ফজলে রাব্বি

বাংলাদেশে চামড়া শিল্প নিয়ে আলোচনায় সাধারণত রপ্তানি, কাঁচা চামড়ার দাম বা সাভারের ট্যানারি সংকট বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব কমই আলোচিত হয়–দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্টসহ নানা চামড়াজাত পণ্যের বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও কেন এই খাতকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক সফল উদ্যোক্তা তৈরি হলো না?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে কিছু উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাপেক্স, বে, লেদারেক্স, ফর্চুনা, জেনিস বা আড়ংয়ের চামড়াজাত পণ্য বিভাগ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভিয়েতনাম, তুরস্ক বা ইতালির মতো হাজার হাজার মাঝারি ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তার একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ঐতিহাসিকভাবে ট্যানারিকেন্দ্রিক ছিল, ব্র্যান্ডকেন্দ্রিক নয়। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি নীতি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, ট্যানিং এবং আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি। অর্থাৎ, চামড়াকে একটি কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়েছে, চূড়ান্ত ভোক্তাপণ্য হিসেবে নয়। ফলে বিনিয়োগ গেছে ট্যানারি স্থাপনে। তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে নকশা, পণ্য উন্নয়ন, ফ্যাশন, ব্র্যান্ডিং, বিপণন ও খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিডোর বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা যায়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিক্রি করে দ্রুত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা ছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাগ, জুতা বা ফ্যাশন পণ্য তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং বাজার উন্নয়ন প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক ব্যবসায়ী তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকির পথে হাঁটেন।
অথচ চামড়া শিল্পকে এগিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোতে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু তৈরি হয় না নতুন উদ্যোক্তা!
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্র্যান্ড: ভিয়েতনাম বনাম বাংলাদেশ
হো চি মিন সিটির শিক্ষার্থী ফিয়ং। এই তরুণী ভিয়েতনাম ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড এডুকেশনে ফুটওয়্যার ও লেদার প্রোডাক্ট ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তৃতীয় বর্ষেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দেশের একটি জুতা কারখানায়। সেখানে তিনি শুধু ইন্টার্নশিপই করেন না, নতুন ডিজাইনের নমুনা তৈরির কাজেও অংশ নেন। স্নাতক হওয়ার আগেই তিনি একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাপ্লাই চেইনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। কয়েক বছরের মধ্যে নিজস্ব ডিজাইন স্টুডিও গড়ে তোলেন। তার ডিজাইন করা পণ্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি হতে থাকে।
একই সময়ে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত চামড়া শিল্পাঞ্চলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর গল্প ভিন্ন। তিনি ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলইটি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা ও বাজার–এই তিনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ না থাকায় তিনি শিল্প উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবর্তে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। কেউ ব্যাংকে, কেউ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে, কেউ আবার শিল্পের বাইরের পেশায় চলে যান।
দুই দেশের এই দুই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে–কেন ভিয়েতনামে বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা ও ব্র্যান্ড একই উৎপাদন শৃঙ্খলের অংশ, অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরির সন্ধানেই সীমাবদ্ধ থাকেন। কেন?
কারণ, একজন নতুন উদ্যোক্তা যদি চামড়াজাত পণ্যের কারখানা গড়ে তুলতে চান, তবে তার প্রয়োজন হয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ কর্মী, নকশাবিদ, বিপণন ব্যবস্থা এবং বিক্রয় নেটওয়ার্ক। কিন্তু ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বড় অঙ্কের জামানত, জমি বা পূর্ব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা চায়। বাংলাদেশ ব্যাংক, সিপিডি এবং বিভিন্ন শিল্প গবেষণায় নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন-সংকটকে চামড়া খাতের অন্যতম কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শুরুতেই বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতা শুধু চামড়া শিল্প নয়; বাংলাদেশি মাত্রই জানেন যেকোনো খাতেই উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কতটা কঠিন।
একই শিল্প, ভিন্ন ফলাফল
ভিয়েতনাম আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জুতা ও লেদার পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্ব ফুটওয়্যার উৎপাদন ও রপ্তানিতে চীনকে অনুসরণ করে দেশটি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমাসহ অসংখ্য বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের বড় অংশের উৎপাদন ভিয়েতনামে হয়।
ভিয়েতনামের এই সাফল্যের পেছনে শুধু কম শ্রম ব্যয় নয়, বরং একটি সুসংগঠিত শিল্প-শিক্ষা কাঠামো কাজ করেছে। দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চামড়া শিল্প বহু বছর ধরে ‘সম্ভাবনাময় খাত’ হিসেবেই পরিচিত। কাঁচামাল রয়েছে, শ্রমশক্তি রয়েছে, প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি তো দূরের কথা, স্থানীয় বাজারেও শক্তিশালী দেশীয় ব্র্যান্ডের সংখ্যা সীমিত।
উদ্যোক্তা নেই, আছে শুধু চাকরিপ্রত্যাশী
বাংলাদেশে লেদার টেকনোলজি শিক্ষার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলইটি) থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হন। রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষার অনেকগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রও। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ কয়েক হাজার স্নাতক বের হয়। কিন্তু এদের মধ্য থেকে কোনো উদ্যোক্তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। অথচ চামড়া শিল্প খাতে চূড়ান্ত ভোক্তাপণ্য (ফিনিশড প্রোডাক্ট) তৈরির জন্য প্রতিটি স্তরেই দক্ষ জনশক্তি রয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এর একটি বড় কারণ হচ্ছে গবেষণা, ডিজাইন উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে দুর্বল সংযোগ।
ভিয়েতনাম মডেল: ক্লাসরুম থেকে কারখানা
ভিয়েতনাম লেদার, ফুটওয়্যার অ্যান্ড হ্যান্ডব্যাগ অ্যাসোসিয়েশনের (LEFASO) বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির শিল্প উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি তৈরিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান নুয়েন ডাক থুয়ান বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, “ভিয়েতনামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রযুক্তি, ডিজাইন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ভিয়েতনামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ, কারখানাভিত্তিক গবেষণা এবং উৎপাদনমুখী প্রকল্প পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব শেখে না; উৎপাদন প্রক্রিয়া, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বিশ্লেষণেও যুক্ত থাকে। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পর তাদের সামনে শিল্প কারখানায় যোগদান, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন অথবা নিজস্ব ব্র্যান্ড গঠন–এই তিনটি পথই খোলা থাকে।
সাভার শিল্পনগরী: স্থানান্তর হয়েছে, রূপান্তর হয়নি
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরকে একসময় চামড়া শিল্পের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু শিল্প উদ্যোক্তারা বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পরিবেশগত মান, আন্তর্জাতিক সনদ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা বলে আসছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)-এর নেতারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম বড় বাধা।
ইতালির শিক্ষা: কারিগরি জ্ঞান থেকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড
ইতালির টাস্কানি অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজাইন স্কুল, ট্যানারি এবং ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফ্লোরেন্স ও মিলানকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প ক্লাস্টারগুলো শুধু উৎপাদন করে না, নতুন ডিজাইন, নতুন উপকরণ এবং নতুন ব্র্যান্ডও তৈরি করে। গুচ্চি, প্রাডা, সালভাতোরে ফেরাগামোর মতো ব্র্যান্ডের পেছনে রয়েছে গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের নিবিড় সংযোগ। ফলে একজন শিক্ষার্থী সরাসরি বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের অংশ হয়ে ওঠেন।
সম্ভাবনার কথা আর কত?
বাংলাদেশে চামড়া শিল্প নিয়ে আলোচনা সাধারণত রপ্তানি, কাঁচামালের দাম বা পরিবেশগত সমস্যা ঘিরেই সীমাবদ্ধ বহু বছর ধরে। কিন্তু ভিয়েতনাম ও ইতালির অভিজ্ঞতা বলছে, শিল্পের প্রকৃত শক্তি শুধু কারখানায় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, ডিজাইন, প্রযুক্তি এবং ব্র্যান্ড নির্মাণের ধারাবাহিক সংযোগে। বাংলাদেশে সেই সংযোগ এখনও দুর্বল।
ফলে ভিয়েতনাম ও ইতালির মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারখানা। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে একটি ব্র্যান্ড দাঁড় করায় এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নানামাত্রিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। অনেকের সাথেই চামড়ার সাথে সম্পর্ক সারাজীবনের জন্যই ছিন্ন হয়ে যায়। চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই–বাংলাদেশ কি কাঁচামাল ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারবে? নাকি সম্ভাবনার গল্প আরও বহু বছর সম্ভাবনাতেই আটকে থাকবে?

বাংলাদেশে চামড়া শিল্প নিয়ে আলোচনায় সাধারণত রপ্তানি, কাঁচা চামড়ার দাম বা সাভারের ট্যানারি সংকট বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন খুব কমই আলোচিত হয়–দেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের জন্য জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, মানিব্যাগ, বেল্টসহ নানা চামড়াজাত পণ্যের বিশাল বাজার থাকা সত্ত্বেও কেন এই খাতকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক সফল উদ্যোক্তা তৈরি হলো না?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে কিছু উদ্যোক্তা ও ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে অ্যাপেক্স, বে, লেদারেক্স, ফর্চুনা, জেনিস বা আড়ংয়ের চামড়াজাত পণ্য বিভাগ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ভিয়েতনাম, তুরস্ক বা ইতালির মতো হাজার হাজার মাঝারি ও উদ্ভাবনী উদ্যোক্তার একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে ওঠেনি।
এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশের চামড়া শিল্প ঐতিহাসিকভাবে ট্যানারিকেন্দ্রিক ছিল, ব্র্যান্ডকেন্দ্রিক নয়। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি নীতি ও ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মূল লক্ষ্য ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, ট্যানিং এবং আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি। অর্থাৎ, চামড়াকে একটি কাঁচামাল হিসেবে দেখা হয়েছে, চূড়ান্ত ভোক্তাপণ্য হিসেবে নয়। ফলে বিনিয়োগ গেছে ট্যানারি স্থাপনে। তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে নকশা, পণ্য উন্নয়ন, ফ্যাশন, ব্র্যান্ডিং, বিপণন ও খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিডোর বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা যায়, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া বিক্রি করে দ্রুত মুনাফা অর্জনের প্রবণতা ছিল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের ব্যাগ, জুতা বা ফ্যাশন পণ্য তৈরি করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং বাজার উন্নয়ন প্রয়োজন হয়। ফলে অনেক ব্যবসায়ী তুলনামূলক সহজ ও কম ঝুঁকির পথে হাঁটেন।
অথচ চামড়া শিল্পকে এগিয়ে নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোতে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কিন্তু তৈরি হয় না নতুন উদ্যোক্তা!
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্র্যান্ড: ভিয়েতনাম বনাম বাংলাদেশ
হো চি মিন সিটির শিক্ষার্থী ফিয়ং। এই তরুণী ভিয়েতনাম ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড এডুকেশনে ফুটওয়্যার ও লেদার প্রোডাক্ট ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তৃতীয় বর্ষেই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় দেশের একটি জুতা কারখানায়। সেখানে তিনি শুধু ইন্টার্নশিপই করেন না, নতুন ডিজাইনের নমুনা তৈরির কাজেও অংশ নেন। স্নাতক হওয়ার আগেই তিনি একটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাপ্লাই চেইনে যুক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান। কয়েক বছরের মধ্যে নিজস্ব ডিজাইন স্টুডিও গড়ে তোলেন। তার ডিজাইন করা পণ্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি হতে থাকে।
একই সময়ে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরিত চামড়া শিল্পাঞ্চলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর গল্প ভিন্ন। তিনি ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলইটি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা ও বাজার–এই তিনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ না থাকায় তিনি শিল্প উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবর্তে চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। কেউ ব্যাংকে, কেউ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে, কেউ আবার শিল্পের বাইরের পেশায় চলে যান।
দুই দেশের এই দুই বাস্তবতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে–কেন ভিয়েতনামে বিশ্ববিদ্যালয়, কারখানা ও ব্র্যান্ড একই উৎপাদন শৃঙ্খলের অংশ, অথচ বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী চাকরির সন্ধানেই সীমাবদ্ধ থাকেন। কেন?
কারণ, একজন নতুন উদ্যোক্তা যদি চামড়াজাত পণ্যের কারখানা গড়ে তুলতে চান, তবে তার প্রয়োজন হয় যন্ত্রপাতি, দক্ষ কর্মী, নকশাবিদ, বিপণন ব্যবস্থা এবং বিক্রয় নেটওয়ার্ক। কিন্তু ব্যাংকগুলো সাধারণত নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে বড় অঙ্কের জামানত, জমি বা পূর্ব ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা চায়। বাংলাদেশ ব্যাংক, সিপিডি এবং বিভিন্ন শিল্প গবেষণায় নতুন উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন-সংকটকে চামড়া খাতের অন্যতম কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা শুরুতেই বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। এই সীমাবদ্ধতা শুধু চামড়া শিল্প নয়; বাংলাদেশি মাত্রই জানেন যেকোনো খাতেই উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা কতটা কঠিন।
একই শিল্প, ভিন্ন ফলাফল
ভিয়েতনাম আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জুতা ও লেদার পণ্য রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্ব ফুটওয়্যার উৎপাদন ও রপ্তানিতে চীনকে অনুসরণ করে দেশটি শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমাসহ অসংখ্য বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের বড় অংশের উৎপাদন ভিয়েতনামে হয়।
ভিয়েতনামের এই সাফল্যের পেছনে শুধু কম শ্রম ব্যয় নয়, বরং একটি সুসংগঠিত শিল্প-শিক্ষা কাঠামো কাজ করেছে। দেশটির শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চামড়া শিল্প বহু বছর ধরে ‘সম্ভাবনাময় খাত’ হিসেবেই পরিচিত। কাঁচামাল রয়েছে, শ্রমশক্তি রয়েছে, প্রযুক্তি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড তৈরি তো দূরের কথা, স্থানীয় বাজারেও শক্তিশালী দেশীয় ব্র্যান্ডের সংখ্যা সীমিত।
উদ্যোক্তা নেই, আছে শুধু চাকরিপ্রত্যাশী
বাংলাদেশে লেদার টেকনোলজি শিক্ষার ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইএলইটি) থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হন। রয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) প্রযুক্তি ও প্রকৌশল শিক্ষার অনেকগুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। রয়েছে ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়ে শিক্ষার ক্ষেত্রও। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতি বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ কয়েক হাজার স্নাতক বের হয়। কিন্তু এদের মধ্য থেকে কোনো উদ্যোক্তা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। অথচ চামড়া শিল্প খাতে চূড়ান্ত ভোক্তাপণ্য (ফিনিশড প্রোডাক্ট) তৈরির জন্য প্রতিটি স্তরেই দক্ষ জনশক্তি রয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এর একটি বড় কারণ হচ্ছে গবেষণা, ডিজাইন উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণের মধ্যে দুর্বল সংযোগ।
ভিয়েতনাম মডেল: ক্লাসরুম থেকে কারখানা
ভিয়েতনাম লেদার, ফুটওয়্যার অ্যান্ড হ্যান্ডব্যাগ অ্যাসোসিয়েশনের (LEFASO) বিভিন্ন প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির শিল্প উন্নয়নে দক্ষ জনশক্তি তৈরিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান নুয়েন ডাক থুয়ান বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, “ভিয়েতনামের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রযুক্তি, ডিজাইন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ভিয়েতনামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণ, কারখানাভিত্তিক গবেষণা এবং উৎপাদনমুখী প্রকল্প পরিচালিত হয়। শিক্ষার্থীরা শুধু তত্ত্ব শেখে না; উৎপাদন প্রক্রিয়া, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বিশ্লেষণেও যুক্ত থাকে। ফলে ডিগ্রি অর্জনের পর তাদের সামনে শিল্প কারখানায় যোগদান, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন অথবা নিজস্ব ব্র্যান্ড গঠন–এই তিনটি পথই খোলা থাকে।
সাভার শিল্পনগরী: স্থানান্তর হয়েছে, রূপান্তর হয়নি
হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরকে একসময় চামড়া শিল্পের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু শিল্প উদ্যোক্তারা বহু বছর ধরে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), পরিবেশগত মান, আন্তর্জাতিক সনদ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা বলে আসছেন। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) ও বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএলএলএফইএ)-এর নেতারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম বড় বাধা।
ইতালির শিক্ষা: কারিগরি জ্ঞান থেকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড
ইতালির টাস্কানি অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজাইন স্কুল, ট্যানারি এবং ফ্যাশন ব্র্যান্ডের মধ্যে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফ্লোরেন্স ও মিলানকে ঘিরে গড়ে ওঠা শিল্প ক্লাস্টারগুলো শুধু উৎপাদন করে না, নতুন ডিজাইন, নতুন উপকরণ এবং নতুন ব্র্যান্ডও তৈরি করে। গুচ্চি, প্রাডা, সালভাতোরে ফেরাগামোর মতো ব্র্যান্ডের পেছনে রয়েছে গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা এবং শিল্পের নিবিড় সংযোগ। ফলে একজন শিক্ষার্থী সরাসরি বৈশ্বিক মূল্য শৃঙ্খলের অংশ হয়ে ওঠেন।
সম্ভাবনার কথা আর কত?
বাংলাদেশে চামড়া শিল্প নিয়ে আলোচনা সাধারণত রপ্তানি, কাঁচামালের দাম বা পরিবেশগত সমস্যা ঘিরেই সীমাবদ্ধ বহু বছর ধরে। কিন্তু ভিয়েতনাম ও ইতালির অভিজ্ঞতা বলছে, শিল্পের প্রকৃত শক্তি শুধু কারখানায় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, ডিজাইন, প্রযুক্তি এবং ব্র্যান্ড নির্মাণের ধারাবাহিক সংযোগে। বাংলাদেশে সেই সংযোগ এখনও দুর্বল।
ফলে ভিয়েতনাম ও ইতালির মতো দেশে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কারখানা। সেখান থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে একটি ব্র্যান্ড দাঁড় করায় এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নানামাত্রিক চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। অনেকের সাথেই চামড়ার সাথে সম্পর্ক সারাজীবনের জন্যই ছিন্ন হয়ে যায়। চামড়া শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই–বাংলাদেশ কি কাঁচামাল ও শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে জ্ঞান, ডিজাইন ও ব্র্যান্ডনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারবে? নাকি সম্ভাবনার গল্প আরও বহু বছর সম্ভাবনাতেই আটকে থাকবে?