প্রবীর বিকাশ সরকার

বাঙালি, বাংলাদেশে জন্ম বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল সর্বকালের জন্য অপরিহার্য একটি নাম এবং একটি জ্বলন্ত ইতিহাস। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে সাম্প্রতকিকালে জানতে শুরু করলেও জাপানে বহুবছর ধরে তিনি রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচিত এবং অত্যধিক সম্মানের পাত্র।
বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নাম জাপানিরা “পার-রু হানজি” বলে সসম্মানে উচ্চারণ করে থাকেন। “পা-রু হানজি”–এই নামটি বর্তমানে জাপানের চিন্তাশীল সমাজে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে, যখন চীনের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়ছে। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পঞ্চাশ থেকে ষাট দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি জাপানসহ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন। কিন্তু এরপর নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার নামটি হারিয়ে গিয়েছিল। যদিও তার নাম জাপানের উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে মুদ্রিত আছে, তথাপি তরুণ প্রজন্মের জাপানিদের তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা স্মরণ করতে পারে না! এর মূল কারণ হচ্ছে বিচারপতি পালের সঠিক ইতিহাস এবং জাপানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন না করা।
সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা নির্দেশিত দায়সারা গোছের তথ্যের কারণে বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর কিছুই মনে থাকে না কারও। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানসহ বহির্বিশ্বে “রুয়ান্ডা ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল”, ২০০৪ সালের “সাদ্দাম হোসেইন ট্রায়াল” পুনরায় বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নামটিকে বিদগ্ধজনের সামনে উপস্থিত করেছে। স্মরণ করিয়ে দিয়েছে টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে (১৯৪৬-১৯৪৮) তিনি কী রায় দিয়েছিলেন? তাছাড়া বিগত দু-তিন দশকজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে জাপানবিরোধী বিক্ষোভের ফলে বিচারপতি পাল ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে অনেক জাপানিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। গবেষণালব্ধ গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এককথায় বিচারপতি পাল ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল সমার্থক। জাপানে তার নামটি পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছে ২০০৭ সালে। সে সময় ভারত সফরের সময় দিল্লিতে ভারতীয় সংসদে বক্তব্য দেন সদ্য স্বেচ্ছাপদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। সেই বক্তব্যে শিনজো বিচারপতি পালের কথা বলেছিলেন। তিনি কলকাতায় “ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র: রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবন” উদ্বোধনের সময় বিচারপতি পালের বড় ছেলে আইনজীবী প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ, আবের মাতামহ দু-দুবার প্রধানমন্ত্রী কিশি নোবুসুকে ছিলেন পালের ঘনিষ্ঠ ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী।
১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বিচারপতি পাল টোকিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যেভাবে বিশ্বকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিলেন রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, তেমনটি আর কোনো প্রাচ্যব্যক্তি আজ পর্যন্ত করতে পারেননি। বিশ্ব ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ জানলেও বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নামটি পর্যন্ত জানে না কোনো প্রজন্মই! এই মানুষটি জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার, মীরপুর থানার অন্তর্গত শালিমপুর গ্রামে। তার জন্ম তারিখ ২৭ জানুয়ারি। জন্মসাল ১৮৮৪ কিংবা ১৮৮৬। তার বাবার নাম বিপিনবিহারী পাল এবং মায়ের নাম মগ্নময়ী দেবী। বর্তমানে শালিমপুর গ্রামটি স্বাধীন বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলায় অবস্থিত।
নিরুদ্দেশ বাবার সন্তান রাধাবিনোদ চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়েছেন। শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ী। কুষ্টিয়া থেকে এনট্রাস উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী কলেজে এফএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এফএ-তে ভালো ফল করার পর কলকাতায় গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হন, যা ছিল তার একান্ত ইচ্ছে। ১৯০৭ সালে বিএ উত্তীর্ণ হলেন। এর মধ্যে কলকাতায় আশ্রিত পূর্বপরিচিত পূর্ণচন্দ্র পালের কন্যা নলিনীবালার সঙ্গে বিয়ে হয়। ১৯০৮ সালে গণিত বিষয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা পাস করেন। তারপর চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন এলাহাবাদ হিসাব রক্ষণ অফিসের একজন কেরানি হিসেবে। চাকরিরত অবস্থায় ১৯১১ সালে বিএল পরীক্ষায় সফল হয়ে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গণিতশ্রাস্ত্রের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় আদালতে ওকালতিরও সুযোগ পান। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব ল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। পরের বছরই রাধাবিনোদ কলকাতায় ফিরে যান, সেখানকার হাইকোর্টে আইনি পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে।

সাংবিধানিক আইনে পারদর্শী রাধাবিনোদ পাল ১৯২২ সালে ভারতীয় আয়কর আইনের সংস্কার সাধন করেন। সদা প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখী ও অদম্য জ্ঞানপিপাসু পাল অধ্যাবসায়বলে ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইন কলেজের অধ্যাপক হন এবং ১৯৩৬ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। এই অধ্যাপনার পাশাপাশি গভীরভাবে গবেষণায়ও নিযুক্ত হন। তারই ফলে ১৯২৪ সালে ডিএল তথা ডক্টরেট অব ল ডিগ্রি অর্জন করেন। সন্দর্ভের বিষয়: Hindu Philosophy of Law in the Vedic and Vedic times prior to the Institutes of Manu. ১৯২৫ সালে ড. পাল Tagore Professor of Law পদাধিকারী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন। বিষয় ছিল: The Law of Primogeniture with special reference to India, ancient and modern. ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় আয়কর বিভাগের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়। সেখানে তিন বছর কাটান তিনি। ১৯২৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে Tagore Professor of Law পদ অলঙ্কৃত করেন। এবারের বক্তৃতার বিষয় ছিল: History of the Hindu Law in the Vedic Age and in the Post-Vedic times down to the Institutes of Manu. এসব কাজ ও ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পরিবার নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যেতেন, যেতেন নিজের জন্মগ্রাম নদীয়ার শালিমপুরেও। আবাল্য পরিচিত বন্ধু, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতেন। জীবনজীবিকার ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র বলে কোনো ভেদাভেদ তার চরিত্রে ছিল না। ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান, স্নেহশীল, জাতীয়তাবোধসম্পন্ন প্রতিবাদী স্বভাবের মানুষ।
১৯৩৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তার জীবনে ঘটে অসামান্য এক ঘটনা। ওই দিন লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলের একটি মামলায় লড়ার জন্য একটি আমন্ত্রণ পত্র আসে তার কাছে। সেই প্রথম তার বিদেশ ভ্রমণ। এরপর তার জীবনে একের পর এক সৌভাগ্যের দ্বার উন্মুক্ত হতে থাকে।
১৯৩৭ সালে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের Congress of Comparative Law প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে International Academy of Comparative Law কার্যকরী পরিষদের যুগ্ম-সভাপতি নির্বাচিত হন। এবার ছিল তার দ্বিতীয় বিদেশ ভ্রমণ। ১৯৩৮ সালে আবার আমন্ত্রণ পান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে Tagore Professor of Law হিসেবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ এক বিরল সম্মান। এবারের বিষয় ছিল: Crimes in International Relations. ক্রমাগত অগ্রগতির সিঁড়ি ভেঙে এগিয়েই যেতে লাগলেন ড. পাল।
১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে অভিষিক্ত হন। তার জন্মদাত্রীর আজীবনের স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন বিচারপতি হবে! সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। যদিও মা সেই স্বপ্নের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তখন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্বনামধন্য ব্যারিস্টার স্যার হ্যারল্ড ডার্বিশায়ার। তার অত্যন্ত স্নেহভাজন ও বিশ্বস্ত ছিলেন বিচারপতি পাল। জানা যায়, তারই প্রস্তাবে ড. পাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানে অনুষ্ঠিত The International Military Tribunal for the Far East, সংক্ষেপে টোকিও ট্রাইব্যুনালে অন্যতম বিচারকের পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরের পদ শূন্য হলে তাকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপাচার্যের দায়িত্বভার পরিচালনা করে অবসর গ্রহণ করেন। আর এই সালেই কর্মবীর ড. পালের কাছে চিঠি আসে জাপানে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে ১১টি দেশের ১১ জন বিচারকের মধ্যে তাকে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে আসন গ্রহণের জন্য। বিশ্বের ইতিহাসে জন্ম হয় এক অবিস্মরণীয় ঘটনার। ১৯৪৬ সালের ৫ মে তারিখে ড. পাল জাপানের পথে যাত্রা করেন কলকাতা থেকে। তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয় একেবারে যুদ্ধবিধস্ত রাজধানী টোকিওর বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল হোটেলে। এখানে অবস্থান করেই তিনি আড়াই বছর বিচারের কাজ ও রায় সমাপ্ত করে ব্যতিক্রমী এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এশিয়ায় প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে নতুন করে আলোকিত করেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বিশ্ববাসী তার নাম জানলেও ব্রিটিশ ভারতে তার কৃতকর্মের ইতিহাস আদৌ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। অজ্ঞাতেই রয়ে গেল এই মহান মনীষীর নাম ও তার অসামান্য কাজের ইতিহাস।
১৯৪৮ সালে যখন টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল বিষয়ে ইংরেজিতে তার লিখিত ১২৩৫ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায়ের সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক ঝড় তুলল, তখন কি এই সংবাদ ভারতবাসী বিশেষ করে কলকাতা ও দিল্লির বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের দৃষ্টিগোচর হয়নি? না হওয়ার তো কথা নয়! কিন্তু তা গুরুত্ব পায়নি বলেই ধারণা করা যায়। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই তখনকার ভারতব্যাপী ছিল একেবারেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। লাগাতার আন্দোলন, হরতাল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, খুনাখুনি ইত্যাদির জেরে উন্মাতাল সমগ্র ভারতবর্ষ। সেই সঙ্গে ভারত ভেঙে যাওয়ার সমূহ সংকট। পরে তা ভেঙে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে গেল রাজনীতিকদের বাসনা অনুযায়ী।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল আরও নিদারুণ এবং বিপর্যস্ত। ব্রিটিশের প্রায় ২০০ বছরের উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ একটি উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তান অন্যটি বাংলাভাষী পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান। এই ভারতভাগকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর দেশবদল; কলকাতা, বিহার, পাঞ্জাব, গুজরাট, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, মুলতান প্রভৃতি শহরে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। দিল্লিতে রাজনীতিকদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় অভাব-অনটন এবং বামপন্থী ও কংগ্রেসপন্থীদের রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের তলে টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের সংবাদ বা এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একজন বাঙালি, তথা এশিয়াবাসীর পক্ষে শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সরব বিজয়ের সংবাদটি একেবারেই তলিয়ে যায়। গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদটি আসেনি। আর এলেও এই নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো দুদণ্ড অবসরও ছিল না সর্বস্তরের মানুষের। আন্তর্জাতিক রাজনীতি সচেতন কিছু আইনজীবী এবং কতিপয় রাজনীতিবিদ ছাড়া এই ঘটনার কথা জানার সুযোগ ছিল না।
ভারতীয় রাজনৈতিক জটিলতার কারণে টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি পালের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা কলকাতা, তথা দিল্লিতে প্রচার লাভে প্রধান প্রতিবন্ধকতাই ছিল রুশপন্থী সমাজতন্ত্রীমনা কংগ্রেস পার্টির প্রধান রাজনীতিক এবং নবভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলে বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যায়। সমবয়সী ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেহরুর সঙ্গে বিচারপতি পালের সদ্ভাব ছিল না বলে জানতে পারি বিচারপতি পালের ছেলে আইনজীবী প্রশান্ত কুমার পালের ভাষ্য থেকেই।
২০০৭ সালে কলকাতার ডোবার লেনে অবস্থিত তার ছিমছাম একতলা বাসভবনে গিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হই। তিনি খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন যে, একজন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি ৭০০০ হাজার মাইল দূর থেকে নমস্য বিচারপতি পালের খোঁজে তার ছেলের বাড়িতে এসেছিল বলে! তার ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি পালের প্রদত্ত রায়টি মনোঃপূত ছিল না বন্ধুবর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর। নেহরু প্রত্যাশা করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রবাহিনী প্রধান আমেরিকার পক্ষে বিচারপতি পাল তার রায় প্রদান করবেন! কিন্তু ন্যায়দণ্ডের মূর্তপ্রতীক–একদা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ বিচারপতি পাল যে নিরপেক্ষ রায়ই প্রদান করবেন, সেটা ছিল নির্ধারিতই। এই রায়ের কারণে প্রধানমন্ত্রী নেহরু বিচারপতি পালকে তিরস্কারও করেছিলেন বলে কথিত আছে। শুধু তাই নয়, তাকে নানাভাবে বিব্রত, বিপর্যস্ত করার কথাও তার ছেলে আমাকে বলেছিলেন। ফলে মানসিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে বিচারপতি পাল তার বাকী জীবনটা কলকাতায় কাটান। কিন্তু অবদমিত সাহসের বরপুত্র বিচারপতি পাল একজন শান্তিবাদী কর্মীও ছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত (১৯৬৭)। কলকাতায় ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন মুভমেন্টের শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি।
তার আগে আমার কাছে একটা রহস্য এখনো অনুন্মুক্ত রয়ে গেছে অনেকের মতো। আর সেটা হলো–কেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রাধাবিনোদ পালকেই টোকিও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ, তথা জেনারেল হেড কোয়ার্টার প্রধান জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থার ১১ জন বিচারপতির অন্যতম হিসেবে নিয়োগ দিলেন? তিনি কি তার জীবনবৃত্তান্ত না জেনেই তাকে নিযুক্ত করেছিলেন এই আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে? যেখানে ভারতবর্ষ তখনো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে শাসিত ও নিপীড়িত! সেখানে পরাধীন একটি দেশ থেকে একজন বিচারপতিকে কেন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেবেন, তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। নিশ্চয়ই এর পেছনে গভীর কোনো উদ্দেশ্য অথবা কারণ ছিল। কার্যকারণ বলতে তো একটা কথা আছেই।
প্রবীর বিকাশ সরকার: জাপানপ্রবাসী লেখক ও গবেষক

বাঙালি, বাংলাদেশে জন্ম বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল সর্বকালের জন্য অপরিহার্য একটি নাম এবং একটি জ্বলন্ত ইতিহাস। ভারত ও বাংলাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে সাম্প্রতকিকালে জানতে শুরু করলেও জাপানে বহুবছর ধরে তিনি রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহলে আলোচিত এবং অত্যধিক সম্মানের পাত্র।
বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নাম জাপানিরা “পার-রু হানজি” বলে সসম্মানে উচ্চারণ করে থাকেন। “পা-রু হানজি”–এই নামটি বর্তমানে জাপানের চিন্তাশীল সমাজে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে, যখন চীনের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক বিদ্বেষ বাড়ছে। অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পঞ্চাশ থেকে ষাট দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি জাপানসহ বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন। কিন্তু এরপর নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার নামটি হারিয়ে গিয়েছিল। যদিও তার নাম জাপানের উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যপুস্তকে মুদ্রিত আছে, তথাপি তরুণ প্রজন্মের জাপানিদের তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা স্মরণ করতে পারে না! এর মূল কারণ হচ্ছে বিচারপতি পালের সঠিক ইতিহাস এবং জাপানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত উপস্থাপন না করা।
সরকারের কর্তাব্যক্তিদের দ্বারা নির্দেশিত দায়সারা গোছের তথ্যের কারণে বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আর কিছুই মনে থাকে না কারও। কিন্তু ১৯৯৭ সালে জাপানসহ বহির্বিশ্বে “রুয়ান্ডা ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল”, ২০০৪ সালের “সাদ্দাম হোসেইন ট্রায়াল” পুনরায় বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নামটিকে বিদগ্ধজনের সামনে উপস্থিত করেছে। স্মরণ করিয়ে দিয়েছে টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে (১৯৪৬-১৯৪৮) তিনি কী রায় দিয়েছিলেন? তাছাড়া বিগত দু-তিন দশকজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনে জাপানবিরোধী বিক্ষোভের ফলে বিচারপতি পাল ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে অনেক জাপানিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। গবেষণালব্ধ গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে, এখনো হচ্ছে। এককথায় বিচারপতি পাল ও টোকিও ট্রাইব্যুনাল সমার্থক। জাপানে তার নামটি পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছে ২০০৭ সালে। সে সময় ভারত সফরের সময় দিল্লিতে ভারতীয় সংসদে বক্তব্য দেন সদ্য স্বেচ্ছাপদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। সেই বক্তব্যে শিনজো বিচারপতি পালের কথা বলেছিলেন। তিনি কলকাতায় “ভারত-জাপান সংস্কৃতি কেন্দ্র: রবীন্দ্র-ওকাকুরা ভবন” উদ্বোধনের সময় বিচারপতি পালের বড় ছেলে আইনজীবী প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এটা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ, আবের মাতামহ দু-দুবার প্রধানমন্ত্রী কিশি নোবুসুকে ছিলেন পালের ঘনিষ্ঠ ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষী।
১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত বিচারপতি পাল টোকিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যেভাবে বিশ্বকে প্রচণ্ড নাড়া দিয়েছিলেন রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে, তেমনটি আর কোনো প্রাচ্যব্যক্তি আজ পর্যন্ত করতে পারেননি। বিশ্ব ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ জানলেও বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নামটি পর্যন্ত জানে না কোনো প্রজন্মই! এই মানুষটি জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতের নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার, মীরপুর থানার অন্তর্গত শালিমপুর গ্রামে। তার জন্ম তারিখ ২৭ জানুয়ারি। জন্মসাল ১৮৮৪ কিংবা ১৮৮৬। তার বাবার নাম বিপিনবিহারী পাল এবং মায়ের নাম মগ্নময়ী দেবী। বর্তমানে শালিমপুর গ্রামটি স্বাধীন বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলায় অবস্থিত।
নিরুদ্দেশ বাবার সন্তান রাধাবিনোদ চরম দারিদ্র্যের মধ্যেই বড় হয়েছেন। শৈশব থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ী। কুষ্টিয়া থেকে এনট্রাস উত্তীর্ণ হয়ে রাজশাহী কলেজে এফএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এফএ-তে ভালো ফল করার পর কলকাতায় গিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হন, যা ছিল তার একান্ত ইচ্ছে। ১৯০৭ সালে বিএ উত্তীর্ণ হলেন। এর মধ্যে কলকাতায় আশ্রিত পূর্বপরিচিত পূর্ণচন্দ্র পালের কন্যা নলিনীবালার সঙ্গে বিয়ে হয়। ১৯০৮ সালে গণিত বিষয়ে স্নাতকোত্তর পরীক্ষা পাস করেন। তারপর চাকরি জীবনে প্রবেশ করেন এলাহাবাদ হিসাব রক্ষণ অফিসের একজন কেরানি হিসেবে। চাকরিরত অবস্থায় ১৯১১ সালে বিএল পরীক্ষায় সফল হয়ে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গণিতশ্রাস্ত্রের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। সেই সঙ্গে স্থানীয় আদালতে ওকালতিরও সুযোগ পান। ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার অব ল পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। পরের বছরই রাধাবিনোদ কলকাতায় ফিরে যান, সেখানকার হাইকোর্টে আইনি পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার উদ্দেশ্যে।

সাংবিধানিক আইনে পারদর্শী রাধাবিনোদ পাল ১৯২২ সালে ভারতীয় আয়কর আইনের সংস্কার সাধন করেন। সদা প্রতিদ্বন্দ্বিতামুখী ও অদম্য জ্ঞানপিপাসু পাল অধ্যাবসায়বলে ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন আইন কলেজের অধ্যাপক হন এবং ১৯৩৬ পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। এই অধ্যাপনার পাশাপাশি গভীরভাবে গবেষণায়ও নিযুক্ত হন। তারই ফলে ১৯২৪ সালে ডিএল তথা ডক্টরেট অব ল ডিগ্রি অর্জন করেন। সন্দর্ভের বিষয়: Hindu Philosophy of Law in the Vedic and Vedic times prior to the Institutes of Manu. ১৯২৫ সালে ড. পাল Tagore Professor of Law পদাধিকারী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন। বিষয় ছিল: The Law of Primogeniture with special reference to India, ancient and modern. ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাষ্ট্রীয় আয়কর বিভাগের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেয়। সেখানে তিন বছর কাটান তিনি। ১৯২৯ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে Tagore Professor of Law পদ অলঙ্কৃত করেন। এবারের বক্তৃতার বিষয় ছিল: History of the Hindu Law in the Vedic Age and in the Post-Vedic times down to the Institutes of Manu. এসব কাজ ও ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পরিবার নিয়ে বিভিন্ন স্থানে যেতেন, যেতেন নিজের জন্মগ্রাম নদীয়ার শালিমপুরেও। আবাল্য পরিচিত বন্ধু, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটাতেন। জীবনজীবিকার ক্ষেত্রে ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র বলে কোনো ভেদাভেদ তার চরিত্রে ছিল না। ছিলেন অত্যন্ত নীতিবান, স্নেহশীল, জাতীয়তাবোধসম্পন্ন প্রতিবাদী স্বভাবের মানুষ।
১৯৩৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তার জীবনে ঘটে অসামান্য এক ঘটনা। ওই দিন লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিলের একটি মামলায় লড়ার জন্য একটি আমন্ত্রণ পত্র আসে তার কাছে। সেই প্রথম তার বিদেশ ভ্রমণ। এরপর তার জীবনে একের পর এক সৌভাগ্যের দ্বার উন্মুক্ত হতে থাকে।
১৯৩৭ সালে নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরের Congress of Comparative Law প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে International Academy of Comparative Law কার্যকরী পরিষদের যুগ্ম-সভাপতি নির্বাচিত হন। এবার ছিল তার দ্বিতীয় বিদেশ ভ্রমণ। ১৯৩৮ সালে আবার আমন্ত্রণ পান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিতে Tagore Professor of Law হিসেবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এ এক বিরল সম্মান। এবারের বিষয় ছিল: Crimes in International Relations. ক্রমাগত অগ্রগতির সিঁড়ি ভেঙে এগিয়েই যেতে লাগলেন ড. পাল।
১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি পদে অভিষিক্ত হন। তার জন্মদাত্রীর আজীবনের স্বপ্ন ছিল ছেলে একদিন বিচারপতি হবে! সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। যদিও মা সেই স্বপ্নের সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তখন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্বনামধন্য ব্যারিস্টার স্যার হ্যারল্ড ডার্বিশায়ার। তার অত্যন্ত স্নেহভাজন ও বিশ্বস্ত ছিলেন বিচারপতি পাল। জানা যায়, তারই প্রস্তাবে ড. পাল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর জাপানে অনুষ্ঠিত The International Military Tribunal for the Far East, সংক্ষেপে টোকিও ট্রাইব্যুনালে অন্যতম বিচারকের পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলরের পদ শূন্য হলে তাকে নিয়োগ প্রদান করা হয়। ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উপাচার্যের দায়িত্বভার পরিচালনা করে অবসর গ্রহণ করেন। আর এই সালেই কর্মবীর ড. পালের কাছে চিঠি আসে জাপানে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে ১১টি দেশের ১১ জন বিচারকের মধ্যে তাকে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে আসন গ্রহণের জন্য। বিশ্বের ইতিহাসে জন্ম হয় এক অবিস্মরণীয় ঘটনার। ১৯৪৬ সালের ৫ মে তারিখে ড. পাল জাপানের পথে যাত্রা করেন কলকাতা থেকে। তার অবস্থান নিশ্চিত করা হয় একেবারে যুদ্ধবিধস্ত রাজধানী টোকিওর বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল হোটেলে। এখানে অবস্থান করেই তিনি আড়াই বছর বিচারের কাজ ও রায় সমাপ্ত করে ব্যতিক্রমী এক ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এশিয়ায় প্রথম নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাঙালি জাতিকে বিশ্বের দরবারে নতুন করে আলোকিত করেন তিনি। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বিশ্ববাসী তার নাম জানলেও ব্রিটিশ ভারতে তার কৃতকর্মের ইতিহাস আদৌ আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। অজ্ঞাতেই রয়ে গেল এই মহান মনীষীর নাম ও তার অসামান্য কাজের ইতিহাস।
১৯৪৮ সালে যখন টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল বিষয়ে ইংরেজিতে তার লিখিত ১২৩৫ পৃষ্ঠার ঐতিহাসিক রায়ের সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক ঝড় তুলল, তখন কি এই সংবাদ ভারতবাসী বিশেষ করে কলকাতা ও দিল্লির বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী ও রাজনীতিকদের দৃষ্টিগোচর হয়নি? না হওয়ার তো কথা নয়! কিন্তু তা গুরুত্ব পায়নি বলেই ধারণা করা যায়। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই তখনকার ভারতব্যাপী ছিল একেবারেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। লাগাতার আন্দোলন, হরতাল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মারামারি, খুনাখুনি ইত্যাদির জেরে উন্মাতাল সমগ্র ভারতবর্ষ। সেই সঙ্গে ভারত ভেঙে যাওয়ার সমূহ সংকট। পরে তা ভেঙে গিয়ে তিন টুকরো হয়ে গেল রাজনীতিকদের বাসনা অনুযায়ী।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল আরও নিদারুণ এবং বিপর্যস্ত। ব্রিটিশের প্রায় ২০০ বছরের উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবার দুটি অংশ একটি উর্দুভাষী পশ্চিম পাকিস্তান অন্যটি বাংলাভাষী পূর্ববাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান। এই ভারতভাগকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর দেশবদল; কলকাতা, বিহার, পাঞ্জাব, গুজরাট, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, মুলতান প্রভৃতি শহরে ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। দিল্লিতে রাজনীতিকদের ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় অভাব-অনটন এবং বামপন্থী ও কংগ্রেসপন্থীদের রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গের তলে টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের সংবাদ বা এই ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে একজন বাঙালি, তথা এশিয়াবাসীর পক্ষে শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সরব বিজয়ের সংবাদটি একেবারেই তলিয়ে যায়। গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদটি আসেনি। আর এলেও এই নিয়ে চিন্তাভাবনা করার মতো দুদণ্ড অবসরও ছিল না সর্বস্তরের মানুষের। আন্তর্জাতিক রাজনীতি সচেতন কিছু আইনজীবী এবং কতিপয় রাজনীতিবিদ ছাড়া এই ঘটনার কথা জানার সুযোগ ছিল না।
ভারতীয় রাজনৈতিক জটিলতার কারণে টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি পালের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা কলকাতা, তথা দিল্লিতে প্রচার লাভে প্রধান প্রতিবন্ধকতাই ছিল রুশপন্থী সমাজতন্ত্রীমনা কংগ্রেস পার্টির প্রধান রাজনীতিক এবং নবভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলে বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যায়। সমবয়সী ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেহরুর সঙ্গে বিচারপতি পালের সদ্ভাব ছিল না বলে জানতে পারি বিচারপতি পালের ছেলে আইনজীবী প্রশান্ত কুমার পালের ভাষ্য থেকেই।
২০০৭ সালে কলকাতার ডোবার লেনে অবস্থিত তার ছিমছাম একতলা বাসভবনে গিয়ে কিছু তথ্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হই। তিনি খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন যে, একজন জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি ৭০০০ হাজার মাইল দূর থেকে নমস্য বিচারপতি পালের খোঁজে তার ছেলের বাড়িতে এসেছিল বলে! তার ভাষ্য থেকে জানা যায় যে, টোকিও ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি পালের প্রদত্ত রায়টি মনোঃপূত ছিল না বন্ধুবর প্রধানমন্ত্রী নেহরুর। নেহরু প্রত্যাশা করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মিত্রবাহিনী প্রধান আমেরিকার পক্ষে বিচারপতি পাল তার রায় প্রদান করবেন! কিন্তু ন্যায়দণ্ডের মূর্তপ্রতীক–একদা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ বিচারপতি পাল যে নিরপেক্ষ রায়ই প্রদান করবেন, সেটা ছিল নির্ধারিতই। এই রায়ের কারণে প্রধানমন্ত্রী নেহরু বিচারপতি পালকে তিরস্কারও করেছিলেন বলে কথিত আছে। শুধু তাই নয়, তাকে নানাভাবে বিব্রত, বিপর্যস্ত করার কথাও তার ছেলে আমাকে বলেছিলেন। ফলে মানসিক বিপর্যয়ের ভেতর দিয়ে বিচারপতি পাল তার বাকী জীবনটা কলকাতায় কাটান। কিন্তু অবদমিত সাহসের বরপুত্র বিচারপতি পাল একজন শান্তিবাদী কর্মীও ছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত (১৯৬৭)। কলকাতায় ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন মুভমেন্টের শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি।
তার আগে আমার কাছে একটা রহস্য এখনো অনুন্মুক্ত রয়ে গেছে অনেকের মতো। আর সেটা হলো–কেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রাধাবিনোদ পালকেই টোকিও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ, তথা জেনারেল হেড কোয়ার্টার প্রধান জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থার ১১ জন বিচারপতির অন্যতম হিসেবে নিয়োগ দিলেন? তিনি কি তার জীবনবৃত্তান্ত না জেনেই তাকে নিযুক্ত করেছিলেন এই আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতে? যেখানে ভারতবর্ষ তখনো ব্রিটিশ শাসনের অধীনে শাসিত ও নিপীড়িত! সেখানে পরাধীন একটি দেশ থেকে একজন বিচারপতিকে কেন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেবেন, তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। নিশ্চয়ই এর পেছনে গভীর কোনো উদ্দেশ্য অথবা কারণ ছিল। কার্যকারণ বলতে তো একটা কথা আছেই।
প্রবীর বিকাশ সরকার: জাপানপ্রবাসী লেখক ও গবেষক

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট