সংখ্যালঘুদের অনিরাপদ রেখে সুষ্ঠু ভোট কীভাবে হবে

সংখ্যালঘুদের অনিরাপদ রেখে সুষ্ঠু ভোট কীভাবে হবে
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্ট্যাডিজ (সিজিএস)-এর উদ্যোগে সংখ্যালঘু ভোটারদের ওপর একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। দেশের ৫০৫ জন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে চালানো এই জরিপের ফলাফল বলছে, ৫০ শতাংশের বেশি অংশগ্রহণকালে উদ্বিগ্ন এবং ২৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা নিজেকে অনিরাপদ বা চরম অনিরাপদ মনে করেন। এর অর্থ ৭৫ শতাংশ উত্তরদাতা কোনো না কোনোভাবে ভয়ভীতিতে আছেন। আর ভয়ভীতি নেই এ রকম সংখ্যালঘু মানুষের সংখ্যা হবে ২৫ শতাংশ। এ অবস্থায় তাদের পক্ষে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া যে কঠিন, সে কথা সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে চান না। তারা মুখস্থ কথা বলে দেন, এখানে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে আছেন। কোনো সমস্যা নেই।

সিজিএসের জরিপের প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল আল জাজিরার প্রতিবেদনেও। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাজশাহীর শিক্ষক সুকুমার প্রামাণিক বলেন, “আসন্ন জাতীয় নির্বাচন হতে পারে রাজনীতির ওপর তার আস্থা রাখার শেষ পরীক্ষা।”

এ প্রসঙ্গে ২০০১ সালে নির্বাচন পরবর্তী ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারি। ওই নির্বাচনের পর ভোলা, বাগেরহাট, বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। একটি মানবাবিধার সংগঠনের প্রতিনিধি দলের সদস্য হয়ে গাজীপুরের কালীগঞ্জের একটি উপদ্রুত গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে এক বৃদ্ধা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, “বাবারা ভোটার তালিকা থেকে আমাদের নামটি বাদ দিয়ে দাও। ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে কেউ আমাদের ওপর হামলা করবে না।”

২০০১ থেকে ২০২৬ সাল। মাঝখানে ২৫ বছর। কিন্তু বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের দুঃখ-দুর্দশা মোটেই কমেনি। যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদল ও নির্বাচন এলেই তারা ভয়ে থাকেন।

বিবিসি নিউজ বাংলার কাছে যশোরের অভয়নগরের নির্মল বিশ্বাস সেই ভয়ের কথাই জানিয়েছেন। তার ভাষায়, “আমরা যদি বিএনপিরে ভোট দিই তালি আমাগে জামাত আইসে ধরে বসবে, আর যদি জামাতরে ভোট দিই তালি বিএনপি আইসে ধরে বসবে। কোন দিকে যাব আমরা কন?” একই গ্রামের শিউলি বিশ্বাস আক্ষেপের সুরে বললেন, “আমরা হলাম হিন্দু মানুষ, সামনে যদি ব্যালট পেপারে সিল মাইরে দিই তাও কিন্তু আমাদের বিশ্বাস করবে না, এইটাই কিন্তু বাস্তব। আমরা হয়ে গেছি বলের মতো, যেদিকে যাই সেদিকে লাথি খাই। পথে ঘাটে যেহানেই যাই শুনি হিন্দু মানেই নৌকার।”

২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি।
২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি।

গত বছর মে মাসে তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক বিএনপি নেতার হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে হিন্দু অধ্যুষিত ওই গ্রামের মতুয়া সম্প্রদায়ের ১৮টি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে বসত বাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে আগুন দিয়ে দিপু চন্দ্রকে হত্যা এবং পর পর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকন্ঠা সৃষ্টি করেছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়।

আলজাজিরার বিশ্লেষণ হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচনের সময় দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক উত্তেজনাপূর্ণ এই সময়টার প্রায়ই ভুক্তভোগী হন ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের অবসানের পর থেকে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা নিজেদের অবরুদ্ধ মনে করছেন। তাদের ওপর হামলা, হত্যাকাণ্ড এবং বাড়িঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, এসব ঘটনার বেশির ভাগই ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত নয়।

এমন এক পরিস্থিতিতে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে, যদিও বড় রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। সব দলই সংখ্যালঘু ভোটারদের অভয় দিচ্ছে। নির্বাচনে সব দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু প্রার্থীও আছেন। কট্টর মৌলবাদী দল হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীও এবারে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিকে প্রার্থী করেছে। কিন্তু প্রতীকী প্রার্থী করা দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে কতটা অভয় দিতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদল ও নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা ভয়ে থাকেন। ছবি: রয়টার্স
যেকোনো রাজনৈতিক পালাবদল ও নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘুরা ভয়ে থাকেন। ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ আলজাজিরাকে বলেন, “আপনি যদি অতীতের নির্বাচনগুলোর দিকে তাকান তাহলে দেখবেন, এমনকি আওয়ামী লীগের আমলেও কখনোই সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন আসলে বন্ধ হয়নি। এটি নির্বাচনের আগে ও পরে সব সময়ই ঘটেছে।” সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এ কারণে সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় বরাবর বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনকারী রানা দাশগুপ্ত প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না।

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হওয়ার পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ওপর ব্যাপক হামলার ঘটনা ঘটে। সে সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করলেও বিচারের উদ্যোগ নেয়নি। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তারা যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করেছিলেন তাও আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি সংখ্যালঘুদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আর এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মাবমাননার অলীক অভিযোগ আনা হয়। যে দরিদ্র জেলের মোবাইল ফোনই নেই তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে উসকানিমূলক বার্তা দেওয়ার অভিযোগ এনে সারা দেশে তুলকালাম ঘটানো হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে দাবি বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৫২২টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি হত্যার ঘটনা রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ওই বছর মোট ২ হাজার ১৮৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

অবশ্য বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য রেকর্ড করেছে কর্তৃপক্ষ। সরকারের দাবি, এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ৭১টি ঘটনার পেছনে ‘সাম্প্রদায়িক যোগসূত্র’ পাওয়া গেছে। বাকি ঘটনাগুলোকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা যেই দাবিই করুন না কেন বিভিন্ন ঘটনায় আক্রমণের শিকার হচ্ছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ২২১টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু ও ১৭ জন আহত হওয়ার তথ্য রয়েছে। আসকের এই পরিসংখ্যান হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের দেওয়া সংখ্যার চেয়ে কম হলেও সরকারের দেওয়া তথ্যের চেয়ে বেশি।

সংখ্যার এই হেরফের সংখ্যালঘুদের মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারছে না। সিজিএসের সভায় অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য যথার্থই বলেছেন, “প্রধান উপদেষ্টার কথার সঙ্গে কাজের সম্পর্ক নেই। তিনি বললেন, ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সবাই এক ছাতার নিচে থাকবে। কিন্তু ছাতা তো খুললই না। বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে।”

সম্পর্কিত