বাংলাদেশের গণভোট কেন জুয়া?

বাংলাদেশের গণভোট কেন জুয়া?
গণভোট। ছবি: চরচা

একদিন বাদেই বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে দেশের ইতিহাসের চতুর্থ গণভোট।

জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন, ভবিষ্যতে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ চালুর প্রশ্ন এবং জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত ৩০ দফা সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে জনগণের সম্মতি আদায়ের জন্যই হবে এই গণভোট।

এই গণভোট বাংলাদেশের সংবিধানের ৭ ও ৭খ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব আইনি আপত্তি আপাতত পাশে সরিয়ে রাখলেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়-নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থাকে ‘পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করার ক্ষমতা ঠিক কার হাতে যাচ্ছে এবং কার পক্ষে?

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, যদি ‘হ্যাঁ’ জয় পায়, তাহলে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। তখন দেশের ত্রয়োদশ সংসদ ১৮০ কর্মদিবসের জন্য একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদে রুপান্তরিত হবে (অনুচ্ছেদ ৭)।

প্রচলিত সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, সংসদের সব ক্ষমতার উৎস হলো সংবিধান এবং পরিসরও মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সংস্কারের বিষয়বস্তু ও প্রক্রিয়া আগেভাগেই নির্ধারণ করে দেওয়ায় ইমপ্লিমেন্টেশন অর্ডার (বাস্তবায়ন আদেশ) সংসদকে একটি নির্বাহী আদেশের অধীনস্থ করে ফেলছে। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ একটি বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়বে, যার অর্থ সে নিজেকেই ক্ষমতাবান করছে।

এই সাংবিধানিক টানাপোড়েন রাজনৈতিক বৈধতার আরও মৌলিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কারণ সংসদের ম্যান্ডেট পূর্বনির্ধারিত এবং এমন এক নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যরা নির্বাচিত, যেখানে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই সনদের অনুমোদন প্রক্রিয়াটি গণতান্ত্রিক ভিত্তির পরিবর্তে এক প্রকার গণভোটভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক সংলাপ ও জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বৈধতার সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, যত পরিশীলিতই হোক না কেন এই গণভোট কি বৃহত্তর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব পূরণ করতে পারবে? আর নির্বাচনের পর যদি সাধারণ মানুষ এই গণভোটের বিষয়গুলোর সঙ্গে সহমত না হতে পারেন?

গত বছরের ১৩ নভেম্বর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, জাতীয় সংস্কার কমিশন একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করেছে। সরকার দাবি করেছে, রাজনৈতিক দল ও জোটসমূহ যৌথভাবে জুলাই সনদে সই ও অনুমোদন করেছে।

তবে এই দাবি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি দল ওই সনদে সই করেনি।

আবার সরকারি আদেশে এও বলা হয়েছে, গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে জুলাই সনদ প্রস্তুত করেছে। এখানেও সমস্যা আছে। কারণ অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিবন্ধন বাতিল করে অফলাইন ও অনলাইন দুইভাবেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। নির্বাহী আদেশে একে ‘অস্থায়ী স্থগিতাদেশ’ বলা হলেও, কার্যত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও ওয়ার্কার্স পার্টিকেও সংলাপ থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে পাশ কাটিয়েই জুলাই সনদ প্রণীত হয়।

সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট প্রচারে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অসম। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, গণভোটের বিরোধিতা করলেও প্রচার চালাতে পারছে না-এমনকি অনলাইনেও নয়। অন্যদিকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও অন্তর্বর্তী প্রশাসন ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গণভোট একটি অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে, যা প্রক্রিয়া ও ফলাফলের বৈধতা উভয়কেই প্রভাবিত করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এনসিপির অবস্থানও দ্ব্যর্থক। জুলাই আন্দোলনের ফল হলেও তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। সনদে সই না করার বিষয়ে তখন সংবাদ সম্মেলন করে তিনটি দাবি জানিয়েছিল এনসিপি। এক- জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের খসড়া স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগেই প্রকাশ ও এই আদেশ প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে জারি করতে হবে (সরকার এটা করেছে)।

দুই- জনগণ গণভোটে সনদের পক্ষে রায় দিলে নোট অব ডিসেন্টের (ভিন্নমত) কার্যকারিতা থাকবে না এবং তিন-গণভোটের রায় অনুযায়ী আগামী নির্বাচিত সংসদ তাদের ওপর প্রদত্ত গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করবে এবং সংস্কার করা সংবিধানের নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’।

তবে জামায়াতের সঙ্গে কৌশলগত জোটের পর এনসিপি এখন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু তারা প্রথমে স্বাক্ষর করল না কেন-এই প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার অবৈধ গ্রেপ্তার, আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন বিষয়ে কঠোর ভাষার মতো বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট রেখেছে জামায়াত।

বিএনপি এক সময় জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলেও এখন তুলনামূলক উদার ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের দিকে সরে এসেছে এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সংসদের মাধ্যমে সংশোধনের পক্ষে। তবুও তারেক রহমানের ‘হ্যাঁ’ ভোটের সমর্থন দলটির ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। তারা সংসদকে পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের পথ বেছে নেবে কি না-তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

এই গণভোটের প্রচার চালাচ্ছে মূলত বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের কিছু মিত্রের জোট। অন্য প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ কিন্তু নেই। এই যে অন্যরা বর্জন করেছে বা বাদ দেওয়া হয়েছে, এতে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সামাজিক চুক্তি তৈরির সম্ভাবনা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অন্য দেশের অভিজ্ঞতাও তাই বলে। মিশরে বিপ্লবের বৈধতার ওপর দাঁড়ানো সংস্কার স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। তিউনিসিয়ায় প্রাথমিক সফলতার পেছনে ছিল কোনো একক গোষ্ঠীকে বিপ্লবের একচেটিয়া দাবিদার হতে না দেওয়া।

স্থিতিশীলতা চাওয়া কোনো গণতান্ত্রিক দেশের সাংবিধানিক সংস্কার কেবল বিপ্লবের বৈধতার দাবিদারদের সম্মতির ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। অন্যদের হিসাবের বাইরে রাখা সাময়িকভাবে হয়তো ফলপ্রসূ মনে হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার অনুকূল নয়। সংস্কার টেকসই হয় তখনই, যখন বাতিল বা বর্জিত শক্তিগুলোকেও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধটি হুবহু অনুবাদ করে প্রকাশিত

ডিপ্লোম্যাটের অতিথি লেখক সংগীতা এফ গাজী ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার হোয়ার্টন স্কুলে একজন লেকচারার এবং রিসার্চ ফেলো।

আরাফাত হোসেন খান, ডিপ্লোম্যাটের অতিথি লেখক। তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের আইন অনুষদে একজন ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক আইনজীবী। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র সাংবিধানিক আইন, গণতন্ত্র এবং সমসাময়িক মানবাধিকার।

সম্পর্কিত