও কম দায়ী নয়। তিনি বললেন, যারা ধর্মীয় রাজনীতি করেন, তারা সমাজের অবহেলিত শ্রেণি। ভদ্রলোকদের ড্রয়িং রুমে ঢুকতে পারেন না। বারান্দা থেকে বিদায় হতে হয়। তার কথাগুলো এখনো প্রতিধ্বনি হয়।
মার্ক টালি ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন। পরের বছর দিল্লিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার আগে ২০ বছর তিনি দিল্লিতে ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ভারতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। নিজে দুটি রেডিও প্রতিষ্ঠা করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন মার্ক টালি। তার মধ্যে রয়েছে, অমৃতসর: মিসেস গান্ধীস লাস্ট ব্যাটল, রাজ টু রাজিব: ফর্টি ইয়ার্স অব ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স, নো ফুল স্টপ ইন ইন্ডিয়া, আনএন্ডিং জার্নি, ইন্ডিয়া: দ্য রোড অ্যাহেড, হার্ট অব ইন্ডিয়া।
একাত্তরের বেশির ভাগ সময় মার্ক টালি বিবিসির সদরদপ্তরে ছিলেন। মার্ক টালির ভাষায়, “আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তখন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক প্রচার দিয়েছিল। মার্কিন গণমাধ্যম তাদের সরকার সহানুভূতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও ইতিবাচক প্রচার দিয়েছিল। প্রতিদিন আমি প্রতিবেদনগুলো পড়তাম আর বিবিসির জন্য আমার নিজের ভাষ্য তৈরি করতাম। এসব প্রতিবেদন ছাড়াও আমি আমার প্রতিবেদনে বাংলাদেশি প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য যোগ করতাম। এ রকম প্রতিনিধিদের আমরা বলতাম ‘স্ট্রিংগার’। তারা খুবই সাহসী ছিলেন। বিবিসির স্ট্রিংগারের নাম ছিল নিজামউদ্দিন। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। খুব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।”
তিনি আরও লিখেছেন, “মানুষ বিবিসির ওপর খুব নির্ভর করত। আমি বিবিসিতে কাজ করেছি বলে বলছি না। পাকিস্তান রেডিও তো ছিলই। তারা পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। ছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। তারা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। বিবিসি ছিল প্রধান বিদেশি চ্যানেল। ধরে নেওয়া হতো যে, আমরা নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রচার করছি। আশা করি, আমরা তা করতামও। ফলে বাংলাদেশে আমাদের খুব সম্মান করা হতো। তবে পশ্চিম পাকিস্তানে যে আমরা খুব সমীহ পেতাম, তা বলা যাবে না। পরিস্থিতি যেমন ছিল, তাতে এ রকম হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
ভারতে বিবিসির হয়ে দায়িত্ব পালনকালে মার্ক টালি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ভুপাল ট্রাজেডি, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ও শিখ বিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এতে কোনো পক্ষ খুশি হয়েছে, কোনো পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। বাবরি মসজিদের প্রতিবেদন করতে গিয়ে তিনি বিপদেও পড়েছিলেন।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ফরাসি সাংবাদিক সেবাস্তিন ফার্সিস সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “১৯৯২ সালের ডিসেম্বর: অযোধ্যায় ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ হিন্দু উগ্রপন্থীরা ভেঙে ফেলেছিল, যারা দাবি করেছিল যে এটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের জায়গায় নির্মিত হয়েছিল। ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এই গ্রামের রাস্তায় হাজার হাজার জঙ্গি ঢুকে পড়ে, দেশের ইতিহাসের এই নাটকীয় মুহূর্তটি কভার করতে আসা সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করে। তারা যখন মিডিয়ার ছবি এবং টেলিভিশন ক্যামেরা ধ্বংস করে দেয়, তখন একজন বিদেশী সাংবাদিককে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। জনতা তার নাম ধরে চিৎকার করে বলে: মার্ক টালি! ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যুরো প্রধান আক্রমণ থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। তিনি একটি ছোট মন্দিরে আটকে ছিলেন, যতক্ষণ না তিনজন ভারতীয় সহকর্মী তাকে ছেড়ে দেন এবং স্থানীয় কর্মকর্তার হস্তক্ষেপের পর তাকে নিরাপদে নিয়ে আসেন।”
মালবিকা ব্যানার্জির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্ক টালি বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক প্রশংসা করেছিলেন। একই সঙ্গে সদ্য স্বাধীন দেশটির চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার যেসব সাংবাদিক নিয়েছিলেন, তাদের একজন হতে পেরে আমি আনন্দিত। তিনি বাংলাদেশের সংগ্রামে বিবিসির ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আমি তাকে বলতে চেষ্টা করি, শেখ সাহেব আমরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে ছিলাম না। আমরা ঘটনার ভারসাম্যপূর্ণ বয়ান তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তিনি সেটা মানছিলেন না এবং আমাকে একটি উপহারও দিয়েছিলেন, যা এখনো দিল্লি অফিসে আছে।
শেষ দিকে সাংবাদিকতা নিয়ে মার্ক টালির হতাশাও ছিল। ২০০০ সালে এক সাক্ষাৎকারে রেডিও সাংবাদিকতার এই কিংবদন্তী বলেন, সার্বিকভাবে টিভি সাংবাদিকতার মান মারাত্মকভাবে নেমে গেছে। তারা সাংবাদিকতার সস্তা পথ বেছে নিয়েছে। শুধু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করছে। তৃণমূলের মানুষ কী ভাবছে, তা খতিয়ে দেখছে না। এ ছাড়া কোনো গণমাধ্যম ফলোআপ করতেও আগ্রহ দেখায় না। একটা-দুটো প্রতিবেদন করে দায়িত্ব শেষ করে। এটি কাঙ্ক্ষিত নয়।
তবে ভারতের মুদ্রিত মাধ্যমের সাংবাদিকতার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, সংবাদপত্রের চিত্রটা উজ্জ্বল। অনেক পত্রিকাই গুরুত্ব দিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে। কেউ কেউ সরকারকে সমর্থন করছে। ঠিকই আছে। ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ওইখানের সংবাদপত্রগুলো এভাবে না হয় ওভাবে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে থাকে। ভারতে সেটা নয়। যেসব পত্রিকা একসময় অধিক সরকার-সমর্থক ছিল, তারা পরে আর সরকারের সঙ্গে যুক্ততা রাখেনি। সরকারকে চ্যালেঞ্জও করছে। ব্রিটেনের অনেক পত্রিকা ঘোষণা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে। এই ধারা পশ্চিমের আরও অনেক দেশে আছে।
মার্ক টালি মনে করেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবল হয়েছে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র। সরকার পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয় সাংবাদিক মার্ক টালির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

বাংলাদেশ, ভারত ও যুক্তরাজ্য-এই তিন দেশে অসামান্য সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন যে সাংবাদিক, তার নাম স্যার উইলিয়াম মার্ক টালি। তিনি নিজ দেশ যুক্তরাজ্যে নাইটহুড উপাধি পেয়েছেন। যে দেশে তার জন্ম ও কর্মজীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, সেই ভারতে পেয়েছেন পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ। আর বাংলাদেশ তাকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
মার্ক টালি নামটি এ দেশের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায় একাত্তরে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে। তিনি তখন ছিলেন বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা। তার পাঠানো খবরগুলো বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল।
১৯৭১ সালের পঁচিশে মার্চ দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার খবর যাতে বহির্বিশ্ব না জানতে পারে, সে জন্য পাকিস্তান সরকার সব বিদেশি সাংবাদিককে বের করে দেয়। এরপরও সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সারা বিশ্ব পাকিস্তানিদের অপকর্মের কথা জেনে যায়। সে সময়ে ভারতে অবস্থানরত সাংবাদিকেরা শরণার্থীদের বরাতে পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞের খবর প্রচার করতে থাকেন।
এই পটভূমিতে পাকিস্তান সরকার কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিককে ‘তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে’ পাঠায় সরেজমিনে সবকিছু দেখে যাওয়ার জন্য। মার্ক টালি ছিলেন সেই সাংবাদিক দলের সদস্য। পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্য ছিল, ‘সব কিছু স্বাভাবিক দেখানো।’ কিন্তু পাকিস্তান সরকারের আতিথেয়তা গ্রহণকারী সাংবাদিকেরা নিজ নিজ দেশে গিয়ে যা লিখলেন, সেটা ইসলামাবাদের জন্য বুমেরাং হলো।
মার্ক টালি সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, যখন ঢাকার বাইরে গেলাম– যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি, দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে।
“আমি তখন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের জন্য কাজ করছিলাম। ছিলাম দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্ব পরিষেবার প্রধান ভাষ্যকার। কাজটি ছিল লন্ডনভিত্তিক। তবে আমাকে নিয়মিত দক্ষিণ এশিয়ায় ভ্রমণ করতে হতো। ১৯৭১ সালে সামরিক হামলার পরে সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে যে সাংবাদিকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাদের প্রথম দলে আমি ছিলাম। সারা দেশে আমাদের মোটামুটিভাবে অবাধে ভ্রমণ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এর আগে সাংবাদিকদের আরেকটি দল এসেছিল। কিন্তু তারা একদমই স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারেনি। সেটা ছিল, যাকে বলে, একরকমের নিয়ন্ত্রিত ভ্রমণ।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সে সময় আমরা যা দেখেছি, যা শুনেছি, তা ছিল হামলার প্রমাণ। সেনারা সেনানিবাস থেকে যে গুলি করতে করতে বের হয়ে এসেছিল, আমরা স্পষ্ট তা বুঝতে পেরেছি। যে ক্ষতি তারা করেছিল, তা আমরা দেখেছি। দেখেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমন ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে যখন ঢাকার বাইরে গেলাম– যেমন রাজশাহীর কথা বলতে পারি– দেখলাম যে রাস্তার পাশের প্রায় প্রতিটি গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই এই ভূমিতে স্রেফ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বাসনায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গ্রামগুলোয় আগুন লাগিয়েছে। বল প্রয়োগ করে বাসিন্দাদের গ্রামছাড়া করেছে যেন তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে।”

একাত্তরে বাংলাদেশের সঙ্গে মার্ক টালির আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, সেটি আজীবন অটুট ছিল। পেশাগত কারণে তিনি বহুবার এখানে এসেছেন, অনেক রাজনীতিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। ২০১২ সালে তাকে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা।
বাংলাদেশ নিয়ে মার্ক টালির আগ্রহের আরেকটি কারণ তার মায়ের জন্ম আখাউড়ায়। মনে পড়ে, ১৯৯৪ সালে তিনি বিবিসির কোনো কাজে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময়ে বিবিসির হয়ে ঢাকায় কাজ করতেন আতাউস সামাদ। তিনিই আমাকে তার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। শেরাটন হোটেলে তার কক্ষে আমাদের কথোপকথন শুরু হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি উপমহাদেশ জুড়ে মৌলবাদী শক্তির উত্থান নিয়েও কথা হয়। এর বছর দুই আগে ভারতে হিন্দু মৌলবাদীরা বাবরী মসজিদ ধ্বংস করে যার অভিঘাত এসে পড়ে এখানেও। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় দুই দেশেই। মার্ক টালির একটি কথা আজও কানে বাজে। সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মধ্যে যে মৌলবাদী রাজনীতির প্রসার ঘটছে, তার পেছনে বঞ্চনাও কম দায়ী নয়। তিনি বললেন, যারা ধর্মীয় রাজনীতি করেন, তারা সমাজের অবহেলিত শ্রেণি। ভদ্রলোকদের ড্রয়িং রুমে ঢুকতে পারেন না। বারান্দা থেকে বিদায় হতে হয়। তার কথাগুলো এখনো প্রতিধ্বনি হয়।
মার্ক টালি ১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন। পরের বছর দিল্লিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ১৯৯৪ সালে বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার আগে ২০ বছর তিনি দিল্লিতে ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। বিবিসি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ভারতেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। নিজে দুটি রেডিও প্রতিষ্ঠা করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন মার্ক টালি। তার মধ্যে রয়েছে, অমৃতসর: মিসেস গান্ধীস লাস্ট ব্যাটল, রাজ টু রাজিব: ফর্টি ইয়ার্স অব ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স, নো ফুল স্টপ ইন ইন্ডিয়া, আনএন্ডিং জার্নি, ইন্ডিয়া: দ্য রোড অ্যাহেড, হার্ট অব ইন্ডিয়া।
একাত্তরের বেশির ভাগ সময় মার্ক টালি বিবিসির সদরদপ্তরে ছিলেন। মার্ক টালির ভাষায়, “আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তখন মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক প্রচার দিয়েছিল। মার্কিন গণমাধ্যম তাদের সরকার সহানুভূতিশীল না হওয়া সত্ত্বেও ইতিবাচক প্রচার দিয়েছিল। প্রতিদিন আমি প্রতিবেদনগুলো পড়তাম আর বিবিসির জন্য আমার নিজের ভাষ্য তৈরি করতাম। এসব প্রতিবেদন ছাড়াও আমি আমার প্রতিবেদনে বাংলাদেশি প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য যোগ করতাম। এ রকম প্রতিনিধিদের আমরা বলতাম ‘স্ট্রিংগার’। তারা খুবই সাহসী ছিলেন। বিবিসির স্ট্রিংগারের নাম ছিল নিজামউদ্দিন। তিনি একজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। খুব ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতেন। পাকিস্তানি সেনারা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।”
তিনি আরও লিখেছেন, “মানুষ বিবিসির ওপর খুব নির্ভর করত। আমি বিবিসিতে কাজ করেছি বলে বলছি না। পাকিস্তান রেডিও তো ছিলই। তারা পাকিস্তানি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। ছিল অল ইন্ডিয়া রেডিও। তারা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরত। বিবিসি ছিল প্রধান বিদেশি চ্যানেল। ধরে নেওয়া হতো যে, আমরা নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রচার করছি। আশা করি, আমরা তা করতামও। ফলে বাংলাদেশে আমাদের খুব সম্মান করা হতো। তবে পশ্চিম পাকিস্তানে যে আমরা খুব সমীহ পেতাম, তা বলা যাবে না। পরিস্থিতি যেমন ছিল, তাতে এ রকম হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
ভারতে বিবিসির হয়ে দায়িত্ব পালনকালে মার্ক টালি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, ভুপাল ট্রাজেডি, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যা ও শিখ বিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে বিশ্লেষণী পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এতে কোনো পক্ষ খুশি হয়েছে, কোনো পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়েছে। বাবরি মসজিদের প্রতিবেদন করতে গিয়ে তিনি বিপদেও পড়েছিলেন।
নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ফরাসি সাংবাদিক সেবাস্তিন ফার্সিস সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “১৯৯২ সালের ডিসেম্বর: অযোধ্যায় ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদ হিন্দু উগ্রপন্থীরা ভেঙে ফেলেছিল, যারা দাবি করেছিল যে এটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের জায়গায় নির্মিত হয়েছিল। ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের এই গ্রামের রাস্তায় হাজার হাজার জঙ্গি ঢুকে পড়ে, দেশের ইতিহাসের এই নাটকীয় মুহূর্তটি কভার করতে আসা সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ করে। তারা যখন মিডিয়ার ছবি এবং টেলিভিশন ক্যামেরা ধ্বংস করে দেয়, তখন একজন বিদেশী সাংবাদিককে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। জনতা তার নাম ধরে চিৎকার করে বলে: মার্ক টালি! ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (বিবিসি) ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যুরো প্রধান আক্রমণ থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যান। তিনি একটি ছোট মন্দিরে আটকে ছিলেন, যতক্ষণ না তিনজন ভারতীয় সহকর্মী তাকে ছেড়ে দেন এবং স্থানীয় কর্মকর্তার হস্তক্ষেপের পর তাকে নিরাপদে নিয়ে আসেন।”
মালবিকা ব্যানার্জির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্ক টালি বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক প্রশংসা করেছিলেন। একই সঙ্গে সদ্য স্বাধীন দেশটির চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছেন, শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার যেসব সাংবাদিক নিয়েছিলেন, তাদের একজন হতে পেরে আমি আনন্দিত। তিনি বাংলাদেশের সংগ্রামে বিবিসির ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আমি তাকে বলতে চেষ্টা করি, শেখ সাহেব আমরা কারও পক্ষে বা বিপক্ষে ছিলাম না। আমরা ঘটনার ভারসাম্যপূর্ণ বয়ান তুলে ধরেছিলাম। কিন্তু তিনি সেটা মানছিলেন না এবং আমাকে একটি উপহারও দিয়েছিলেন, যা এখনো দিল্লি অফিসে আছে।
শেষ দিকে সাংবাদিকতা নিয়ে মার্ক টালির হতাশাও ছিল। ২০০০ সালে এক সাক্ষাৎকারে রেডিও সাংবাদিকতার এই কিংবদন্তী বলেন, সার্বিকভাবে টিভি সাংবাদিকতার মান মারাত্মকভাবে নেমে গেছে। তারা সাংবাদিকতার সস্তা পথ বেছে নিয়েছে। শুধু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করছে। তৃণমূলের মানুষ কী ভাবছে, তা খতিয়ে দেখছে না। এ ছাড়া কোনো গণমাধ্যম ফলোআপ করতেও আগ্রহ দেখায় না। একটা-দুটো প্রতিবেদন করে দায়িত্ব শেষ করে। এটি কাঙ্ক্ষিত নয়।
তবে ভারতের মুদ্রিত মাধ্যমের সাংবাদিকতার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, সংবাদপত্রের চিত্রটা উজ্জ্বল। অনেক পত্রিকাই গুরুত্ব দিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে। কেউ কেউ সরকারকে সমর্থন করছে। ঠিকই আছে। ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ওইখানের সংবাদপত্রগুলো এভাবে না হয় ওভাবে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে থাকে। ভারতে সেটা নয়। যেসব পত্রিকা একসময় অধিক সরকার-সমর্থক ছিল, তারা পরে আর সরকারের সঙ্গে যুক্ততা রাখেনি। সরকারকে চ্যালেঞ্জও করছে। ব্রিটেনের অনেক পত্রিকা ঘোষণা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে। এই ধারা পশ্চিমের আরও অনেক দেশে আছে।
মার্ক টালি মনে করেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবল হয়েছে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র। সরকার পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের আত্মার আত্মীয় সাংবাদিক মার্ক টালির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সম্পাদক, চরচা।

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট