সরকারি স্যারদের বেতন তো বাড়বে, ঘুষ কি কমবে?

সরকারি স্যারদের বেতন তো বাড়বে, ঘুষ কি কমবে?
প্রতীকী ছবি

পশ্চিমা দেশগুলোয় কাউকে ‘স্যার’, ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন করা স্বাভাবিক সহবত। তার সাথে সম্মান, শ্রদ্ধা প্রদর্শনের সম্পর্ক থাকে। তবে ক্ষমতাকাঠামোর সম্পর্ক তেমনটা থাকে না। কার্যকারণ হিসেবে ভয়ও কোনো ভূমিকা রাখে না সাধারণত।

তবে আমাদের এই বাংলাদেশে বিষয়টি তা নয়। এ দেশে অনেকটা ভয় ও সামান্য সম্মান থেকেই ‘স্যার’, ‘ম্যাডাম’ মুখে আসে। কারণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সম্বোধন করতে হয় বাধ্য হয়ে। পদাধিকারীরা যে এসব শুনতে না পেলে কখনো কখনো কারও কথা কানেই তুলতে চান না। এই ঘটনাটি বেশি ঘটে সাধারণত সরকারি নানা অফিসে। এসব অফিসে ‘স্যার’, ‘ম্যাডাম’ ডাকা বা না ডাকা নিয়ে আমাদের দেশে কিছুদিন পর পরই নানা ঘটনা ঘটে। সেসব নিয়ে সংবাদও হয়। মূলত সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেই এসব ঘটনার অবতারণা বেশি হয়। সেবা নিতে গেলেও তাই সেবাগ্রহীতাদের তটস্থ থাকতে কাকে কি বলে ডাকতে হবে, তা নিয়ে। এর ব্যতিক্রমই কখনো কখনো হয়ে দাঁড়ায় মহানুভবতার দৃষ্টান্ত!

গত দুই দশকের বেশি সময় ধরেই আমাদের দেশে সরকারি চাকরির দাম তুলনামূলকভাবে একটু বেশি বেশি। আগে ক্ষমতা থাকলেও, বেতন-ভাতা কিছুটা কম ছিল সরকারি চাকুরেদের। তবে ২০১৫ সালের পে কমিশনে বেতন বৃদ্ধির পর থেকে দুই পাল্লাই প্রায় সমান সমান। সেই সঙ্গে আবাসন থেকে শুরু করে সহজ শর্তে ঋণ পর্যন্ত অন্যান্য বিভিন্ন সুবিধা তো আছেই। ফলে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা প্রশাসনিক– সব ধরনের মর্যাদার দিক থেকেই সাধারণ নাগরিকদের চেয়ে অনেকাংশে এগিয়ে গেছেন সরকারি চাকুরেরা।

আর এই প্রেক্ষাপটেই সরকারি চাকরি হয়ে গেছে সোনার হরিণের অন্য নাম। ক্যাডার হোক বা নন-ক্যাডার– শিক্ষার্থীরা চাকরির ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য করে সরকারিকেই। এতে কোটা থাকা, না থাকা নিয়েই এ দেশে হলো দুটি বড় আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান। সরকারের পতন হলো। মোটা দাগে কারণ সেই সরকারি চাকরিই। তাতে যেন বৈষম্য না হয়, তার দাবিতে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, সেটিই শেষে আরও বড় প্রেক্ষাপটে হাজির হয়, সরকারের পতন ঘটে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় অর্থ উপার্জনের নিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আর সরকারি চাকরি সে কারণেই সোনার হরিণ বনে যায়। কারণ সরকারি চাকরি হারানো খুব কঠিন! বাংলাদেশে তো আরও বেশি। গত ৫৪ বছরের ইতিহাসে বোধহয় গত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরই সরকারি চাকরি হারানোর ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে। তা নইলে কর্মস্থলে দিনের পর দিন উপস্থিত না থাকার পরও, কোনো কাজ না করার পরও, সরকারি চাকরি রয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

আশা করা যায়, এ দেশে সরকারি চাকরি আদতে কী, তা বোঝা যাচ্ছে নিখুঁতভাবে। সরকারি চাকরি নিয়ে এত কথা উঠছে, কারণ সম্প্রতি সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ২৫ হাজার ৮০০ টাকা করার প্রস্তাব করা সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেছে পে-কমিশন।

সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এ জন্য সরকারের বাড়তি দরকার হবে, প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবি থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সূত্রপাত হয়েছিল। ছবি: চরচা
সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবি থেকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সূত্রপাত হয়েছিল। ছবি: চরচা

নতুন পে-স্কেল রিপোর্টে সবচেয়ে বেশি ১৪৪ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ২০তম গ্রেডে। ফলে ৮ হাজার ২০০ টাকার মূল বেতন হয়ে যাচ্ছে ২৫ হাজার ৮০০ টাকা, সর্বসাকুল্যে যা দাঁড়াতে পারে ৪২ হাজারে। বিদ্যমান ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫,৮০০ টাকা এবং ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৬৫,৫০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট পক্ষ বলছে, ২০১৫ সালের সর্বশেষ বেতন স্কেলের পর গত ১০ বছরে মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়লেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মুদ্রাস্ফীতির পুঞ্জীভূত হার প্রায় ২.১২ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে এবং প্রশাসনিক কাজে গতি আনতে এই নতুন বেতন কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

যদিও এই সংবাদ প্রকাশের পর নানামুখী আলোচনা শুরু হয়, সমালোচনাও ওঠে। কারণ দেশের সার্বিক অর্থনীতির অবস্থা সুবিধার না। প্রায়ই অর্থনীতির অধোঃগতির নানা খবর মিলছে। বেকারত্ব বাড়ছে। জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপও বাড়ছে। এমন অবস্থায় যখন সরকারের ব্যয়ের তালিকায় বাড়তি ১ লাখ কোটি টাকা যুক্ত করার প্রস্তাব আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি করদাতা আমজনতার ভালো লাগার কথা নয়। দিনশেষে তাদের করের টাকাতেই তো এত বেতন দিতে হয়। ফলে সরকারের ব্যয় বাড়লে, তা আসলে সাধারণের ঘাড়েই চাপে। আর সেই চাপের কাফফারা হিসেবে দিতে হয় বেশি বেশি কর।

কথা হলো, অতিরিক্ত কর দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক অবস্থা সাধারণ মানুষের আছে কিনা। দেশের মানুষের এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা আসলে কেমন?

দৈনিক প্রথম আলোর এক্সপ্লেইনার বলছে, খাদ্যপণ্যের দামের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো বেশি। একই সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভালো নয়। রপ্তানি আয় পরিস্থিতিও আগের চেয়ে কিছুটা খারাপ হয়েছে।

বিবিএস বলছে, গত ডিসেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। এর মানে হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। কারণ প্রকৃত আয় কমে যায়।

অন্যদিকে এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৩১ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে সরকারের আয়ে টান পড়ছে।

অর্থাৎ, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, কর দেনেওয়ালা মানুষের হাতে টাকা বেশি নেই। তাই কর দিচ্ছেও মানুষ কম। এই কারণেই কি করের রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় খালি বাড়ছেই? স্বাভাবিক হিসাবে তেমনটাই মনে হবে। আসল কারণ এই দেশের কোন সরকার জানিয়েছে কবে?

গত বছরের শেষের দিকে শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ প্রকাশ করে বিবিএস। ২০২৪ সাল শেষে বাংলাদেশের বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। সবচেয়ে বেশি বেকার ঢাকা বিভাগে। এরপরের দুটি স্থানে আছে যথাক্রমে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগে। দেশে এক বছরের ব্যবধানে বেকারের সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। একই সঙ্গে কমেছে কর্মক্ষম ও কর্মে নিয়োজিত জনগোষ্ঠী। নারীর চেয়ে উল্লেখযোগ্য হারে পুরুষ বেকারের সংখ্যা বেড়েছে।

এটাই সরকারিভাবে পাওয়া সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ। সাম্প্রতিক অবস্থা তাহলে কেমন? যদি সর্বশেষ জরিপকে (যা প্রকাশিত হয়েছে গত বছরের শেষের দিক) ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়, তবে বলতেই হয় যে, দেশের কর্মসংস্থানের সার্বিক পরিস্থিতি আসলে সুবিধার নয়। তা কাজই যদি না থাকে, আয় হবে কীভাবে? আয় যদি না হয় ঠিকমতো, তাহলে কর দেবে কীভাবে? নিজের সঞ্চয় ভেঙে?

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেছে পে-কমিশন। ছবি: বাসস
সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল রিপোর্ট প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেছে পে-কমিশন। ছবি: বাসস

অন্তর্বর্তী সরকারের হাবভাব অবশ্য সেরকমই। এ কারণেই হয়তো সরকারি চাকুরেদের বেতন ব্যাপক হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে এবং তা নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে তাদের দ্বিধা হয়নি। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক সব সরকারই এই দেশের করদাতা (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) জনতাকে ‘গৌরী সেন’ হিসেবেই দেখে থাকে। সেই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরও তেমন হয়নি।

সরকারি চাকুরেদেরও অবশ্য কিছু যুক্তি আছে। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণ দেখানোই যায়। তবে কথা হলো, সরকারি চাকুরেদের যে বেতন বাড়ছে না, তা কিন্তু নয়। বার্ষিক কর্মমূল্যায়ন ও ইনক্রিমেন্ট তো আর থেমে নেই। ফলে আয়বৃদ্ধির পথ খোলাই আছে। এখন পে-স্কেল রিপোর্ট প্রস্তাব করছে সরকারি চাকুরেদের মূল বেতনই বাড়িয়ে দেওয়ার। তাও করাই যায়। যদি যে কারণে সরকারি চাকুরেদের প্রয়োজন হয় করদাতা জনতার, সেই কাজটি ঠিকঠাক হয়। অর্থাৎ, জনগণ যদি ঠিকঠাক সরকারি সেবা পায়, সরকারি কর্মকাণ্ড যদি পুরোপুরি জনমুখী হয়, তাহলে জনতার জন্য সেই কাজে ‘ব্রতী’ মানুষদের বেতন বাড়ানোয় আপত্তি করার কোনো কারণই নেই। বরং উৎসাহ দেওয়ার কথা। কিন্তু সরকারি সেবা কি মানুষ পায় ঠিকমতো, হয়রানি ছাড়া?

বাংলাদেশের জন্মের পর থেকেই এই দেশটায় সরকারি সেবা, তার মান এবং সেবা পাওয়ার হয়রানিমূলক ধরণ নিয়ে প্রশ্ন আছে ঢের। কিছু তথ্য জেনে নেওয়া যাক এ বিষয়ে।

বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৪তম। ২০২৩ সালে এই অবস্থান ছিল ১০ম। বাংলাদেশের চার ধাপ এগিয়ে যাওয়ার কারণ এ দেশে দুর্নীতি কমেছে, তা নয়। বরং বাংলাদেশ নম্বর আরও কম পেয়েছে।

টিআই-এর দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) অনুযায়ী, ২০২৪-এ বাংলাদেশের স্কোর ২০২৩ এর তুলনায় এক পয়েন্ট কমে ২৩ এবং উর্ধ্বক্রম অনুযায়ী অবস্থানের দুই ধাপ অবনতি হয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫১তম। বাংলাদেশের এ স্কোর ২০১২ সাল থেকে ১৩ বছরে সর্বনিম্ন।

‘সেবাখাতে দুর্নীতি: টিআইবির জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মেয়াদে সার্বিকভাবে ৭০.৯ শতাংশ খানা দুর্নীতির শিকার হয়েছে এবং সেবাখাতে দেশের সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্থ খাত হলো পাসপোর্ট, বিআরটিএ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, বিচারিক সেবা ও ভূমি খাত। সর্বোচ্চ ঘুষ গ্রহণকারী তিনটি খাত হলো: পাসপোর্ট, বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। আর ২০২৩ খানা জরিপে সার্বিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।

মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। ছবি: বাসস
মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। ছবি: বাসস

কিছু বিষয় লক্ষ্যণীয়। আমাদের দেশে যেসব সেবাখাত বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, তার সবই সরকারি। সাধারণ মানুষদের বেশি ঘুষও দিতে হচ্ছে এসব খাতে। সরকারি চাকুরেদেরই ঘুষ দিতে হচ্ছে। তা না দিলে সেবা পাওয়াও যাচ্ছে না, মিলছে হয়রানি। অর্থাৎ, সরকারি সেবা পাওয়ার জন্য সরকারি চাকুরেদের বেতন দিতে একদিকে কর দিচ্ছে নাগরিকেরা। অন্যদিকে সেই সেবা পাওয়ার জন্য যাতে হয়রানি না হয়, তার জন্য উপরি অর্থও দিতে হচ্ছে টেবিলের নিচ দিয়ে। টেবিলের উপরে আর নিচে–সাধারণ নাগরিকদের খরচ করতে হচ্ছে দুই দিকেই। তাদের ডান ও বাম, দুই হাতই আটকে গেছে। তাতেও শান্তি নেই। এখন আবার সেই সরকারি খাতের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর চাপও নিতে হবে ওই সাধারণদেরই। ট্র্যাজেডি আর কাকে বলে!

এরই মধ্যে অবশ্য টিআইবি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। টিআইবি বলেছে, জনপ্রশাসনে কার্যকর সংস্কার ও সরকারি সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন পে-স্কেল ঘুষ ও দুর্নীতির প্রিমিয়াম বৃদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি বলেছে, জনপ্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে পে-স্কেল বাড়ালে দুর্নীতি কমার কোনো বাস্তব উদাহরণ নেই।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রস্তাবিত বেতন বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর। একইসঙ্গে দ্রব্যমূল্যসহ সার্বিক ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, জনগণের করের টাকায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হলেও ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়ম একটি বড় অংশের কাছে যেন অধিকার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অতীতে বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানোর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। অন্যদিকে বেতন বৃদ্ধির তুলনায় ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন আরও বেড়েছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে– এমনটি ভাবার কারণ নেই।

অর্থাৎ, বেতন বাড়িয়েও ঘুষ, দুর্নীতি, হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় নেই। বরং আরও বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা প্রবল। আর এই দেশের ইতিহাসে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব বিলম্বে হলেও কোনো না কোনো মাত্রায় বাস্তবায়নের দিকেই এগিয়েছে প্রতিবার। তাই যতই অন্তর্বর্তী সরকার বলুক না কেন, তারা এটি বাস্তবায়ন করবে না, করবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার–তাতে অন্তত এই প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিল হওয়ার, বা প্রস্তাবিত মাত্রা হ্রাসের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনাকে বোঝায় না। কারণ ইতিহাস বলে যে, বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব যখন উঠেছে, তা কোনো না কোনো মাত্রায় বাস্তবায়িত হবেই। আর মাত্রা কমে যাওয়ার উদাহরণও বেশ দুর্লভ।

তাই প্রস্তাব দেওয়ার সময়ই সার্বিক বাস্তবতা বিবেচনা করার প্রয়োজন ছিল। গ্রেডভেদে সর্বোচ্চ ১৪৪ শতাংশ বেতন বাড়ানোর সুপারিশ অন্তত সেই বিবেচনাবোধের পরিচয় দেয় না। অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ব্যয়ের তালিকায় বাড়তি ১ লাখ কোটি টাকা যুক্ত করার প্রস্তাবও কোনোভাবেই সুবিবেচনাবোধের পরিচায়ক নয়। সুতরাং, বিচার, বিবেচনায় যে সংশ্লিষ্টদের ঘাটতি ছিল, সেটি স্পষ্ট।

অবশ্য, দেনেওয়ালাদের যদি গৌরী সেনই মনে করা হয়, তবে আলাপ ভিন্ন। সেক্ষেত্রে কে আর দেনেওয়ালার কষ্টের কথা ভাবে! দেনেওয়ালারা তখন কেবলই অর্থের এক অবারিত উৎস হিসেবে হাজির হয়। যেখান থেকে টাকা ওড়াতে কারোরই গায়ে লাগে না। বোধহয়, সরকারেরও না!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত