আলি হাসেম

২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, বৈশ্বিক সামরিক সম্প্রদায়ের বাইরে অধিকাংশ মানুষ কখনোই ইরানের শহীদ ড্রোনের নাম শোনেনি। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর সস্তা ড্রোনের ঝাঁকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর কিছুটা গুঞ্জন শোনা যায়। তখন থেকেই গোটা বিশ্ব এ সম্পর্কে জানতে পারে। এগুলো খুব বেশি নির্ভুল বা অত্যাধুনিক ছিল না, কিন্তু অন্য দেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য নষ্ট করে দেওয়াই ছিল এগুলোর শক্তি। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এগুলোকে “উড়ন্ত উৎপাত” বলে অভিহিত করেছিলেন। এগুলো এমন এক অস্ত্র, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্ণায়ক আঘাত হানা নয়, বরং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলা।
পশ্চিমা রাজধানীগুলোর কাছে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের কাছে, রাশিয়াকে হাজার হাজার এমন ড্রোন সরবরাহে ইরানের সিদ্ধান্ত দেশটির কৌশলে বড় ধরনের এক মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালে ভিয়েনায় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা চলাকালে কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন যে তেহরান এক অদৃশ্য সীমা অতিক্রম করেছে, নিজস্ব সীমান্তের বহু বাইরে সংঘাতে ঘটনাপ্রবাহ প্রভাবিত করার প্রস্তুতি প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ইরানের জন্য সংঘাতটি ভিন্ন ফল বয়ে আনে। ইউক্রেন একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। কঠিন যুদ্ধ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিকশিত রুশ যুদ্ধক্ষেত্রের উন্নয়ন ড্রোনগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায়, তাদের পরিসর ও প্রভাব বিস্তৃত করে।

বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: ইরান নতুন ধরনের যুদ্ধ শুরু করেছে, নিয়ন্ত্রণের বদলে স্থায়িত্বকে কেন্দ্র করে। এবং গত কয়েক বছরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিক মুখোমুখি সংঘাতে এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ড্রোন ও অপেক্ষাকৃত কম কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান ইসরায়েলের বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে বড় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে।
আজ, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে সতর্ক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন এই শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সংকট দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যা ২০২৫ সালের জুনের আগের সপ্তাহগুলোর মতো। যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান নতুন দফা পারমাণবিক আলোচনায় বসতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করে।
তখন ইরানের আলোচনার কৌশল ছিল সহজ: শূন্য পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণযোগ্য, কিন্তু শূন্য সমৃদ্ধকরণ মানে কোনো চুক্তি নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিপরীত ধারণা নিয়ে আলোচনায় বসে: শূন্য সমৃদ্ধকরণই কেবল পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তির নিশ্চয়তার একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। পার্থক্যটি কেবল প্রযুক্তিগত বা মতাদর্শগত সংজ্ঞার বিষয় ছিল না। উভয় পক্ষের স্থিতিশীলতার সংজ্ঞা ছিল ভিন্ন।
এর পর থেকে খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। ইরান এখনো ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মধ্যে আলোচনা করছে।
ইরানি নেতারা বলে যাচ্ছেন, কূটনীতি যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারে, যেমনটি তারা ২০২৫ সালের জুনে লড়াই শুরুর আগে বলেছিলেন। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সতর্ক করছেন যে সামরিক পদক্ষেপ শুরুর আগে ইরানের হাতে চুক্তি করার জন্য মাত্র কয়েক দিন সময় আছে।
ওয়াশিংটনে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সীমিত আঘাত কি বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু না করেই ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে পারে? কিন্তু এই ধারণাটি হয়তো ভ্রান্ত অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যে আবদ্ধ নয়; উভয় পক্ষ যখন তা সীমিত রাখতে চায়, তখনই কেবল তা সীমিত থাকে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, সেই অভিন্ন আগ্রহ হয়তো আর নেই।

সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ‘কৌশলগত সংযম’ থেকে সরে এসে ‘কারবালার দৃষ্টিকোণ থেকে মুখোমুখি সংঘাত’-এর ভাষা ব্যবহার শুরু করেছেন। এটি শিয়া ঐতিহ্যের কেন্দ্রীয় কাহিনি ইমাম হোসাইনের প্রতি ইঙ্গিত করে, যিনি অন্যায়কারী শাসকের কাছে আত্মসমর্পণের বদলে শাহাদাত বেছে নিয়েছিলেন।
বহির্বিশ্বের কাছে এমন উল্লেখ প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু শিয়া রাজনৈতিক চেতনায় কারবালা একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকেত। অস্তিত্বগত হুমকির মুখে আপসের বদলে প্রতিরোধের মহিমা এতে তুলে ধরা হয়। ‘হাঁটু গেড়ে বেঁচে থাকার চেয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যু বরণ উত্তম’– এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া ও চাপসৃষ্টিমূলক কূটনীতির যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।
ইয়াজিদ, নমরুদ ও মিসরের ফেরাউনদের মতো ঐতিহাসিক অত্যাচারীদের উল্লেখ করে ইরানি নেতা স্পষ্ট করেছেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈধতা ক্রমশ আত্মসমর্পণের বদলে প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে সীমিত মার্কিন হামলাকে শক্তির সংকেত হিসেবে দেখা হবে না; বরং নৈতিক বৈধতা রক্ষার জন্য প্রতিক্রিয়া দাবি করে এমন আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং পূর্ববর্তী হামলাগুলোর বিপরীতে, মুখরক্ষা-কেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়া এবার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে, বিশেষত যদি তার পর ভারসাম্যহীন আলোচনা হয়।
ওয়াশিংটন সামরিক চাপকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে। তেহরান ক্রমশ সংঘাতকে মতাদর্শগত টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। দুই পক্ষ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলগত ভাষায় কথা বলছে।
প্রুশিয়ান সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লাউজউৎজ একবার যুদ্ধকে ‘ঘর্ষণ’ বা ফ্রিকশন-এর দ্বারা চিহ্নিত কার্যকলাপ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। যেখানে অনিশ্চয়তার ক্রমবর্ধমান হয়ে সহজ পরিকল্পনাকে জটিল ও অজানা ঘটনায় রূপ দেয়। অস্তিত্বগত হুমকির ভিত্তিতে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে তার সীমারেখা ক্রমেই তরল হয়ে ওঠে।
ইরান কোনো অ-রাষ্ট্রীয় (নন স্টেট) সত্তা নয়, যাকে এক আঘাতে নিষ্ক্রিয় করা যায়। এটি বিস্তৃত সক্ষমতা সম্পন্ন একটি বড় দেশ, ফলে উত্তেজনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাদের বিস্তৃত অস্ত্রভাণ্ডার এই ধারণার ওপর নির্মিত। শহীদ ড্রোন কর্মসূচি এমন এক যুদ্ধকৌশল তুলে ধরে, যা নির্ভুলতার বদলে স্থায়িত্বের ওপর নির্ভরশীল। ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার যুদ্ধ, উপসাগরীয় সামুদ্রিক চাপবিন্দু এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কের পাশাপাশি ইরানের প্রতিরোধ কৌশল উত্তেজনা বিস্তারকে উৎসাহিত করে। যুদ্ধ একটি অক্ষ বরাবর গভীরতর না হয়ে একাধিক ক্ষেত্রজুড়ে বিস্তৃত হয়।
মৌলিক প্রশ্ন হলো উত্তেজনা বাড়বে কি না, তা নয়; বরং কোথা থেকে শুরু হবে। স্পষ্ট যে ইরানের আঞ্চলিক অংশীদাররা দুর্বল হয়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লেবাননে হিজবুল্লাহ বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইরাকি মিলিশিয়ারা এখন অভ্যন্তরীণ চাপে রয়েছে, এবং আঞ্চলিক পরিবেশ ইরানের উত্তেজনা বিস্তারের নমনীয়তা সীমিত করেছে।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই দুর্বলতা কম ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবসময় নিরাপদ নয়। হুমকি অনুভব করলে তারা কম সংযত থাকতে পারে। যুদ্ধ যখন এভাবে শুরু হয়, তা খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় সীমিত থাকে। ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু করতে পারে, কিন্তু তা হয়তো উত্তেজনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
লেখক: লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল হলোওয়ে-তে অবস্থিত সেন্টার ফর ইসলামিক অ্যান্ড ওয়েস্ট এশিয়ান-এর গবেষণার সাথে যুক্ত
(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে)

২০২২ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে, বৈশ্বিক সামরিক সম্প্রদায়ের বাইরে অধিকাংশ মানুষ কখনোই ইরানের শহীদ ড্রোনের নাম শোনেনি। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের ওপর সস্তা ড্রোনের ঝাঁকের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর কিছুটা গুঞ্জন শোনা যায়। তখন থেকেই গোটা বিশ্ব এ সম্পর্কে জানতে পারে। এগুলো খুব বেশি নির্ভুল বা অত্যাধুনিক ছিল না, কিন্তু অন্য দেশের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য নষ্ট করে দেওয়াই ছিল এগুলোর শক্তি। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা এগুলোকে “উড়ন্ত উৎপাত” বলে অভিহিত করেছিলেন। এগুলো এমন এক অস্ত্র, যার উদ্দেশ্য ছিল নির্ণায়ক আঘাত হানা নয়, বরং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্লান্ত করে তোলা।
পশ্চিমা রাজধানীগুলোর কাছে, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের কাছে, রাশিয়াকে হাজার হাজার এমন ড্রোন সরবরাহে ইরানের সিদ্ধান্ত দেশটির কৌশলে বড় ধরনের এক মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ২০২২ সালে ভিয়েনায় পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা চলাকালে কয়েকজন পশ্চিমা কূটনীতিক আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছিলেন যে তেহরান এক অদৃশ্য সীমা অতিক্রম করেছে, নিজস্ব সীমান্তের বহু বাইরে সংঘাতে ঘটনাপ্রবাহ প্রভাবিত করার প্রস্তুতি প্রদর্শন করেছে। কিন্তু ইরানের জন্য সংঘাতটি ভিন্ন ফল বয়ে আনে। ইউক্রেন একটি পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। কঠিন যুদ্ধ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিকশিত রুশ যুদ্ধক্ষেত্রের উন্নয়ন ড্রোনগুলোর কার্যকারিতা বাড়ায়, তাদের পরিসর ও প্রভাব বিস্তৃত করে।

বার্তাটি ছিল স্পষ্ট: ইরান নতুন ধরনের যুদ্ধ শুরু করেছে, নিয়ন্ত্রণের বদলে স্থায়িত্বকে কেন্দ্র করে। এবং গত কয়েক বছরে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একাধিক মুখোমুখি সংঘাতে এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ড্রোন ও অপেক্ষাকৃত কম কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইরান ইসরায়েলের বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে, ফলে বড় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যভেদ করতে পেরেছে।
আজ, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে শুরু করেছে এবং একই সঙ্গে সতর্ক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন এই শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সংকট দ্রুত এমন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, যা ২০২৫ সালের জুনের আগের সপ্তাহগুলোর মতো। যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান নতুন দফা পারমাণবিক আলোচনায় বসতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু করে।
তখন ইরানের আলোচনার কৌশল ছিল সহজ: শূন্য পারমাণবিক অস্ত্র গ্রহণযোগ্য, কিন্তু শূন্য সমৃদ্ধকরণ মানে কোনো চুক্তি নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিপরীত ধারণা নিয়ে আলোচনায় বসে: শূন্য সমৃদ্ধকরণই কেবল পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তির নিশ্চয়তার একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ। পার্থক্যটি কেবল প্রযুক্তিগত বা মতাদর্শগত সংজ্ঞার বিষয় ছিল না। উভয় পক্ষের স্থিতিশীলতার সংজ্ঞা ছিল ভিন্ন।
এর পর থেকে খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। ইরান এখনো ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মধ্যে আলোচনা করছে।
ইরানি নেতারা বলে যাচ্ছেন, কূটনীতি যুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারে, যেমনটি তারা ২০২৫ সালের জুনে লড়াই শুরুর আগে বলেছিলেন। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার সতর্ক করছেন যে সামরিক পদক্ষেপ শুরুর আগে ইরানের হাতে চুক্তি করার জন্য মাত্র কয়েক দিন সময় আছে।
ওয়াশিংটনে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, সীমিত আঘাত কি বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু না করেই ইরানের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে পারে? কিন্তু এই ধারণাটি হয়তো ভ্রান্ত অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যুদ্ধ পরিকল্পনার মধ্যে আবদ্ধ নয়; উভয় পক্ষ যখন তা সীমিত রাখতে চায়, তখনই কেবল তা সীমিত থাকে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, সেই অভিন্ন আগ্রহ হয়তো আর নেই।

সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ‘কৌশলগত সংযম’ থেকে সরে এসে ‘কারবালার দৃষ্টিকোণ থেকে মুখোমুখি সংঘাত’-এর ভাষা ব্যবহার শুরু করেছেন। এটি শিয়া ঐতিহ্যের কেন্দ্রীয় কাহিনি ইমাম হোসাইনের প্রতি ইঙ্গিত করে, যিনি অন্যায়কারী শাসকের কাছে আত্মসমর্পণের বদলে শাহাদাত বেছে নিয়েছিলেন।
বহির্বিশ্বের কাছে এমন উল্লেখ প্রতীকী মনে হতে পারে। কিন্তু শিয়া রাজনৈতিক চেতনায় কারবালা একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকেত। অস্তিত্বগত হুমকির মুখে আপসের বদলে প্রতিরোধের মহিমা এতে তুলে ধরা হয়। ‘হাঁটু গেড়ে বেঁচে থাকার চেয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যু বরণ উত্তম’– এই ধারণা যুক্তরাষ্ট্রের আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া ও চাপসৃষ্টিমূলক কূটনীতির যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে।
ইয়াজিদ, নমরুদ ও মিসরের ফেরাউনদের মতো ঐতিহাসিক অত্যাচারীদের উল্লেখ করে ইরানি নেতা স্পষ্ট করেছেন যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বৈধতা ক্রমশ আত্মসমর্পণের বদলে প্রতিরোধের ওপর নির্ভর করছে। এই প্রেক্ষাপটে সীমিত মার্কিন হামলাকে শক্তির সংকেত হিসেবে দেখা হবে না; বরং নৈতিক বৈধতা রক্ষার জন্য প্রতিক্রিয়া দাবি করে এমন আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং পূর্ববর্তী হামলাগুলোর বিপরীতে, মুখরক্ষা-কেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়া এবার পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করতে পারে, বিশেষত যদি তার পর ভারসাম্যহীন আলোচনা হয়।
ওয়াশিংটন সামরিক চাপকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখে। তেহরান ক্রমশ সংঘাতকে মতাদর্শগত টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। দুই পক্ষ যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশলগত ভাষায় কথা বলছে।
প্রুশিয়ান সামরিক তাত্ত্বিক কার্ল ভন ক্লাউজউৎজ একবার যুদ্ধকে ‘ঘর্ষণ’ বা ফ্রিকশন-এর দ্বারা চিহ্নিত কার্যকলাপ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। যেখানে অনিশ্চয়তার ক্রমবর্ধমান হয়ে সহজ পরিকল্পনাকে জটিল ও অজানা ঘটনায় রূপ দেয়। অস্তিত্বগত হুমকির ভিত্তিতে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করলে তার সীমারেখা ক্রমেই তরল হয়ে ওঠে।
ইরান কোনো অ-রাষ্ট্রীয় (নন স্টেট) সত্তা নয়, যাকে এক আঘাতে নিষ্ক্রিয় করা যায়। এটি বিস্তৃত সক্ষমতা সম্পন্ন একটি বড় দেশ, ফলে উত্তেজনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাদের বিস্তৃত অস্ত্রভাণ্ডার এই ধারণার ওপর নির্মিত। শহীদ ড্রোন কর্মসূচি এমন এক যুদ্ধকৌশল তুলে ধরে, যা নির্ভুলতার বদলে স্থায়িত্বের ওপর নির্ভরশীল। ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার যুদ্ধ, উপসাগরীয় সামুদ্রিক চাপবিন্দু এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্কের পাশাপাশি ইরানের প্রতিরোধ কৌশল উত্তেজনা বিস্তারকে উৎসাহিত করে। যুদ্ধ একটি অক্ষ বরাবর গভীরতর না হয়ে একাধিক ক্ষেত্রজুড়ে বিস্তৃত হয়।
মৌলিক প্রশ্ন হলো উত্তেজনা বাড়বে কি না, তা নয়; বরং কোথা থেকে শুরু হবে। স্পষ্ট যে ইরানের আঞ্চলিক অংশীদাররা দুর্বল হয়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে লেবাননে হিজবুল্লাহ বড় ধাক্কা খেয়েছে। ইরাকি মিলিশিয়ারা এখন অভ্যন্তরীণ চাপে রয়েছে, এবং আঞ্চলিক পরিবেশ ইরানের উত্তেজনা বিস্তারের নমনীয়তা সীমিত করেছে।
ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে এই দুর্বলতা কম ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থা সবসময় নিরাপদ নয়। হুমকি অনুভব করলে তারা কম সংযত থাকতে পারে। যুদ্ধ যখন এভাবে শুরু হয়, তা খুব কম ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় সীমিত থাকে। ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরু করতে পারে, কিন্তু তা হয়তো উত্তেজনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।
লেখক: লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল হলোওয়ে-তে অবস্থিত সেন্টার ফর ইসলামিক অ্যান্ড ওয়েস্ট এশিয়ান-এর গবেষণার সাথে যুক্ত
(লেখাটি ফরেন পলিসির সৌজন্যে)

ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার উত্তেজনা এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানী, সংবাদকক্ষ এবং নীতি-নির্ধারণী মহলে একটি প্রশ্ন নিয়েই বেশ গুঞ্জন চলছে: চীন কি শেষ পর্যন্ত ইরানের রক্ষাকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে? আর যদি আসে, তবে সেই সহায়তার ধরণ কেমন হবে?

ইরানি বাহিনীর হাতের কাছেই বহু লক্ষ্যবস্তু আছে। এর মধ্যে রয়েছে–হরমুজ প্রণালী বা বৃহত্তর উপসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজ। নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা তেহরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর ক্ষেত্রে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল, যাদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র থেকে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট