রুবিয়াত সাইমুম ও তৌফিক ই ফারুক
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন এবং বিপ্লব-পরবর্তী সংস্কার প্যাকেজ ‘জুলাই চার্টার’-এর ওপর একটি সাংবিধানিক গণভোট। দেশটির গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এই যুগপৎ আয়োজন একটি চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের ‘মনসুন অভ্যুত্থান’ বা জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। ওই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নজিরবিহীনভাবে দলীয়করণ করা হয় এবং সেগুলো কার্যত নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন উত্তরাধিকারসূত্রে এই ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করেছে এবং বর্তমানে মৌলিক সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে।
এই নির্বাচনের বৈধতা এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে ইউনূস প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা, ব্যাপক অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও তারা কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই নির্বাচনের ফলাফল আগাম অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। এই নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেবেন, যাদের গড় বয়স মাত্র ২৬ বছর। এর অর্থ হলো, ভোটারদের একটি বিশাল অংশ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিক নির্বাচনী কারচুপির কারণে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘদিনের দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বরং অনভিজ্ঞ ও তরুণ ভোটারদের বৃহৎ অংশকে কেন্দ্রে আনার সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করবে।

২০২৪ সালের নৃশংস দমন-পীড়নে ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বর্তমানে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে; শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নির্বাসিত অথবা কারাবন্দি। জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামলেও দেশের কিছু অঞ্চলে দলটির এখনো উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ভোটাররা তাদের পছন্দের দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না, যা বিশেষ করে ফরিদপুরের মতো আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোতে নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করলেও, জুলাই বিপ্লবের মূল কুশীলবদের মধ্যে দলটির অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ বিদ্যমান।
এই প্রেক্ষাপটে এক পুনর্গঠিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখনো দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী শক্তি হিসেবে সুসংগঠিত রয়েছে। তবে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সচেষ্ট। তারা তরুণ নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে, যা মূলত বিএনপির একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল। এই জোট এনসিপিকে অন্তত ৩০টি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এনসিপির পূর্বসূরি সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ছিল হাসিনা-বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি এবং ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এনসিপি গঠনের পর দলটি দ্রুত রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে হিমশিম খেতে শুরু করে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণে বিএনপি ও জামায়াতের মতো সুসংগঠিত এবং গভীর শিকড়সম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নিজেদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে টানা পরাজয়ের পর এনসিপি সম্ভবত উপলব্ধি করেছে যে, বাংলাদেশের জোট রাজনীতির বাইরে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। দেশের বর্তমান দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোতে এর আগে ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের সব প্রচেষ্টাই ব্যালট বাক্সে ব্যর্থ হয়েছে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জামায়াতের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটি নিজেদের সাবেক মিত্র বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। জামায়াত এখন বিএনপির ‘ভাবমূর্তির সংকট’-কে কাজে লাগাতে সচেষ্ট। তারা গণমাধ্যমে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগগুলোকে সামনে আনছে। এর বিপরীতে বিএনপি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ইতিহাস তুলে ধরে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে।
যদিও নির্বাচনী লড়াইয়ে বিএনপি এখনো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবে অতীতের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারির কারণে দেশ পরিচালনায় তাদের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়ে গেছে। বিভিন্ন জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, জামায়াত দ্রুতই দুই দলের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বড় জয় অর্জন করেছে, যা দলটির জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাচনী হাওয়া তৈরি করেছে। জামায়াত ও এনসিপির এই জোটটি অত্যন্ত কৌশলগত। এর লক্ষ্য আধুনিক ‘জেন-জি’ ভোটারদের আকৃষ্ট করা এবং কেবল ইসলামপন্থী দল হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা। যদি জনমত জরিপগুলো সঠিক হয়, তবে এই সম্মিলিত শক্তি বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই সমীকরণের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে এনসিপির ভোটাররা এই জোটকে কতটা গ্রহণ করে তার ওপর। কারণ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোটের প্রতিবাদে দলটির অনেক প্রগতিশীল নেতা ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন, যা অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আরও তীব্র করেছে।
একটি বিষয় নিশ্চিত, যেসব ইসলামপন্থী দল একসময় রাজনীতিতে কেবল সহযোগী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, তারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী রাজনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রাখা বিএনপি এখন এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি, যারা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে আরও কট্টর অবস্থান গ্রহণ করছে। মূলত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন দেশের রাজনীতিতে এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
ডানপন্থী ভোটব্যাংকে জামায়াতের ভাগ বসানোর আশঙ্কায় বিএনপি এখন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সেক্যুলার সুশীল সমাজ এবং সুফি ঘরানার মুসলিমদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে—যারা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। এই নতুন ভোটার মেরুকরণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যাবে আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
লেখাটি ইস্ট এশিয়া ফোরাম থেকে অনূদিত
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদীয় নির্বাচন এবং বিপ্লব-পরবর্তী সংস্কার প্যাকেজ ‘জুলাই চার্টার’-এর ওপর একটি সাংবিধানিক গণভোট। দেশটির গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এই যুগপৎ আয়োজন একটি চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০২৪ সালের ‘মনসুন অভ্যুত্থান’ বা জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার টানা ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। ওই সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নজিরবিহীনভাবে দলীয়করণ করা হয় এবং সেগুলো কার্যত নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন উত্তরাধিকারসূত্রে এই ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো লাভ করেছে এবং বর্তমানে মৌলিক সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিয়োজিত রয়েছে।
এই নির্বাচনের বৈধতা এখন অনেকাংশেই নির্ভর করছে ইউনূস প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা, ব্যাপক অপপ্রচার এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেও তারা কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে পারে সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
এই নির্বাচনের ফলাফল আগাম অনুমান করা অত্যন্ত কঠিন। এই নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ নিবন্ধিত ভোটার অংশ নেবেন, যাদের গড় বয়স মাত্র ২৬ বছর। এর অর্থ হলো, ভোটারদের একটি বিশাল অংশ এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনা সরকারের ধারাবাহিক নির্বাচনী কারচুপির কারণে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফল দীর্ঘদিনের দলীয় আনুগত্যের চেয়ে বরং অনভিজ্ঞ ও তরুণ ভোটারদের বৃহৎ অংশকে কেন্দ্রে আনার সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করবে।

২০২৪ সালের নৃশংস দমন-পীড়নে ভূমিকার কারণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বর্তমানে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দলটির সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে; শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নির্বাসিত অথবা কারাবন্দি। জনপ্রিয়তায় বড় ধরনের ধস নামলেও দেশের কিছু অঞ্চলে দলটির এখনো উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ভোটাররা তাদের পছন্দের দলের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না, যা বিশেষ করে ফরিদপুরের মতো আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোতে নির্বাচনী ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করলেও, জুলাই বিপ্লবের মূল কুশীলবদের মধ্যে দলটির অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ বিদ্যমান।
এই প্রেক্ষাপটে এক পুনর্গঠিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখনো দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী শক্তি হিসেবে সুসংগঠিত রয়েছে। তবে দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে সচেষ্ট। তারা তরুণ নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে, যা মূলত বিএনপির একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল। এই জোট এনসিপিকে অন্তত ৩০টি আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
এনসিপির পূর্বসূরি সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ছিল হাসিনা-বিরোধী অভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি এবং ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এনসিপি গঠনের পর দলটি দ্রুত রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখতে হিমশিম খেতে শুরু করে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যস্থান পূরণে বিএনপি ও জামায়াতের মতো সুসংগঠিত এবং গভীর শিকড়সম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
নিজেদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে টানা পরাজয়ের পর এনসিপি সম্ভবত উপলব্ধি করেছে যে, বাংলাদেশের জোট রাজনীতির বাইরে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। দেশের বর্তমান দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামোতে এর আগে ‘তৃতীয় শক্তি’ গঠনের সব প্রচেষ্টাই ব্যালট বাক্সে ব্যর্থ হয়েছে।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচন জামায়াতের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে দলটি নিজেদের সাবেক মিত্র বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। জামায়াত এখন বিএনপির ‘ভাবমূর্তির সংকট’-কে কাজে লাগাতে সচেষ্ট। তারা গণমাধ্যমে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগগুলোকে সামনে আনছে। এর বিপরীতে বিএনপি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহযোগিতার ইতিহাস তুলে ধরে পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে।
যদিও নির্বাচনী লড়াইয়ে বিএনপি এখনো তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবে অতীতের দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারির কারণে দেশ পরিচালনায় তাদের সক্ষমতা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়ে গেছে। বিভিন্ন জরিপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, জামায়াত দ্রুতই দুই দলের মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বড় জয় অর্জন করেছে, যা দলটির জন্য একটি শক্তিশালী নির্বাচনী হাওয়া তৈরি করেছে। জামায়াত ও এনসিপির এই জোটটি অত্যন্ত কৌশলগত। এর লক্ষ্য আধুনিক ‘জেন-জি’ ভোটারদের আকৃষ্ট করা এবং কেবল ইসলামপন্থী দল হিসেবে নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করা। যদি জনমত জরিপগুলো সঠিক হয়, তবে এই সম্মিলিত শক্তি বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। তবে এই সমীকরণের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে এনসিপির ভোটাররা এই জোটকে কতটা গ্রহণ করে তার ওপর। কারণ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে জোটের প্রতিবাদে দলটির অনেক প্রগতিশীল নেতা ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন, যা অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে আরও তীব্র করেছে।
একটি বিষয় নিশ্চিত, যেসব ইসলামপন্থী দল একসময় রাজনীতিতে কেবল সহযোগী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো, তারা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থী রাজনীতিতে একক আধিপত্য বজায় রাখা বিএনপি এখন এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি, যারা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিতে আরও কট্টর অবস্থান গ্রহণ করছে। মূলত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতন দেশের রাজনীতিতে এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
ডানপন্থী ভোটব্যাংকে জামায়াতের ভাগ বসানোর আশঙ্কায় বিএনপি এখন ধর্মীয় সংখ্যালঘু, সেক্যুলার সুশীল সমাজ এবং সুফি ঘরানার মুসলিমদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে—যারা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল। এই নতুন ভোটার মেরুকরণ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতি একটি মৌলিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখা যাবে আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
লেখাটি ইস্ট এশিয়া ফোরাম থেকে অনূদিত

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট