দেশ আছে, নাগরিকত্ব নেই: দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রহীনতার ইতিহাস
সুবিন মুলমি
দেশ আছে, নাগরিকত্ব নেই: দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রহীনতার ইতিহাস
সুবিন মুলমি
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১৯: ৫৯
বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রহীনতা অল্প কিছু মানুষের বিচ্ছিন্ন সংকট নয়, বরং এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগঠন ও নাগরিকত্ব ব্যবস্থার গভীরে থাকা একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি সীমান্ত, কাগজপত্রনির্ভর প্রশাসন ও নাগরিকত্ব আইনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই বাস্তবতা।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, ভারতের এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানুষ, বাংলাদেশের উর্দুভাষী বিহারি সম্প্রদায় কিংবা শ্রীলঙ্কার তামিল শ্রমিকদের অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের আইন ও রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব।
সাধারণত ভূখণ্ডের সীমানা, ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সরকারি কাগজপত্রের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এসব নিয়ম প্রায়ই জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। এগুলো শুধু রাষ্ট্রের প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সীমা ও পরিচয় নির্ধারণের অংশ।
উনিশ ও বিশ শতকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছিল ব্রিটেন। এর মধ্যে ছিল তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), আজকের পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা (তৎকালীন সিলন)।
এরপর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার পর নতুন সীমান্ত তৈরি হয় এবং এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়। অন্যদিকে বার্মা ও শ্রীলঙ্কা ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়।
ঔপনিবেশিক শাসনের ‘প্রজার পরিচয়’ থেকে জাতীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে নতুন সীমান্ত, নতুন পরিচয় ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা তৈরি হয়। আর এই প্রক্রিয়াই অনেক মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীন হওয়ার পর এসব দেশে এই বিশাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্ব আইন তৈরি হয়। সেখানে বংশপরিচয়, স্থায়ী বসবাস এবং সরকারি কাগজপত্রকে নাগরিকত্বের প্রধান শর্ত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনাকে প্রায়ই আলাদা আলাদা দেশের সংকট হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে একটি একই ধরনের কাঠামোগত ধারা কাজ করেছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ‘প্রজার পরিচয়’ থেকে জাতীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে নতুন সীমান্ত, নতুন পরিচয় ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা তৈরি হয়। আর এই প্রক্রিয়াই অনেক মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্যার বিস্তৃতি
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যাকে কোনো দেশ তার আইনের অধীনে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ১৯৫৪ সালের ‘স্ট্যাটাস অব স্টেটলেস পারসনস’ কনভেনশনে এ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শিশু অধিকার সনদেও বলা হয়েছে, কোনো শিশু যেন রাষ্ট্রহীন না থাকে, সে জন্য রাষ্ট্রগুলোকে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমান নাগরিকত্ব আইনের কারণে ৬ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় আছে। সহিংসতা থেকে বাঁচতে ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশেই ১০ লাখের বেশি রাষ্ট্রহীন মানুষের তথ্য নথিভুক্ত করেছে ইউএনএইচসিআর।
ভারতের আসাম রাজ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ সরকারি নাগরিক নিবন্ধন তালিকা বা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৩ লাখ তামিলের নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি করেছে। তবে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীনতা তাদের সামাজিক অবস্থান এখনো পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
ইউএনএইচসিআর বারবার সতর্ক করেছে, বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রহীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি। কারণ, অনেক দেশে এমন মানুষদের শনাক্ত করার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। ফলে যে সংখ্যাগুলো পাওয়া যায়, তা আসলে ন্যূনতম হিসাব, পুরো বাস্তবতা নয়।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: সীমান্ত, শ্রেণিবিন্যাস ও বাদ পড়া মানুষ
ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আধুনিক নাগরিকত্ব ব্যবস্থা অনেকটাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে গড়ে উঠেছে। সীমান্ত নির্ধারণ, কেন্দ্রীয় প্রশাসন গঠন এবং মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নতুনভাবে সাজিয়েছিল ব্রিটিশরা।
ইতিহাসবিদ সুগাতা বোস, আয়েশা জালাল, বার্নাড কোহেন ও পার্থ চ্যাটার্জির ভাষ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শুধু শাসনই করেনি, সমাজকেও নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছিল। জনশুমারি ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আগে যেসব সামাজিক পরিচয় তুলনামূলক নমনীয় ছিল, সেগুলোকে স্থায়ী ও নির্দিষ্ট শ্রেণিতে রূপ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এর ফলে সাম্রাজ্যের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া আগে স্বাভাবিক চলাচল হিসেবে দেখা হলেও নতুন সীমান্ত তৈরির পর ‘সীমান্ত পার হয়ে অভিবাসন’ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। তবে এই চলাচল সবসময় স্বেচ্ছায় হয়নি। উপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও মানুষকে চলাচলে বাধ্য করেছে।
ব্রিটিশ শাসন কাগজপত্রকে পরিচয় ও স্বীকৃতির মূল শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। জমির নথি, নিবন্ধন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক রিপোর্টের মাধ্যমে লিখিত প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী নিরজা গোপাল জয়াল বলেন, স্বাধীনতার পরও এই ধরণের অনেক প্রবণতা ভারতবর্ষে বজায় রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, নাগরিকত্ব শুধু আইনি মর্যাদা নয়, এটি রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে কাকে গ্রহণ করা হবে, সেই ধারণার সঙ্গেও জড়িত।
বিশ শতকের শুরুতে দুটি বিষয় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমত, মানুষ ও নাগরিকত্বকে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা। দ্বিতীয়ত, স্বীকৃতি নির্ভর করবে শ্রেণিবিন্যাস ও কাগজপত্রের ওপর।
গবেষণার তথ্য বলছে, একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘প্রজা’ পরিচয় অনেক বিস্তৃত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই পরিচয় সংকুচিত হয়ে জাতীয় নাগরিকত্বে রূপ নেয়। যদিও পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো ও কাগজপত্রনির্ভর ব্যবস্থা রয়ে যায়।
রাষ্ট্রহীনতার সমস্যা মূলত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে এবং স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুনভাবে কার্যকর হয়েছে। সাম্রাজ্য থেকে জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তর হলেও মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস ও কাগজপত্রের ভিত্তিতে চিহ্নিত করার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে যায়নি, বরং তা জাতীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। মিয়ানমার, ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় এই উত্তরাধিকার কীভাবে কাজ করেছে, তা বিভিন্ন উদাহরণে দেখা যায়।
মিয়ানমার: জাতিগত পরিচয়, ঔপনিবেশিক অভিবাসন ও রোহিঙ্গা সংকট
মিয়ানমারের বর্তমান নাগরিকত্ব ব্যবস্থা ব্রিটিশ শাসনামলের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৮২৪ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ছিল ব্রিটিশ ভারতের অংশ। এ সময় বঙ্গ অঞ্চল থেকে আরাকানে শ্রমিকদের যাতায়াত ও বসতি বাড়ে। তখন বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এই চলাচলকে বিদেশি অভিবাসন হিসেবে দেখা হতো না, কারণ সবই একই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরে ছিল।
রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বহু প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করলেও ১৮২৩ সালের আগের পূর্বপুরুষের উপস্থিতির প্রমাণ দেখানোর শর্ত তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঔপনিবেশিক আমলের শ্রেণিবিন্যাসকে পরে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বর্তমান নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করতে।
কিন্তু ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ধীরে ধীরে স্বীকৃত জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে নাগরিকত্বকে যুক্ত করতে শুরু করে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন নাগরিকত্বকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে এবং কেবল ‘জাতীয় জাতিগোষ্ঠী’ বা ‘ন্যাশনাল রেসেস’-এর জন্য পূর্ণ নাগরিকত্ব সীমিত করে। শর্ত ছিল, তাদের পূর্বপুরুষ ১৮২৩ সালের আগে বার্মায় বসতি স্থাপন করেছে বলে স্বীকৃত হতে হবে। রোহিঙ্গাদের এই তালিকায় রাখা হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পূর্ণ নাগরিকত্ব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব কাঠামো প্রশাসনিক ভুলের কারণে নয়, বরং বংশপরিচয়ভিত্তিক নিয়মের মাধ্যমেই বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
ইনস্টিটিউট অন স্টেটলেসনেস অ্যান্ড ইনক্লুশন বলেছে, এই আইনে জাতিগত স্বীকৃতিকেই নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রধান শর্ত করা হয়েছে, যা স্বীকৃতি না পাওয়া গোষ্ঠীগুলোকে কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রহীন করে তোলে।
রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বহু প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করলেও ১৮২৩ সালের আগের পূর্বপুরুষের উপস্থিতির প্রমাণ দেখানোর শর্ত তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঔপনিবেশিক আমলের শ্রেণিবিন্যাসকে পরে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বর্তমান নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করতে।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি দেখায় কীভাবে ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসন, জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস এবং স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদ একসঙ্গে কাজ করেছে। যারা একসময় একই সাম্রাজ্যের ভেতরে চলাচল করেছিল, পরে তাদেরই দেশের বাইরের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীনতা শুধু সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং আইনের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্বকে স্বীকৃত জাতিগত পরিচয়, ভূখণ্ডের ইতিহাস এবং কাগজপত্রের সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভারত: কাগজপত্র, দেশভাগ ও সন্দেহের রাজনীতি
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর প্রায় দেড় কোটি মানুষ নতুন সীমান্ত পেরিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের সংবিধানে নাগরিকত্ব নির্ধারণে স্থায়ী বসবাস, অভিবাসন ও বংশপরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নাগরিকত্ব শুধু জন্ম বা বংশ নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানুষের চলাচল ও অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) ও সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) নাগরিকত্ব নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এসব ব্যবস্থায় ‘নির্যাতিত সংখ্যালঘু’ ও ‘অবৈধ অভিবাসী’কে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করা হয়।
বাস্তবে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর, বিশেষ করে আসামে। সেখানে কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আবার সিএএ অমুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দিলেও মুসলিমদের সেই সুযোগের বাইরে রেখেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা, যেখানে কিছু জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়।
আসামে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা মানুষের বিষয়ে বিতর্ক বিংশ শতকের শেষদিকে তীব্র হয়। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিতে ২৪ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে অনেক মানুষ নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং তাদের অনেককে আটক, আপিল বা দীর্ঘ আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।
এই নীতিরই বড় উদাহরণ এনআরসি হালনাগাদ। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালের আগস্টে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ে। বাদ পড়াদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারী বা তাদের পূর্বপুরুষের ২৪ মার্চ ১৯৭১-এর আগের সরকারি নথির প্রমাণ দেখাতে হয়। কিন্তু গ্রামীণ মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জন্য এমন কাগজপত্র জোগাড় করা অনেক সময় কঠিন বা অসম্ভব। নামের বানান বা বয়সে সামান্য ভুলও আবেদন বাতিলের কারণ হয়েছে। আর প্রমাণের দায় পুরোপুরি ব্যক্তির ওপরই ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা একদিকে ঔপনিবেশিক আমলের সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের উত্তরাধিকার বহন করে, অন্যদিকে কাগজপত্রনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে আরও জোরদার করেছে। এনআরসি দেখায়, কীভাবে নাগরিকত্বকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়সীমা ও নথিপত্রের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একসময় সাম্রাজ্যের ভেতরে যে চলাচল ছিল স্বাভাবিক, তা এখন সীমান্ত অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও আইনি অনিশ্চয়তা
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। তবে স্বাধীনতার পর জাতীয় পরিচয় গঠনে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সেই পুরোনো প্রভাব থেকেই যায়, যেখানে ভাষা, সম্প্রদায় ও ভূখণ্ডের সঙ্গে নাগরিকত্বকে যুক্ত করা হয়েছিল।
এখানে শুধু বসবাস নয়, বরং প্রশাসনিক স্বীকৃতি, কাগজপত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানও নাগরিকত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর, যাদের সাধারণভাবে ‘বিহারি’ বলা হয়।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে অনেক উর্দুভাষী মানুষ বিহার থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের একটি অংশ পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে–এমন ধারণা তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর তাদের ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বলা হয় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে রাখা হয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতার পর জাতি গঠনের প্রক্রিয়াও কখনো কখনো দেশের ভেতরে বাদ পড়া বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রহীনতা একদিকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের ফল, অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টার সঙ্গেও জড়িত।
দীর্ঘ সময় তারা কার্যকরভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, আবার পাকিস্তানের নাগরিকত্বও নিশ্চিত হয়নি। নাগরিকত্বের কাগজপত্র না থাকায় ক্যাম্পবাসীরা শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নানা বাধার মুখে পড়ে।
যদিও পাকিস্তানের ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, বাস্তবে তা রাজনৈতিক আনুগত্য ও ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অসঙ্গতভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয় যে, ১৯৭১ সালের পর জন্ম নেওয়া উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের নাগরিক এবং তারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অধিকার রাখে। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, দীর্ঘ প্রশাসনিক বঞ্চনা সাংবিধানিক অধিকারকে বাতিল করতে পারে না।
এই রায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এলেও, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
বাংলাদেশ এখন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যারা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে। তবে আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনো পথ তৈরি করেনি। সরকারের অবস্থান হলো, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে বড় একটি জনগোষ্ঠী নাগরিকত্বহীন অবস্থায় রয়েছে, যদিও তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ মিয়ানমারের আইন ও নীতি।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতার পর জাতি গঠনের প্রক্রিয়াও কখনো কখনো দেশের ভেতরে বাদ পড়া বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রহীনতা একদিকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের ফল, অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টার সঙ্গেও জড়িত।
শ্রীলঙ্কা: চা বাগানের শ্রমিক ও স্বাধীনতার পর বঞ্চনা
শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রহীনতার সংকট স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিকভাবে চা-বাগানের শ্রমিকদের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখা হতো। নিবন্ধন ব্যবস্থা, বাগানভিত্তিক বসবাস এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই প্রশাসনিক বিভাজনই নাগরিকত্বের মানদণ্ডে পরিণত হয়।
উনিশ ও বিশ শতকে ব্রিটিশ আমলে সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) চা-বাগান অর্থনীতি মূলত দক্ষিণ ভারত থেকে আনা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এসব তামিল শ্রমিক প্রধানত মধ্যাঞ্চলের চা-বাগানে কাজ করতেন। তখন তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হিসেবে একই সাম্রাজ্যের ভেতরে চলাচল করছিলেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের আইনি অবস্থান বদলে যায়। ১৯৪৮ সালের ‘সিলন সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’ নাগরিকত্বের জন্য বাবার বংশপরিচয় ও দীর্ঘদিনের বসবাসের কঠোর শর্ত আরোপ করে। অনেক তামিল শ্রমিকের জন্মনিবন্ধন, জমির কাগজ বা বংশপরিচয়ের লিখিত প্রমাণ ছিল না। ফলে স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যেই আনুমানিক সাত লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে।
এরপর ১৯৪৯ সালের ‘ইন্ডিয়ান অ্যান্ড পাকিস্তানি রেসিডেন্টস (সিটিজেনশিপ) অ্যাক্ট’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত করে। রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া চা-বাগানের শ্রমিকেরা ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব হারান।
পরবর্তী সময়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা হয়। ১৯৬৪ সালের সিরিমা–শাস্ত্রী চুক্তি এবং পরবর্তী সমঝোতাগুলো অনুযায়ী, কিছু মানুষকে ভারতে ফেরত পাঠানো এবং অন্যদের শ্রীলঙ্কার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা ছিল। তবে এই প্রক্রিয়া ধীরে এবং অসমভাবে বাস্তবায়িত হয়। ফলে বহু মানুষ দীর্ঘ সময় আইনি অনিশ্চয়তায় থাকে।
অবশেষে ২০০০ সালের শুরুর দিকে আইন সংস্কারের মাধ্যমে, বিশেষ করে ২০০৩ সালের ‘গ্রান্ট অব সিটিজেনশিপ টু পারসন্স অব ইন্ডিয়ান অরিজিন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে, বাকি রাষ্ট্রহীন তামিলদের শ্রীলঙ্কার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যদিও এতে আইনি সমাধান আসে, দক্ষিণ এশিয়ায় এটি স্বাধীনতার পর সৃষ্ট রাষ্ট্রহীনতার অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতা শুধু মুক্তির ঘটনা ছিল না। এটি নতুন সীমারেখা ও সদস্যপদ নির্ধারণেরও সময় ছিল। যারা ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অংশ ছিল, স্বাধীনতার পর তাদের একটি সংকীর্ণ জাতীয় কাঠামোর মধ্যে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। যেখানে নথিপত্র সংরক্ষণ দুর্বল ছিল, সেখানে বংশপরিচয়ের লিখিত প্রমাণ নাগরিকত্বের কেন্দ্রীয় শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে রাষ্ট্রহীনতা এখানে প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের সময় সদস্যপদ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ফল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীনতাকে প্রায়ই কিছু প্রান্তিক মানুষের ব্যতিক্রমী সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এসব উদাহরণ দেখায়, বিষয়টি আসলে আরও গভীর ও কাঠামোগত।
দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রহীনতার বিষয়টি বুঝতে হলে আধুনিক নাগরিকত্ব ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা নতুনভাবে ভাবতে হবে। নাগরিকত্বের ধারণা দেখায়, আইনি সদস্যপদ বা নাগরিক স্বীকৃতি আসলে নিরপেক্ষ নয়, বরং এটি অতীত থেকে পাওয়া রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত। আর সেই কাঠামোই এখনো নির্ধারণ করে দেয়–কে জাতির অংশ হতে পারবে এবং কোন শর্তে সেই স্বীকৃতি পাবে।
(লেখাটি এশিয়াভিত্তিক জার্নাল মেলবোর্ন এশিয়া রিভিউ থেকে নেওয়া)
বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রহীনতা অল্প কিছু মানুষের বিচ্ছিন্ন সংকট নয়, বরং এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগঠন ও নাগরিকত্ব ব্যবস্থার গভীরে থাকা একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি সীমান্ত, কাগজপত্রনির্ভর প্রশাসন ও নাগরিকত্ব আইনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই বাস্তবতা।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, ভারতের এনআরসি থেকে বাদ পড়া মানুষ, বাংলাদেশের উর্দুভাষী বিহারি সম্প্রদায় কিংবা শ্রীলঙ্কার তামিল শ্রমিকদের অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের আইন ও রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব।
সাধারণত ভূখণ্ডের সীমানা, ইতিহাসের নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং সরকারি কাগজপত্রের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এসব নিয়ম প্রায়ই জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। এগুলো শুধু রাষ্ট্রের প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রের সীমা ও পরিচয় নির্ধারণের অংশ।
উনিশ ও বিশ শতকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছিল ব্রিটেন। এর মধ্যে ছিল তৎকালীন বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার), আজকের পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা (তৎকালীন সিলন)।
এরপর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হওয়ার পর নতুন সীমান্ত তৈরি হয় এবং এতে প্রায় দেড় কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পরে ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়। অন্যদিকে বার্মা ও শ্রীলঙ্কা ১৯৪৮ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পায়।
ঔপনিবেশিক শাসনের ‘প্রজার পরিচয়’ থেকে জাতীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে নতুন সীমান্ত, নতুন পরিচয় ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা তৈরি হয়। আর এই প্রক্রিয়াই অনেক মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীন হওয়ার পর এসব দেশে এই বিশাল রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নাগরিকত্ব আইন তৈরি হয়। সেখানে বংশপরিচয়, স্থায়ী বসবাস এবং সরকারি কাগজপত্রকে নাগরিকত্বের প্রধান শর্ত হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনাকে প্রায়ই আলাদা আলাদা দেশের সংকট হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর পেছনে একটি একই ধরনের কাঠামোগত ধারা কাজ করেছে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ‘প্রজার পরিচয়’ থেকে জাতীয় নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে নতুন সীমান্ত, নতুন পরিচয় ও বাস্তুচ্যুতির বাস্তবতা তৈরি হয়। আর এই প্রক্রিয়াই অনেক মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সমস্যার বিস্তৃতি
আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রহীন ব্যক্তি বলতে এমন কাউকে বোঝায়, যাকে কোনো দেশ তার আইনের অধীনে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। ১৯৫৪ সালের ‘স্ট্যাটাস অব স্টেটলেস পারসনস’ কনভেনশনে এ সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শিশু অধিকার সনদেও বলা হয়েছে, কোনো শিশু যেন রাষ্ট্রহীন না থাকে, সে জন্য রাষ্ট্রগুলোকে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বর্তমান নাগরিকত্ব আইনের কারণে ৬ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় আছে। সহিংসতা থেকে বাঁচতে ৯ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশেই ১০ লাখের বেশি রাষ্ট্রহীন মানুষের তথ্য নথিভুক্ত করেছে ইউএনএইচসিআর।
ভারতের আসাম রাজ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ সরকারি নাগরিক নিবন্ধন তালিকা বা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছেন, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৩ লাখ তামিলের নাগরিকত্ব সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি করেছে। তবে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রহীনতা তাদের সামাজিক অবস্থান এখনো পুরোপুরি দূর করতে পারেনি।
ইউএনএইচসিআর বারবার সতর্ক করেছে, বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রহীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি। কারণ, অনেক দেশে এমন মানুষদের শনাক্ত করার পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই। ফলে যে সংখ্যাগুলো পাওয়া যায়, তা আসলে ন্যূনতম হিসাব, পুরো বাস্তবতা নয়।
ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার: সীমান্ত, শ্রেণিবিন্যাস ও বাদ পড়া মানুষ
ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আধুনিক নাগরিকত্ব ব্যবস্থা অনেকটাই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে গড়ে উঠেছে। সীমান্ত নির্ধারণ, কেন্দ্রীয় প্রশাসন গঠন এবং মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নতুনভাবে সাজিয়েছিল ব্রিটিশরা।
ইতিহাসবিদ সুগাতা বোস, আয়েশা জালাল, বার্নাড কোহেন ও পার্থ চ্যাটার্জির ভাষ্য, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য শুধু শাসনই করেনি, সমাজকেও নতুনভাবে সাজিয়ে তুলেছিল। জনশুমারি ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আগে যেসব সামাজিক পরিচয় তুলনামূলক নমনীয় ছিল, সেগুলোকে স্থায়ী ও নির্দিষ্ট শ্রেণিতে রূপ দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
এর ফলে সাম্রাজ্যের ভেতরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া আগে স্বাভাবিক চলাচল হিসেবে দেখা হলেও নতুন সীমান্ত তৈরির পর ‘সীমান্ত পার হয়ে অভিবাসন’ হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে। তবে এই চলাচল সবসময় স্বেচ্ছায় হয়নি। উপনিবেশিক শ্রমব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনাও মানুষকে চলাচলে বাধ্য করেছে।
ব্রিটিশ শাসন কাগজপত্রকে পরিচয় ও স্বীকৃতির মূল শর্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। জমির নথি, নিবন্ধন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক রিপোর্টের মাধ্যমে লিখিত প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী নিরজা গোপাল জয়াল বলেন, স্বাধীনতার পরও এই ধরণের অনেক প্রবণতা ভারতবর্ষে বজায় রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেন, নাগরিকত্ব শুধু আইনি মর্যাদা নয়, এটি রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে কাকে গ্রহণ করা হবে, সেই ধারণার সঙ্গেও জড়িত।
বিশ শতকের শুরুতে দুটি বিষয় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমত, মানুষ ও নাগরিকত্বকে নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা। দ্বিতীয়ত, স্বীকৃতি নির্ভর করবে শ্রেণিবিন্যাস ও কাগজপত্রের ওপর।
গবেষণার তথ্য বলছে, একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘প্রজা’ পরিচয় অনেক বিস্তৃত ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর সেই পরিচয় সংকুচিত হয়ে জাতীয় নাগরিকত্বে রূপ নেয়। যদিও পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো ও কাগজপত্রনির্ভর ব্যবস্থা রয়ে যায়।
রাষ্ট্রহীনতার সমস্যা মূলত ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে এসেছে এবং স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুনভাবে কার্যকর হয়েছে। সাম্রাজ্য থেকে জাতিরাষ্ট্রে রূপান্তর হলেও মানুষকে শ্রেণিবিন্যাস ও কাগজপত্রের ভিত্তিতে চিহ্নিত করার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে যায়নি, বরং তা জাতীয় ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। মিয়ানমার, ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার নাগরিকত্ব ব্যবস্থায় এই উত্তরাধিকার কীভাবে কাজ করেছে, তা বিভিন্ন উদাহরণে দেখা যায়।
মিয়ানমার: জাতিগত পরিচয়, ঔপনিবেশিক অভিবাসন ও রোহিঙ্গা সংকট
মিয়ানমারের বর্তমান নাগরিকত্ব ব্যবস্থা ব্রিটিশ শাসনামলের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৮২৪ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) ছিল ব্রিটিশ ভারতের অংশ। এ সময় বঙ্গ অঞ্চল থেকে আরাকানে শ্রমিকদের যাতায়াত ও বসতি বাড়ে। তখন বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এই চলাচলকে বিদেশি অভিবাসন হিসেবে দেখা হতো না, কারণ সবই একই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভেতরে ছিল।
রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বহু প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করলেও ১৮২৩ সালের আগের পূর্বপুরুষের উপস্থিতির প্রমাণ দেখানোর শর্ত তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঔপনিবেশিক আমলের শ্রেণিবিন্যাসকে পরে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বর্তমান নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করতে।
কিন্তু ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ধীরে ধীরে স্বীকৃত জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে নাগরিকত্বকে যুক্ত করতে শুরু করে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন নাগরিকত্বকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে এবং কেবল ‘জাতীয় জাতিগোষ্ঠী’ বা ‘ন্যাশনাল রেসেস’-এর জন্য পূর্ণ নাগরিকত্ব সীমিত করে। শর্ত ছিল, তাদের পূর্বপুরুষ ১৮২৩ সালের আগে বার্মায় বসতি স্থাপন করেছে বলে স্বীকৃত হতে হবে। রোহিঙ্গাদের এই তালিকায় রাখা হয়নি। ফলে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা পূর্ণ নাগরিকত্ব ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, মিয়ানমারের নাগরিকত্ব কাঠামো প্রশাসনিক ভুলের কারণে নয়, বরং বংশপরিচয়ভিত্তিক নিয়মের মাধ্যমেই বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
ইনস্টিটিউট অন স্টেটলেসনেস অ্যান্ড ইনক্লুশন বলেছে, এই আইনে জাতিগত স্বীকৃতিকেই নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রধান শর্ত করা হয়েছে, যা স্বীকৃতি না পাওয়া গোষ্ঠীগুলোকে কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রহীন করে তোলে।
রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বহু প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বাস করলেও ১৮২৩ সালের আগের পূর্বপুরুষের উপস্থিতির প্রমাণ দেখানোর শর্ত তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ঔপনিবেশিক আমলের শ্রেণিবিন্যাসকে পরে ব্যবহার করা হয়েছে তাদের বর্তমান নাগরিক পরিচয় অস্বীকার করতে।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি দেখায় কীভাবে ঔপনিবেশিক আমলের অভিবাসন, জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস এবং স্বাধীনতার পর জাতীয়তাবাদ একসঙ্গে কাজ করেছে। যারা একসময় একই সাম্রাজ্যের ভেতরে চলাচল করেছিল, পরে তাদেরই দেশের বাইরের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রহীনতা শুধু সামাজিক বাস্তবতা নয়, বরং আইনের মাধ্যমেই তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্বকে স্বীকৃত জাতিগত পরিচয়, ভূখণ্ডের ইতিহাস এবং কাগজপত্রের সঙ্গে বেঁধে দেওয়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভারত: কাগজপত্র, দেশভাগ ও সন্দেহের রাজনীতি
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর প্রায় দেড় কোটি মানুষ নতুন সীমান্ত পেরিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়। ১৯৫০ সালে গৃহীত ভারতের সংবিধানে নাগরিকত্ব নির্ধারণে স্থায়ী বসবাস, অভিবাসন ও বংশপরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে নাগরিকত্ব শুধু জন্ম বা বংশ নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানুষের চলাচল ও অবস্থানের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতের ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) ও সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট (সিএএ) নাগরিকত্ব নির্ধারণে ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এসব ব্যবস্থায় ‘নির্যাতিত সংখ্যালঘু’ ও ‘অবৈধ অভিবাসী’কে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করা হয়।
বাস্তবে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর, বিশেষ করে আসামে। সেখানে কাগজপত্রের ঘাটতির কারণে অনেক মানুষ এনআরসি তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আবার সিএএ অমুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ দিলেও মুসলিমদের সেই সুযোগের বাইরে রেখেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রক্রিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতার পর গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোর ধারাবাহিকতা, যেখানে কিছু জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয়।
আসামে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আসা মানুষের বিষয়ে বিতর্ক বিংশ শতকের শেষদিকে তীব্র হয়। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তিতে ২৪ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত ‘বিদেশি’ শনাক্ত করার শেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে অনেক মানুষ নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়ে এবং তাদের অনেককে আটক, আপিল বা দীর্ঘ আইনি অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে হয়।
এই নীতিরই বড় উদাহরণ এনআরসি হালনাগাদ। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে ২০১৯ সালের আগস্টে প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ বাদ পড়ে। বাদ পড়াদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় আবেদনকারী বা তাদের পূর্বপুরুষের ২৪ মার্চ ১৯৭১-এর আগের সরকারি নথির প্রমাণ দেখাতে হয়। কিন্তু গ্রামীণ মানুষ, বিশেষ করে নারীদের জন্য এমন কাগজপত্র জোগাড় করা অনেক সময় কঠিন বা অসম্ভব। নামের বানান বা বয়সে সামান্য ভুলও আবেদন বাতিলের কারণ হয়েছে। আর প্রমাণের দায় পুরোপুরি ব্যক্তির ওপরই ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের নাগরিকত্ব ব্যবস্থা একদিকে ঔপনিবেশিক আমলের সীমান্ত পুনর্নির্ধারণের উত্তরাধিকার বহন করে, অন্যদিকে কাগজপত্রনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে আরও জোরদার করেছে। এনআরসি দেখায়, কীভাবে নাগরিকত্বকে নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়সীমা ও নথিপত্রের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। একসময় সাম্রাজ্যের ভেতরে যে চলাচল ছিল স্বাভাবিক, তা এখন সীমান্ত অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ: মুক্তিযুদ্ধ, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ ও আইনি অনিশ্চয়তা
১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়। তবে স্বাধীনতার পর জাতীয় পরিচয় গঠনে ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সেই পুরোনো প্রভাব থেকেই যায়, যেখানে ভাষা, সম্প্রদায় ও ভূখণ্ডের সঙ্গে নাগরিকত্বকে যুক্ত করা হয়েছিল।
এখানে শুধু বসবাস নয়, বরং প্রশাসনিক স্বীকৃতি, কাগজপত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানও নাগরিকত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ওপর, যাদের সাধারণভাবে ‘বিহারি’ বলা হয়।
দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে অনেক উর্দুভাষী মানুষ বিহার থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের একটি অংশ পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে–এমন ধারণা তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর তাদের ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বলা হয় এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে রাখা হয়।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতার পর জাতি গঠনের প্রক্রিয়াও কখনো কখনো দেশের ভেতরে বাদ পড়া বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রহীনতা একদিকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের ফল, অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টার সঙ্গেও জড়িত।
দীর্ঘ সময় তারা কার্যকরভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, আবার পাকিস্তানের নাগরিকত্বও নিশ্চিত হয়নি। নাগরিকত্বের কাগজপত্র না থাকায় ক্যাম্পবাসীরা শিক্ষা, চাকরি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নানা বাধার মুখে পড়ে।
যদিও পাকিস্তানের ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল, বাস্তবে তা রাজনৈতিক আনুগত্য ও ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে অসঙ্গতভাবে প্রয়োগ হয়েছে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ রায় দেয় যে, ১৯৭১ সালের পর জন্ম নেওয়া উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের নাগরিক এবং তারা ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অধিকার রাখে। আদালত স্পষ্ট করে জানায়, দীর্ঘ প্রশাসনিক বঞ্চনা সাংবিধানিক অধিকারকে বাতিল করতে পারে না।
এই রায়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এলেও, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
বাংলাদেশ এখন বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যারা মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে এসেছে। তবে আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশ তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার কোনো পথ তৈরি করেনি। সরকারের অবস্থান হলো, এই সংকটের স্থায়ী সমাধান রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের মধ্যেই রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভেতরে বড় একটি জনগোষ্ঠী নাগরিকত্বহীন অবস্থায় রয়েছে, যদিও তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ মিয়ানমারের আইন ও নীতি।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতার পর জাতি গঠনের প্রক্রিয়াও কখনো কখনো দেশের ভেতরে বাদ পড়া বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পারে। এখানে রাষ্ট্রহীনতা একদিকে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের ফল, অন্যদিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টার সঙ্গেও জড়িত।
শ্রীলঙ্কা: চা বাগানের শ্রমিক ও স্বাধীনতার পর বঞ্চনা
শ্রীলঙ্কায় রাষ্ট্রহীনতার সংকট স্বাধীনতার পরপরই শুরু হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রশাসনিকভাবে চা-বাগানের শ্রমিকদের অন্য জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা করে দেখা হতো। নিবন্ধন ব্যবস্থা, বাগানভিত্তিক বসবাস এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তাদের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এই প্রশাসনিক বিভাজনই নাগরিকত্বের মানদণ্ডে পরিণত হয়।
উনিশ ও বিশ শতকে ব্রিটিশ আমলে সিলনের (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) চা-বাগান অর্থনীতি মূলত দক্ষিণ ভারত থেকে আনা শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এসব তামিল শ্রমিক প্রধানত মধ্যাঞ্চলের চা-বাগানে কাজ করতেন। তখন তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রজা হিসেবে একই সাম্রাজ্যের ভেতরে চলাচল করছিলেন।
কিন্তু স্বাধীনতার পর তাদের আইনি অবস্থান বদলে যায়। ১৯৪৮ সালের ‘সিলন সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট’ নাগরিকত্বের জন্য বাবার বংশপরিচয় ও দীর্ঘদিনের বসবাসের কঠোর শর্ত আরোপ করে। অনেক তামিল শ্রমিকের জন্মনিবন্ধন, জমির কাগজ বা বংশপরিচয়ের লিখিত প্রমাণ ছিল না। ফলে স্বাধীনতার পর কয়েক বছরের মধ্যেই আনুমানিক সাত লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে।
এরপর ১৯৪৯ সালের ‘ইন্ডিয়ান অ্যান্ড পাকিস্তানি রেসিডেন্টস (সিটিজেনশিপ) অ্যাক্ট’ ভারতীয় বংশোদ্ভূত বাসিন্দাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ আরও সীমিত করে। রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া চা-বাগানের শ্রমিকেরা ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব হারান।
পরবর্তী সময়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা হয়। ১৯৬৪ সালের সিরিমা–শাস্ত্রী চুক্তি এবং পরবর্তী সমঝোতাগুলো অনুযায়ী, কিছু মানুষকে ভারতে ফেরত পাঠানো এবং অন্যদের শ্রীলঙ্কার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা ছিল। তবে এই প্রক্রিয়া ধীরে এবং অসমভাবে বাস্তবায়িত হয়। ফলে বহু মানুষ দীর্ঘ সময় আইনি অনিশ্চয়তায় থাকে।
অবশেষে ২০০০ সালের শুরুর দিকে আইন সংস্কারের মাধ্যমে, বিশেষ করে ২০০৩ সালের ‘গ্রান্ট অব সিটিজেনশিপ টু পারসন্স অব ইন্ডিয়ান অরিজিন অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে, বাকি রাষ্ট্রহীন তামিলদের শ্রীলঙ্কার নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। যদিও এতে আইনি সমাধান আসে, দক্ষিণ এশিয়ায় এটি স্বাধীনতার পর সৃষ্ট রাষ্ট্রহীনতার অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে রয়ে গেছে।
শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায়, স্বাধীনতা শুধু মুক্তির ঘটনা ছিল না। এটি নতুন সীমারেখা ও সদস্যপদ নির্ধারণেরও সময় ছিল। যারা ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অংশ ছিল, স্বাধীনতার পর তাদের একটি সংকীর্ণ জাতীয় কাঠামোর মধ্যে নতুনভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। যেখানে নথিপত্র সংরক্ষণ দুর্বল ছিল, সেখানে বংশপরিচয়ের লিখিত প্রমাণ নাগরিকত্বের কেন্দ্রীয় শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। ফলে রাষ্ট্রহীনতা এখানে প্রশাসনিক ভুল নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের সময় সদস্যপদ নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার ফল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে রাষ্ট্রহীনতাকে প্রায়ই কিছু প্রান্তিক মানুষের ব্যতিক্রমী সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এসব উদাহরণ দেখায়, বিষয়টি আসলে আরও গভীর ও কাঠামোগত।
দক্ষিণ এশিয়ায় রাষ্ট্রহীনতার বিষয়টি বুঝতে হলে আধুনিক নাগরিকত্ব ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা নতুনভাবে ভাবতে হবে। নাগরিকত্বের ধারণা দেখায়, আইনি সদস্যপদ বা নাগরিক স্বীকৃতি আসলে নিরপেক্ষ নয়, বরং এটি অতীত থেকে পাওয়া রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দ্বারা প্রভাবিত। আর সেই কাঠামোই এখনো নির্ধারণ করে দেয়–কে জাতির অংশ হতে পারবে এবং কোন শর্তে সেই স্বীকৃতি পাবে।
(লেখাটি এশিয়াভিত্তিক জার্নাল মেলবোর্ন এশিয়া রিভিউ থেকে নেওয়া)