৪. মিশরের গোল করা নিয়ে উল্লাস, ব্রাজিল সমর্থককে পেটালেন আর্জেন্টিনার ভক্ত
৫. কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ ঘিরে সংঘর্ষ, যুবক নিহত
৬. বিশ্বকাপ উন্মাদনায় প্রাণ গেছে ১০ জনের
এমন শিরোনাম আরও মিলবে। শুধু গুগলে একবার সার্চ করলেই হবে।
আচ্ছা, কী মনে হচ্ছে? দেশের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কি বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় আসলেই উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে? নইলে কেন একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে মারামারিতে জড়াচ্ছে বাংলাদেশের সমর্থকেরা? সেই মারামারি আবার এতটাই সিরিয়াস যে, মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে!
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থক বাংলাদেশে অনেক বেশি। এটা বোঝা যায় আসলে ৪ বছর পরপর, যখন বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়। হুট করেই দেশের বিভিন্ন স্থান ছেয়ে যায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকায়। তার সাথে সাথে টুপি, টিশার্ট ইত্যাদি নানা কিছুতে চলে আসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। কোনোটা হয় হলুদ-সবুজ, কোনোটা আকাশী-সাদা। এবার অবশ্য শাড়ি ও লুঙ্গিতেও দেখা যাচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকা। বুঝুন তবে, সমর্থকেরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে কতটা ভালোবাসে!
সমস্যা হলো, এই সমর্থন শুধু সমর্থনমূলক ভালোবাসাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চলতে থাকে বিতর্ক, কে বেশি ভালো তা নিয়ে। এরপর বিতর্ক রূপ নেয় ঝগড়ায়। এসব বিতর্ক ও ঝগড়া, ট্রোলিং বা মিম বানিয়ে ফাজলামো–এগুলো যেমন অনলাইনে হয়, তেমনি হয় অফলাইনেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও শরীরী উপস্থিতি থাকে না। ফলে গালিগালাজ হলেও তা মনেই আঘাত করে, শরীরে না।
কিন্তু অফলাইনের বিতর্ক যখন ঝগড়ায় রূপ নেয়, তখন কখনো কখনো সেসব হাতাহাতি বা মারামারিতেও পরিণত হয়। যেমন–
এই জুন মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যকার ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এতে উভয়পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়। কাশীপুর গ্রামে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সেখানে ২-০ গোলে ব্রাজিল হেরে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। পরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় উভয়পক্ষ। এই সংঘর্ষ চলেছিল ঘণ্টাব্যাপী। দুই পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই অবশ্য নানা ধরনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছিল। ব্রাজিল জিতলে দেখা যাচ্ছিল যে, ওই দলের সমর্থকেরা আর্জেন্টিনার কোনো সমর্থককে ধরে জোর করে পুকুরে ফেলে দিচ্ছে। আবার আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিলের কোনো সমর্থককে চেপে ধরে জোর করে গেলানো হচ্ছিল সেভেন-আপ!
অর্থাৎ, নির্দোষ তর্কাতর্কি আসলে দোষমুক্ত থাকছে না। বাংলাদেশের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কেন জানি ‘হাত থাকতে মুখে কেন’ নামের প্রচলিত বাক্যকে একেবারে হৃদয়ে ধারণ করতে শুরু করেছে। তর্কের খাতিরে কিছুই মেনে নিতে তারা কেন জানি রাজি হচ্ছে না আর। যেমন: এই তো ৮ জুলাই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক যুবক গুরুতর আহত হয়। আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ওদিকে কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার জেরে ৩৫ বছ বয়সী এক যুবক মরেই গেছেন। ঘটনাক্রম একই, কথা কাটাকাটি থেকে মারামারি। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করার পর বাংলাদেশের কুমিল্লায় এক চায়ের দোকানে সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই উত্তেজনায় দুই আর্জেন্টিনার সমর্থক বিপক্ষের একজনের মাথায় আঘাত করেন, আর তা থেকেই মৃত্যু। দাবি করা হচ্ছে, নিহত ব্যক্তি ছিলেন ব্রাজিল সমর্থক।
একই ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এক পাড়ার দোকানে এক ব্রাজিল সমর্থককে পেটানো হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। ঘটনা এরকম–পাড়ার দোকানে একসঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচটি উপভোগ করছিলেন কয়েকজন। খেলা শুরুর পর মিশরের খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার জালে গোল করতেই উল্লাস করেন ব্রাজিলের এক সমর্থক। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে কিছুটা স্থানীয়ভাবে। কখনো চায়ের দোকানে, কখনো পাড়ার কোথাও। তাই বলে শিক্ষা যে এ ধরনের মারামারি আটকাতে পারে, তা নয়। উদাহরণ দেওয়া যাক। টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘাতের সময় স্নাতক পড়ুয়ারাও ভাবার চেষ্টা করেননি যে, একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে এমন মারামারি কতটা অযৌক্তিক হতে পারে!
অবশ্য, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে এমন সহিংসতা বা মারামারি নতুন নয়। এর আগেও এমনটা দেখা গেছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় রাজশাহী, নীলফামারি বা ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে ছোটোখাটো সহিংসতার খবর পাওয়া গিয়েছিল। ওই সময় খুলনায় এক দম্পতিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর ঘটনাও ঘটেছিল। এর আগের বিভিন্ন বিশ্বকাপেও এমন টুকরো টুকরো খবর পাওয়া গিয়েছিল বটে। তবে এবার এমন ঘটনার ঘনঘটা একটু বেশিই।
সেই বেশিটা এতটাই যে জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে কথা হয়েছে। গত ৯ জুলাই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সংসদে বলেছেন, বিশ্বকাপ নিয়ে সহিংসতায় দেশজুড়ে এখনও পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে আলোচনাকালে প্রতিমন্ত্রী বিশ্বকাপ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ তথ্য জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা দেখেছি। আজ আমার কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।” তিনি আরও বলেছেন, “বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা শান্তিপূর্ণ ও আনন্দদায়ক হওয়া উচিত।”
বাকি দুনিয়ায় কী হয়?
ক্রমঘনায়মান বিশ্বায়ন ও ফেসবুক-ইনস্টা-ইউটিউবের রাজত্বের এই দুনিয়ায় চাইলেও নিজেদের তফাতে রাখার বা থাকার সুযোগ নেই। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যে শুধু বাংলাদেশেই মারামারি করছে, তা নয়। আসলে ফুটবলের সামগ্রিক ইতিহাসেই এমন সমর্থকদের মারামারিতে বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা আছে ঢের।
এই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ারের একটি ম্যাচেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে হওয়া সেই ম্যাচে ব্রাজিল হেরেছিল আর্জেন্টিনার কাছে। তবে হারার আগেই সমর্থকেরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছিল। সেই সহিংসতা এতটাই ছিল যে, ম্যাচ শুরু হতেই প্রায় ৩০ মিনিট দেরি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্যাপক লাঠিচার্জ করা হয়েছিল সেদিন। পেটানো হয়েছিল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজও মাঠ থেকে গ্যালারিতে চলে গিয়েছিলেন পুলিশের কাছ থেকে লাঠি কেড়ে নিতে!
পরে একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার পুরো দল মাঠ ছেড়ে ড্রেসিং রুমে চলে গিয়েছিল। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা মাঠে থেকে পরিস্থিতি শান্ত করায় অংশ নেয়। শেষে ম্যাচ হয় বটে, তবে কলঙ্ক যা হওয়ার ততক্ষণে তা হয়েই গেছে।
সারা দুনিয়ায় ফুটবল ম্যাচ ঘিরে এমন সহিংসতা আরও অনেক ঘটেছে। এই যেমন, ২০২৪ সালে গিনি’তে এক ফুটবল ম্যাচে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছিল। ২০২২ সালে এমনই আরেক সহিংসতায় ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিল ১৩৫ মানুষের প্রাণ। অবস্থা সেবার এতটাই খারাপ ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফুটবল মাঠে ঢুকে মেরেছিল টিয়ার গ্যাস, চলেছিল লাঠিচার্জ। এতে পদদলনের ঘটনার সৃষ্টি হয় এবং নিহতের সংখ্যাও বেড়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
২০১২ সালে মিশরে এক ফুটবল ম্যাচ ঘিরে স্টেডিয়ামের ভেতরে দুই পক্ষের সমর্থকেরা অস্ত্র নিয়ে একে-অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এতে প্রায় ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আরও শতাধিক আহত হয়েছিল।
চাইলে আরও পেছনে যাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালে বেলজিয়ামে ইউভেন্তাস ও লিভারপুল সমর্থকদের মধ্যে ধুন্ধুমার মারামারি হয়েছিল। ইউরোপীয় কাপ ফাইনালের আগে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। সেবার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। আর মারা গিয়েছিল ৩৯ জন।
১৯৬৪ সালে পেরুতে আর্জেন্টিনা ও পেরুর মধ্যকার ম্যাচে একটি বিতর্কিত গোল নিয়ে সমর্থকেরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল। লিমা’তে হওয়া সেই ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়।
আর ১৯৬৯ সালে বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনায় দুই দেশের মধ্যেই যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। ফুটবল ম্যাচের উত্তেজনায় ঘি ঢেলেছিল রাজনীতিও। ফলে সমর্থকদের মধ্যে থাকা সহিংসতা থেকে একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধেই জড়িয়ে পড়েছিল এল সালভাদর ও হন্ডুরাস। সকার ওয়ার বা ফুটবল ওয়ার হিসেবে এই ঘটনা বিখ্যাত হয়ে আছে। ওই সংঘাতে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
সমাজ গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল খেলাটারই প্রকৃতিগতভাবে সহিংসতা সৃষ্টির সক্ষমতা আছে। তাই এই প্রশ্নটি বারবারই ওঠে যে, ফুটবলে এবং ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে এমন কি বিষয় আছে, যাতে ফুটবল ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত হয়? কেন ঘন ঘন সহিংসতায় জড়ায় সমর্থকেরা?
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয় ‘Why Does Fan Violence Persist in Football? Football Rivalries Ideology, the Reproduction of Football-Related Violence and its Everyday Dimensions’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। পোল্যান্ডের গবেষক ম্যাথেউস গ্রুধেচকি এবং আয়ারল্যান্ডের গবেষক জোল রুকউড এটি লিখেছিলেন।
টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস অনলাইন এ গবেষণাটি প্রকাশ করেছিল। এই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ফুটবল ম্যাচের দুই দলের মধ্যকার শত্রুতা ধীরে ধীরে সমাজেও দুটি ভাগের সৃষ্টি করে। মাঠের শত্রুতা ধীরে ধীরে সমাজের দুটি ভাগের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। এক্ষেত্রে মাঠে যে আদর্শের ভিত্তিতে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি করা হয়, সেটিই প্রতিফলিত হয় সমাজে। আবার ফুটবল সংশ্লিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে সংঘটিত সহিংসতাকে এক ধরনের বৈধতার দৃষ্টিতে বা লঘুভাবে দেখার অভ্যাসও চালু আছে। ফলে সহিংসতার এক ধরনের পুনরুৎপাদন হয় সমাজের মানুষের মধ্যে। এ ধরনের গুন্ডামি বা সহিংসতা ঠেকানোর প্রক্রিয়ার ব্যর্থতাও এক্ষেত্রে এর ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী। তাই মাঠের শত্রুতা সমাজেও বিভক্তি সৃষ্টি করে, সহিংসতাকে উসকে দেয়। তাছাড়া মাঠে যেহেতু খেলোয়াড় ও অফিশিয়ালদের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা বা এর অভ্যাস করা এখন নিষিদ্ধ, তাই এটি সহজেই চলে যায় মাঠের বাইরে। আবার মাঠে মারামারি করলেও নিষিদ্ধ হওয়ার ঝামেলা আছে। তাই মাঠের সহিংসতা ক্রমে মাঠের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি ও তার পুণরুৎপাদন প্রক্রিয়ার সবটাই দায়ী।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে সেজ জার্নালসে প্রকাশিত হয়েছে ‘Everyday Football Fan Violence’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। এতে বলা হয়েছে, ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা নানা ধরনের হয়। এখনও পর্যন্ত এটিকে একটি নির্দিষ্ট ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটে বলে প্রতীয়মান হলেও আসলে এমন সহিংসতার শিকড় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। ফুটবল সমর্থকদের মধ্যকার সহিংসতার ঘটনার সাথে তাদের প্রতিদিনের জীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কেবল নিত্যদিনের জীবনেই ৯ ধরনের সহিংসতায় ফুটবল সমর্থকেরা প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। এসব সহিংসতার সবগুলো শরীরী আক্রমণ হয় না। বরং মৌখিক ও আচরণগত নানা সহিংসতাও এখন হচ্ছে বলে দাবি গবেষকদের।
জার্মানি ও ব্রাজিল–এই দুই দেশই ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আছে ভালোভাবেই। এই দুই দেশেও সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা সৃষ্টির পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো নির্দিষ্ট ফুটবল দলের সমর্থকেরা প্রায়শই সেই দলকে সমর্থন করাকেই নিজেদের সামাজিক পরিচয়ের জায়গা দিয়ে দেয়। ফলে ওই দলের জন্য তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘ওয়ারিয়র সাইকোলজি’ তৈরি হয়। ফলে ওই ফুটবল দল ম্যাচে হারলে সেসব সমর্থক খুবই ব্যক্তিগতভাবে সেটি নিয়ে নেন, যা একসময় সহিংসতায় রূপ নেয়।
গবেষকেরা আরও বলছেন, উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয় মূলত তরুণ, বেকার ও কম শিক্ষিত মানুষদের দিয়ে। এরা সহিংসতায় জড়ায় বেশি এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। এর বাইরে মাদকের ব্যবহারও সহিংসতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন গবেষকেরা।
সমর্থকদের সহিংস করে তুলতে সংবাদমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। ২০০২ সালে সায়েন্স ডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছিল ‘Fan violence: Social problem or moral panic?’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। এতে গবেষক রাসেল ই ওয়ার্ড জুনিয়র লিখেছেন, মোরাল প্যানিক নিয়ন্ত্রণের একটি উপকরণ মিডিয়া। এর বাইরে অন্যান্য মাধ্যমও থাকে নিয়ন্ত্রক হিসেবে। এগুলো জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে ব্যাপকভাবে। অনেক সময় এসব থেকে মোরাল প্যানিক ছড়িয়ে পড়ে সমর্থকদের মধ্যে, ‘কিছু একটা করা’র তাড়না অনিচ্ছাকৃতভাবেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা। আর সেই উত্তেজনাই দৈত্যের মতো সহিংসতার রূপে স্থান নিতে পারে ফুটবল সমর্থকদের হৃদয়ে।
অর্থাৎ, কারণ আসলে একটি নয়, বরং অজস্র ও বহুমাত্রিক। এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্বজুড়েও অপ্রতুল বটে। অথচ, মানুষ মরছে ঠিকই।
বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা কেন সহিংস ও টক্সিক হয়ে উঠছে?
এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার সাম্প্রতিক ম্যাচ-সংক্রান্ত একটি দেশীয় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক।
সেদিন একটু রাত করেই বাসায় ফেরা হচ্ছিল। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে আর্জেন্টিনার খেলা। রাস্তা কিছুটা শুনশানও ছিল। রিকশার চালক বেশ কিছুটা এগিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “মামা, খেলার খবর জানেন নাকি কিছু? সবাই কেমন চুপচাপ... খেলা কি জিইত্যা গেল নাকি মাঠে নাইমাই?”
জবাবে বলতেই হলো যে, খেলার খবর নেওয়ার অবসর হয়নি। জানাশোনায় ওনারাও যে অবস্থা, আমারও তাই।
তবে রিকশাচালক ভাইটির তর সইল না। এক চায়ের দোকানে জটলা দেখে সেখানেই তিনি ব্রেক ধরলেন। স্কোরবোর্ড দেখা গেল তার বদৌলতেই। দেখেই ওনার উল্লসিত চিৎকার, “ওরে মা রে, মিশর গোল দিয়া ফেলছে, মামা... কী কয়! আর্জেন্টিনা তো গোল খাইয়া বইসা আছে...”
এরপর তাড়া খেয়ে তিনি রিকশা আবার চালাতে শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু কথার ফুলঝুরি থামছে না। তার বক্তব্যে, “মামা, আপনারে নামায় দিয়াই যামু গেরেজে। ধরমু আর্জেন্টিনা গো... গোল খাইসে আগে, খাইবো ধরা... হা...হা, আইজক্যা খ্যাপামু ওগো...।”
এই ‘ওগো’ কারা জানতে চাইলে চালকের স্বীকারোক্তি হলো, ওনারা তার বন্ধু, সহকর্মী সতীর্থ। ব্রাজিলের সমর্থক বলে ব্রাজিল বাদ পড়ার পর এসব সহকর্মী কাম আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা তাকে নাকি ‘কিছু বলতে’ আর বাকি রাখে নাই। এবার, তাই তার পালা!
অন্যদিকে মিশরের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য জয়ের পর একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে এক আর্জেন্টিনা সমর্থকের বক্তব্য শোনার সুযোগ হলো। তিনি অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলছিলেন, “আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে কোনো ব্রাজিল সমর্থককে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।” তার এমন বক্তব্যের কারণ হলো, মিশর আগে দুই গোল দেওয়ার পর তার আশপাশের ব্রাজিল সমর্থকেরা নাকি উল্লাস প্রকাশ করছিলেন! আর এ কারণে তিনি ব্রাজিল সমর্থক মানুষটির ওপর থেকেই বিশ্বাস তুলে নিতে চাইছেন।
ওদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থককে চ্যাংদোলা করে পুকুরে ফেলে ব্রাজিলের সমর্থকদের বিজয় উদযাপন করতেও আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। অর্থাৎ, দুই পক্ষেই এক ধরনের ‘ওয়ারিয়র সাইকোলজি’র উপস্থিতি প্রবলভাবে টের পাওয়া যায়।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
তা, এটি কেন তৈরি হচ্ছে? এবারই বা এত বেশি অনুভূত হচ্ছে কেন?
আসলে কোনো সামাজিক আচরণগত পরিবর্তনই হুট করে তৈরি হয় না। এর পেছনে নানামাত্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণ থাকে। আমাদের এই দেশটা সংকট ছাড়া খুব বেশি সময় থাকেনি। বেশির ভাগ সময়ই বহুমাত্রিক সংকটে ভুগে চলেছে বাংলাদেশের মানুষ। কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষ সংকট তাড়া করছে মানুষকে। ফলে উৎসবের উপলক্ষ বেশ কম। আর যখনই তা কিছুটা হলেও আসছে, তখনই কি মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে?
হতে পারে। এটিও হতে পারে যে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সার্বিক সহনশীলতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। রাস্তায় নামলে পথচলতি মানুষের অসহিষ্ণুতার প্রমাণ মেলে তুমুল গালিগালাজে। বাপ, মা তুলে গালি দিতে এখন আর আমাদের তুমুল শত্রুতার প্রয়োজন হয় না। এক রিকশার চাকা কোনো বাইকের গায়ে লাগলেই সেসব গালি শুনে ফেলা যায়। এমনকি আরও তুচ্ছ কারণেও শোনা যায়। তবে কি দীর্ঘ সময়ের দুর্বল শাসনের প্রভাবে হতাশাগ্রস্ত মানুষের অসহিষ্ণুতার মাত্রা এতটাই হয়ে যাচ্ছে যে, মেসি বা নেইমারের পেনাল্টি মিসের উপলক্ষে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়?
আমাদের এই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এমন কোনো চূড়ান্ত কল্যাণকর শাসনকাল পাব না, যা দিয়ে আইনের প্রকৃত শাসনের প্রতি মানুষের যে পিপাসা, তা পূরণ করার মডেল পাওয়া যাবে। সব শাসক ও শাসনকালই নানা ত্রুটি, বিচ্যুতিতে ভরপুর। ফলে এই দেশের মানুষ আসলে প্রকৃত আইনের শাসনই কখনো দেখেনি। দেখেনি একেবারেই সৎ উপায়ে জীবনে উন্নতি করার আদর্শ ব্যবস্থা। উল্টো আমরা এমন এক সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি দেখেছি, যা প্রমাণ করে এই বঙ্গে জোর যার, মুলুক তার। তাহলে কি গায়ের জোর (যা ক্ষমতারও অন্য নাম) এবং তার প্রতিফলন ঘটানোর ইচ্ছাই ফুটবল সমর্থকদের অন্তত খেলার ক্ষেত্রে যেভাবেই হোক জয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে? এমনকি মানুষ মেরে বা ট্রোলের তোড়ে কাউকে আত্মঘাতী বানিয়ে হলেও?
হতে পারে। ‘হতে পারে’ এতবার বলতে হচ্ছে কারণ, আমাদের সমাজের মানুষের এমন পরিবর্তন নিয়ে কোনো বিস্তারিত গবেষণা সেভাবে কখনো হয়নি। তাই আমাদের কারণ খুঁজতে হয় অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে। যদিও তাতে সমস্যার সমাধান খুব একটা হয় না। বরং সমস্যা তলে তলে বাড়তে থাকে, হয়তো একসময় প্রবল দানো হবে বলে!
আমরা বরং সেই দৈত্যদানোর অপেক্ষাতেই থাকি। কে না জানে, শিরে সংক্রান্তিই আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একমাত্র নিশ্চিত স্বস্তি!
৪. মিশরের গোল করা নিয়ে উল্লাস, ব্রাজিল সমর্থককে পেটালেন আর্জেন্টিনার ভক্ত
৫. কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ ঘিরে সংঘর্ষ, যুবক নিহত
৬. বিশ্বকাপ উন্মাদনায় প্রাণ গেছে ১০ জনের
এমন শিরোনাম আরও মিলবে। শুধু গুগলে একবার সার্চ করলেই হবে।
আচ্ছা, কী মনে হচ্ছে? দেশের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কি বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় আসলেই উন্মাদ হয়ে যাচ্ছে? নইলে কেন একটা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে মারামারিতে জড়াচ্ছে বাংলাদেশের সমর্থকেরা? সেই মারামারি আবার এতটাই সিরিয়াস যে, মানুষের প্রাণ চলে যাচ্ছে!
ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থক বাংলাদেশে অনেক বেশি। এটা বোঝা যায় আসলে ৪ বছর পরপর, যখন বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়। হুট করেই দেশের বিভিন্ন স্থান ছেয়ে যায় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকায়। তার সাথে সাথে টুপি, টিশার্ট ইত্যাদি নানা কিছুতে চলে আসে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকা। কোনোটা হয় হলুদ-সবুজ, কোনোটা আকাশী-সাদা। এবার অবশ্য শাড়ি ও লুঙ্গিতেও দেখা যাচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকা। বুঝুন তবে, সমর্থকেরা ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে কতটা ভালোবাসে!
সমস্যা হলো, এই সমর্থন শুধু সমর্থনমূলক ভালোবাসাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। চলতে থাকে বিতর্ক, কে বেশি ভালো তা নিয়ে। এরপর বিতর্ক রূপ নেয় ঝগড়ায়। এসব বিতর্ক ও ঝগড়া, ট্রোলিং বা মিম বানিয়ে ফাজলামো–এগুলো যেমন অনলাইনে হয়, তেমনি হয় অফলাইনেও। সোশ্যাল মিডিয়ায় কারও শরীরী উপস্থিতি থাকে না। ফলে গালিগালাজ হলেও তা মনেই আঘাত করে, শরীরে না।
কিন্তু অফলাইনের বিতর্ক যখন ঝগড়ায় রূপ নেয়, তখন কখনো কখনো সেসব হাতাহাতি বা মারামারিতেও পরিণত হয়। যেমন–
এই জুন মাসের শুরুতে হবিগঞ্জে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যকার ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এতে উভয়পক্ষের অন্তত অর্ধশতাধিক লোক আহত হয়। কাশীপুর গ্রামে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। সেখানে ২-০ গোলে ব্রাজিল হেরে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। পরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় উভয়পক্ষ। এই সংঘর্ষ চলেছিল ঘণ্টাব্যাপী। দুই পক্ষের অন্তত ৫০ জন আহত হয়।
এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই অবশ্য নানা ধরনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ছিল। ব্রাজিল জিতলে দেখা যাচ্ছিল যে, ওই দলের সমর্থকেরা আর্জেন্টিনার কোনো সমর্থককে ধরে জোর করে পুকুরে ফেলে দিচ্ছে। আবার আর্জেন্টিনা জিতলে ব্রাজিলের কোনো সমর্থককে চেপে ধরে জোর করে গেলানো হচ্ছিল সেভেন-আপ!
অর্থাৎ, নির্দোষ তর্কাতর্কি আসলে দোষমুক্ত থাকছে না। বাংলাদেশের ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা কেন জানি ‘হাত থাকতে মুখে কেন’ নামের প্রচলিত বাক্যকে একেবারে হৃদয়ে ধারণ করতে শুরু করেছে। তর্কের খাতিরে কিছুই মেনে নিতে তারা কেন জানি রাজি হচ্ছে না আর। যেমন: এই তো ৮ জুলাই ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক যুবক গুরুতর আহত হয়। আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর প্রথমে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
ওদিকে কুমিল্লায় আর্জেন্টিনা-মিশর ফুটবল ম্যাচ দেখা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডার জেরে ৩৫ বছ বয়সী এক যুবক মরেই গেছেন। ঘটনাক্রম একই, কথা কাটাকাটি থেকে মারামারি। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করার পর বাংলাদেশের কুমিল্লায় এক চায়ের দোকানে সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই উত্তেজনায় দুই আর্জেন্টিনার সমর্থক বিপক্ষের একজনের মাথায় আঘাত করেন, আর তা থেকেই মৃত্যু। দাবি করা হচ্ছে, নিহত ব্যক্তি ছিলেন ব্রাজিল সমর্থক।
একই ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের এক পাড়ার দোকানে এক ব্রাজিল সমর্থককে পেটানো হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। ঘটনা এরকম–পাড়ার দোকানে একসঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচটি উপভোগ করছিলেন কয়েকজন। খেলা শুরুর পর মিশরের খেলোয়াড় আর্জেন্টিনার জালে গোল করতেই উল্লাস করেন ব্রাজিলের এক সমর্থক। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে কিছুটা স্থানীয়ভাবে। কখনো চায়ের দোকানে, কখনো পাড়ার কোথাও। তাই বলে শিক্ষা যে এ ধরনের মারামারি আটকাতে পারে, তা নয়। উদাহরণ দেওয়া যাক। টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা ও মিশরের ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই সংঘাতের সময় স্নাতক পড়ুয়ারাও ভাবার চেষ্টা করেননি যে, একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে এমন মারামারি কতটা অযৌক্তিক হতে পারে!
অবশ্য, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের মধ্যে এমন সহিংসতা বা মারামারি নতুন নয়। এর আগেও এমনটা দেখা গেছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় রাজশাহী, নীলফামারি বা ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে ছোটোখাটো সহিংসতার খবর পাওয়া গিয়েছিল। ওই সময় খুলনায় এক দম্পতিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর ঘটনাও ঘটেছিল। এর আগের বিভিন্ন বিশ্বকাপেও এমন টুকরো টুকরো খবর পাওয়া গিয়েছিল বটে। তবে এবার এমন ঘটনার ঘনঘটা একটু বেশিই।
সেই বেশিটা এতটাই যে জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে কথা হয়েছে। গত ৯ জুলাই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সংসদে বলেছেন, বিশ্বকাপ নিয়ে সহিংসতায় দেশজুড়ে এখনও পর্যন্ত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে আলোচনাকালে প্রতিমন্ত্রী বিশ্বকাপ উদযাপনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ তথ্য জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা দেখেছি। আজ আমার কাছে থাকা সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।” তিনি আরও বলেছেন, “বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়, তা শান্তিপূর্ণ ও আনন্দদায়ক হওয়া উচিত।”
বাকি দুনিয়ায় কী হয়?
ক্রমঘনায়মান বিশ্বায়ন ও ফেসবুক-ইনস্টা-ইউটিউবের রাজত্বের এই দুনিয়ায় চাইলেও নিজেদের তফাতে রাখার বা থাকার সুযোগ নেই। ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা যে শুধু বাংলাদেশেই মারামারি করছে, তা নয়। আসলে ফুটবলের সামগ্রিক ইতিহাসেই এমন সমর্থকদের মারামারিতে বা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা আছে ঢের।
এই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ারের একটি ম্যাচেই ২০২৩ সালের নভেম্বরে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে হওয়া সেই ম্যাচে ব্রাজিল হেরেছিল আর্জেন্টিনার কাছে। তবে হারার আগেই সমর্থকেরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েছিল। সেই সহিংসতা এতটাই ছিল যে, ম্যাচ শুরু হতেই প্রায় ৩০ মিনিট দেরি হয়। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্যাপক লাঠিচার্জ করা হয়েছিল সেদিন। পেটানো হয়েছিল আর্জেন্টিনার সমর্থকদের। একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজও মাঠ থেকে গ্যালারিতে চলে গিয়েছিলেন পুলিশের কাছ থেকে লাঠি কেড়ে নিতে!
পরে একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার পুরো দল মাঠ ছেড়ে ড্রেসিং রুমে চলে গিয়েছিল। ব্রাজিলের খেলোয়াড়রা মাঠে থেকে পরিস্থিতি শান্ত করায় অংশ নেয়। শেষে ম্যাচ হয় বটে, তবে কলঙ্ক যা হওয়ার ততক্ষণে তা হয়েই গেছে।
সারা দুনিয়ায় ফুটবল ম্যাচ ঘিরে এমন সহিংসতা আরও অনেক ঘটেছে। এই যেমন, ২০২৪ সালে গিনি’তে এক ফুটবল ম্যাচে রেফারির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। তাতে প্রায় ৫০ জন নিহত হয়েছিল। ২০২২ সালে এমনই আরেক সহিংসতায় ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিল ১৩৫ মানুষের প্রাণ। অবস্থা সেবার এতটাই খারাপ ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ফুটবল মাঠে ঢুকে মেরেছিল টিয়ার গ্যাস, চলেছিল লাঠিচার্জ। এতে পদদলনের ঘটনার সৃষ্টি হয় এবং নিহতের সংখ্যাও বেড়ে গিয়েছিল বলে অভিযোগ আছে।
২০১২ সালে মিশরে এক ফুটবল ম্যাচ ঘিরে স্টেডিয়ামের ভেতরে দুই পক্ষের সমর্থকেরা অস্ত্র নিয়ে একে-অন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এতে প্রায় ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আরও শতাধিক আহত হয়েছিল।
চাইলে আরও পেছনে যাওয়া যায়। ১৯৮৫ সালে বেলজিয়ামে ইউভেন্তাস ও লিভারপুল সমর্থকদের মধ্যে ধুন্ধুমার মারামারি হয়েছিল। ইউরোপীয় কাপ ফাইনালের আগে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। সেবার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছিল। আর মারা গিয়েছিল ৩৯ জন।
১৯৬৪ সালে পেরুতে আর্জেন্টিনা ও পেরুর মধ্যকার ম্যাচে একটি বিতর্কিত গোল নিয়ে সমর্থকেরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছিল। লিমা’তে হওয়া সেই ম্যাচ ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতায় প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হয়।
আর ১৯৬৯ সালে বিশ্বকাপের কোয়ালিফায়ার ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনায় দুই দেশের মধ্যেই যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল। ফুটবল ম্যাচের উত্তেজনায় ঘি ঢেলেছিল রাজনীতিও। ফলে সমর্থকদের মধ্যে থাকা সহিংসতা থেকে একপর্যায়ে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধেই জড়িয়ে পড়েছিল এল সালভাদর ও হন্ডুরাস। সকার ওয়ার বা ফুটবল ওয়ার হিসেবে এই ঘটনা বিখ্যাত হয়ে আছে। ওই সংঘাতে ২ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।
সমাজ গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবল খেলাটারই প্রকৃতিগতভাবে সহিংসতা সৃষ্টির সক্ষমতা আছে। তাই এই প্রশ্নটি বারবারই ওঠে যে, ফুটবলে এবং ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে এমন কি বিষয় আছে, যাতে ফুটবল ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত হয়? কেন ঘন ঘন সহিংসতায় জড়ায় সমর্থকেরা?
২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত হয় ‘Why Does Fan Violence Persist in Football? Football Rivalries Ideology, the Reproduction of Football-Related Violence and its Everyday Dimensions’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। পোল্যান্ডের গবেষক ম্যাথেউস গ্রুধেচকি এবং আয়ারল্যান্ডের গবেষক জোল রুকউড এটি লিখেছিলেন।
টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস অনলাইন এ গবেষণাটি প্রকাশ করেছিল। এই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ফুটবল ম্যাচের দুই দলের মধ্যকার শত্রুতা ধীরে ধীরে সমাজেও দুটি ভাগের সৃষ্টি করে। মাঠের শত্রুতা ধীরে ধীরে সমাজের দুটি ভাগের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। এক্ষেত্রে মাঠে যে আদর্শের ভিত্তিতে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি করা হয়, সেটিই প্রতিফলিত হয় সমাজে। আবার ফুটবল সংশ্লিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে সংঘটিত সহিংসতাকে এক ধরনের বৈধতার দৃষ্টিতে বা লঘুভাবে দেখার অভ্যাসও চালু আছে। ফলে সহিংসতার এক ধরনের পুনরুৎপাদন হয় সমাজের মানুষের মধ্যে। এ ধরনের গুন্ডামি বা সহিংসতা ঠেকানোর প্রক্রিয়ার ব্যর্থতাও এক্ষেত্রে এর ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী। তাই মাঠের শত্রুতা সমাজেও বিভক্তি সৃষ্টি করে, সহিংসতাকে উসকে দেয়। তাছাড়া মাঠে যেহেতু খেলোয়াড় ও অফিশিয়ালদের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা বা এর অভ্যাস করা এখন নিষিদ্ধ, তাই এটি সহজেই চলে যায় মাঠের বাইরে। আবার মাঠে মারামারি করলেও নিষিদ্ধ হওয়ার ঝামেলা আছে। তাই মাঠের সহিংসতা ক্রমে মাঠের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে শত্রুতার সম্পর্ক তৈরি ও তার পুণরুৎপাদন প্রক্রিয়ার সবটাই দায়ী।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে সেজ জার্নালসে প্রকাশিত হয়েছে ‘Everyday Football Fan Violence’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। এতে বলা হয়েছে, ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা নানা ধরনের হয়। এখনও পর্যন্ত এটিকে একটি নির্দিষ্ট ম্যাচের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটে বলে প্রতীয়মান হলেও আসলে এমন সহিংসতার শিকড় সমাজের অনেক গভীরে প্রোথিত। ফুটবল সমর্থকদের মধ্যকার সহিংসতার ঘটনার সাথে তাদের প্রতিদিনের জীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কেবল নিত্যদিনের জীবনেই ৯ ধরনের সহিংসতায় ফুটবল সমর্থকেরা প্রতিনিয়ত জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা। এসব সহিংসতার সবগুলো শরীরী আক্রমণ হয় না। বরং মৌখিক ও আচরণগত নানা সহিংসতাও এখন হচ্ছে বলে দাবি গবেষকদের।
জার্মানি ও ব্রাজিল–এই দুই দেশই ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আছে ভালোভাবেই। এই দুই দেশেও সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা সৃষ্টির পেছনের কারণ খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো নির্দিষ্ট ফুটবল দলের সমর্থকেরা প্রায়শই সেই দলকে সমর্থন করাকেই নিজেদের সামাজিক পরিচয়ের জায়গা দিয়ে দেয়। ফলে ওই দলের জন্য তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘ওয়ারিয়র সাইকোলজি’ তৈরি হয়। ফলে ওই ফুটবল দল ম্যাচে হারলে সেসব সমর্থক খুবই ব্যক্তিগতভাবে সেটি নিয়ে নেন, যা একসময় সহিংসতায় রূপ নেয়।
গবেষকেরা আরও বলছেন, উগ্র সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয় মূলত তরুণ, বেকার ও কম শিক্ষিত মানুষদের দিয়ে। এরা সহিংসতায় জড়ায় বেশি এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। এর বাইরে মাদকের ব্যবহারও সহিংসতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ বলে মনে করেন গবেষকেরা।
সমর্থকদের সহিংস করে তুলতে সংবাদমাধ্যমেরও ভূমিকা আছে। ২০০২ সালে সায়েন্স ডাইরেক্টে প্রকাশিত হয়েছিল ‘Fan violence: Social problem or moral panic?’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র। এতে গবেষক রাসেল ই ওয়ার্ড জুনিয়র লিখেছেন, মোরাল প্যানিক নিয়ন্ত্রণের একটি উপকরণ মিডিয়া। এর বাইরে অন্যান্য মাধ্যমও থাকে নিয়ন্ত্রক হিসেবে। এগুলো জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে ব্যাপকভাবে। অনেক সময় এসব থেকে মোরাল প্যানিক ছড়িয়ে পড়ে সমর্থকদের মধ্যে, ‘কিছু একটা করা’র তাড়না অনিচ্ছাকৃতভাবেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা। আর সেই উত্তেজনাই দৈত্যের মতো সহিংসতার রূপে স্থান নিতে পারে ফুটবল সমর্থকদের হৃদয়ে।
অর্থাৎ, কারণ আসলে একটি নয়, বরং অজস্র ও বহুমাত্রিক। এবং এ সংক্রান্ত গবেষণা বিশ্বজুড়েও অপ্রতুল বটে। অথচ, মানুষ মরছে ঠিকই।
বাংলাদেশের ফুটবল সমর্থকেরা কেন সহিংস ও টক্সিক হয়ে উঠছে?
এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টিনা ও মিশরের মধ্যকার সাম্প্রতিক ম্যাচ-সংক্রান্ত একটি দেশীয় অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নেওয়া যাক।
সেদিন একটু রাত করেই বাসায় ফেরা হচ্ছিল। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে আর্জেন্টিনার খেলা। রাস্তা কিছুটা শুনশানও ছিল। রিকশার চালক বেশ কিছুটা এগিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “মামা, খেলার খবর জানেন নাকি কিছু? সবাই কেমন চুপচাপ... খেলা কি জিইত্যা গেল নাকি মাঠে নাইমাই?”
জবাবে বলতেই হলো যে, খেলার খবর নেওয়ার অবসর হয়নি। জানাশোনায় ওনারাও যে অবস্থা, আমারও তাই।
তবে রিকশাচালক ভাইটির তর সইল না। এক চায়ের দোকানে জটলা দেখে সেখানেই তিনি ব্রেক ধরলেন। স্কোরবোর্ড দেখা গেল তার বদৌলতেই। দেখেই ওনার উল্লসিত চিৎকার, “ওরে মা রে, মিশর গোল দিয়া ফেলছে, মামা... কী কয়! আর্জেন্টিনা তো গোল খাইয়া বইসা আছে...”
এরপর তাড়া খেয়ে তিনি রিকশা আবার চালাতে শুরু করলেন ঠিকই, কিন্তু কথার ফুলঝুরি থামছে না। তার বক্তব্যে, “মামা, আপনারে নামায় দিয়াই যামু গেরেজে। ধরমু আর্জেন্টিনা গো... গোল খাইসে আগে, খাইবো ধরা... হা...হা, আইজক্যা খ্যাপামু ওগো...।”
এই ‘ওগো’ কারা জানতে চাইলে চালকের স্বীকারোক্তি হলো, ওনারা তার বন্ধু, সহকর্মী সতীর্থ। ব্রাজিলের সমর্থক বলে ব্রাজিল বাদ পড়ার পর এসব সহকর্মী কাম আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা তাকে নাকি ‘কিছু বলতে’ আর বাকি রাখে নাই। এবার, তাই তার পালা!
অন্যদিকে মিশরের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য জয়ের পর একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে এক আর্জেন্টিনা সমর্থকের বক্তব্য শোনার সুযোগ হলো। তিনি অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলছিলেন, “আর্জেন্টিনার সমর্থক হিসেবে কোনো ব্রাজিল সমর্থককে আমরা বিশ্বাস করতে পারি না।” তার এমন বক্তব্যের কারণ হলো, মিশর আগে দুই গোল দেওয়ার পর তার আশপাশের ব্রাজিল সমর্থকেরা নাকি উল্লাস প্রকাশ করছিলেন! আর এ কারণে তিনি ব্রাজিল সমর্থক মানুষটির ওপর থেকেই বিশ্বাস তুলে নিতে চাইছেন।
ওদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থককে চ্যাংদোলা করে পুকুরে ফেলে ব্রাজিলের সমর্থকদের বিজয় উদযাপন করতেও আমরা কিছুদিন আগেই দেখেছি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। অর্থাৎ, দুই পক্ষেই এক ধরনের ‘ওয়ারিয়র সাইকোলজি’র উপস্থিতি প্রবলভাবে টের পাওয়া যায়।
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
তা, এটি কেন তৈরি হচ্ছে? এবারই বা এত বেশি অনুভূত হচ্ছে কেন?
আসলে কোনো সামাজিক আচরণগত পরিবর্তনই হুট করে তৈরি হয় না। এর পেছনে নানামাত্রিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কারণ থাকে। আমাদের এই দেশটা সংকট ছাড়া খুব বেশি সময় থাকেনি। বেশির ভাগ সময়ই বহুমাত্রিক সংকটে ভুগে চলেছে বাংলাদেশের মানুষ। কখনো প্রত্যক্ষ, কখনো পরোক্ষ সংকট তাড়া করছে মানুষকে। ফলে উৎসবের উপলক্ষ বেশ কম। আর যখনই তা কিছুটা হলেও আসছে, তখনই কি মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে?
হতে পারে। এটিও হতে পারে যে, আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে সার্বিক সহনশীলতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। রাস্তায় নামলে পথচলতি মানুষের অসহিষ্ণুতার প্রমাণ মেলে তুমুল গালিগালাজে। বাপ, মা তুলে গালি দিতে এখন আর আমাদের তুমুল শত্রুতার প্রয়োজন হয় না। এক রিকশার চাকা কোনো বাইকের গায়ে লাগলেই সেসব গালি শুনে ফেলা যায়। এমনকি আরও তুচ্ছ কারণেও শোনা যায়। তবে কি দীর্ঘ সময়ের দুর্বল শাসনের প্রভাবে হতাশাগ্রস্ত মানুষের অসহিষ্ণুতার মাত্রা এতটাই হয়ে যাচ্ছে যে, মেসি বা নেইমারের পেনাল্টি মিসের উপলক্ষে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়?
আমাদের এই বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে আমরা এমন কোনো চূড়ান্ত কল্যাণকর শাসনকাল পাব না, যা দিয়ে আইনের প্রকৃত শাসনের প্রতি মানুষের যে পিপাসা, তা পূরণ করার মডেল পাওয়া যাবে। সব শাসক ও শাসনকালই নানা ত্রুটি, বিচ্যুতিতে ভরপুর। ফলে এই দেশের মানুষ আসলে প্রকৃত আইনের শাসনই কখনো দেখেনি। দেখেনি একেবারেই সৎ উপায়ে জীবনে উন্নতি করার আদর্শ ব্যবস্থা। উল্টো আমরা এমন এক সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনীতি দেখেছি, যা প্রমাণ করে এই বঙ্গে জোর যার, মুলুক তার। তাহলে কি গায়ের জোর (যা ক্ষমতারও অন্য নাম) এবং তার প্রতিফলন ঘটানোর ইচ্ছাই ফুটবল সমর্থকদের অন্তত খেলার ক্ষেত্রে যেভাবেই হোক জয়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে? এমনকি মানুষ মেরে বা ট্রোলের তোড়ে কাউকে আত্মঘাতী বানিয়ে হলেও?
হতে পারে। ‘হতে পারে’ এতবার বলতে হচ্ছে কারণ, আমাদের সমাজের মানুষের এমন পরিবর্তন নিয়ে কোনো বিস্তারিত গবেষণা সেভাবে কখনো হয়নি। তাই আমাদের কারণ খুঁজতে হয় অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে। যদিও তাতে সমস্যার সমাধান খুব একটা হয় না। বরং সমস্যা তলে তলে বাড়তে থাকে, হয়তো একসময় প্রবল দানো হবে বলে!
আমরা বরং সেই দৈত্যদানোর অপেক্ষাতেই থাকি। কে না জানে, শিরে সংক্রান্তিই আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একমাত্র নিশ্চিত স্বস্তি!