ইব্রাহীম চৌধুরী খোকন

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছিল, একদম লাল টুকটুকে, যেন আগুনের ছোট্ট চাঁদ। আকাশ মেঘমুক্ত, কুয়াশাহীন–এমন ভোরের সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য খুব কমই হয়েছে আমার। বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে, সেই নতুন দিনের আলোয় মনে হচ্ছিল রমনার বটমূলে থাকা স্বজনেরা হাসিমাখা চোখে দেখছে আমাকে। গান গাইছিলাম, ‘এসো হে বৈশাখ’, কিন্তু অন্তরে বাজছিল অন্য এক সুর–বিদেশের পথে যাত্রার ব্যথা, ফ্লাইটের সঙ্গে মিলিত বুকের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ, আর কখনো আগের নববর্ষের মতো ফিরে যায়নি। দিনপঞ্জি তো আর পেছনে যায় না।
আমেরিকা পৌঁছে, প্রথম কয়েক দিন মনটা যেন আনচান করে। তখনো হাতে মোবাইল বা ইন্টারনেট নেই। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হিলসাইডের ১৫০ নম্বর স্ট্রিটের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে আমি স্বদেশের খোঁজ নিই। মা পাশে বসে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “মন এত খারাপ কেন?”
“পান্তা ভাত আর ইলিশের জন্য”–বলতেই মা হাসলেন। মনে হলো, তিনি বুঝলেন–আমি কোনো মেয়ের জন্য নয়, বরং স্বদেশের জন্য মন খারাপ করছি। মা তখনই সমাধানের খোঁজে ব্যস্ত হলেন। বললেন, “এখানে আমরা চেষ্টা করি। ঠান্ডা ভাত আছে, ভিজিয়ে পান্তা ভাত করব। ইলিশ মাছও চেষ্টা করে দেখি।”
এরপর গল্পও জুড়ে দিলেন, “তোমরা এখন যেভাবে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন কর, আমাদের সময় তা ছিল হালখাতার দিন। মনে আছে তোমার বাবা জীবিত থাকলে কত লোক তখন নাড়ু-মিঠাই নিয়ে আসত!” মায়ের চোখে-মুখে তখন স্মৃতির ঝিলিক ফুটে উঠেছিল।

জ্যাকেট জড়িয়ে মা বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন, সাটপিন বুলেভার্দের চাইনিজ দোকান থেকে মাছ নিয়ে। বললেন, “এটাই এখানে ইলিশের মতো স্বাদ।” আমেরিকায় সেই প্রথম পান্তা-ইলিশ খাওয়া। স্বাদ ছিল তাজা, অথচ মনে হচ্ছিল স্বদেশের মাটির রূপ, স্বাদের ছোঁয়া। মা টের পেলেন। বললেন, “আমরা সিলেটের মানুষ স্বাভাবিকভাবে পান্তাভাত খাই না, কিন্তু এটিই আমাদের বাঙালিয়ানা।”
তারপর ধীরে ধীরে জানতে পারলাম–তখনকার অল্প কয়েকজন বাঙালি প্রবাসীই এই সংস্কৃতিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। নার্গিস আহমেদ নামের এক প্রবাসী, বাংলা নাটকের দল ‘ড্রামা সার্কেল’-এর সঙ্গে মিলিয়ে ছোট আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষ পালন শুরু করেছিলেন। শাড়ি, চুড়ি, ঘুঙুর, লাল-সবুজের উজ্জ্বলতা–সেই সব পদক্ষেপ বিদেশিদেরও মুগ্ধ করেছিল। নার্গিস আহমেদ আমাকে শোনালেন, কীভাবে কয়েকজন প্রবাসীর হাত ধরে নিউইয়র্কে পয়লা বৈশাখের রূপ তৈরি হয়। দিনগুলোকে পেছনে ফেলে সেই অল্পসংখ্যক উদ্যোগ আজ প্রায় এক দশক ধরে নিউইয়র্কের কুইন্স, ব্রংক্স, ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনে বড় আকারে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। সেই সময় থেকে মার্কিন কংগ্রেসম্যানসহ মূলধারার লোকজনও বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পরিচিত হন এবং অংশ নিতে থাকেন।

পয়লা বৈশাখ এখন শুধু দিন নয়, বাঙালির আত্মার উৎসব। নতুন প্রজন্ম দেশি পোশাক, শাড়ি, ঘুঙুর পরে আনন্দধ্বনির মধ্যে গান গায়–এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও বার্তা দেন, স্বীকৃতি দেন, এবং দেশ থেকে দূরে জন্ম নেওয়া বাঙালিরা নিজেদের সংস্কৃতিকে আবারও আবিষ্কার করে।
উত্তর আমেরিকায় এখন শুধু চীনা নববর্ষ, জাপানি নববর্ষ (Shōgatsu), কোরিয়ান নববর্ষ (Seollal), ইরানীয় নববর্ষ (Nowruz), হিব্রু নববর্ষ (Rosh Hashanah), ইসলামি নববর্ষ (Muharram), থাই নববর্ষ (Songkran) ও পশ্চিমী নববর্ষ (Gregorian New Year) উদ্যাপন হয়। কিন্তু বাংলার নববর্ষ–পয়লা বৈশাখ সবচেয়ে বর্ণাঢ্যভাবে পালিত হয়। নিউইয়র্কের টাইম স্কোয়ারও জেগে ওঠে বৈশাখের আহ্বানে, ঢাক-ঢোল, বাঙালিয়ানার আনন্দে, মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
প্রায় এক দশক আগে, মা ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমরা সবাই মায়ের পাশে জড়ো হয়েছিলাম। বাংলা টিভিতে চলছিল পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান। প্রবাসে জন্মানো নাতি-নাতনিসহ আমরা ঘরোয়াভাবে শেষবার বৈশাখ পালন করি। মা তখন বলেছিলেন, “যেখানেই থাক, দেশ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করবে।”
আজ মা নেই, কিন্তু দেশ তো আছে। এবং সেই দেশের প্রতি অনুরাগ, সেই স্মৃতি–এখনো আমার শ্বাসে, রক্তে–যা প্রতিটি বৈশাখে বাজে। দেশ যত দূরে হোক–আমাদের হৃদয়ে বাঙালিয়ানা চিরকাল বিরাজমান।

পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠছিল, একদম লাল টুকটুকে, যেন আগুনের ছোট্ট চাঁদ। আকাশ মেঘমুক্ত, কুয়াশাহীন–এমন ভোরের সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্য খুব কমই হয়েছে আমার। বিমানবন্দরের বাইরে দাঁড়িয়ে, সেই নতুন দিনের আলোয় মনে হচ্ছিল রমনার বটমূলে থাকা স্বজনেরা হাসিমাখা চোখে দেখছে আমাকে। গান গাইছিলাম, ‘এসো হে বৈশাখ’, কিন্তু অন্তরে বাজছিল অন্য এক সুর–বিদেশের পথে যাত্রার ব্যথা, ফ্লাইটের সঙ্গে মিলিত বুকের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ, আর কখনো আগের নববর্ষের মতো ফিরে যায়নি। দিনপঞ্জি তো আর পেছনে যায় না।
আমেরিকা পৌঁছে, প্রথম কয়েক দিন মনটা যেন আনচান করে। তখনো হাতে মোবাইল বা ইন্টারনেট নেই। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা হিলসাইডের ১৫০ নম্বর স্ট্রিটের ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বসে আমি স্বদেশের খোঁজ নিই। মা পাশে বসে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, “মন এত খারাপ কেন?”
“পান্তা ভাত আর ইলিশের জন্য”–বলতেই মা হাসলেন। মনে হলো, তিনি বুঝলেন–আমি কোনো মেয়ের জন্য নয়, বরং স্বদেশের জন্য মন খারাপ করছি। মা তখনই সমাধানের খোঁজে ব্যস্ত হলেন। বললেন, “এখানে আমরা চেষ্টা করি। ঠান্ডা ভাত আছে, ভিজিয়ে পান্তা ভাত করব। ইলিশ মাছও চেষ্টা করে দেখি।”
এরপর গল্পও জুড়ে দিলেন, “তোমরা এখন যেভাবে ঘটা করে বাংলা নববর্ষ পালন কর, আমাদের সময় তা ছিল হালখাতার দিন। মনে আছে তোমার বাবা জীবিত থাকলে কত লোক তখন নাড়ু-মিঠাই নিয়ে আসত!” মায়ের চোখে-মুখে তখন স্মৃতির ঝিলিক ফুটে উঠেছিল।

জ্যাকেট জড়িয়ে মা বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এলেন, সাটপিন বুলেভার্দের চাইনিজ দোকান থেকে মাছ নিয়ে। বললেন, “এটাই এখানে ইলিশের মতো স্বাদ।” আমেরিকায় সেই প্রথম পান্তা-ইলিশ খাওয়া। স্বাদ ছিল তাজা, অথচ মনে হচ্ছিল স্বদেশের মাটির রূপ, স্বাদের ছোঁয়া। মা টের পেলেন। বললেন, “আমরা সিলেটের মানুষ স্বাভাবিকভাবে পান্তাভাত খাই না, কিন্তু এটিই আমাদের বাঙালিয়ানা।”
তারপর ধীরে ধীরে জানতে পারলাম–তখনকার অল্প কয়েকজন বাঙালি প্রবাসীই এই সংস্কৃতিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। নার্গিস আহমেদ নামের এক প্রবাসী, বাংলা নাটকের দল ‘ড্রামা সার্কেল’-এর সঙ্গে মিলিয়ে ছোট আয়োজনের মাধ্যমে নববর্ষ পালন শুরু করেছিলেন। শাড়ি, চুড়ি, ঘুঙুর, লাল-সবুজের উজ্জ্বলতা–সেই সব পদক্ষেপ বিদেশিদেরও মুগ্ধ করেছিল। নার্গিস আহমেদ আমাকে শোনালেন, কীভাবে কয়েকজন প্রবাসীর হাত ধরে নিউইয়র্কে পয়লা বৈশাখের রূপ তৈরি হয়। দিনগুলোকে পেছনে ফেলে সেই অল্পসংখ্যক উদ্যোগ আজ প্রায় এক দশক ধরে নিউইয়র্কের কুইন্স, ব্রংক্স, ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনে বড় আকারে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান হয়ে উঠেছে। সেই সময় থেকে মার্কিন কংগ্রেসম্যানসহ মূলধারার লোকজনও বাংলা নববর্ষের সঙ্গে পরিচিত হন এবং অংশ নিতে থাকেন।

পয়লা বৈশাখ এখন শুধু দিন নয়, বাঙালির আত্মার উৎসব। নতুন প্রজন্ম দেশি পোশাক, শাড়ি, ঘুঙুর পরে আনন্দধ্বনির মধ্যে গান গায়–এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও বার্তা দেন, স্বীকৃতি দেন, এবং দেশ থেকে দূরে জন্ম নেওয়া বাঙালিরা নিজেদের সংস্কৃতিকে আবারও আবিষ্কার করে।
উত্তর আমেরিকায় এখন শুধু চীনা নববর্ষ, জাপানি নববর্ষ (Shōgatsu), কোরিয়ান নববর্ষ (Seollal), ইরানীয় নববর্ষ (Nowruz), হিব্রু নববর্ষ (Rosh Hashanah), ইসলামি নববর্ষ (Muharram), থাই নববর্ষ (Songkran) ও পশ্চিমী নববর্ষ (Gregorian New Year) উদ্যাপন হয়। কিন্তু বাংলার নববর্ষ–পয়লা বৈশাখ সবচেয়ে বর্ণাঢ্যভাবে পালিত হয়। নিউইয়র্কের টাইম স্কোয়ারও জেগে ওঠে বৈশাখের আহ্বানে, ঢাক-ঢোল, বাঙালিয়ানার আনন্দে, মঙ্গল শোভাযাত্রায়।
প্রায় এক দশক আগে, মা ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে আমরা সবাই মায়ের পাশে জড়ো হয়েছিলাম। বাংলা টিভিতে চলছিল পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান। প্রবাসে জন্মানো নাতি-নাতনিসহ আমরা ঘরোয়াভাবে শেষবার বৈশাখ পালন করি। মা তখন বলেছিলেন, “যেখানেই থাক, দেশ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করবে।”
আজ মা নেই, কিন্তু দেশ তো আছে। এবং সেই দেশের প্রতি অনুরাগ, সেই স্মৃতি–এখনো আমার শ্বাসে, রক্তে–যা প্রতিটি বৈশাখে বাজে। দেশ যত দূরে হোক–আমাদের হৃদয়ে বাঙালিয়ানা চিরকাল বিরাজমান।

পয়লা বৈশাখ এখন শুধু দিন নয়, বাঙালির আত্মার উৎসব। নতুন প্রজন্ম দেশি পোশাক, শাড়ি, ঘুঙুর পরে আনন্দধ্বনির মধ্যে গান গায়–এসো হে বৈশাখ, এসো এসো। আমেরিকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও বার্তা দেন, স্বীকৃতি দেন, এবং দেশ থেকে দূরে জন্ম নেওয়া বাঙালিরা নিজেদের সংস্কৃতিকে আবারও আবিষ্কার করে।

জাতির মধ্যকার ঐক্য-সংহতি ক্রমাগত বৈষম্য ও বিভাজনের চূড়ান্ত সীমায়। জাতির মধ্যকার সম্প্রীতি যদি না-ই থাকে, তাহলে জাতির উৎসব পালন সর্বজনীন হবে কোন উপায়ে! জাতির মধ্যকার বৈষম্য-বিভাজন এবং ধর্মীয় আচার নির্মূল সম্ভব হলেই বাংলা নববর্ষ যেমন সর্বজনীন হবে, তেমনি হবে বাঙালি জাতির একমাত্র ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।