যে দুই কারণে রাধাবিনোদ পাল নিজ দেশে অপরিচিত

প্রবীর বিকাশ সরকার
প্রবীর বিকাশ সরকার
যে দুই কারণে রাধাবিনোদ পাল নিজ দেশে অপরিচিত
টোকিওর ইয়াসুকুনি জিনজা মন্দিরের প্রাঙ্গণে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক।

প্রথম কারণ হচ্ছে, ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দি ফার ইস্ট সংক্ষেপে টোকিও ট্রাইব্যুনাল যেহেতু আন্তর্জাতিক একটি বিচার, তাই তাতে আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ বিচারপতি না থাকলে পরে তা সমালোচনার সম্মুখীন হবে। সুতরাং অন্ততপক্ষে একজন হলেও আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞকে বিচারক নিয়োগ না দিলেই নয়। কিন্তু তৎকালীন বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ খুব বেশি ছিলেন না বলেই প্রতীয়মান হয়। আর থাকলেও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে বসতে রাজি হননি কেউ। কারণ, যথার্থ আইন বহির্ভূত মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ শক্তিধর রাজনীতিকরা শতাধিক বছর আগে থেকেই করে আসছেন। এটা আমেরিকার কালচারও বটে! কিন্তু এবার যেহেতু যুদ্ধাপরাধের বিচারটা বহির্বিশ্বের একটি দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সুতরাং এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে না করলে ইজ্জৎ খোয়ানোর ব্যাপারও আছে বলে কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করেছিলেন। তাই এমন বিচারক খুঁজতে ভারতের দিকে তাকাতে হয়েছিল বিচারের আয়োজক মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থারকে। এক ঢিলে যাতে দুটি পাখি মারা যায়, তাও তিনি চিন্তা করেছিলেন অথবা নির্দেশিত হয়েছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। যা আসলে দ্বিতীয় কারণ অর্থাৎ ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনরত ভারতীয়দেরকে সতর্ক করা বা আইওয়াশ করা। অর্থাৎ, স্বাধীনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে পরিকল্পিত টোকিও ট্রাইব্যুনালের মতো শাস্তি তাদের ঘাড়েও চেপে বসতে পারে–এই চিত্রটি দেখানো! বলা বাহুল্য, বিচারকারী মিত্রবাহিনীর তিনটি দেশের মধ্যে সাম্রাজ্যবাদী গ্রেট ব্রিটেন অন্যতম।

কিন্তু শেষমেষ তা রক্ষা হয়নি। ভারতের স্বাধীনতাকে আটকে রাখা যায়নি। ধর্মের ঢোল আপনি বেজে ওঠার মতো ভুল অঙ্ক ধরেই এগিয়ে চলছিল টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল। আজন্ম স্বাধীনতাকামী, জাতীয়তাবাদী ও শ্বেতাঙ্গবিরোধী বিচারপতি পালকে নিযুক্ত করাই ছিল মহা ভুল, যাকে বলে গোড়াতেই গলদ। আর সেটা প্রথম থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম ব্রিটিশ প্রতিনিধি বিচারক স্কটিশ অধিবাসী লর্ড ইউলিয়াম প্যাট্রিক। তিনি কিছুতেই বিচারপতি পালকে সহ্য করতে পারছিলেন না। কারণ, রাধাবিনোদ পাল ট্রাইব্যুনালের সত্যিকারের চেহারাটি ধরে ফেলেছিলেন। নানা রকম বাদপ্রতিবাদ করছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী মনোভঙ্গির শ্বেতাঙ্গ প্যাট্রিক আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি পর্যন্ত লিখেছিলেন, যেন পালকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পারা যায়নি জেনারেল ম্যাক-আর্থারের কারণে। কেন? সে এক মহারহস্য! জেনারেল আর্থার চেয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক একজন আইনজ্ঞ যদি বিচারে থাকেন, তাহলে তাকে দিয়ে বিচার চালিয়ে নিয়ে উদ্দেশ্য মিটিয়ে ফেলা। কিন্তু এলোমেলো, অপরিপক্ক, অস্পষ্ট এবং জোরজবরদস্তিমূলক এই বিচারের নোংরা জল তাদের মুখেই পড়েছিল। ধর্মের ঢোলের মতো গোমর ফাঁস করে দিয়েছিলেন জেনারেল ম্যাক-আর্থার নিজেই।

অন্যদিকে, বিচারপতি পালও ট্রাইব্যুনালের হাবভাব দেখে এটা যে জাপান তথা বিশ্বমানবতার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র এবং প্রতারণা, তা ভালো করেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। কারণ, ১১ জন বিচারপতির মধ্যে ১০ জনই ছিলেন সাধারণ আইনজীবী, না হয় ছোটখাটো আদালতের বিচারক অথবা মিলিটারি আইনের লোক, এবং অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ নন। বিচারপতি পাল দেখলেন নির্দিষ্টভাবে কোনো আন্তর্জাতিক আইনকানুনও নেই যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য! কীসের ভিত্তিতে এই বিচার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে যুগপৎ বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন তিনি। কিন্তু হাতে আসা সুযোগকে যথাযথভাবে ব্যবহারে দ্বিধাবোধ করেননি। প্রকৃতপক্ষে, বিচারপতি পালেরই জয় হয়েছে। পরাধীন এশিয়াবাসীর বিজয় চিহ্নিত হয়েছে তার দীর্ঘ রায়ের মাধ্যমে। মানবতা, শান্তি ও আইনের ক্ষেত্রে একটি সোনালি মাইলফলক তার প্রদত্ত ভিন্নমতাবলম্বী সুদীর্ঘ “জাপান নির্দোষ রায়”।

জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৬-৪৮)।
জাপানে অনুষ্ঠিত টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল (১৯৪৬-৪৮)।

বিচারপতিপুত্র প্রশান্ত কুমার পালের ভাষ্য থেকে জানা যায়, জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থারের প্রতিনিধি নেদারল্যান্ডস এর আইনজ্ঞ বার্ট রোলিং টোকিও ট্রাইব্যুনালের কমিটি গঠনের প্রাক্কালে ভারতে গিয়ে নেহরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ট্রাইব্যুনালের জন্য একজন বিচারপতি চান, যিনি আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ। কিন্তু নেহরু ভারতে তেমন কেউ নেই বলে তাকে অবহিত করেন। অথচ ১৯৩৭ সালে হেগ শহরে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক আইন সম্মেলনে বিচারপতি পাল অন্যতম যুগ্ম-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সংবাদ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিপ্রাপ্ত একজন আইনজ্ঞ জওহরলাল নেহরু জানতেন না, তা কি বিশ্বাসযোগ্য? তবে কি ব্যক্তিগত খ্যাতিজনিত ঈর্ষা নাকি রাজনৈতিক মতাদর্শের বশবর্তী হয়ে নেহরু তার বন্ধু আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ বিচারপতি রাধাবিনোদ পালের নামটি বলেননি বার্ট রোলিংকে, তা গবেষণাসাপেক্ষ। নেহরু ছিলেন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘেঁষা সমাজতন্ত্রী, আর বিচারপতি পাল ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী কট্টর জাতীয়তাবাদী। কমিউনিস্ট ও ন্যাশনালাস্টিদের বিরোধ চিরাচরিত।

যাহোক, বিফল মনোরথে আইনজ্ঞ বার্ট রোলিং স্বদেশে ফিরে যান। এরপর কোনো না কোনো সূত্র ধরে তিনি বিচারপতি পালের খোঁজ পান এবং আবার ভারত, তথা কলকাতায় যান। আর এখানেই বুঝি ইতিহাস নড়ে উঠেছিল তার নতুন পাতা ওল্টানোর তাগিদে। বিচারপতি পাল যেন এই সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলেন। লুফে নেন সুযোগটি। পেছন থেকে সহয়তা করেছিলেন পূর্বোল্লেখিত কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার ডার্বিশায়ার। কেন? সেও এক মহারহস্য!

আজকে টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনালের কথা অনেকেই জানেন। বিচারপতি পাল যে প্রথম থেকেই এই ট্রাইব্যুনালকে অস্বীকার করেছিলেন, বলেছিলেন বিচারের নামে প্রহসন, অভিহিত করেছিলেন “Victor’s justice”  অর্থাৎ “বিজয়ীর বিচার” বলে, তার প্রমাণ তো বিচার শেষে মার্কিন সিনেটের উচ্চসভায় আহুত হয়ে জেনারেল ডগলাস ম্যাক-আর্থারের স্বীকারোক্তি (৩ মে, ১৯৫১) থেকেই প্রমাণিত। গণমাধ্যমের কল্যাণে বিশ্ববাসীও তা জেনেছিল। অবশ্য বিচারপতি পাল ছাড়াও ফ্রান্সের বিচারপতি হেনরি বার্নাড এবং নেদারল্যান্ডসের বিচারপতি বার্ট রোলিংও এই বিচারের কিছু দিক সম্পর্কে ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রভাবিত করেছিল বিচারপতি পালের যৌক্তিক অভিমত ও মতামত। যে কারণে জেনারেল ম্যাক-আর্থারের পাতানো টোকিও ট্রাইব্যুনাল “ভুল বিচার” ছিল বলে স্বীকার করা ছাড়া আর অন্যপ্রকার উপায় ছিল না। তিনি আরও বলেছিলেন, অভিযুক্ত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো হিদেকিসহ সকলেই নিজেদের “নিরাপত্তা”র কারণে যুদ্ধ করেছেন। ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে জেনারেল তোজো বারংবার দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন, তিনি দেশ রক্ষার্থে যুদ্ধ করেছেন, আগ্রাসী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেননি। তাহলে কেন জেনারেল ম্যাক-আর্থারের নেতৃত্বে মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, শান্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ; চীন, কোরিয়া, আমেরিকার বিরুদ্ধে আগ্রাসী যুদ্ধ করার অপরাধে অভিযুক্ত করা হলো জাপানকে? কীসের বদলা বা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল মিত্রশক্তি প্রধান আমেরিকা? এসবের উত্তর বিচারপতি পালের জ্ঞানগর্ভ রায়ের মধ্যে উল্লেখিত আছে।

টোকিও ট্রাইব্যুনালের আড়াই বছরের সময়কালে ইম্পেরিয়াল হোটেলের একটি কক্ষে বসে বিগত ২০টি বছরের জাপানের ইতিহাসসহ নানা ধরনের বহু গ্রন্থ এবং তথ্য ঘেঁটে সুদীর্ঘ রায় লেখেন যখন, তখন অন্যান্য বিচারপতি জাপানের যত্রতত্র ঘুরে বেড়িয়ে খাওয়াদাওয়া করছিলেন বলে কথিত আছে।

১৯৯৭ সালে কিয়োতোর উপশহরে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক উদ্বোধন।
১৯৯৭ সালে কিয়োতোর উপশহরে বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলক উদ্বোধন।

প্রকৃতপক্ষে, জেনারেল ম্যাক-আর্থার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানের ইচ্ছেকেই বাস্তবায়িত করতে বাধ্য ছিলেন। ট্রুম্যান ছিলেন তার আগের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের অনুসারী। ইহুদি জায়োনিস্ট ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্ট, এলগার হিস, হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইটসহ আরও ইহুদি এবং প্রভাবশালী রাশিয়ান কমিনটার্ন তথা কমিউনিস্ট এজেন্টদের ষড়যন্ত্রের ফসলই হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আণবিক বোমা (মতান্তরে মাস্টার্ড গ্যাস বোমা) তৈরির ম্যানহাটেন প্রজেক্ট এবং টোকিও ট্রাইব্যুনাল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধিয়েছিল ইহুদি জায়োনিস্টরা। রাষ্ট্রবিহীন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা “ডায়াসপোরা” ইহুদিরা একটি নিজস্ব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বহু বছর ধরেই ষড়যন্ত্রে মেতেছিল। বিশেষ করে যুদ্ধে জাপানকে টেনে আনা এবং সাজানো বিচারের মাধ্যমে তাকে অপরাধী করে পরবর্তী বিশ্বজয়ের টার্গেটই করেছিল তারা। আর এই ষড়যন্ত্রে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইহুদি বংশোদ্ভূত ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান ছিলেন ইহুদি তথা জায়োনিস্টদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তার নেতৃত্বেই জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে বিশ্বের প্রথম আণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পোল্যান্ডে জন্ম ইহুদি পদার্থ বিজ্ঞানী পরবর্তীকালে আমেরিকায় আশ্রিত ড, ওপেনহেইমার ছিলেন উক্ত আণবিক বোমা তৈরির জনক। আণবিক বোমা তৈরির প্রকল্প গ্রহণের পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছিল জার্মানিতে জন্ম ও পরবর্তীকালে আমেরিকায় আশ্রিত নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইহুদি পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের প্ররোচনা। ইহুদিদের পরিকল্পিত আণবিক বোমা এবং টোকিও ট্রাইব্যুনালের সুদূর প্রসারী ফলাফলই হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের হটিয়ে দিয়ে তাদের দেশে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ইউরোপে ন্যাটো জোট গঠন, বিশ্বকে দুভাগে যথাক্রমে পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদে বিভক্ত করে শাসন ও শোষণ। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালে আমেরিকার এফবিআই কর্তৃক উদঘাটিত সোভিয়েত কমিনটার্ন গুপ্তচরদের ভয়ঙ্কর “ভেনোনা প্রজেক্ট” পাঠ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং টোকিও ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কিত ষড়যন্ত্রের স্বরূপ সহজেই পরিষ্কার হয়ে যায়। আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী গুপ্ত রাজনৈতিক জোট “ডিপ স্টেট” এর অদৃশ্য ভূমিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠনের পেছনে ছিল না এমন ধারণা করাও অস্বাভাবিক কিছু নয়।

টোকিও ট্রাইব্যুনাল নিয়ে জাপানে ও অন্যান্য দেশে বেশ কিছু বই ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই বিচারকে বিশ্লেষণ করতে গেলে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। আজকে কয়েকটি বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু বলাই সমীচীন।

প্রথমত, প্রাচ্য থেকে এই বিচারের রায়কে প্রথম ও শক্তিশালী রাজনৈতিক একটি প্রতিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কারণ:

১. জাপানকে সাম্রাজ্যবাদী, আগ্রাসনবাদী, গণহত্যাকারী, শান্তিবিরোধী বলে মিত্রশক্তি (আমেরিকা, ব্রিটেন ও নেদারল্যান্ডস) যেভাবে অপরাধী চিহ্নিত করেছে, তার প্রত্যুত্তরে এশিয়ায় অত্যাচারী সাম্রাজ্যবাদী, শান্তিহরণকারী ও গণহত্যাকারী শ্বেতাঙ্গ শক্তি ব্রিটিশ, ওলন্দাজ, ফরাসি, স্পেন, পর্তুগিজ যে প্রথম ছিল, তা মুক্তকণ্ঠে সাহসের সঙ্গে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালি বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল। 

২. যে কারণে এশিয়ায় গণহত্যার জন্য জাপানকে নাৎসির সঙ্গে তুলনা করেছে মিত্রশক্তি, একই কারণে হিরোশিমা, নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে নিষ্পাপ লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করার জন্য আমেরিকারও বিচার তিনি দাবি করেছেন।

৩. যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য যেখানে কোনো আন্তর্জাতিক আইনই ছিল না, তড়িঘড়ি করে নিজেরা আইন তৈরি করে জাপানের কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে, তা ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ এবং প্রহসন। তার এই সুচিন্তিত রায়ের কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের জন্য আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নে জাতিসংঘ পরে উদ্যোগ নিয়েছিল। যুদ্ধের পর জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ল কমিশনে দুবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন বিচারপতি পাল। প্রথম ১৯৫৮ সালে এবং দ্বিতীয়বার ১৯৬২-৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন, যা এক বিরল সম্মান।

১৯৫২ সালে ইসুজু মোটর কোম্পানি পরিদর্শনে বিচারপতি পাল।
১৯৫২ সালে ইসুজু মোটর কোম্পানি পরিদর্শনে বিচারপতি পাল।

দ্বিতীয়ত, এশিয়া তথা বিশ্বব্যাপী প্রথম শান্তিবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল টোকিও ট্রাইব্যুনালের কারণেই। আণবিক বোমায় বিধ্বস্ত হিরোশিমাকে কেন্দ্র করে শান্তিবাদী আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন কতিপয় জাপানি বুদ্ধিজীবী। এর মধ্যে ছিলেন খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ ও আধুনিক প্রকাশনার পথিকৃৎ শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও, নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ড. ইউকাওয়া হিদেও, সাম্যবাদী ও শান্তিবাদী নেতা কাগাওয়া তোয়োহিকো, সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞ তানাকা মাসাআকি প্রমুখ। ট্রাইব্যুনালের সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে পরিণত হওয়া পুত্রতুল্যশিষ্য সাংবাদিক, লেখক ও রাজনীতি গবেষক তানাকা মাসাআকি, হেইবোনশা পাবলিশারের কর্ণধার শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও প্রমুখের আমন্ত্রণে বিচারপতি পাল দ্বিতীয়বার জাপানে যান হিরোশিমা শহরে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন মুভমেন্ট কর্তৃক আয়োজিত এশিয়ার প্রথম শান্তি সম্মেলনে ১৯৫২ সালে। এতে তিনি সভাপতিত্ব করেন। এই সম্মেলনে আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া থেকে শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। তাদের সম্মুখে তিনি উচ্চকণ্ঠে বলেন, “হিরোশিমা, নাগাসাকিতে আণবিক বিস্ফোরণের কৈফিয়তটা কী? জাপানে বোমা ফেলার কারণ কী ছিল? সেই সময় রাশিয়ার মাধ্যমে জাপান আত্মসমপর্ণের চেষ্টা কি করেনি? কেন সেটা আমলে না নিয়ে এমন নিষ্ঠুর বোমা বিস্ফোরণ করা হলো? একই শ্বেতাঙ্গ জাতির দেশ জার্মানিতে বোমা না ফেলে কেন জাপানে ফেলা হলো? সেখানে জাতিগত বৈষম্য কি ছিল না? এতদসত্ত্বেও আজ পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করে একটি বাক্যও শুনতে পাইনি আমরা! তারা তাদের হাত এখনো পরিষ্কার করেনি। এই রকম অবস্থায় কীভাবে তাদের সঙ্গে আমরা শান্তির জন্য কাজ করব?”

এই সফরে তিনি জাপানের একাধিক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সংবর্ধনা সভা, যুদ্ধে স্বজন হারানো জাপানিদের “নিহোন ইজোকুকাই” অর্থাৎ “শোকাহত পরিবার সংস্থা”র সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এবং ইম্পেরিয়াল হোটেলে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় আইনজীবীদের সমাবেশে তার প্রদত্ত “জাপান নির্দোষ রায়” সম্পর্কে সুদৃঢ় কণ্ঠে নিরপেক্ষতা দাবি করেন। তিনি বলেন, “আমি সমবেদনার বশবর্তী হয়ে জাপানের পক্ষে রায় প্রদান করিনি। আইনের সত্যতা রক্ষার্থে সচেষ্ট থেকে নিরপেক্ষ রায় দিয়েছি। আমার রায় নিয়ে গবেষণা করুন। আমার রায় নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ নেই।” যদিও–বা বিশিষ্ট  মনস্তাত্ত্বিক এবং সংস্কৃতি সমালোচক আশিস নন্দী বিচারপতি পালের রায় নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন এবং উক্ত রায়ে পালের অন্তর্নিহিত ভারতীয় ঐতিহ্য এবং আফ্রো-এশীয় জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রভাব পড়েছিল বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। এমন অভিমত কোনো কোনো জাপানি গবেষকের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

বিচারপতি পাল এই ভ্রমণের সময় যুদ্ধের পর জাপান বিগত কয়েক বছরে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। ভুল ইতিহাস বিদ্যালয়ের কোমলমতী ছাত্রছাত্রীদেরকে পড়ানো হচ্ছে বলে ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন। তখন তিনি “জাপানিরা জাপানে ফিরে এসো” (“নিহোনজিন ওয়া নিহোন নি কায়েরে”) বলে জাপানিদের আহ্বান জানান। হিরোশিমা শহরে অবস্থানকালে হিরোশিমা আণবিক জাদুঘরের সম্মুখে স্থাপিত স্মৃতিফলকে খোদিত একটি বাণীর অর্থ তাকে থমকে দেয়। ফলকে জাপানি ভাষায় লেখা “ইয়াসুরাকা নি নেমুত্তে কুদাসাই। আয়ামাচি ওয়া কুরিকায়েশি মাসেনু কারা” অর্থাৎ “শান্তিতে ঘুমাও। ভুলের পুনরাবৃত্তি আর ঘটাব না।” এই বাণীর অর্থ ব্যাখা করে তাকে শোনান দোভাষী ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের জাপান প্রবাসী অন্যতম প্রধান বিপ্লবী এএম নায়ার। ব্যাখ্যা শুনে বিস্ময়ের সঙ্গে, গভীর পরিতাপের সঙ্গে বিচারপতি বলেন, “যারা বোমা ফেলেছে ক্ষমা তাদেরকে চাইতে হবে, তারা ভুল করেছে। জাপানিরা ক্ষমা চাইবে কেন? এটা সঠিক হয়নি। ভুল ইতিহাস শেখানো উচিত নয়।”

২০০৫ সালে টোকিওতে স্থাপিত বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলকের সম্মুখে দর্শকবৃন্দ।
২০০৫ সালে টোকিওতে স্থাপিত বিচারপতি পালের স্মৃতি ফলকের সম্মুখে দর্শকবৃন্দ।

হিরোশিমা জাদুঘরের অনতিদূরে অবস্থিত হোনশোওজি বৌদ্ধমন্দিরে যুদ্ধে নিহত মানুষের আত্মার শান্তি কামনা করে একটি স্মৃতিফলক স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়। এই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত কাকেই য়োশিআকির অনুরোধে একটি বাণী লিখে দেন বাংলা ও সংস্কৃতভাষায় বিচারপতি পাল। ৬ আগস্ট ১৯৪৫ সালের সকাল ৮:১৫ মিনিটে নিক্ষিপ্ত আণবিক বোমার আঘাতে এই মন্দিরসহ সমগ্র হিরোশিমাতে লক্ষাধিক নিহত মানুষের আত্মার শান্তির উদ্দেশে তিনি কাগজে যে বাণীটি লিপিবদ্ধ করেন, সেটি নিম্নরূপ:

নির্যাতিত এশিয়ার মুক্তিযজ্ঞে

মন্ত্রদীক্ষিত স্বর্গত আত্মার

শান্তি কামনায়

–রাধাবিনোদ পাল

৬ নভেম্বর, ১৯৫২

হোনশোওজি মন্দির চত্বরে স্থাপিত পাথুরে স্মারক ফলকটি খোদাইকৃত বিচারপতি পালের বাণী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরবে বিগত প্রায় ৭৪ বছর ধরে। প্রতি বছর অনেক বাঙালি ও ভারতীয় হিরোশিমা শান্তি জাদুঘর পরিদর্শনে যান; কিন্তু জানেন না এই ফলকটির কথা। সেটা আজও যত্নের সঙ্গে সংরক্ষিত হচ্ছে, যা সম্পর্কে অধিকাংশ জাপানিও জানে না। দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বন্দরনগরী ফুকুওকা শহরে অবস্থিত গণমুক্তি আন্দোলনের প্রবল প্রভাবশালী নেতা, রাজনীতিবিদ, গুপ্ত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান “গেনয়োওশা”র প্রতিষ্ঠাতা, চীনা বিপ্লবী ড. সান-ইয়াত সেন, মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু, বিপ্লবী হেরম্বলাল গুপ্ত প্রমুখের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা গুরু তোওয়ামা মিৎসুরুর সমাধিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন বিচারপতি পাল। প্রায় প্রতিদিনই তিনি কোথাও না কোথাও বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, সমাবেশে তার রায় নিয়ে গবেষণা করার আহ্বান জানাচ্ছিলেন—এই উপলক্ষণকে গণমাধ্যম তখন “পা-রু ছেনফুউ” অর্থাৎ “পাল হওয়া” বলে আখ্যায়িত করেছিল। একাধিকবার তিনি যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। টোকিওর সুগামো প্রিজনেও তিনি গিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত প্রধান আসামী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো হিদেকিসহ অন্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য। তোজো তাকে একটি হাইকু লিখে উৎসর্গ করেছিলেন। ফাঁসিতে মৃত্যুর পর জেনারেল মাৎসুই ইওয়ানের শোকানুষ্ঠানেও উপস্থিত হয়েছিলেন বিচারপতি পাল।

বিচারপতি পালের স্বর্গবাসী সহধর্মিণীর পবিত্র স্মৃতির সম্মানার্থে বন্ধু শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও টোকিওর হোনকানজি বৌদ্ধমন্দিরে একটি শোকসভার আয়োজন করেছিলেন তানাকা মাসাআকির কাছ থেকে একটি ঘটনা জানতে পেরে। তানাকা জানতে পেরেছিলেন, অসুস্থ প্রিয়তমা পত্নীকে পাল বলেছিলেন তাকে নিয়ে জাপানে আসবেন, ঘুরে বেড়াবেন। কিন্তু তা আর হয়নি, ১৯৪৮ সালে ট্রাইব্যুনাল শেষে স্বদেশে ফিরে গেলে স্ত্রীর মৃত্যু হয়। অথচ এই মহীয়সী স্ত্রীর অনুরোধেই তিনি ট্রাইব্যুনালে পুনরায় ফিরে এসেছিলেন। জানা যায় যে, টোকিও ট্রাইব্যুনাল চলাকালে বিচারপতি পাল স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ার জরুরি সংবাদ পান মেয়ের কাছ থেকে। ফলে তৎক্ষণাৎ কলকাতায় ফিরে যান। কিন্তু মানবতাবাদী সহধর্মিণী তাকে বলেন, “আজকে জাপানের ভাগ্য বিচারাধীন, তুমি গিয়ে তার জন্য লড়াই করো। আমার জন্য চিন্তা করো না। তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি মরব না।”

বিচারপতি পাল জাপানকে এত ভালোবেসেছিলেন যে, এই দেশে তার মৃত্যু পর্যন্ত কামনা করেছিলেন বলে আমাকে একবার বলেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো হিদেকির নাতনি তোজো য়ুকো সান, যিরি নিজে বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক, গ্রন্থকার ও পরিবেশবাদী কর্মী। তার সঙ্গে ছিল আমার গভীর বন্ধুত্ব। ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি দূরারোগ্য ব্যাধিতে ৭৪ বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। বিচারপতি পালকে তিনি গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন অগণিত জাপানি নাগরিকের মতো। ২০০০ সালে প্রথম সাক্ষাতেই তিনি যখন জানতে পারেন, আমি “পা-রু হানজি”র (হানজি>বিচারপতি) জন্মভূমি তথা বাংলাদেশের লোক তখন বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “পা-রু হানজি ওয়া নিহোনজিন নো ইনোচি নো অনজিন দেসু য়ো!” অর্থাৎ, “বিচারপতি পাল হচ্ছেন জাপানিদের জীবনদাতা!”

হিরোশিমা শান্তি সম্মেলন চলাকালে তার রায়টি এই প্রথম জাপানি ভাষায় প্রকাশ করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিশি নোবুসুকে ১৯৫২ সালে। তারপর কলকাতায় ফিরে গিয়ে ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন মুভমেন্টের একটি শাখা কলকাতায় উন্মুক্ত করে শান্তির পক্ষে কাজ করে যান মৃত্যু পর্যন্ত (১০.১.১৯৬৭)।

২০০৭ সালে জেনারেল তেজো হিদেকির নাতনি তোজো ইউকো সানের সঙ্গে লেখক।
২০০৭ সালে জেনারেল তেজো হিদেকির নাতনি তোজো ইউকো সানের সঙ্গে লেখক।

১৯৬৬ সালে শেষবারের জন্য বিচাপরপতি পাল জাপানে আগমন করেন সম্রাট হিরোহিতোর কাছ থেকে তার অবদানের মূল্যায়নস্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদক “কোক্কা কুনশো”র “পার্পল রিবন” গ্রহণের জন্য।

তৃতীয়ত, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদকে অনুসরণ, অনুকরণ ও বিচারের রায় গ্রহণে জাপানের মহা ভুল ছিল বলে বিচারপতি পাল মনে করেছেন। চীনে জাপানি সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত “নানকিং গণহত্যা”র জন্য জাপানকে নিন্দা জানান। যদিও তখন নানকিং গণহত্যা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে জরিপ চলছিল, যথেষ্ট গবেষণাও হয়নি তখন। সাম্প্রতিককালে যেমন হচ্ছে এবং নানকিং-এ অবস্থিত তখনকার শ্বেতাঙ্গ বিদেশিদের সঙ্গে মিলেমিশে যৌথভাবে জেনারেল চিয়াং কাইশেকের অনুসারীরা বিপুল প্রপাগান্ডা, মিথ্যে সংবাদ প্রচার করছিল যুদ্ধ চলাকালে এবং অনেক জাল আলোকচিত্রের সত্যতা পাওয়া গেছে, যা তৎকালীন দেশ-বিদেশের সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। তথাপি, বিচারপতি পালের রায়ে মেইজি যুগ (১৮৬৮-১৯১২) থেকে শোওয়া যুগের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯২৬-১৯৪৫) পর্যন্ত পাশ্চাত্য শ্বেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদকে অনুসরণ ছিল জাপানের জন্য দুর্বল দিক। শুধু তাই নয়, টোকিও ট্রাইব্যুনালের রায়কে মেনে নিয়ে জাপান মহা ভুলও করেছে–এটাও সত্য। হিরোশিমা জাদুঘরের প্রাঙ্গণে স্থাপিত স্মৃতিফলকটির বাণীটিই তার বড় প্রমাণ। সঠিক ইতিহাস জাপান সরকার তার শিশু ও তরুণ প্রজন্মকে আদৌ শেখানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি আজ পর্যন্ত। ফলে যুদ্ধপূর্ব ও পরবর্তী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে জাপানিরা কিছুই জানে না। এ কারণে আজকে চীন ও দুই কোরিয়ার বিষোদগারের শিকার হচ্ছে জাপান। বিপুল খেসারত দিতে হচ্ছে সঠিক ইতিহাস না পড়ানো, না শেখানোর জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। ইতিহাস শিক্ষা তাই কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, চলমান জাপান-চীন-কোরিয়ার নাজুক সম্পর্ক থেকে তা সহজেই বোধগম্য।

প্রবীর বিকাশ সরকার: সাহিত্যিক ও গবেষক

সম্পর্কিত