সুব্রত শুভ্র

সরকারি পরিসংখ্যান এখনো বলছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৩ শতাংশ (২০২৫ অর্থবছর)। কিন্তু এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাস্তব প্রবৃদ্ধি মানে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি–শীর্ষ ১০ শতাংশের আয় বৃদ্ধির হার ২০ গুণ বেশি, তুলনায় নিম্ন ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠী প্রায় স্থবির। অর্থনীতির বড় অংশ এখন রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে আবদ্ধ। উন্নয়নের খোলস, বৈষম্যের বাস্তবতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে, যার ফলে অর্থনীতি ক্রমশ রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে–যেখানে উন্নয়নের ভাষা আসলে ক্ষমতার ভাষা।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার দাবি করে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি স্পষ্টভাবে মন্থর হয়েছে। এডিবির আউটলুক ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরে ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম এবং দীর্ঘমেয়াদি গড় হার থেকেও নিচে। এই প্রবৃদ্ধিকে ‘সংকুচিত চাহিদা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপের মাঝেও টিকে থাকা এক ন্যূনতম বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা গুণগত অর্থে স্থিতিশীল কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
একদিকে সামগ্রিক জিডিপি বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের বণ্টন ক্রমশ অসম হয়ে উঠছে। ওয়ার্ল্ড ইক্যুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে যায় জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে যায় মাত্র ১৯ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ধনসম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র শীর্ষ ১ শতাংশ ধনকুবের। আর নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মিলে ধরে রাখতে পারে মোট সম্পদের ৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ, ম্যাক্রো পর্যায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও মাইক্রো পর্যায়ে তা সাধারণ মানুষের জীবনমানে সেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অর্থনীতির এই বৈষম্যকেন্দ্রিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। সরকারি টাস্ক ফোর্স এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, একাধিক মেগা প্রকল্পে প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে–দুর্নীতি, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। দ্য ব্লিটজে প্রকাশিত এ সম্পর্কিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল আটটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়ই প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার বেশি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের বড় অংশকে অকার্যকর খাতে আটকে রাখছে।
এই বাস্তবতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যখন বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার বদলে রাজনৈতিক সান্নিধ্য ব্যবসায়িক সুবিধার মূল নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ কার্যকর হয়–যেখানে উন্নয়নের ভাষা মূলত ক্ষমতার বলয়কে বৈধতা দেওয়ার উপায়ে পরিণত হয়। বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, নীতি-পরিবর্তন, ট্যাক্স প্রশাসন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া–সবকিছুতেই প্রভাব বিস্তার করছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আস্থার সংকট বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ‘সংকীর্ণ ও অসম’–এটি মূলত শহরমুখী, নির্দিষ্ট কিছু খাতনির্ভর এবং উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। আয় বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাববলয় ও প্রকল্পভিত্তিক অপচয় মিলিয়ে যে চিত্র তৈরি হয়েছে, সেটি ইঙ্গিত দেয়–বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ কেবল উন্নয়নের খোলসে মোড়া; ভেতরে জমে আছে গভীর বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার বাস্তবতা।
সামাজিক বিভাজন, সোশ্যাল মিডিয়া ও ঘৃণার মেকানিজম
গত কয়েক বছরে এই ডিজিটাল পরিবর্তন সমাজে নতুন ধরনের সংকট তৈরি করেছে। ঘৃণা, বিভাজন, ভুল তথ্য ও অনলাইন প্ররোচনা এখন সব বয়স, শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল বিশ্বের এই নেতিবাচক প্রবণতা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণার রাজনীতির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও একই গতিতে বাড়েনি ডিজিটাল সচেতনতা বা নিরাপত্তা সংস্কৃতি। ফলে ভার্চুয়াল ঘৃণা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের সহিংসতা ও মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষে ডিজিটাল সেফটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ৭৮ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী গত বছরে ‘ঘৃণাত্মক বা বিভাজনমূলক মন্তব্যের’ শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে অনলাইন সহিংসতা এখন একঘেয়ে ঘটনা নয়; বরং এটি দৈনন্দিন সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘৃণার প্রধান উৎস তিনটি। ধর্ম, রাজনীতি, জাতিগত পরিচয়। এসব সম্পর্কিত ঘৃণামূলক পোস্ট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে সাম্প্রতিককালে। এই তিনটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ছড়ানো ভুল তথ্য, গুজব, আবেগ উসকে দেওয়া বার্তা ও আক্রমণাত্মক প্রচার জনমতকে আরও বিভক্ত করছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ার মেকানিজমে এর অ্যালগরিদমগুলো মূলত ব্যবহারকারীর আবেগ, প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কিত পোস্টকে প্রাধান্য দেয়। এতে যা হয়–
১। উত্তেজনাপূর্ণ বা বিভাজনমূলক পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়।
২। ভুল তথ্য সংশোধনের আগে বহু মানুষ তা দেখে ফেলে।
৩। ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীরা ‘ইকো চেম্বার’-এ আটকে পড়ে।
৪। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা হারিয়ে যায়।
অ্যালগরিদমিক চাপ, ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে এক ধরনের অনলাইন-টু-অফলাইন ঘৃণা সংক্রমণ চক্র তৈরি হয়েছে। মেরুকরণের চরম পর্যায়ে ভিন্নমতকে দেশবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার কারণে জনমত এখন অভূতপূর্বভাবে মেরুকৃত।
এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। এর উদ্বেগজনক বাস্তবতায় ভিন্নমত প্রকাশ ও অনলাইন আক্রমণের ভয়ে অনেকেই মতপ্রকাশ থেকে বিরত থাকছেন। অনলাইন উত্তেজনা প্রায়ই বাস্তব জগতে শারীরিক সংঘাত বা হয়রানিতে রূপ নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বহুমত, বিতর্ক ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত করে দিচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার কারণে সামাজিক অস্থিরতা ও অনলাইন ঘৃণা-সংস্কৃতি বৃদ্ধির পাশাপাশি সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও চাপে রয়েছে। ২০২৫ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৮তম স্থানে নেমে গেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি শুধু গণমাধ্যমের সংকট নয়। এটি সমগ্র সমাজের তথ্যপ্রাপ্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যা সামাজিক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তায় ঝুঁকির বৃহত্তর প্রভাব পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভুল তথ্য, অনলাইন ঘৃণা এবং অফলাইন সহিংসতার মিলিত ফলাফল সমাজে যেসব দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করছে–
১। সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সন্দেহ ও ভয় বাড়ছে।
২। সামাজিক আস্থা কমছে।
৩। তরুণদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
৪। উগ্র মতাদর্শের বিস্তার সহজ হচ্ছে।
৫। সামাজিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হচ্ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার একটি পুরো জাতিকে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় আটকে দিচ্ছে, যেখানে আলোচনার বদলে সংঘাত, যুক্তির বদলে আবেগ, আর সম্প্রীতির বদলে বিভাজন প্রাধান্য পাচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি ঘৃণা, বিভাজন ও ভুল তথ্যের প্রবাহ এখন একটি বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ভার্চুয়াল জগৎ ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ায় সমাজের সংহতি, নিরাপত্তা ও জনমতের গঠন প্রক্রিয়া গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি, মিডিয়ার স্বাধীনতা সুরক্ষা, ঘৃণামূলক প্রচার প্রতিরোধে কার্যকর নীতি, সমাজে সহনশীলতা ও বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি। নইলে আগামী দিনে বিভাজন আরও গভীর হবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক

সরকারি পরিসংখ্যান এখনো বলছে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৩ শতাংশ (২০২৫ অর্থবছর)। কিন্তু এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাস্তব প্রবৃদ্ধি মানে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি–শীর্ষ ১০ শতাংশের আয় বৃদ্ধির হার ২০ গুণ বেশি, তুলনায় নিম্ন ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠী প্রায় স্থবির। অর্থনীতির বড় অংশ এখন রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে আবদ্ধ। উন্নয়নের খোলস, বৈষম্যের বাস্তবতায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে, যার ফলে অর্থনীতি ক্রমশ রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে–যেখানে উন্নয়নের ভাষা আসলে ক্ষমতার ভাষা।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখার দাবি করে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির গতি স্পষ্টভাবে মন্থর হয়েছে। এডিবির আউটলুক ২০২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরে ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম এবং দীর্ঘমেয়াদি গড় হার থেকেও নিচে। এই প্রবৃদ্ধিকে ‘সংকুচিত চাহিদা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপের মাঝেও টিকে থাকা এক ন্যূনতম বৃদ্ধি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা গুণগত অর্থে স্থিতিশীল কিংবা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
একদিকে সামগ্রিক জিডিপি বাড়ছে, অন্যদিকে আয়ের বণ্টন ক্রমশ অসম হয়ে উঠছে। ওয়ার্ল্ড ইক্যুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে যায় জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ, যেখানে নিচের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে যায় মাত্র ১৯ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ধনসম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র শীর্ষ ১ শতাংশ ধনকুবের। আর নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মিলে ধরে রাখতে পারে মোট সম্পদের ৫ শতাংশেরও কম। অর্থাৎ, ম্যাক্রো পর্যায়ে প্রবৃদ্ধি থাকলেও মাইক্রো পর্যায়ে তা সাধারণ মানুষের জীবনমানে সেভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।
অর্থনীতির এই বৈষম্যকেন্দ্রিক কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায়। সরকারি টাস্ক ফোর্স এবং স্বাধীন গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, একাধিক মেগা প্রকল্পে প্রাথমিক প্রাক্কলনের তুলনায় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে–দুর্নীতি, দুর্বল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা। দ্য ব্লিটজে প্রকাশিত এ সম্পর্কিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল আটটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়ই প্রাথমিক হিসাবের তুলনায় প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার বেশি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের বড় অংশকে অকার্যকর খাতে আটকে রাখছে।
এই বাস্তবতা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, স্টার্টআপ ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। যখন বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার বদলে রাজনৈতিক সান্নিধ্য ব্যবসায়িক সুবিধার মূল নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’ কার্যকর হয়–যেখানে উন্নয়নের ভাষা মূলত ক্ষমতার বলয়কে বৈধতা দেওয়ার উপায়ে পরিণত হয়। বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, নীতি-পরিবর্তন, ট্যাক্স প্রশাসন, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া–সবকিছুতেই প্রভাব বিস্তার করছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আস্থার সংকট বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ‘সংকীর্ণ ও অসম’–এটি মূলত শহরমুখী, নির্দিষ্ট কিছু খাতনির্ভর এবং উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। আয় বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাববলয় ও প্রকল্পভিত্তিক অপচয় মিলিয়ে যে চিত্র তৈরি হয়েছে, সেটি ইঙ্গিত দেয়–বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ কেবল উন্নয়নের খোলসে মোড়া; ভেতরে জমে আছে গভীর বৈষম্য, অনিশ্চয়তা ও আস্থাহীনতার বাস্তবতা।
সামাজিক বিভাজন, সোশ্যাল মিডিয়া ও ঘৃণার মেকানিজম
গত কয়েক বছরে এই ডিজিটাল পরিবর্তন সমাজে নতুন ধরনের সংকট তৈরি করেছে। ঘৃণা, বিভাজন, ভুল তথ্য ও অনলাইন প্ররোচনা এখন সব বয়স, শ্রেণি ও পেশার মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল বিশ্বের এই নেতিবাচক প্রবণতা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়েছে, যা সামাজিক সম্প্রীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়া থেকে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়া ঘৃণার রাজনীতির ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও একই গতিতে বাড়েনি ডিজিটাল সচেতনতা বা নিরাপত্তা সংস্কৃতি। ফলে ভার্চুয়াল ঘৃণা ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনের সহিংসতা ও মেরুকরণকে উসকে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষে ডিজিটাল সেফটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ৭৮ শতাংশ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী গত বছরে ‘ঘৃণাত্মক বা বিভাজনমূলক মন্তব্যের’ শিকার হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেখায় যে অনলাইন সহিংসতা এখন একঘেয়ে ঘটনা নয়; বরং এটি দৈনন্দিন সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘৃণার প্রধান উৎস তিনটি। ধর্ম, রাজনীতি, জাতিগত পরিচয়। এসব সম্পর্কিত ঘৃণামূলক পোস্ট বা বিভ্রান্তিকর তথ্য সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়েছে সাম্প্রতিককালে। এই তিনটি সংবেদনশীল ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে ছড়ানো ভুল তথ্য, গুজব, আবেগ উসকে দেওয়া বার্তা ও আক্রমণাত্মক প্রচার জনমতকে আরও বিভক্ত করছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সোশ্যাল মিডিয়ার মেকানিজমে এর অ্যালগরিদমগুলো মূলত ব্যবহারকারীর আবেগ, প্রতিক্রিয়া ও বিতর্কিত পোস্টকে প্রাধান্য দেয়। এতে যা হয়–
১। উত্তেজনাপূর্ণ বা বিভাজনমূলক পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়।
২। ভুল তথ্য সংশোধনের আগে বহু মানুষ তা দেখে ফেলে।
৩। ধীরে ধীরে ব্যবহারকারীরা ‘ইকো চেম্বার’-এ আটকে পড়ে।
৪। ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা হারিয়ে যায়।
অ্যালগরিদমিক চাপ, ব্যবহারকারীর মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে এক ধরনের অনলাইন-টু-অফলাইন ঘৃণা সংক্রমণ চক্র তৈরি হয়েছে। মেরুকরণের চরম পর্যায়ে ভিন্নমতকে দেশবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার কারণে জনমত এখন অভূতপূর্বভাবে মেরুকৃত।
এই বিভাজন শুধু রাজনৈতিক বিরোধের বিষয় নয়। এটি সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার, কর্মক্ষেত্র, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। এর উদ্বেগজনক বাস্তবতায় ভিন্নমত প্রকাশ ও অনলাইন আক্রমণের ভয়ে অনেকেই মতপ্রকাশ থেকে বিরত থাকছেন। অনলাইন উত্তেজনা প্রায়ই বাস্তব জগতে শারীরিক সংঘাত বা হয়রানিতে রূপ নিচ্ছে।
এই পরিস্থিতি বহুমত, বিতর্ক ও যুক্তিভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্র সংকুচিত করে দিচ্ছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার কারণে সামাজিক অস্থিরতা ও অনলাইন ঘৃণা-সংস্কৃতি বৃদ্ধির পাশাপাশি সাংবাদিকতার স্বাধীনতাও চাপে রয়েছে। ২০২৫ সালে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) প্রকাশিত সূচকে বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬৮তম স্থানে নেমে গেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি শুধু গণমাধ্যমের সংকট নয়। এটি সমগ্র সমাজের তথ্যপ্রাপ্তি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যা সামাজিক সম্প্রীতি ও জননিরাপত্তায় ঝুঁকির বৃহত্তর প্রভাব পড়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভুল তথ্য, অনলাইন ঘৃণা এবং অফলাইন সহিংসতার মিলিত ফলাফল সমাজে যেসব দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি তৈরি করছে–
১। সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সন্দেহ ও ভয় বাড়ছে।
২। সামাজিক আস্থা কমছে।
৩। তরুণদের আচরণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
৪। উগ্র মতাদর্শের বিস্তার সহজ হচ্ছে।
৫। সামাজিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হচ্ছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার একটি পুরো জাতিকে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় আটকে দিচ্ছে, যেখানে আলোচনার বদলে সংঘাত, যুক্তির বদলে আবেগ, আর সম্প্রীতির বদলে বিভাজন প্রাধান্য পাচ্ছে। বাংলাদেশে ডিজিটাল যোগাযোগের বিস্তার যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি ঘৃণা, বিভাজন ও ভুল তথ্যের প্রবাহ এখন একটি বড় সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব ভার্চুয়াল জগৎ ছাড়িয়ে বাস্তব জীবনে ছড়িয়ে পড়ায় সমাজের সংহতি, নিরাপত্তা ও জনমতের গঠন প্রক্রিয়া গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি, মিডিয়ার স্বাধীনতা সুরক্ষা, ঘৃণামূলক প্রচার প্রতিরোধে কার্যকর নীতি, সমাজে সহনশীলতা ও বহুমতের প্রতি শ্রদ্ধা বৃদ্ধি। নইলে আগামী দিনে বিভাজন আরও গভীর হবে এবং সামাজিক সম্প্রীতি দীর্ঘমেয়াদে হুমকির মুখে পড়বে।
লেখক: মাল্টিডিসিপ্লিনারি আর্টিস্ট, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠক

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট